কলকাতার ‘কয়লাঘাট’ তথা কয়লাঘাটা নামটি এসেছে কোথা থেকে? এ নিয়ে দু’টি প্রধান মত আছে। ইংরেজদের পুরনো ফোর্ট উইলিয়াম ছিল এখনকার জিপিও-র জায়গায়। সিরাজদৌল্লা ১৭৫৬-এ কলকাতা আক্রমণের সময় এই কেল্লাটি ধ্বংস করে দেন। সেই কেল্লা থেকে গঙ্গার দিকে একটি রাস্তা ছিল। ওল্ড ফোর্ট ঘাট স্ট্রিট বা কেল্লাঘাট স্ট্রিট নামে পরিচিত ছিল সেটি। ‘কেল্লাঘাট’-ই নাকি অপভ্রংশের ফলে ‘কয়লাঘাট’ হয়ে গিয়েছে বলে অনেকের বিশ্বাস। তবে বিশ্বাসটি কষ্টকল্পিত। হরিসাধন মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘কলিকাতা সেকালের ও একালের’ বইয়ে লিখেছেন, “অনেকে এই কেল্লাঘাট নাম হইতে বর্তমান কয়লাঘাট নামকরণ হইয়াছে, এরূপ অনুমান করেন। ইহা কতদূর সঙ্গত তাহা ঠিক বলা যায় না”।
আবার একদল বিশেষজ্ঞ সত্যি সত্যিই ঘাটটিকে কয়লা আমদানি-রপ্তানির ঘাট বলেই ভাবেন। দ্বারকানাথ ঠাকুরের কয়লার ব্যবসাও এই ঘাট থেকেই শুরু বলে তাঁদের বিশ্বাস।
তবে কলকাতার ‘কোল-কানেকশন’ মনে হয় অনেক পরের ব্যাপার।
অন্য কোনও ব্যুৎপত্তি সম্ভব কি না, ভাবতে ভাবতে হঠাৎই মনে এল ‘কয়াল’-দের কথা। ‘কয়াল’ একটি নিখাদ বাংলা শব্দ। আরবি থেকে এসেছে বাংলাভাষায়।

কয়াল-এর মানে, ‘মাপদার’ বা জিনিসিপত্রের ওজনকারী। মুঘল আমলে কয়াল সরকারি পদ ছিল। বাঙালির পদবিও হয় ‘কয়াল’। কয়েক যুগ আগেও গ্রামের দিকে কয়ালদের দাপট দেখা যেত। পেল্লায় ওজনদাঁড়িতে একদিকে মন মন বাটখারা চাপিয়ে অন্যদিকে ধান বা পাট চাপিয়ে ওজন করত কয়াল বা মাপদাররা। কলকাতার কয়লাঘাট অঞ্চলের পারিপার্শ্বিক অবস্থাটা দেখলে দেখা যাবে, সেখান থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে জিপিও, যেখানে ১৭৫৭-র আগে ছিল পুরনো ফোর্ট উইলিয়াম। পাশে ব্যাঙ্কশাল ঘাটে ছিল ওলন্দাজদের শুল্ক আদায়ের অফিস। কেল্লার গোলাবারুদ মাপতে কয়ালদের ডাক পড়ত। আবার জাহাজের মালপত্রের ওজন করতেও এদের শরণাপন্ন হত ওলন্দাজরা। মালপত্রের সঠিক ওজন হলে তবেই না শুল্ক আদায় সম্ভবপর হবে! আসলে কয়লাঘাট জায়গাটির আদিনাম ছিল ‘কয়াল-ঘাট’। এখানেই ডেরা বেঁধেছিল মাপদার তথা কয়ালরা। হৃষিকেশ ও ভাগলপুরে গঙ্গার তীরে ‘কয়ালঘাট’ বলে দু’টি জায়গার অস্তিত্ব এখনও আছে। বাংলাদেশের খুলনাতেও আছে কয়ালঘাট। খোদ কলকাতাতেই ভবানীপুরে আদিগঙ্গায় একটি ঘাট আছে, যার নাম ‘গোলক কয়ালের ঘাট’। তার মানে, নদীমাতৃক ভারতবর্ষের নদ-নদীর ঘাটে ঘাটে ছিল কয়ালদের আস্তানা।
বর্ধমানে আছে কয়ালপাড়া। আছে কামদুনিতেও।
কয়ালদের কাজ ছিল মাপদারের। গ্রামে গ্রামে ধান-পাট মাপার কাজ তারাই করত।
কলকাতার কয়লাঘাটায় অনেকবার গিয়েছি বিভিন্ন কাজে। খুঁজে দেখেছি কয়ালদের ডেরাগুলি কোথায় ছিল। অনেককে জিজ্ঞেস করেও দেখেছি। অনেকে বলেছে, জানি না। অবাঙালি ব্যবসাদাররা বলেছে, পাতা নেহি। কেউ কেউ জিজ্ঞাসা শুনে মুখের দিকে তাকিয়ে হেসেছে। এই বুরবাক কোথা থেকে আমদানি হল, ভেবে মজা পেয়েছে।

তাতে অবশ্য আমার কিছু যায় আসে না।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর শ্রীকান্ত উপন্যাসে রেঙ্গুনগামী জাহাজ কয়লাঘাটা থেকে ছাড়ার কথা লিখেছেন। কয়লাঘাটা থেকেই তখন জাহাজ ছাড়ত। জাহাজের জিনিস ওজন করত কয়ালরা। নন্দ মিস্ত্রী ও টগর বোষ্টমী হয়ত জানত কয়ালদের ঠিকানা। আমরাই জানি না।
ডেভিড হেয়ার কয়লাঘাটার বাড়িতে থাকতেন বলে শুনেছি। কয়লাঘাটায় ছিল ঠাকুর বংশের একটি শাখা।