ওঁ বিশ্বরূপস্য ভার্যাসি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে।/ সর্বতঃ পাহি মাং দেবী মহালক্ষ্মী…
বাংলার ঘরে ঘরে কোজাগরী লক্ষী পূজো এক চিরন্তন উৎসব। “আশ্বিন পূর্ণিমায় যখন হৈমন্তিক শস্য ঘরে আসবে, তখনকার ব্রত এটি। সন্ধ্যার সময় লক্ষীপুজো।”
ভাগবত্ পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ ও ব্রহ্মা পুরাণ অনুযায়ী ভৃগুর ঔরষে ও দক্ষরাজ প্রজাপতির কন্যা খ্যাতির গর্ভে লক্ষ্মী দেবীর জন্ম। লক্ষ্মীর দুই ভাইয়ের নাম ধাতা ও বিধাতা। শতপথ ব্রাহ্মণে, ব্রহ্মা থেকে লক্ষী দেবীর জন্ম বলা হয়। বিষ্ণুপত্নী লক্ষ্মী স্বর্গ মর্ত্য পাতাল, সর্বত্র ধনলক্ষ্মীরূপে পূজিতা।
বাংলায় কোজাগরী লক্ষীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৃষি সমাজ। এর প্রমাণ মেলে পুজোর উপকরণ ও আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে। পুজো হয় মূলত প্রতিমা, সরা, নবপত্রিকা বা কলার পেটোর তৈরি নৌকায়। পূর্ববঙ্গে সরাতেই লক্ষী পুজোর প্রচলন ছিলো বেশি। দেশভাগ, বিশ্বায়নের পর পশ্চিমবঙ্গের অঞ্চল ভেদে সরাতেও দেখা যায় নানাব্যাতিক্রম।
আদিম মানুষ বিশ্বাস করতো গুহার গায়ে বাইসনের ছবি এঁকে শিকারে গেলে ভালো শিকার হবে, বাংলার মেয়েরাও সংসার ও সংশ্লিষ্ট জীবনের শুভ কামনা করে আলপনার মধ্যে দিয়ে।
লক্ষীপুজোয় আলপনার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্কন হলো লক্ষীর ‘পা’। প্রাগৈতিহাসিক যুগে শিকারে গেলে মাটিতে পায়ের ছাপ দেখে কোন জন্তু এসেছিল মানুষ বুঝতে পারতো। সেই ধারণায় হয়তো মা লক্ষীর আগমনের প্রতীক হিসাবে এই চিহ্নের প্রচলন। মা লক্ষী সম্পদের দেবী। আলপনায় লক্ষীর পায়ের ছাপ গৃহে দেবীর আগমনকেই বোঝায়। কথিত আছে, আলো-আঁধারিতে দেবী আলপনা দেখে বুঝতে পারেন কোন গৃহে দেবীর আরাধনা হচ্ছে, সেই গৃহে দেবী বিরাজ করেন।
আলপনায় মানুষের পা ও দেবীর পায়ের মধ্যে বিশেষ প্রকারেই পার্থক্য রক্ষা করা হয়। এটি দেখতে অনেকটা ইংরেজি ‘S’ অক্ষরের মতো। ছোট্ট ছোট্ট করে পা আঁকা হয়। এস অক্ষরের মাথায় পাঁচটি আঙ্গুল আঁকা হয়। বাড়ির গৃহিণীরা চৌকাঠ থেকে শুরু করে দেবীর ঘট বা মূর্তি রাখার আসন অবধি পায়ের চিহ্ন আঁকেন। তার সঙ্গে থাকে ধানের ছড়া। আমাদের কৃষিনির্ভর দেশে ধান সমৃদ্ধির প্রতীক। মাঠের সোনালী ধানের শীষ মাথা নোয়ানোর অর্থ, লক্ষীর কৃপায় ফসল ভালো হয়েছে। ঘরের কেউ যেন অভুক্ত না থাকে, তার প্রতীক হিসাবেও ধানের শীষ আঁকা হয়।
গ্রাম বাংলার নিকানো মাটির ভূমিতে সাদা পিটুলির আলপনায় এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা থাকে। রাঢ় অঞ্চলের লাল মাটিতে সেটি আরেক রকমের সুন্দর।
এখন যদিও চটজলদি স্টিকার দেওয়া আলপনা পাওয়া যায়। তবে নিজ হাতে যে আবেগ, ভালোবাসা দিয়ে আলপনা আঁকা হয়, তার মুগ্ধতাই আলাদা।
দেবীর বাহন দুধসাদা পেঁচা। মনে করা হয়, পেঁচা সৌভাগ্যের প্রতীক। শিকারী পাখি পেঁচা, যখন ওড়ে তখন নাকি বাতাসও কাঁপে না। যার দরুণ শিকার টের পায়না শিকারীর। তেমনি, সম্পদ সংগ্রহ করতে হবে নিঃশব্দে এবং তা রক্ষা করতে হবে অতন্দ্র প্রহরী রূপে।
‘কোজাগরী’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ‘কো জাগতি’ অর্থ্যৎ ‘কে জেগে আছো’ কথাটি থেকে।

এছাড়াও ধানক্ষেতের চারিদিকে ইঁদুর বা মূষিকের বাস। এরা প্রভূত ধানের ক্ষতি করে। পেঁচার আহার হলো ইঁদুর। পেঁচা ইঁদুর খেয়ে শস্য রক্ষা করে। নিশাচর পেঁচা তাই হয়তো দেবীর বহন।
লক্ষী পুজোয় প্রসাদ হিসেবে নারকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু, মুড়ির মোয়া, চিড়ের মোয়া, মুড়কি, মটকা, পাঁচ রকমের ফল, মিষ্টি দেওয়া হয়। অনেকেই নিরামিষ ভোগ হিসেবে খিচুড়ি, পাঁচরকম ভাজা, ফুলকপির তরকারি, চাটনি, পায়েস ইত্যাদি নিবেদন করেন। তবে বাঙাল ঘরে খিচুড়ির সঙ্গে জোড়া ইলিশ মাছ দেওয়ার রীতি রয়েছে। নিয়ম আছে, লক্ষী পুজোয় ইলিশ মাছ খাওয়ার পর তা আবার সরস্বতী পুজোয় খাওয়া হবে, মধ্যে ইলিশ ভক্ষণে বিরতি। পূর্ববঙ্গে বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকা, বিক্রমপুরে জোড়া ইলিশ খাওয়ার রীতি থাকলেও ফরিদপুরের কোটালীপাড়ায়, পাবনা-সহ বেশ কিছু জায়গায় নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়।
দেবীর প্রিয় পুষ্প পদ্ম, কদম্ব, জবা, কামিনী৷ যৎসামর্থ্য পুষ্প নিবেদন করা হয়৷ আতপ চাল, দূর্বা, চন্দন, পান, হরিতকি, হরিদ্রা ইত্যাদি পুজোয় ব্যবহার করা হয়।
কোজাগরী লক্ষীপুজা রাত্রের পূজা নয়। কোজাগরী লক্ষীপুজা হচ্ছে প্রদোষকালীন সময়ের পূজা!
আর এই প্রদোষ সময় কাল হচ্ছে……..
সুর্যাস্ত হবার পরের দুই মুহুর্তকাল সময় যা ঘড়ির সময়কাল অনুসারে ১ ঘন্টা ৩৬ মিঃ। অথবা চার দণ্ড সময়কাল যা ২৪×৪ = ৯৬ মিঃ। এই নিয়মে বুধবার কোজাগরী লক্ষীপুজার সঠিক সময়।
মা লক্ষীকে বাঙালী দিব্যলোকের দেবী হিসাবে শুধু নয়, বাংলার ঘরে ঘরে হৃদয়ে আসন পেতে মা কে রেখেছেন। কোথাও যেন তিনি ঘরের সুরুপা গৌরী যিনি লাল টুকটুকে শাড়ি, শাঁখা-সিঁদুরে সেজে একহাতে ঝাঁপিটি আগলে অন্য হাতে অভয় দান করছেন। দেবীর পায়ের কাছে বসে আছে বাধ্য বাহনটি—লক্ষী পেঁচা।
অনেকের ধারণা লক্ষ্মীপূজোর দিন, কাউকে দানধান করলে হয়তো দেবী রুষ্টা হন ও তার সাথে চলে যান৷ এমনটা নয়৷ বরং যিনি দানী, দয়ালু তিনিই কমলার কৃপাপাত্র৷ তাই আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী দান করুন৷ পারলে অভুক্তকে ভোজন করান৷ বাড়িতে চিৎকার, কলহ, অশান্তি থেকে বিরত থাকুন৷ যে গৃহে কলহ হয়, অশান্তি হয় সেখানে অলক্ষ্মীর নিত্য বাস হয়৷ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বস্ত্র পরিধান করুন।
মা লক্ষীর ব্রতকথা বা পয়ার ছন্দে লেখা পাঁচালি পড়ে এই কথাই মনে হয়, দুঃখ দুর্দশাপূর্ন জীবনের অসম লড়াইয়ে মুক্তির পথ লুকিয়ে আছে মহালক্ষীর জাগরণে। সরল ভাষায় লেখা এই পাঁচালীর সঠিক সময়কাল জানা নেই, তবে প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পাঁচালি পাঠের মধ্যে স্ত্রীশিক্ষার ব্যাপারটি ও উঠে এসেছে।
প্রত্যেক নারী লক্ষী স্বরূপা। নিজগুনে তাঁরা অনন্যা। তাই বাড়ির নারী-সদস্যদের যদি একটু বেশি যত্নে, সম্মানে রাখা যায়, সংসার সুখের হয়। মা লক্ষী বাঁধা পড়েন সম্পর্কের বাঁধনে। লক্ষী আসলে কতগুলো জীবনের পজিটিভ গুণ। তাই সেই গুণগুলো পুরুষদের মধ্যে খুঁজে পেলে, বাঙালি তাকেও বলছে ‘লক্ষ্মীমন্ত’।
দেবতার সঙ্গে ভক্তের যোগ স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় লক্ষ্মীপুজোর মধ্যে দিয়ে। তাই ঘরের গৃহিণীটি খুব সহজেই গেয়ে ওঠে,— ‘শঙ্খ বাজিয়ে মাকে ঘরে এনেছি/ সুগন্ধি ধূপ জ্বেলে আসন পেতেছি/ প্রদীপ জ্বেলে নিলাম তোমায় বরণ করে/ আমার এ ঘরে থাকো আলো করে।।
খুবই সুন্দর লেখা। অপ্রতীম।
তথ্য সমৃদ্ধ লেখা।
খুব ভালো তথ্যসমৃদ্ধ একটি লেখা।