দেবাশিস ভট্টাচার্য ও ইন্দ্রজিৎ রায়
কলকাতা ও হাওড়া কর্পোরেশনের ভোট ১২ এপ্রিল এবং অন্য পুরসভার ভোট ২৬ এপ্রিল হতে পারে বলে জানা গেছে। শুনেই বিজেপি ভোট পিছনোর জন্য রাজ্য নির্বাচন কমিশনে দরবার করেছে। বিজেপি বলছে, পরীক্ষার জন্য এখন মাইক বাজাতে পারা যাবে না। পরীক্ষা শেষ হলে মাইক বাজান যাবে। সে ক্ষেত্রে প্রচারের সময় অনেক কমে যাবে। মে মাসে করলে বিজেপি বলতো প্রচণ্ড গরম, জুন-জুলাইয়ে করলে বলতো, বর্ষায় ভোট হবে কি করে? বিগত পাঁচ বছর ধরে পুরসভার ওয়ার্ড ধরে ধরে কোনও সাংগঠনিক প্রস্তুতিই নেয় নি বিজেপি। কেউ বলবেন, তাহলে লোকসভা ভোটে ১৮টি আসন পেল কি করে? বিজেপি ওই ১৮টি আসন জিতেছে তাৎক্ষণিক হাওয়ায়, সেই হাওয়া মিইয়ে গেছে, তার প্রমাণ কালিয়াগঞ্জ, করিমপুর, খড়গপুর সদর বিধানসভার আসনের ফল। ১২ এপ্রিলের বদলে ১২ ডিসেম্বর ভোট হলেও বিজেপি সুবিধে করতে পারবে না। কারণ তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে ইতিবাচক ফ্যাক্টরগুলি হলো—এক. প্রতিটি বুথে পুরুষ ও মহিলা মিলিয়ে অন্তত ৫০ জন সক্রিয় কর্মী আছে। বিজেপির ৫ জনও নেই। দুই. পুরসভার কাজ যথেষ্ট হয়েছে। কলকাতায় ১৬ লক্ষ বস্তিবাসী ভোটার আছেন, অস্বীকার করবো না বস্তির অবস্থা বামফ্রন্টের আমলেই কিছুটা ভাল হয়েছিল। পাকা শৌচালয়, বস্তির মধ্যেকার সিমেন্টের রাস্তা, আলো সে সব বামফ্রন্ট করেছিল। তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত পুরসভা আরও আধুনিক করেছে। উদবাস্তু কলোনিগুলোর বাসিন্দারা খুশি, কিছু কিছু ব্যাপারে সমস্যা আছে কিন্তু সেগুলি ১০ শতাংশ নেতিবাচক ফ্যাক্টর। কলকাতায় বে-আইনি নির্মাণ নিয়ে কিছু অভিযোগ আছে। যদিও মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেছেন, সব বে-আইনি নির্মাণ ভেঙে দেওয়া হবে।
প্রয়াত মুখ্য-নির্বাচন কমিশনার টি.এন সেশন বলেছিলেন, নির্বাচন দিন ঘোষণা থেকে নির্বাচন গ্রহণের তারিখ ৮/১০ দিনের বেশি ফারাক থাকবে না। ক্ষমতাসীন দল ৫ বছরে কি কি কাজ করেছেন, বিরোধীরাই বা ৫ বছরে কি আন্দোলন গড়ে তুলেছে সেটা জনতা বিচার করবেন। হটাত ভোটের মুখে ৩৩ বা ৩৫ দিন ডুগডুগি বাজালেই হবে না। ১৯৯১-৯২ সালে টি.এন সেশন যখন এমন সব কথা বলেছিলেন তখন বিজেপি সমর্থন করেছিল। এখন তাহলে অল্প দিনে প্রচার সারতে হবে জেনে ভয় পাচ্ছে কেন? বিগত ৪.৫ বছরে কলকাতা কর্পোরেশনের সদর, অথবা কোনও বরো এলাকায় বা কোনও ওয়ার্ড নিয়ে বিজেপির কোনও মণ্ডলের কোনও মোড়ল প্রতিবাদ আন্দোলন করেন নি। সিঁথির মোড়ে ১ নং ওয়ার্ড থেকে দক্ষিণ শহরতলির জোকায় ১৪৪ নং ওয়ার্ডে কোনটায় বিজেপি কি করেছে? বড়বাজারের ২২ ও ৪৫ নং ওয়ার্ড যেটা বিজেপির বাঁধা শিট সেখানেই বা বিজেপি কি করেছে? বিপরীতে প্রতিটি ওয়ার্ডে এমনকি ২২ এবং ৪৫ নং ওয়ার্ডেও বারো মাসে তেরো পার্বণ লাগিয়েই রেখেছে। বিধায়ক কাপ, কাউন্সিলর কাপ, পিঠেপুলি উৎসব, ফুচকা উৎসব, লিট্টি-চোখা উৎসব, ঘুরি উৎসব যেখানে যেরকম দরকার তাই করেছে, আর বিজেপির মোড়লরা সেই সব উৎসবে গিয়ে খেয়ে, শালপাতা চেটে, বাহবা দিয়েছেন। বিজেপির পয়সা আছে কিন্তু মাথা খাটিয়ে জনতাকে জড়ো করার মতন কোনও পরিকল্পনা করতে পারে না। শুধু মিডিয়া নির্ভর রাজনীতি করে বাংলায় থই পাওয়া দুষ্কর। তৃণমূল কংগ্রেস বহুবছর ধরে একটানা লড়াই করে ২০১০ সালে একা পুরসভাগুলি জিতেছিল। ভগবানের ভরসায় থেকে জেতেনি, লড়াই করে জিততে হয়েছে। এরপর আছে মমতা ব্যনার্জি ফ্যাক্টর। ২০০০ সাল পর্যন্ত সিপিআইএময়ের যেমন জ্যোতি বসু ফ্যাক্টর ছিল, বিগত ১০ বছরে তৃণমূল কংগ্রেসের তেমন মমতা ফ্যাক্টর কাজ করছে। মমতা ব্যানার্জি ৪/৫টা ওয়ার্ড ধরে পদযাত্রা অথবা জনসভা করবেন তাতেই জোড়াফুলের পক্ষে আলোড়ণ ও ঢেউ উঠবে। দিলীপ ঘোষের সেই ক্যারিশ্মা ১০ শতাংশও আছে? ভোটে ক্যারিশ্মাও একটা ফ্যাক্টর। মোদীর ক্যারিশ্মা লোকসভা ভোটে কাজ করেছে অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু বাংলার পুরভোটে মোদী প্রচারে আদৌ আসবেন কিনা সন্দেহ, আসলেও লাভ হবে না।
যোগাযোগ করুন : দেবাশিস ভট্টাচার্য-৯৮৩০৪৯০০১২, ইন্দ্রজিৎ রায়-৯৮৩০০৮৪১৬৪