শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাই কোর্টের ৫ বিচারপতির বিশেষ বেঞ্চ রাজ্যের ২ মন্ত্রী-সহ এক বিধায়ক এবং কলকাতার প্রাক্তন মেয়র জামিন মঞ্জুর করলেন। শুক্রবার বেলায় রিকল মামলার এজলাসে সলিসিটর জেনারেল ফের জামিনের বিরোধিতা করেন। কিন্তু বেঞ্চ তাঁর আপত্তি অগ্রাহ্য করে এসজিকে পালটা প্রশ্ন করেন, ৪ বছর ধরে যাঁদের গ্রেফতার করার দরকার হল না তাঁদের আঁজ গৃহ বন্দি রাখার অর্থ কী? তাছাড়া মহামারির সময় যখন তাঁদের প্রকাশ্য উপস্থিতি একান্ত কাম্য।
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে একটি স্টিং ভিডিও ঘিরে তোলপাড় হয়েছিল রাজ্য। স্টিং অপারেশনে দেখা যায় তৃণমূলের একাধিক মন্ত্রী ঘুষ নিচ্ছেন। তৃণমূলের বেশ কয়েকজন সাংসদকেও দেখা যায় টাকা নিতে। ভোটের আগে এই ভিডিও ঘিরে চরম অস্বস্তিতে পড়ে তৃণমূল। ইতিমধ্যে কেটে গিয়েছে প্রায় পাঁচ বছর। গঙ্গা দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। গত লোকসভা নির্বাচনে ভাল ফল করে এ রাজ্যে পায়ের নীচে একটু জমি বিজেপি ভাবলো এবার গোটা বাংলা কব্জা করতে হবে। কিন্তু সেই আশা বালির বাধের মতো ভেঙ্গে পড়ল বিধান সভা নির্বাচনে। অন্যদিকে সিবিআই ফের পাঁচ বছরের মাথায় সেই ঘটনাকে নতুন মোড় দিতে তৎপর হয়ে ওঠে।
সবাই বুঝলো কেন্দ্রের বিজেপি সরকার প্রতিহিংসার খেলায় মেতেছে। সিবিআইকে নারদ মামলায় অভিযুক্ত তৎকালীন চার বিধায়কের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করার অনুমতি দিলেন রাজ্যপাল। এঁদের মধ্যে তিন জনই ফের নির্বাচনে জিতে বিধায়ক হয়েছেন। আর একজন বিজেপিতে যোগ দিলেও প্রার্থী না হতে পেরে বিজেপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। উল্লেখ্য, স্টিং অপারেশনে শুভেন্দু অধিকারীকেও দেখা যায়। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণভাবে তাঁর নাম রাজ্যপালের অনুমোদন দেওয়ার তালিকায় নেই। কেন নেই? সিবিআই-এর বক্তব্য অনুযায়ী, যে সময়ে মামলা শুরু হয়েছিল, সেই সময়ে শুভেন্দু সাংসদ ছিলেন। তাঁর ক্ষেত্রে অনুমোদন দিতে পারেন লোকসভার অধ্যক্ষ। প্রশ্ন, বিধায়কের জন্যেও তো বিধানসভার অধ্যক্ষের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন। অনেক আইনজীবীর মতে, এখনও নতুন বিধানসভা গঠন হয়নি, এই অবস্থায় রাজ্যপাল অনুমতি দিতে পারেন।
নারদা মামলার তদন্তে সিবিআই ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে ২০১৪ সালে কলকাতায় এসেছিলেন সাংবাদিক ম্যাথু স্যামুয়েল। তৃণমূলের একাধিক সাংসদ-বিধায়কের স্টিং অপারেশন করা হয়। পুলিশকর্তারও স্টিং করা হয়। কলকাতা হাই কোর্টে নারদ কাণ্ড নিয়ে মামলা হয় এবং হাই কোর্টের নির্দেশে তদন্তে নামে সিবিআই। ২০১৬ ভোটের আগে শাসকদলকে চাপে রাখতেই সেই কৌশল ছিল বলে মনে করা হয়। কিন্তু ২০১৬-র বিধানসভা ভোটের বাক্সে তার কোনও প্রভাব পড়েনি। ২০০-রও বেশী আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন মমতা।
এবারও মামলা শুরু হয় কলকাতা হাই কোর্টে। মাঝপথে সিবিআই মামলা তুলে নিয়ে যায় সুপ্রিম কোর্টে। সুপ্রিম কোর্টে সিবিআইয়ের আর্জি ছিল, গৃহবন্দির নির্দেশ খারিজ করে নারদ কাণ্ডে অভিযুক্ত চার নেতা-মন্ত্রীকে ফের হাসপাতালে পাঠানো হোক। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে শুনানি শুরু হতেই একের পর এক বিষয়ে রীতমতো বেকায়দায় পড়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। আদালতে সওয়াল-জবাবে সিবিআইয়ের আইনজীবীদের রীতিমতো কঠিন প্রশ্নবাণের মুখে পড়তে হয়।একাধিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহেতাও। এমতাবস্থায় অবস্থায় কার্যত মান বাঁচাতেই সিবিআইয়ের আইনজীবীরা পিছু হটে। আগের দিন সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি যে মনোভাব দেখিয়েছিলেন, তাতে মামলার রায় সিবিআই-এর বিরুদ্ধে যাওয়ারও প্রভূত সম্ভাবনা ছিল। আগেভাগেই তা টের পেয়ে সিবিআই কলকাতা হাই কোর্টে ফিরে আসে।
তবে বিধ্বংসী করোনাকালেই নারদকাণ্ডে দুই মন্ত্রী-সহ চারজনকে গ্রেপ্তার করায় বিজেপির বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। বিধানসভা ভোটে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ফেরা সরকারের ওপর এটা যে অনৈতিক আক্রমণ এবং প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার একটা কৌশল তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনীতিক থেকে সাধারণ মানুষ এটা বুঝলেও কি সেটা বিজেপি নেতারা জানতেন না? তাহলে কেন ছ’বছর ধরে চলা মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের এটাই ঠিক সময় বলে তারা মনে করলেন? তার একটাই কারণ, বিজেপি যেনতেন বাংলা দখল করতে চেয়েছিল। তারা বাংলার ভিতর বাহির আন্দাজ না করেই ধরে নিয়েছিল সেটা ঘটবে।কিন্তু বাংলার মাটি যে বড় কঠিন ঠাঁই সেটা বিজেপি ভাবতে পারেনি। এতকাল পরে সিবিআইকে লেলিয়ে দিয়ে তৃণমূল বিধায়কদের গ্রেফতারের ছক প্রতিহিংসা ছাড়া আর কি?
তবে বিজেপি ছক কষেছিল এক ঢিলে দু’টি পাখি মারার। একদিকে বাংলায় গো-হারান হারের বদলা, অন্যদিকে দলবদলুদের বিজেপিতে ধরে রাখার মোক্ষম দাওয়াই।শোভনকে গ্রেপ্তার করিয়ে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে যে ফের দল বদলে দিদির আশ্রয়ে ফিরে গেলে পরিণতি কী হবে! অনেকটা যেন ঝিকে মেরে বউকে শেখানোর মতো। যখন প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ করোনার বিষাক্ত ছোবলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। অক্সিজেনের আকাল, হাসপাতালে জায়গা নেই, শ্মশানে, কবরস্থানেও ঠাঁই হচ্ছে না। ঠিক তখনই কেন্দ্রের বিজেপি সরকার আর তার তোতাপাখি ঝাপিয়ে পড়ল। কিন্তটফল কি হিল? দুদিন আগে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মাথা হেঁট আর আজ কলকাতা উচ্চ আদালতে পুড়লো মুখ।
‘সোনার বাংলা’ গড়তে চেয়েছিলেন বিজেপির দিল্লির নেতারা, কিন্তু করোনার এমন ভয়ঙ্কর সময়ে তারা নিজেরাই বুঝিয়ে দিলেন, তাঁরা আসলে বাংলার মঙ্গল চাননি, চেয়েছিলেন দখল করতে। সেটা যখন হল না তখন যেভাবেই হোক বাংলার সর্বনাশ করাটাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
এই মামলায় প্রশ্নটা প্রাতিষ্ঠানিক বেআইনির। সিবিআইয়ের মাথা মুড়নো নয়। দেখানো আমিও ইচ্ছে করলে আইনের
মারপ্যাঁচে ১০ দিন হেফাজত করে দিতে পারি।
প্রতিহিংসার রাজনীতি খুব সহজে থেমে যায় না। বিজেপির মতো দল, যাদের টাকা আছে, নানা ক্ষমতা আছে ওরা সমস্ত শক্তি
দিয়ে বাংলাকে শেষব করার চেষবটা করবে।
তিন জনই ফের নির্বাচনে জিতে বিধায়ক হয়েছেন- এতেই মোদি বেদম খেপেছেন। তাছাড়া সুনার বাংলার স্বপ্ন ঘুচে যাওয়ায়
প্রতিহিংসার জালা যে তীব্র হয়ে উঠেছে … রিল আভি বাকি হ্যায় দেখতে রহো
কেউ ঘাসে মুখব দিয়ে চলে না। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যে প্রতিহিংসার খেলায় মেতেছেতা বুঝতে কারও বাকি নেই।
বিজেপি ভুলে যাচ্ছে সব কিছুর একটা সীমা আছে। শুধু বাংলা নয় সব রাজ্যেই ওদের বিদায় ঘন্টা বাজছে।