বছর কুড়ি আগেও বাঙালি পুস্তকপ্রেমীরা গড়ের মাঠ বা ময়দানের ময়দানবীয় যজ্ঞে শামিল হতেন।
বইমেলা কোথায় হবে? না ময়দানে৷ ময়দানটা কোথায়? ও হরি, তাও বোঝেন না, ওই যে ব্রিগেডে৷ ওই, ওই যে গড়ের মাঠ! হ্যাঁ, হ্যাঁ এবার বোঝা গেছে৷ ওই তো ফোর্ট উইলিয়ামের মাঠ, সেখানেই! কেল্লা বা ‘গড়’-এর সঙ্গে গড়ের মাঠকে যেন একাকার করে নেওয়া হয়েছে৷ গড় যেখানে তৈরি হয়েছে, সেটাই হচ্ছে গিয়ে গড়ের মাঠ৷ আসলে কিন্তু ব্যাপারটা অত সোজা নয়৷
ইংরেজদের পুরনো কেল্লাটার সামনে অনেক বড়ো বড়ো বাড়ি থাকায় যুদ্ধ-শাস্ত্র অনুযায়ী শত্রুপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করতে অসুবিধা হত৷ ১৭৫৬য় সিরাজদৌল্লার কলকাতা আক্রমণের সময় পুরনো কেল্লা ভীষণরকমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই পলাশির যুদ্ধের পরে ইংরেজ শাসক তথা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গোবিন্দপুরের ‘গড়ের মাঠে’ নতুন কেল্লা বানাতে শুরু করল৷ ‘গড়ের’ শব্দটি সংস্কৃত ‘গড্ডর’ থেকে এসেছে। মানে ভেড়া বা মেষ৷ যে মাঠে ‘গড়ের’ বা ভেড়া চরে বেড়ায়, সেটাই ‘গড়ের মাঠ’৷ কলকাতার ওই অঞ্চলে তখন গোচারণভূমি ছিল, ছিল নবীন ঘাসে পূর্ণ উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। রাশি রাশি ভেড়ার পাল ঘুরে বেড়াত, সঙ্গে গোরুবাছুরও থাকত নিশ্চয়ই৷ সেই থেকেই ‘গড়ের মাঠ’ বলে পরিচিতি লাভ করে এই তল্লাটটা৷ এখানেই গড়ে উঠল ইংরেজ বাহাদুরের নতুন কেল্লা৷ দ্বিতীয় ফোর্ট উইলিয়াম। কলকাতায় ‘গড়ের মাঠ’ যেমন আছে, তেমনি গড়ের হাটও ছিল৷ খিদিরপুরের দিকে এর দেখা মিলবে৷ পুরনো উত্তর কলকাতায় গরানহাটা বলে যে জায়গা, তারও পুরোনো ইতিহাস ঘাঁটলে গড়ের হাটের চিহ্ন পাওয়া যাবে৷ গড়েরিয়া বলে একটি সম্প্রদায় আছে এখনও। এদের কাজ হল মেষ বা ভেড়া প্রতিপালন করা। গড়ের বা ভেড়া কলকাতায় প্রথম আসে মোগলদের সঙ্গে আসা বালু্চদের সঙ্গে। আর্মেনিয়ান হোলি ন্যাজারেথ চার্চ ১৭২৪ এ স্থাপিত। প্রথম থেকেই ওদের ক্রিসমাসের ডিশ লিবাস বানাতো ভেড়ার মাংস বা ল্যাম্ব দিয়ে। তার মানে কলকাতায় দ্বিতীয় ফোর্ট উইলিয়াম হওয়ার আগেই কলকাতায় ভেড়ার পাল চরত।
পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের এক বছর পর ১৭৫৮ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গোবিন্দপুর গ্রামের কেন্দ্রস্থলে নতুন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের নির্মাণকার্য শুরু করে। উক্ত গ্রামের বাসিন্দাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং তালতলা, কুমারটুলি ও শোভাবাজার অঞ্চলে জমি দেওয়া হয়। ১৭৭৭ সালে দুর্গনির্মাণের কাজ শেষ হয়। “যে ব্যাঘ্র-সংকুল জঙ্গলটি চৌরঙ্গী গ্রাম থেকে নদীকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল, সেই জঙ্গলটি কেটে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়। এরই ফলে কলকাতার গৌরব ময়দানের বিস্তৃর্ণ তৃণক্ষেত্রটির সৃষ্টি হয়। এই মুক্ত প্রাঙ্গণের উদ্ভব এবং দক্ষিণের বসতি অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা খালটি বুজিয়ে দেওয়ার ফলে ইউরোপীয় বাসিন্দারা দুর্গের আবদ্ধ সংকীর্ণ পরিমণ্ডল পরিত্যাগ করতে শুরু করেন। অবশ্য ১৭৪৬ সাল থেকেই চৌরঙ্গী অঞ্চলে বাসিন্দাদের সরে আসা শুরু হয়েছিল।”
১৯০৯ সালে এইচ. ই. এ. কটন লিখেছেন, — “The great Maidan presents a most refreshing appearance to the eye, the heavy night dew, even in the hot season, keeping the grass green. Many of the fine trees with which it was once studded were blown down in the cyclone of 1864. But they have not been allowed to remain without successors, and the handsome avenues across the Maidan still constitute the chief glory of Calcutta. Dotting the wide expanse are a number of fine tanks, from which the inhabitants were content in former days to obtain their water-supply.”
১৮৫৯ সালে জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন কলকাতায় প্রথম বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করলে রক্ষণশীল কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লেখেন : —
‘যত ছুঁড়িগুলো তুড়ি মেরে কেতাব হাতে নিচ্ছে যবে,
এ বি শিখে, বিবি সেজে, বিলাতী বোল কবেই কবে;
আর কিছুদিন থাক রে ভাই! পাবেই পাবে দেখতে পাবে,
আপন হাতে হাঁকিয়ে বগি, গড়ের মাঠে হাওয়া খাবে।’
এর কিছুকাল পরেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্ত্রী কাদম্বিনী দেবীকে ময়দানে নিয়ে গিয়ে অশ্বচালনা শিক্ষা দেন। এতে বাঙালি সমাজের রক্ষণশীলতায় প্রচণ্ড আঘাত লাগে এবং বাঙালি সমাজে এক অভূতপূর্ব সংস্কার সাধিত হয়।
ব্রিটিশ শাসনে ইংরেজ সেনারা ময়দানে বাঙালি ছেলেদের দেখলেই লাথি মারত। বাঙালিরা এতটাই ভীরুস্বভাবের ছিল যে এর কোনো প্রতিবাদই করত না। সরলা দেবী চৌধুরানী এই ঘটনায় অত্যন্ত ব্যথিত হন। তিনি দুর্গাপূজায় বীরাষ্টমী ব্রতের সূচনা করেন। এই ব্রতে যুবকদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করার শপথ নিতে হত। এই ঘটনা পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
তাই দেখা যাচ্ছে, কেল্লা বা গড় নয়, বিশুদ্ধ মেষের বিচরণভূমিকেই প্রাচীন কলকাতায় গড়ের মাঠ বলে ডাকা হত। বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে গড়ের মাঠ বলে একটি অঞ্চল আছে। গড়ের মাঠ আছে হুগলির জেজুরে। তাই কেল্লা বা গড়ের মাঠ নয়, ভেড়া চরার মাঠ হল এই গড়ের মাঠ।
তথ্যঋণ : উইকিপিডিয়া ও কালীকোটির ইতিকথা।