কলকাতা পুরভোটে তৃণমূলের বিপুল জয় নিয়ে বিজেপি-বাম-কংগ্রেস কারও কোনও সংশয় ছিল না। বরং তারা জানত যে কলকাতা পুরভোটে তৃণমূলের জয় স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। তবে তৃণমূলের জয় যেমন নিশ্চিত ছিল পাশাপাশি বিজেপিকে টপকে সিপিএম যে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসবে সেটা মনে হয় কেউ ভাবেন নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কলকাতা পুরভোটের ফলাফলে এই বিষয়টিকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য জানাচ্ছে, এবারের পুরভোটে বামেদের ঝুলিতে পড়া ভোটের হার প্রায় ১২ শতাংশ৷ ৬ মাস আগে একুশের বিধানসভা নির্বাচনের সেই ভোটের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ৷ অর্থাৎ বিগত ১৮০ দিনে বামেরা নিজেদের পক্ষে প্রায় ৮ শতাংশ জনসমর্থন বাড়াতে সমর্থ হয়েছে। অন্যদিকে গেরুয়া শিবির বিধানসভা ভোটে পেয়েছিল ২৯ শতাংশ ভোট। কিন্তু পুরভোটে সেই ভোটের হার নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ৮ শতাংশে৷ তার মানে গেরুয়া শিবিরের ভোট ব্যাঙ্কে শতাংশের হিসাবে শতকরা প্রায় ২১ শতাংশ ধস নেমেছে৷
একথা ঠিকই যে বামেদের ঝুলিতে সেই অর্থে আহামরি কোনও জয়ের খবর নেই৷ তবে একথা বলতেই হবে; দীর্ঘ টালবাহনার প্রায় দেড় বছর পর কলকাতা পুরভোটের ফলাফলে বামেদের প্রাপ্ত ভোটে ৮ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে। কেবল তাই নয়, প্রাপ্ত ভোটের এই হার বৃদ্ধি ঘটেছে মাত্র ছ’মাসে। প্রশ্ন এই ঘটনাকে কি বামেদের মরা গাঙে রামের জোয়ার বলা হবে নাকি বাম থেকে রামে যাওয়া ভোট ফের ঘরে ফিরতে শুরু করেছে বলা যাবে? ঘটনা যাই হোক না কেন পুরভোটে বামেদের প্রাপ্ত ভোট শতাংশের হার বৃদ্ধিতে যে আলিমুদ্দিনের ব্যাজার মুখো নেতৃত্বের মুখের হাসি স্বল্প হলেও চওড়া হল তা বলাই যায়৷
কলকাতা পুরভোটের ফলাফল অনুযায়ী বামেরা জয়ী হয়েছে সন্তোষপুরে ১০৩ নম্বর ওয়ার্ড এবং ঢাকুরিয়ায় ৯২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে৷ পাশাপাশি তিনটি ওয়ার্ডে বাম প্রার্থীরা খুব সামান্য ভোটের ব্যবধানে হেরে গিয়েছেন৷ উল্লেখ্য; বামেরা ক্ষমতায় থাকা কালীনও অনেক সময়ে কলকাতার বিধানসভা ও লোকসভা কেন্দ্রগুলি প্রথমে কংগ্রেস, পরবর্তীকালে তৃণমূল জিতে এসেছে। ভোটের বিচারে শহর কলকাতা অধিকাংশ সময়েই বামেদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
গত মে মাসে একুশের বিধানসভা ভোটে যেখানে বামেদের একেবারে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছিল তার নিরিখে কলকাতা পুরভোটে দুটি ওয়ার্ডে বাম প্রার্থীর জয়, ৬৬টি ওয়ার্ডে বাম প্রার্থীদের দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসাতে তারা যে নতুন করে অক্সিজেন পাবে সে কথা বলাই যায়। তুলনায় বিজেপির ৪৭টি ওয়ার্ডে দ্বিতীয় স্থান, এই পতন গেরুয়া শিবিরকে ভাবিয়ে তুলেছে। যদিও প্রথম স্থানে থাকা তৃণমূলের থেকে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা বামেদের ভোটের ব্যবধান বিস্তর। তবুও এই ফলাফল থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে বামেরা বিজেপিকে টপকে যে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসবে সেটা মনে হয় কেউ ভাবেন নি।
এরপরও ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ৯৮ নম্বর ওয়ার্ড দীর্ঘ ৩৬ বছর পর বামেদের হাতছাড়া হয়েছে। অনেক পোড় খাওয়া বাম নেতা নেত্রী পরাজিত হয়েছেন। পুরভোটের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০১৫ সালের পুরভোটে বামেদের হাতে ছিল ১৬টি ওয়ার্ড। তার মধ্যে সিপিএম একাই পেয়েছিল ১০টি ওয়ার্ড, সিপিআই ৩টি, ফরওয়ার্ড ব্লক ১টি, আরএসপি ২টি। তাদের প্রাপ্ত ভোট ছিল ২৫.৭৯ শতাংশ। এবার বামেদের পাওয়া দুটি ওয়ার্ডের মধ্যে একটি পেয়েছে সিপিএম, আর একটি সিপিআই। আরএসপি ও ফরওয়ার্ড ব্লকের হাত ফাঁকা। অন্যদিকে সিপিএম পেয়েছে ১০.০৮ শতাংশ ভোট, সিপিআই ১.১ শতাংশ, ফরওয়ার্ড ব্লক ০.৪১ শতাংশ, আরএসপি ০.৭৫ শতাংশ। তারমানে অবস্থা খুবই করুণ। স্বস্তি একটাই। কলকাতা পুর এলাকায় ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের তুলনায় বামেদের ভোট বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ।
প্রসঙ্গত, ২০০৫ সালে বামেরা ক্ষমতায় থাকাকালীনও কলকাতা পুরসভা তাদের হাতছাড়া হয়েছিল। তারপর গত ১৬ বছরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে ২০১১ সালে রাজ্যপাটে পালাবদল হয়। তারপরের ঘটনাক্রম অনুসারে কলকাতা পুরভোটের আজকের ফলাফল। তবু বামেরা এখান থেকেও অক্সিজেন পেতে পারেন। যেখানে মানুষের সঙ্গে বামেদের দিন প্রতিদিনের যোগাযোগ একেবারে তলানিতে ঠেকে গিয়েছে। ২০১১ সালে পালা বদলের পর বাম নেতারা একেবারে শূন্য থেকে শুরুর কথা বললেও সেই শুরু আর প্রত্যক্ষ করা যায়নি। দুটি ওয়ার্ড জিতে আর ৬৬টি ওয়ার্ডে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেই সন্তুষ্ট থাকতে হল। বলার কথা; বামেদের পাশাপাশি কংগ্রেসও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করেছে। কিন্তু বিজেপি হারিয়ে গেল। আর তৃণমূল শুধু বিজেপি, বামফ্রন্ট বা কংগ্রেসকে নয়, একুশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলকেও টপকে গেল।