২৭ জানুয়ারি রাজেশ টিকায়েত দিল্লিতে জলের জন্যে হাপুসনয়নে কাতরাচ্ছেন। আন্দোলন দমন এবং প্রধান নেতার চরিত্র হনন করতে বিজেপি আরএসএস শিখ জাঠ, সর্বোপরি কৃষকদের খালিস্তানি, বিচ্ছিন্নতাবাদী, গদ্দার ইত্যাদি বাছা বাছা বিশেষণে দাগিয়ে দিচ্ছেন। এই প্রথম চাষীদের আন্দোলন কিছুটা যেন ছন্নছাড়া লাগছে। ২৯ জানুয়ারি উত্তর প্রদেশ থেকে এক প্রাক্তন বাঙালি সঙ্ঘী উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রতিবেদককে জানালেন, বিষোদ্গার যদি আর কয়েক দিন এইভাবে অপ্রতিহত গতিতে চলতে থাকে, উত্তর ভারতে, বিশেষ করে জাঠ অধ্যুষিত চাষী অঞ্চলে বিজেপি আর সঙ্ঘীদের আগামী ২০ বছর অবাধে সংগঠন করার দিন শেষ। বাংলার পোড়খাওয়া কয়েকজন বিজেপি ক্যাডারও আশঙ্কিত গলায় বলেছিলেন, উত্তর ভারতে কংগ্রেস অস্তমিত হওয়ার পিছনে ১৯৮৪-র শিখ দাঙ্গার ভূমিকা কম ছিল না। ২৭ জানুয়ারি জাঠ কুলপতি রাজেশ টিকায়েত এবং সামগ্রিক শিখ এবং জাঠ কৃষককুলকে যেভাবে গদ্দার দাগিয়ে দেওয়া হল, সেটা দোয়াব অঞ্চল থেকে পাঞ্জাবের সীমান্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিজেপির সংগঠনের জন্যে খুব সুখদ বার্তা বয়ে নিয়ে গেল না। হিন্দু হৃদয় সম্রাট নরেন্দ্র মোদি সমস্যাটা শেষ মুহূর্তে বুঝতে পেরেছেন বলেই কৃষি বিল ফেরত নেওয়ার পরেও বারানসীতে এক গলা গঙ্গাজলে তার ডুব দেওয়া আসলে হিন্দি অক্ষহৃদয়ে, নাক ভাসিয়ে রাখা ডুবন্ত দলকে টেনে তোলার প্রাণান্তকর চেষ্টা। রামমন্দির ইস্যু মোটামুটি কবরে। ভোটে রামমন্দির আর বিজেপিকে সেই মাত্রায় ডিভিডেণ্ড দেবে না। হিন্দুত্ব উত্তর ভারতে বিজেপির নির্বাচনের সর্বরোগ হাতিয়ার হচ্ছে না বুঝেই ভোটের আগে উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাবে মরিয়া সংঘ পরিবার দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে।
কিন্তু কলকাতার পুরভোটের ফল আলোচনা করতে আমায় ১১ মাস পিছিয়ে দিল্লিতে পৌঁছতে হল কেন? কারন আর্যাবর্তে চাষী আন্দোলন রুখতে, বিজেপি দল বেঁধে যেভাবে শিখ জাঠ এবং উত্তর ভারতের অন্যান্য সমাজে কালিমা লেপন করেছে, পূর্ব ভারতে ৪০০র বেশি বছর ধরে বাস করা শিখ জাঠ এবং উত্তর ভারতের এক শ্রেণীর বানিয়া সেই কলঙ্ক লেপন ভালভাবে নেয় নি। মাথায় রাখুন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ৭০এর বেশি পেলেও, তৃণমূল কংগ্রেস ঠাসবুনোট অবাঙালি এলাকাগুলোয় উত্তরভারতীয় ভোটে বেশ বড়সড় সিঁধ কেটেছিল। আমার এই তত্ত্বের ফাইনাল মহড়া হল কলকাতা পুর নির্বাচনে।
আমি নির্বাচনের কয়েকদিন আগেই এই তত্ত্ব কয়েকজন বিজেপি বড়বাজারের ক্যাডারকে শুনিয়েছিলাম। যদিও তারা মনে করেন বিজেপির বড় সমস্যা দলের মধ্যে নবীন-আদি দ্বন্দ্ব এবং চরম খেয়োখেয়ি, কিন্তু আমার তত্ত্ব তারা এক্কেবারেই খারিজ করেন নি, সুনীতা ঝাওয়ার এবং প্রাক্তন ডেপুটি মেয়র মীনাদেবী পুরোহিতের জেতা নিয়ে শংকা প্রকাশ করেছিলেন। হারের খাঁড়া মাথার ওপর ঝুলছে বুঝেই আগস্টে বিজেপি মরিয়া হয়ে ‘লক্ষ্মীশ্রী’ প্রকল্প প্রচারে সুনীতা ঝাওয়ারকে নামিয়েছিল। তাদের আশংকাই সত্যি হকরে আজকের পুরনির্বাচনের ফল বলছে সুনীতা ঝাওয়ার তার আসনটি হারালেন। বলা দরকার দলীয় প্রধান হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাবাদীদের অবস্থান উপেক্ষা করে হিন্দিভাষীদের সঙ্গে সেতু তৈরি করার উদ্যোগে তৃণমূল লাভবান হয়েছে। ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রীকে হারাবার খোয়াব দেখা বিজেপি একের পর এক হিন্দিভাষী আসনে গোহারান হেরে ভোটের হারে তৃতীয় স্থানে।

আমার তত্ত্বের আরেকটা প্রমান হল বিধানসভা নির্বাচনে নেতিয়েপড়া বাম-কংগ্রেস উত্থানের ইঙ্গিত। পুর নির্বাচনে মমতার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১০০-র কাছাকাছি আসনে নেমে আসবে, এটা অতি আশাবাদী ভোটে সন্ত্রাসের গাওনা গাওয়া বিরোধীপক্ষও আশা করে নি, কিন্তু কয়েকমাস আগে ৭০+ আসন পাওয়া বিজেপির শতাংশের হারের ভরাডুবি এবং ১১৬টা আসনে জামানত জব্দ হওয়ার তথ্য ভোট সন্ত্রাসের যুক্তিতে ধোপে টেঁকে না। না হলে কংগ্রেস বড়বাজার আসন ধরে রাখতে পারে না। ১১২ কংগ্রেস প্রার্থীর, ৯৬ বাম প্রার্থীর জমানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে! বিজেপি ৯%-এ নেমেছে বাম ১০%-এ উঠেছে, কংগ্রেস ৪%-এ থিতু। ভোট শতাংশের নিরিখে বাম-কংগ্রেস জোট দ্বিতীয়স্থানে। শতাংশের নিরিখে পুর নির্বাচনে বিধানসভার পারফরম্যান্সের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে নি বিজেপি। তাকে টপকেছে বামেরা। এ ক্ষতস্থান সারাবে কে? মোদি? শাহ?
তো বাংলার গড় কলকাতা মজবুত করে, বাংলার সীমান্ত পেরিয়ে সুদূর পশ্চিমের উপকূল রাজ্যে ডানা ছড়াতে চাওয়া সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস দল, পুর নির্বাচনের ফলের পরে আর্যাবর্তের হৃদয় অক্ষে যে বার্তাটা পরোক্ষে ছড়িয়ে দিতে চাইল, সেটা কয়েক দিন আগে তীব্র শীতে কাশীর গঙ্গায় ডুব দেওয়া নরেন্দ্র মোদি আর তার ডেপুটি অমিত শাহ নির্ভর বিজেপি হাইকমাণ্ডের কানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ঝঙ্কার তুলবে না, এটা রাজনৈতিক নভিসরাও জানে। গোয়ায় তৃণমূলে যোগ দেওয়ার হিড়িক এবং তার সঙ্গে কলকাতার পুর নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভোটের শতাংশে এক অঙ্কে নামিয়ে আনা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, তৃণমূলেশ্বরী, মোদির হাতে নতুন করে গড়ে তোলা ইন্দ্রপ্রস্থে ২০২৪এ স্থায়ী বাসিন্দা হবেন কীনা সেটা বলার সময় এখনও আসে নি, কিন্তু তিনি আপাতত শাহজাহানাবাদে প্রবেশের সীমান্ত চৌকিটা কলকাতার মজবুত গড় থেকে অনেকটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন।
এক নজরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
♣♣ মন্ত্রী জাভেদ খাঁর পুত্র ফৈয়াজ আহমেদ খাঁ সর্বাধিক ভোটে (৬২,০৪৫) জিতেছেন।
♣♣ বিধায়ক স্বর্ণকমল সাহার পুত্র সন্দীপন সাহা জিতেছেন ৪০,০০০ বেশি ভোটে।
♣♣ ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় জিতলেন ৩৭ হাজার ৬২৩ ভোটে।
♣♣ সাতটি ওয়ার্ডে ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা। (১৩৪ নম্বরের শামস ইকবালের ঝুলিতে প্রাপ্ত ভোট শতাংশ ৯৭.২৬। ৯৩ শতাংশ ভোট পেয়েছেন ৩৫ নম্বরের আশুতোষ দাস ও ১৪২ নম্বরের রঘুনাথ পাত্র। ৯০ শতাংশ ভোট পেয়েছন মনজার ইকবাল, জীবন সাহা, শাম্মি জাহান।)
♣♣ ৮০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে ‘লেটার মার্কস’ ২৫ জন (উল্লেখযোগ্য অতীন ঘোষ, গৌতম হালদার, তরুণ সাহা, পরেশ পাল, অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় ও কাকলি সেন।)।
♣♣ সবথেকে কম ব্যবধানে জয় উত্তর কলকাতার মীরা হাজরার। মাত্র ৪৪ ভোটে জিতেছেন তিনি।
♣♣ এবারের পুরভোটে ৭৩১ জনের জামানত জব্দ হয়েছে (বিজেপির প্রার্থী ১১৬ জন, বামফ্রন্টের ৯৭ জন ও ১১২ জন কংগ্রেস প্রার্থী, এছাড়াও ৪০৬ নির্দল প্রার্থী)।
♣♣ এবার জামানত হিসাবে সাধারণ প্রার্থীদের জন্য ৫০০ টাকা এবং মহিলা ও তফশিলি প্রার্থীর জন্য ২৫০ টাকা বরাদ্দ করেছিল কমিশন।