কলকাতার ভেতরে আছে আর এক কলকাতা। সেই কলকাতার মধ্যে একদিকে যেমন আছে বিখ্যাত স্ট্রিট ফুড, বনেদি বাড়ি, বারোয়ারি দুর্গা পুজো, আধুনিক আবাসন আবার একই ভাবে আছে কলকাতার বস্তি। নিয়ন আলোর নিচে খানিকটা অন্ধকারাচ্ছন্ন আর এক যাপন প্রবাহ। তবে একথা অনস্বীকার্য, ১০-১১ বছরে কলকাতার বস্তিগুলির পরিকাঠামো অনেক উন্নত মানের হয়েছে। মহানগরীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগণ বস্তিবাসী। এর মধ্যে আবার আছে উত্তর কলকাতার বস্তির সঙ্গে দক্ষিণ কলকাতার বস্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিস্তর ফারাক। বিগত চার-পাঁচ দশক আগে গরু বা মোষের বিষ্ঠা, ঘানির তেলের ঝাঁঝে চোখ কড়কড় করা এবং প্রায় সারা বছর প্যাচ-প্যাচে কাদা ছিল উত্তর কলকাতার বস্তিগুলির পরিচিত ছবি। বলা বাহুল্য তৎকালীন সময়ে গরুর গাড়ি ছিল যানবাহনের উল্লেখযোগ্য মাধ্যম।

শোনা যায় শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর প্রতিমা গড়ার উদ্দেশ্যে অন্য জেলা থেকে দক্ষ কুমোর এনে গঙ্গার পাড়ে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব। উত্তর কলকাতায় কুমোরটুলিতেই প্রথমে গড়ে উঠেছিল বস্তি। তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল প্রবাহিত হয়েছে। ক’দিন আগে গিয়েছিলাম কলকাতা পুরসভার ১ নম্বর বরোর অন্তর্গত ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ১৪ বি, উমাকান্ত সেন লেন বস্তিতে। কথা হচ্ছিল ৭০ বছর বয়সি এক ব্যক্তির সঙ্গে। ছেলে-মেয়ে-নাতি-নাতনি নিয়ে তাঁর সংসার। স্বপ্ন দেখেন নাতি বড়ো হয়ে এমবিএ করবে, আর নাতনি হবে স্কুল টিচার। বললেন, আমাদের ছোট বেলায় বস্তির অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। এখন তো আমার নাতি বিনামূল্যে পৌর প্রাথমিক স্কুলে পড়ে। নাতনি ইংরাজি মাধ্যম স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে সামনের বছর। আমাদের শৈশব কিন্তু এভাবে কাটেনি। একসময় কত দূর থেকে খাবার জল আনতে হতো। পুকুরের জলও ব্যবহার করেছি। মাসের অধিকাংশ দিনই পেট-খারাপের অসুখে ভুগেছি। কিন্তু এখনতো বস্তির প্রতি ঘরের সামনে পাইপ লাইনের মাধ্যমে পুরসভা পানীয় জল পাঠাচ্ছে। দিনে এক বার নয়, একাধিক বার।
দুর্গা পুজো, মহরম ইত্যাদি বিভিন্ন উৎসবে প্রয়োজন মতো অতিরিক্ত পানীয় জলও পাই। এছাড়া প্রয়োজনীয় কাজের জন্য গঙ্গার জলও পাইপের মাধ্যমে আসে। জলের জন্য এখন আর দু-মাইল গিয়ে ভোর থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইন দিতে হয় না। বৃদ্ধের মুখে এক অমায়িক হাসি। নীল আকাশে শরতের সাদা মেঘের স্নিগ্ধতা আমার মনে নাড়া দিয়ে গেল। বেশ বুঝলাম বস্তিবাসী ও ফ্ল্যাট বাড়িতে বসবাসকারী জনগনের মধ্যে জীবন ধারনের প্রাথমিক চাহিদাগুলির পরিষেবা পাওয়ার মাঝের দূরত্ব কমছে।

কলকাতা শহরের প্রায় সব বস্তি এলাকায় আজ কলকাতা পুরসভার পরিচালনায় পানীয় জল পাইপের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে। যেমন বলা যায় ১১ নম্বর ওয়ার্ডের মাধব দাশ লেন বস্তির কথা। এখানে তিন বার পানীয় জলের পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে। তবে এ কথাও ঠিক কিছু সংখ্যক বস্তিতে পানীয় জলের সমস্যা এখনও পুরোপুরি মেটেনি। পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলীর চেয়ারপার্সন ফিরহাদ হাকিম খুব তাড়াতাড়ি এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন। বস্তিগুলির সামগ্রিক মান উন্নতিতে তাঁর প্রয়াস প্রশংসার দাবি রাখে।

কলকাতা পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য স্বপন সমাদ্দার-এর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বস্তি বিভাগের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন বিগত ৬ বছর ধরে। এই সময় পর্বে বস্তির উন্নয়ন চোখে পরার মতো। শহরের প্রায় সাড়ে তিন হাজার বস্তির মান উন্নতিতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি। স্বপনবাবু জানালেন, “কলকাতা পুরসভার বস্তি এলাকার নাগরিক পরিষেবার মান উন্নয়ন করাই আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য। এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই আমাদের বস্তি বিভাগ বস্তি এলাকার সার্বিক উন্নতি ঘটাতে নিরন্তর প্রয়াসী। বস্তি অঞ্চলে মৌলিক ও সামাজিক পরিকাঠামোর উন্নতি বিধানের জন্য নিয়মিত জল সরবরাহ, উন্নতমানের রাস্তাঘাট, নিকাশি ও পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা, আলোকায়ন ইত্যাদি পরিষেবার ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কাজকর্ম চলছে ও আগামীদিনেও তা অব্যাহত থাকবে। প্রতিটি বস্তি এলাকায় স্বাস্থ্যকর শৌচালয় নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনালোকিত ও স্বল্পালোকিত বস্তি অঞ্চলগুলিতে ঔজ্জ্বল্যবৃদ্ধির জন্য আলোকায়নের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বস্তিবাসীদের প্রাথমিক চাহিদাগুলি, যেমন জল, আলো, রাস্তা, নিকাশি ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমরা যেমন পৌরপরিষেবা দিচ্ছি, একই ভাবে বস্তির শিশুদের জন্য স্কুল, খেলার মাঠ, উদ্যান ইত্যাদিও আমরা তৈরি করেছি।”

শুধু মাত্র ১১ নম্বর ওয়ার্ডেই নয়, কলকাতা পুরসভার সব ওয়ার্ডের বস্তিতেই আজ অনেক সমস্যারই সমাধান হয়েছে। তবে সব সমস্যা যে মিটে গেছে এমন কথা বলার সময় এখনও আসেনি। কিন্তু বস্তির মান উন্নতির জন্য পুরসভার প্রয়াসকে সাধুবাদ দিতেই হয়। ধর্ম-বর্ণ-ভাষার মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে কলকাতার বস্তিগুলিতে। এ যেন এক ‘মিনি ভারত’। সবশেষে বলা যায়, বিদেশি কোন পরিচালক আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কলকাতার বস্তি জীবনের দুর্দশা নিয়ে কোনোও সিনেমা বোধহয় করবেন না।