যখন কলকাতা পুরভোটের প্রার্থীতালিকা চূড়ান্ত করতে কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে তৃণমূল শীর্ষনেতৃত্ব বৈঠকা ব্যস্ত, তখন বামফ্রন্ট সবার আগে প্রার্থীতালিকা প্রকাশ করল। কলকাতা জেলা বামফ্রন্ট এদিন প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে সাংবাদিক বৈঠক করে ১৫-১৬টি আসন ছেড়ে ১২০টি ওয়ার্ডে প্রার্থীতালিকা ঘোষণা করলো।
প্রসঙ্গত, রাজ্য নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার আগামী ১৯ ডিসেম্বর কলকাতা পুরসভার ভোটের দিন ঘোষণা করে। বিজ্ঞপ্তি জারির হওয়ার পর কলকাতা পুর এলাকার ১৪৪টি ওয়ার্ডে নির্বাচনীবিধি কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি মনোনয়ন জমা নেওয়াও শুরু হয়ে গিয়েছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হবে আগামী ১ ডিসেম্বর।
তবে সবথেকে আগে প্রার্থিতালিকা প্রকাশ করলেও বামেদের প্রার্থিতালিকা অসম্পূর্ণ। এ বিষয়ে বামেদের তরফে জানানো হয়, বামেরা এই ১৫-১৬টি আসনে প্রার্থী দেবে না। একুশের বিধানসভা ভোটে বামেরা কংগ্রেস এবং আইএসএফ-র সঙ্গে জোট করেও ফলাফলে শূন্য লাভ করেছিল। আইএসএফ-এর মতো দলের সঙ্গে জোট করায় প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তারপর রাজনৈতিক মহলে ধারণা তৈরি হয় হয়ত বামেরা আগামি দিনে আইএসএফ-কে জোটে রাখবে না। তাছাড়া সিপিএম-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি তো জানিয়েই দিয়েছেন, ভোট শেষ, জোট শেষ। কিন্তু আজ ফের সেই প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই উঠে এল, জোট না হলেও এই সব আসনে কি বামেরা কংগ্রেস ও আইএসএফ-কে সমর্থন জানাচ্ছে?
সিপিএমের রাজ্য কমিটির বৈঠকে প্রশ্ন উঠেছিল, কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতায় গিয়ে বামেরা গত পাঁচ বছরে কি লাভ পেয়েছে? অন্তত এ বার পুরভোটে একার শক্তিতে লড়াই করে কি বামেরা নিজেদের ক্ষমতা যাচাই করতে পারে না? এর পরই উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে প্রাক্তন বিধায়ক ননী কর স্মারক বক্তৃতায় পুরভোট প্রসঙ্গে বিমান বসু বলেন, পুরসভা ভোটে সিপিএম মূলত বামফ্রন্টগত ভাবে লড়াই করবে। তবে তৃণমূল ও বিজেপির বিরুদ্ধে যাঁরা লড়াই করতে চান, তাঁদের সঙ্গে সমঝোতা হতে পারে। জোট না হলেও বামেরা যে কিছু জায়গায় কংগ্রেস ও আইএসএফ-কে সমর্থন জানাচ্ছে সেদিনই তার ইঙ্গিত মিলেছিল বিমানবাবুর কথায়।
অন্যদিকে পুরভোটের প্রস্তুতি নিয়ে বামফ্রন্টের বৈঠকে ফরওয়ার্ড ব্লক স্পষ্ট করেই জানিয়েছিল বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ও আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট করে যে ভরাডুবি হয়েছে তার পুনরাবৃত্তি আর চায় না তারা। তাই কোনও পরিস্থিতিতেই এই দুই দলের সঙ্গে তারা জোট মেনে নেবে না। ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায় তো হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আইএসএফ বা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করলে তারা আলাদা লড়বেন।
কলকাতা পুরভোটের দিন ঘোষণার আগে থেকেই তা নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ চড়তে শুরু করেছিল। সেই সময় বিমান বসু জোট প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন, কংগ্রেস বা বামফ্রন্ট কেউ জোট ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে এমন ঘোষণা তো করেনি। পুরভোটে জোটের ব্যাপারে কংগ্রেস যে জেলা নেতৃত্বের মতামতকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন সেকথা আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীরবাবু। তিনি এও বলেন, বিধানসভা নির্বাচনে তাঁরা আইএসএফের সঙ্গে জোট করেননি, পুরভোটেও তা করার প্রশ্ন নেই। সেই সঙ্গে অধীরবাবু বলেন, তারা কখনওই বামেদের সঙ্গে জোট ভেঙে গিয়েছে- এ কথা বলেননি। তবে বামেরা ২০১৬ সালের পরে কিছু দিন আলাদা আন্দোলনের কথা বলেছিল, ২০২১ সালে আবার তারা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে আগ্রহ দেখায়। বামেদের দিক থেকে জোট নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও কংগ্রেসের মত সব সময়েই স্পষ্ট। ওদিকে কয়েকদিন আগে আইএসএফের রাজ্য কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে তারা কলকাতা পুরভোটে একাই লড়বে। বাছাই করা কয়েকটি ওয়ার্ডেই আব্বাসের দল প্রার্থী দেবে।
একুশের বিধানসভা ভোট, উপনির্বাচন থেকে এ রাজ্যের সিপিএম নিজেদের চেহাড়া দেখে আরও বুঝেছে অস্তিত্ব রক্ষা, শরিকি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা এমনকি কংগ্রেস-আইএসএফের সঙ্গে জোটের দরজা খুলে রাখাটাও জরুরি। তাই কলকাতা পুরসভা ভোটে তৃণমূল-বিজেপি বিরোধী দলগুলির জন্যই ১৬ আসন ছেড়ে রাখলো। আরও স্পষ্ট ভাষায় কংগ্রেস ও আইএসএফ-এর জন্যই ছেড়ে রাখলো। যে জোট নিয়ে বহু সমস্যা তবু এই জোট ছাড়া সিপিএমের পক্ষে বাংলার মাঠিতে টিকে থাকা কঠিন, তা আলিমুদ্দিনের পক্ককেশের নেতারা একাধিক বিরোধিতা স্বত্বেও শেষ পর্যন্ত জোটের পথ খুলেই রাখলেন।
জোটে গেলে তৃণমূল-বিজেপি বিরোধিতায় সিপিএমের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায় অন্যদিকে সমঝোতায় না গেলে খাদের সামনে চলে যেতে হয়। একটি দলের পক্ষে এই অবস্থা বড়ই বেদনার। তাই বিজেপি-তৃণমূলকে হারানোর সাফাই দিয়ে বামেরা জোটের একটা দরজা খুলে রাখার চেষ্টা করল ১৪৪ এর মধ্যে ১৫-১৬ আসনে প্রার্থী না দিয়ে।