একুশের বিধানসভা নির্বাচনের পর কলকাতা পুরসভার ভোট এই মুহুর্তে রাজ্য রাজনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগামী রবিবার কলকাতা পুরসভার ১৪৪টি ওয়ার্ডে সেই নির্বাচন হতে চলেছে। এই নির্বাচন নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা পুরসভা নির্বাচনের পরেই যেমন হাওড়া পুরসভার ভোট অন্যদিকে আগামী বছরেই বাংলার অন্য শহরাঞ্চল ও জেলা স্তরের পুরসভাগুলিতে নির্বাচন হবে। কলকাতা পুরসভা নির্বাচনের ফলাফল যে সেই সব ভোটকে প্রভাবিত সে কথা বলাই বাহুল্য।
কলকাতা পুরসভা নির্বাচনে তৃণমূল যে অধিকাংশ ওয়ার্ডগুলিতে জিতবে এবং ফের ক্ষমতায় বসবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তৃণমূলের জয় নিশ্চিত জেনেও এই নির্বাচনের দিকে সবার তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে। প্রথমত দেখার বিষয় বিজেপি কলকাতা পুরসভার ভোটে দ্বিতীয় আসনটি দখল করে নিজেদের প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করতে পারে কিনা।
বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বাংলা দখলের স্বপ্ন দেখেছিল, কিন্তু সে স্বপ্ন তাদের অধরা রয়ে গিয়েছে। একুশের নির্বাচনে বিপুল পরাজয় বাংলা বিজেপিকে কেবল বিপর্যস্ত করেনি মনোবল ভেঙে দিয়েছে। তারপর উপনির্বাচন, সেখানেও বিজেপির হাত শূন্য থেকেছে। এরপর আগামী রবিবার কলকাতা পুরভোট সেখানেও কোনভাবেই জয়ের আশা দেখছে না বিজেপি। কিন্তু কলকাতা পুরসভায় যাতে কোনোভাবেই তৃণমূলের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সিপিএম জায়গা না পায়, সেদিকে কড়া নজর রাখছে বিজেপি। তাই এবার কলকাতা পুরভোটের লড়াইতে তাদের লক্ষ্য প্রধান বিরোধী দল হওয়া।
পুরভোটে দ্বিতীয় স্থান পেলে তবেই বিজেপির সেই লক্ষ্য পূরণ হবে। তাছাড়া এই মুহুর্তে এর থেকে বেশি কিছু আশা করার নেই তাদের। আসন্ন পুরভোটকে মাথায় রেখে প্রস্তুতি বৈঠকে দলীয় নেতারাও সেই আশার কথা জানিয়েছেন। হারবে বলে কোনও দলই নির্বাচনের লড়াই করেনা, লড়াইয়ের মানসিকাতাটাই আসল। কিন্তু সম্প্রতি একের পর এক নির্বাচনে ধাক্কা খেয়ে বাংলা বিজেপির নেতা কর্মীদের মনোবল একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। কলকাতা পুরভোটের দিন স্থির হওয়ার পরও তাদের মধ্যে তেমন লড়াকু মনোভাব দেখা যায়নি। তাছাড়া বিধানসভা ও উপনির্বাচনের ফলাফলে বিরাট ধাক্কা খেয়ে তারা ধরাশায়ী। তাই বাংলার বিজেপি কলকাতা পুরবোর্ড দখল করার ‘দিবাস্বপ্ন’ দেখতে রাজি নয়। তাদের কাছে প্রধান বিরোধী দলের খেতাব রক্ষা করাটাই এখন সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। কোনওভাবে বামেদের পিছনে ফেলে দ্বিতীয় আসনটি দখল করতে পারলেই বিজেপি খুশি। তাতে অন্তত দলের মান সম্মান বাঁচবে। নেতা কর্মীদের মনোবল যুগিয়ে দলে আটকে রাখা সম্ভব হবে।

এবার চোখ রাখতে হবে ২০১৫ সালের কলকাতা পুরসভা নির্বাচনের ফলাফলে। অর্থাৎ শেষবার কে কি অবস্থায় ছিল সেই দিকে। দেখা যাচ্ছে তৃণমূল শেষবার ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১১৪টি নিজেদের দখলে রেখেছিল এবং তারা প্রায় ৫১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। দেখার বিষয় এবার তৃণমূল ১১৪টি নাকি তার বেশি আসন নিজেদের ঝুলিতে ভরতে পারে। অন্যদিকে ২০১৫ সালের পুরভোটে বিজেপির ঝুলিতে জুটেছিল ৭টি ওয়ার্ড, পেয়েছিল ১৫ শতাংশ ভোট। উল্লেখ্য, সে সময়ে বিধানসভায় বাংলা বিজেপির আসন ছিল শূন্য এবং ভোটের হার মাত্র ৪ শতাংশ। এখন বাংলা বিধানসভায় বিজেপির আসন সংখ্যা ৭০ এবং তারা ভোট পেয়েছে ৩৮ শতাংশ।
অন্যদিকে ২০১৫ সালে কলকাতা পুরসভা নির্বাচনে বামেরা ২৪ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৫টি ওয়ার্ড জিতেছিল। বাংলার বামেরাই তখন বিধানসভা ও কলকাতা পৌরসভায় প্রধান বিরোধী দল ছিল। এখন বামপন্থীদের শক্তি অনেক কম। বিধানসভায় তাঁদের আসন শূন্য এবং ভোট ৫ শতাংশ। উল্লেখ্য; সম্প্রতি ৪ কেন্দ্রের বিধানসভা উপ-নির্বাচনে বামেদের ভোট বেড়েছে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে। তৃণমূলের বিপুল জয়ের থেকেও সিপিএমের ভোটবৃদ্ধি বিজেপির কাছে চিন্তার বিষয়। কারণ, রাজ্য রাজনীতিতে আবার বামেদের শক্তি বৃদ্ধি হলে তার জন্য পুরো খেসারতটাই যে দিতে হবে বিজেপিকে সেটাও বিজেপি নেতৃত্বের ভাল করে জানা আছে। আর তা জানা আছে বলেই পুরভোটের প্রস্তুতি বৈঠকে বিজেপি শীর্ষনেতাদের তরফে বামেদের ২০১৫-তে প্রধান বিরোধী হওয়ার কথাটা আরও একবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়।
এই পরিস্থিতিতা কলকাতা পুরসভা নির্বাচনে বিজেপির ফলাফল কেমন হতে পারে, দল কী ধরনের ফল আশা করছে? বিজেপির তরফে পাওয়া উত্তর অনুযায়ী, এটা তো স্বাভাবিক যে ফল বিধানসভার তুলনায় খারাপ হবে। কারণ, অধিকাংশ ওয়ার্ডগুলিতেই প্রার্থী দিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তবে গত পুরসভার থেকে বেশি আসন যে পাওয়া যাবে এটা তারা জোর দিয়ে বলছেন। তার মানে কি বিধানসভার মতোই কলকাতা পুরসভাতেও বিজেপি প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পাবে?
বিজেপির পুরসভা ভোটের প্রার্থী তালিকায় এমন কোনও পরিচিত মুখ বা নাম জোগাড় করতে পারেনি যারা শাসকদল বা তৃণমূলের সঙ্গে লড়াই করার মতো ক্ষনতা রাখে। এই অবস্থায় ভোটের লড়াইতে বিজেপির অবস্থান কেবল অংশগ্রহণ ছাড়া কিছু নয়। পুরভোটের হাওয়া গরম হয়ে উঠলেও ভোটের প্রচার থেকে শুরু করে সাংগঠনিক কাজকর্ম কোনও ক্ষেত্রেই তাদের সংঘবদ্ধ হতে দেখা যাচ্ছে না। বরং দলের চেহাড়া ছন্নছাড়া। বিজেপির অনেক নেতা-কর্মীরাই সেভাবে প্রচারে নামেননি। তাই প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে; ২০১৫ সালে যে সাতটি আসন পেয়েছিল, এবার সেকটিও কি ধরে রাখা যাবে?