দোষ আমারই। রাস্তার দিকে তাকিয়ে আমার হাঁটা উচিত ছিল। তা না করে আড়চোখে মেয়েটিকে দেখতে গেলাম। তাতেই ফুটপাতের গর্তে পা পড়ে গেল। আমি পড়ে গেলাম। পা মচকে গেল। যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগলাম। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। পারলাম না। তা দেখে অনেকে চারপাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের মধ্যে সেই মেয়েটিও ছিল। সকলেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। মেয়েটিও দিল। আমি এখন কার হাত ধরব? আমি মেয়েটির হাত ধরলাম। মেয়েটি আমাকে টেনে তুলল।
মেয়েটি আমাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি বাড়ি যেতে পারবেন?
আমি অবশ্য খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাড়ি যেতে পারতাম। কিন্তু বললাম, না।
মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, আমি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেব? বললাম, দিলে খুব উপকার হয়।
সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি একটি ট্যাক্সি ডাকল। মেয়েটির সাহায্যে আমি ট্যাক্সিতে উঠলাম। মেয়েটি আমার পাশে বসল।
মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, আপনার বাড়ি কোথায়?
বললাম, গড়পার রোডে।
তাহলে তো কাছেই। – বলেই মেয়েটি ড্রাইভারকে গড়পার রোডে যেতে বলল।
ট্যাক্সি চলতে শুরু করল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কোথায় থাকেন?
—সুকিয়া স্ট্রিটে।
আপনিও তাহলে কাছেই থাকেন। —বলে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার নামটা জানতে পারি?
মেয়েটি হেসে বলল, আমার নাম দোলা। —বলে জিজ্ঞেস করল, আপনার নাম?
আমার নাম বিপুল।
দোলা এবার একটু থেমে বলল, বিপুলবাবু, আজ আপনার এই পতনের জন্যে আমি দায়ী। আপনি যদি আজ আমার দিকে না তাকিয়ে রাস্তার গর্তের দিকে তাকাতেন, তাহলে আপনার এ অবস্থা হত না। আমি এর জন্যে দুঃখিত।
আমি এবার পাল্টা প্রশ্ন করলাম, আপনি কী করে জানলেন, আমি আপনার দিকে তাকিয়েছিলাম?
—দোলা হেসে বলল, আমিও যে তাকিয়েছিলাম। কিন্তু আমি হোঁচট খাইনি, আপনি খেলেন।
—কী আর বলব! এ আমার কপাল।
—আপনি কি এভাবে প্রায়ই মেয়েদের দিকে তাকান?
—হ্যাঁ।
—আমিও এভাবে ছেলেদের দিকে তাকাই। অতএব দোষের কিছু নেই। —বলে দোলা বলল, আপনার মোবাইল নাম্বারটা দিন।
আমি আমার মোবাইল নাম্বারটা দোলাকে দিলাম। দোলা আমার নাম্বারটা তার মোবাইলে তুলে রাখল। আমিও দোলার মোবাইল নাম্বারটা নিয়ে আমার মোবাইলে রেখে দিলাম।
দোলা বলল, আমি মাঝে মাঝে আপনাকে ফোন করব।
আমি বললাম, আমিও ফোন করব। —বলে একটু থেমে বললাম, আজ আপনি আমার যে উপকার করলেন, তা আমি জীবনে ভুলব না। ভবিষ্যতে আমি যদি আপনার কোনও উপকারে আসি, তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করব।
দোলা বলল, ছেলেরা এরকম কথা বলে। তারপর সব ভুলে যায়।
তা শুনে জোর দিয়ে বললাম, আমি ভুলব না।
—ঠিক আছে। কথাটা যেন মনে থাকে।
হেসে বললাম, থাকবে।
তারপর আর বিশেষ কথা হল না। একটু পরে ট্যাক্সি কথামতো আমার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর ট্যাক্সির দরজা খুলে দোলা আমার হাত ধরে আমাকে নামাল। আমি ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিলাম। তারপর দোলা আমাকে ধরে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। ঢুকে আমাকে মার হাতে তুলে দিল।
মা আমাকে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে তোর?
—রাস্তার গর্তে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছি। ইনি তা দেখে আমাকে ট্যাক্সি করে বাড়িতে পৌঁছে দিলেন। ইনি না থাকলে আমার আজ দুর্গতির শেষ থাকত না।
মা এবার দোলার কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমাকে বলল, তুই কি আকাশের দিকে তাকিয়ে রাস্তায় হঁাটছিলি?
সত্যি কথাটা বলতে পারলাম না। বললাম, রাস্তার গর্ত দেখতে পাইনি। তাই…
মা জিজ্ঞেস করল, হাড় ভাঙেনি তো?
—না। একটু মচকে গেছে। ও দু’দিনে ঠিক হয়ে যাবে। তুমি চিন্তা করো না। —বলে আমি সোফায় বসে পড়লাম। বসার পর দোলাকে বললাম, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
বসুন। চা খেয়ে যান।
দোলা বলল, বেলা বারোটা বাজে। এখন চা খাব না। পরে একদিন এসে খাব। —বলে চলে গেল। আমি মাকে বললাম, মেয়েটি খুব ভাল।
হ্যাঁ।
২
পায়ের এক্স–রে হল। হাড় ভাঙেনি। হাড়ে সামান্য চিড় ধরেছে। আর ব্যান্ডেজ করা হল। ডাক্তার ওষুধ লিখলেন। বললেন, তেমন কিছু না। কিছুদিন শুয়ে থাকলে ঠিক হয়ে যাবে। তা শুনে বাবা–মা নিশ্চিন্ত হল। দোলাও নিশ্চিন্ত হল। কিন্তু আমি নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না। কেবলই চিন্তা হতে লাগল, আমি আবার আগের মতো হাঁটতে পারব তো? অফিসের সিঁড়ি ভেঙে উঠতে পারব তো? কোথাও মারামারি হলে দৌড়ে পালাতে পারব তো? উঁহ! কী কুক্ষণে যে আড়চোখে দোলাকে দেখতে গিয়েছিলাম! এখন তার শাস্তিভোগ করছি। ঠিক করলাম, রাস্তায় যেতে যেতে আমি আর রাস্তার দিকে না তাকিয়ে মেয়েদের দিকে তাকাব না। এই বদ অভ্যাস আমাকে ছাড়তে হবে। নইলে আবার দুর্ঘটনা ঘটবে। এবার দোলা আমাকে সাহায্য করেছে। তখন কোন দোলার সাহায্য পাব? আর পেলেও তাকে ওই এক প্রতিশ্রুতি দিতে হবে: আজ আপনি আমার যে উপকার করলেন, তা আমি জীবনে ভুলব না। ভবিষ্যতে আমি যদি আপনার কোনও উপকারে আসি, তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করব। সমস্যা হল, আমি এইভাবে কতজনের উপকার করব? দোলা অবশ্য এখনও আমার কাছ থেকে কোনও উপকার চায়নি। অবশ্য চাইবে কী করে? আমি এখন প্রায় শয্যাশায়ী। আমার এখন কোনও উপকার করার ক্ষমতা নেই। দোলা তা ভালভাবেই জানে। আর তা জানে বলেই কিছু বলে না। আমার কাছে রোজ বিকেলে আসে। ফলের রস করে আমাকে খাওয়ায়। আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। মা–র তা দেখে ভাল লাগে। বাবারও ভাল লাগে। আমারও ভাল লাগে। কিন্তু আমি ভয়ে সিঁটিয়ে থাকি। ভাবি, দোলা হয়ত কোনওদিন আমার কাছ থেকে এমন উপকার চাইবে, যা পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। ধরা যাক, দোলা যদি বলে অমুক লোকটাকে খুন করে আমার উপকার কর, আমি সে উপকার করতে পারব না। যদি বলে, আমাকে দশ লাখ টাকা দিয়ে উপকার কর, তাহলে সে উপকারও করতে পারব না। যদি বলে, আমাকে একটা চাকরি দিয়ে উপকার কর, আমি সে উপকারও করতে পারব না। তাহলে আমি পারব কী? এখন বুঝতে পারছি, দোলাকে উপকার করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া আমার উচিত হয়নি। আমার বোঝা উচিত ছিল, মানুষ মানুষের উপকার করে। এর মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। এর জন্যে যে উপকার করেছে, তাকে ভবিষ্যতে উপকারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া ঠিক নয়। আমার ভুল হয়ে গেছে। এখন আর কিছু করার নেই। ভবিষ্যতে যা হওয়ার হবে। তবে দোলা নিশ্চয় এমন কোনও উপকার আমার কাছে চাইবে না, যা পালন করা আমার ক্ষমতার বাইরে।
৩
আস্তে আস্তে আমি ভাল হয়ে উঠলাম। পায়ের ব্যান্ডেজ খুলে দেওয়া হল। আমি আবার আগের মতো হাঁটতে শুরু করলাম। অফিস যেতে শুরু করলাম। আমি এখন স্বাভাবিক। তবে আমি এখন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মেয়েদের দিকে তাকাই না। আমি এখন রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাঁটি। কারণ, আমি চাই না আবার একটা দুর্ঘটনা ঘটুক। দোলাও তা চায় না। দোলা এখন আমাকে চোখে চোখে রাখে। দোলাকে নিয়ে আমি এখন ছুটির দিনে ঘুরে বেড়াই। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা খাই। কোনওদিন সিনেমা দেখি। কোনওদিন নন্দন চত্বরে বসে গল্প করি। কেন এসব করি, তা জানি না। দোলাই বা কেন এসব করে, তাও জানি না। মাঝে মাঝে ভাবি, আমি কি দোলাকে ভালবাসি? দোলা কি আমাকে ভালবাসে? ভালবাসার একটাই সমস্যা। শেষ পর্যন্ত যাকে ভালবাসা যায়, তাকে বিয়ে করতে হয়। কেন করতে হয়, তা জানি না। বিয়ে না করে কাউকে সারাজীবন ভালবাসা যায় না? যায়, অবশ্যই যায়। কিন্তু জীবনে তা বড় একটা ঘটে না। তবে দোলা কী চায়, তা জানা দরকার। একদিন তাই নন্দন চত্বরে গল্প করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম—
—তোমাকে একটা প্রশ্ন করব?
—কী?
—তুমি কি আমাকে ভালবাস?
—তাই তো মনে হয়?
—আমি কি তোমাকে ভালবাসি?
—সেটা তুমিই জানো।
—আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
—বুঝে দরকার নেই। বিয়ের পর সেটা বুঝবে।
আমি চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম, তার মানে? তুমি আমাকে বিয়ে করবে?
—হ্যাঁ, সেইরকম ইচ্ছে আছে।
—তোমার বাবা–মা আপত্তি করবে না?
—না।
—আমার বাবা–মা কী করবে জানি না। তবে মনে হয় তারাও আপত্তি করবে না। কিন্তু আমার একটু আপত্তি আছে।
—কীসের আপত্তি? আমি তোমার কোনও আপত্তি শুনব না।
—তার মানে, আমাকে বিয়ে করতেই হবে?
—হ্যাঁ।
এ কথা শুনে আমি চুপ করে গেলাম। ভাবতে লাগলাম, এটা কি উপকারের মধ্যে পড়ে? দোলাকে বিয়ে করা মানে কি দোলাকে উপকার করা? মনে হয়, এটা ঠিক উপকারের মধ্যে পড়ে না। কাউকে বিয়ে করা মানে তার উপকার করা নয়। ফলে দোলাকে বিয়ে করে আমি দোলার কোনও উপকার করছি না। কিন্তু আমি দোলাকে উপকার করার জন্যে দায়বদ্ধ। এখন আমি যদি বিয়ে না করি, তাহলে দোলা রেগে যাবে। রেগে গিয়ে বলবে, তুমি আমার উপকার করবে বলে কথা দিয়েছিলে। এখনই আমাকে দশ লাখ টাকা দাও। আমার খুব দরকার। আমি তখন কী করব? কী বলব দোলাকে? অতএব ঝামেলা না বাড়িয়ে বিয়ে করে ফেলাই ভাল।
৪
বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু ভয় আমার গেল না। উল্টে ভয় আমার বেড়ে গেল। আগে দোলার সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হত। এখন দোলার সঙ্গে ঘর করছি। এখন আর পালাবার উপায় নেই। এখন দোলা যদি একটা অবাস্তব কিছু আমার কাছে চেয়ে বসে, যদি বলে এই উপকারটা আমার কর, তাহলে আমি কী করব? কোথায় যাব? অনেকে অবশ্য প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিশ্রুতি রাখে না। বিশেষ করে আমাদের নেতারা তো তাই করে। কিন্তু আমি তো নেতা নই। আমি সাধারণ মানুষ। কাউকে কোনও কথা দিলে আমি তা রাখার চেষ্টা করি। নইলে আমি শান্তি পাই না। আমি দোলাকে বলেছি: ভবিষ্যতে আমি যদি আপনার কোনও উপকারে আসি, তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করব। সমস্যা হল, আজ পর্যন্ত দোলা আমার কাছ থেকে কোনও উপকার চায়নি। মাঝে মাঝে ভাবি, দোলা কি আমার কাছ থেকে উপকার নেওয়ার কথা ভুলে গেল? ভুলে গেলে ভাল, খুবই ভাল। আমি উপযাচক হয়ে সেটা মনে করিয়েও দেব না। আর যদি ভুলে না গিয়ে থাকে? তাহলে সমস্যা। অবশ্যই সমস্যা। এই সমস্যার কথা ভেবে মনের মধ্যে উদ্বেগ জমা হতে লাগল। আমার খাওয়া–দাওয়া কমে গেল। রাতের ঘুম কমে গেল। ভয়ে ভয়ে আমি দিন কাটাতে লাগলাম। চিন্তায় চিন্তায় আমার শরীর ভেঙে গেল। মা বলে, দিন দিন তোর শরীর খারাপ হচ্ছে কেন? বাবা বলে, তুই ডাক্তার দেখা। দোলা বলে, তুমি এত কী চিন্তা কর বল তো? আমি কাউকে কিছুই বলতে পারি না। আমি সামান্য হেসে চুপ করে যাই।
একদিন হঠাৎ দোলা আমাকে বলল, আমার একটা উপকার করবে?
আমি তো প্রায় আঁতকে উঠলাম, উপকার! কী উপকার?
দোলা হেসে বলল, তুমি ভগবান মানো না। কিন্তু আমি মানি, তোমার মা মানে। মা বলছিল…
উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চাইলাম, কী বলছিল?
—বলছিল, বউমা, তুমি শিবের পুজো কর। তাহলে খোকা ভাল হয়ে যাবে। তাই বলছি…
—কী বলছ?
—একটা ছোট শিবলিঙ্গ নিয়ে এসো। আমি পুজো করব।
কথাটা শুনে আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। বললাম আনব। কালই আনব?
আমি বাজার থেকে একটা শিবলিঙ্গ কিনে আনলাম। এনে দোলার হাতে তুলে দিয়ে বললাম, আজ আমি দায়মুক্ত হলাম।
দোলা অবাক হয়ে জিজ্ঞস করল, মানে?
বললাম, তুমি আমাকে যত্ন করে রাস্তা থেকে বাড়িতে এনে দিয়েছিলে। আমি বলেছিলাম: ভবিষ্যতে আমি যদি আপনার কোনও উপকারে আসি, নিজেকে ধন্য মনে করব। আজ আমি তোমার উপকার করে ধন্য হলাম।
সঙ্গে সঙ্গে দোলা হি হি করে হাসতে লাগল।
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, হাসছ েকন?
হাসি থামিয়ে দোলা বলল, আমার কিন্তু কিছু মনে নেই।
—সত্যি?
—হ্যাঁ।
তা শুনে ভাবলাম, তাহলে আমি এতকাল বোকার মতো… উহ!