সংবাদপত্রের একটি খবরে দেখা গেল, সিপিএমের কমরেডরা কৌটোতে চাঁদা সংগ্রহ করছেন। সাধারণত এরকম ছবি আর দেখা যায় না। ‘কৌটো কালেকশন’ একসময় বাম দলগুলোর অন্যতম কালচার ছিল। কবেই এই কালচার অতীত হয়ে গিয়েছে। মুর্শিদাবাদ জেলার ডোমকলের সিপিএম কমরেডরা অতীত হয়ে যাওয়া ‘কৌটো কালেকশন’ ফিরিয়ে অর্থ সংগ্রহ ও জনসংযোগে নেমেছেন। সিপিএম পার্টির ওই কমরেডদের এটি একটি সদর্থক ভাবনা অবশ্যই। এ বিষয়ে অন্য কিছু বলার নেই। সেজন্যই শিরোনাম করা হয়েছে কৌটো কালেকশন নিয়েই। সিপিএমের এই ‘কৌটো কালেকশন’ ও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নানান ইস্যু নিয়ে কংগ্রেস-সিপিএমের কিছু যুগান্তকারী ঐতিহাসিক স্লোগান রয়েছে— এখানে সেগুলো একটু মনে করব।
‘এ আজাদি ঝুটা হ্যায়
ভুল মৎ ভুল মৎ।’
স্বাধীনতা-প্রাপ্তির পর বামপন্থীদের এটিই ছিল প্রথম বিতর্কিত স্লোগান। স্বাভাবিকভাবেই এই স্লোগানে ক্ষুব্ধ হয়েছিল কংগ্রেস। পরে অনেক বামদল স্লোগানের ওই বক্তব্য থেকে সরে এসেছিল। তারা মনে করেছিল, স্বাধীনতা সদর্থক। কিন্তু ইতিহাস ভোলেনি। এখনও সিপিএম ও অন্য বামপন্থীদের অস্বস্তিতে ফেলে এই স্লোগান।
‘পুলিশ তুমি যতই মারো
মাইনে তোমার একশো বারো।’
‘কেউ খাবে কেউ খাবে না,
তা হবে না তা হবে না।’
স্বাধীনতা-প্রাপ্তির একদশক পরে রাজ্য খাদ্য সংকট তীব্র হয়। কালোবাজারি, মজুতদারদের দাপট ও সেই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। জনতা আন্দোলনে পথে নামে। ১৯৫৯ সালের ৩১ আগস্ট আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশ নির্মমভাবে গুলি চালায়। মারা যায় ৮০ জন মানুষ। তখনই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ওই দু’টি স্লোগান। ষাটের দশকের মাঝামাঝির খাদ্য আন্দোলনে আবার স্লোগান দু’টি মানুষের মুখে উঠে আসে।
‘তোমার নাম আমার নাম,
ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম।’
ষাটের দশকের ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় কমিউনিস্টরা ভিয়েতনামের সমর্থনে এই স্লোগান তুলেছিল।
‘বলতে বলতে ভিয়েতনাম
ভুলে গেছে বাপের নাম।’
ভিয়েতনামের সমর্থনে কমিউনিস্টরা স্লোগান তুলবে, আর কংগ্রেসই বা চুপ থাকে কী করে। কটাক্ষ করে তারাও এই স্লোগান দেয়।
‘গ্রাম নগর মাঠ পাথার বন্দরে তৈরি হও
কার ঘরে জ্বলেনি দীপ চির আঁধার তৈরি হও
কার বাছার জোটেনি দুধ শুকনো মুখ তৈরি হও।’
১৯৬৫-৬৬ সালের খাদ্য সংকটের সময় ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিমান বসু, দীনেশ মজুমদার, সুভাষ চক্রবর্তী, শ্যামল চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। মিছিলে সলীল চৌধুরীর কবিতার লাইন স্লোগান হয়ে উঠে এসেছিল আন্দোলনকারী ছাত্রদের মুখে।
‘হয় কম খাও
নয় গম খাও।’
ওই সময় আমেরিকার সঙ্গে ভারতের চুক্তি হয়। চুক্তি মতো ভারত পিএল ৪৮০ নামের গম আমেরিকা থেকে আমদানি করে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন জনগণকে গমের সাথে আলু, কাঁচাকলা, বেগুন প্রভৃতি সব্জি খাওয়ার উপদেশ দেন। তখনই তিনি শ্লোগানের ধাঁচে ওই কথা বলেন।
‘বাজার থেকে বেগুন কিনে
মনটা হল প্রফুল্ল,
ঘরে এসে দেখি
এ তো কানা অতুল্য।’
মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের গম ও আনাজ খাওয়ার নিদানে বিরোধী বামেরা পাল্টা এই স্লোগান দেয়। সেসময়ও স্লোগানে বামেদের ব্যক্তি আক্রমণ ছিল লাগামছাড়া। এই স্লোগানের ‘কানা অতুল্য’ হল কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষ। ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলনে কারারুদ্ধ হন অতুল্য ঘোষ। অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে জেলের মধ্যে বিক্ষোভ ও অনশন করছিলেন। সেসময় ইংরেজ জেলারের বেয়নেটের আঘাতে একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। বহু চিকিৎসাতেও চোখ ফিরে পাননি। অতুল্য ঘোষের এ হেন মর্মান্তিক ঘটনাও বামেদের ওই স্লোগানে উঠে এসেছিল।
‘চীনের কাস্তে হাতুড়ি
পাকিস্তানের তারা,
এরপরেও কি বলতে হবে
দেশের শত্রু কারা?’
কমিউনিস্টদের চীনের দালাল, রাশিয়ার দালাল বলত কংগ্রেস। ইন্দো-পাক, চীন-ভারত যুদ্ধ নিয়ে বামেদের অস্পষ্ট অবস্থান মনে করে এই স্লোগান দিয়ে কটাক্ষ করত কংগ্রেস কর্মীরা।
‘যখনই জনতা চাই চাকরি ও খাদ্য
সীমান্তে বেজে ওঠে যুদ্ধের বাদ্য।’
পাল্টা স্লোগানে থেমে থাকত না বাম কর্মীরা। বাম ছাত্ররা দেওয়াল রাঙিয়ে দিত এই স্লোগানে। এও যেন স্লোগানের যুদ্ধ।
‘দিল্লি থেকে এল গাই
সঙ্গে বাছুর সিপিআই।’
‘৭২-এর নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে সিপিআই। এই নিয়ে ব্যঙ্গ করে অন্য বাম দলগুলো এই স্লোগান দিয়েছিল।
‘দিনের বেলায় কৌটো নাড়ে
রাত্রে করে ফিস্ট
এরাই আবার চেঁচিয়ে বলে
আমরা কমিউনিস্ট।’
বামেদের আক্রমণ করে এই স্লোগান তুলেছিল কংগ্রেস। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি এবং সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত এই স্লোগান। বিরোধী বামেদের আক্রমণ করে স্লোগান তৈরিতে এই জুটি সিদ্ধহস্ত ছিলেন।
ষাট ও সত্তর দশকের শুরুটা ছিল স্লোগান-যুদ্ধের সময়। কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তি আক্রমণ থাকলেও স্লোগান তৈরিতে বুদ্ধিদীপ্ত মুন্সিয়ানা ছিল। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বহু রাজনৈতিক স্লোগান ইতিহাস হয়ে থাকবে। সিপিএমের ‘কৌটো কালেকশন’ স্লোগানগুলো মনে করিয়ে দিল।
ভালো লাগলো। এর আগেও নবিউলদার এই ধরনের স্লোগান নিয়ে লেখা পড়েছি।যখন লেখেন তখন বেশ নিখুঁত লেখেন। ধন্যবাদ লেখককে।