কাট ওয়ান
মধ্যবিত্ত তখনো হ্যারিকেনের আলোয় পড়তে বসতো। চাঁদিয়াল, পেটকাটি ঘুড়িগুলো ছিঁড়ে গিয়ে উপরের তার থেকে ঝুলতো। অফিসফেরত মধ্যবিত্ত জিলিপি আর সিঙ্গারার গন্ধে তাদের সান্ধ্যসুখের ঠিকানা জোগাড় করত। সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব-দের গোধূলি লগ্নের এক চিলতে আলো মাত্র পড়েছিল মধ্যবিত্তের মহানাগরিক জীবনে আর বাকি দিনটায় ঝলমল করত ময়দানের মেঠো রোদ্দুর। তখন মহানগরীর ঘুম ভাঙতো আকাশবাণীর শব্দে আর ঘুমাতে যেত রেডিওর সান্ধ্য খবর শুনে। আশির দশক। ধুতি পরা আপিস যাত্রীর জীবনের তারকা শুধু সুনীল কিংবা কপিল নন, তাদের চিলেকোঠার চুনখোসা দেওয়ালে টিমটিম করতো সুব্রত, প্রসূন, সুদীপরা আর তাদের মধ্যে রঙীনতম মহানায়ক হয়ে জ্বলজ্বল করছে একটা নাম একটা লাল হলুদ আট নম্বর জার্সি।
কাট টু
বছর সতেরো পর। সময়টা ২০০৩। আস্তে আস্তে মধ্যবিত্তের জীবনে আনাগোনা শুরু করেছে শচীন-সৌরভরা। কিন্তু খোঁজ নেই সেই রঙীনতম মহানায়কের। খোঁজ নেই সেই আট নম্বর জার্সিটারও।….উডল্যান্ড হাসপাতাল। মুখে অক্সিজেন মাস্ক পড়ে শুয়ে আছে আট নম্বর সেই লাল-হলুদ জার্সিটা। বাইরে প্রহর গুণছে পরিবার। ময়দানভোলা মহানগরী তখন দলে দলে টিভি ভাড়া করে ঝুঁকেছে ভারত-কেনিয়া সেমিফাইনাল ম্যাচে। নাকতলার বাড়িতে অপেক্ষা করছে ছোট্ট রুব্বা, কখন তার বাবা সুস্থ হয়ে এসে টিভিতে জুড়বে ভারত-কেনিয়া ম্যাচটা। মেঝেতে আঙুল দিয়ে বোঝাবে—”এই দেখ রুব্বা, এটা কভার ড্রাইভ, এটা স্কোয়ার কাট”। মহানগরী তখন ভুলে গেছে রন্টুকে। আট নম্বর জার্সিটা হয়ে গেছে সাদা-কালো, আর রঙীন হয়েছে একটা দশ নম্বর নীল জার্সি। ভেন্টিলেশনের বাইরে প্রহর গুনছেন পনীদেবী। আর হয়তো কিছুক্ষণ বাকী, হয়তো আর ফিরবেনা সে, তবুও মীরাকেল যদি হয়! এই তো কিছু বছর আগের কথা। সালটা বোধকরি ১৯৭৯। প্রভাত সংঘের হয়ে চাঁদা নিতে এল হালকা গোঁফ আর দুটো তিলওয়ালা একটা ফর্সা ছেলে। বিনয়, নম্র আর শান্ত স্বভাবটায় কি অনাবিল আকর্ষণ। তারপর ভালোবাসা, বিয়ে। সময় কত দ্রুত বয়ে গেলো।

ভেন্টিলেশনের আট নম্বর জার্সিটা ঝাপসা চোখে তাকাচ্ছে মাঝেমাঝে। পাগলের মতো চোখদুটো অপেক্ষা করছে পনিদেবীর, অপেক্ষা করছে ছোট্ট রুব্বার, আর চাতকের মতো খুঁজছে প্রাণাধিক প্রিয় ‘লালু’কে। এই তো কদিন আগেই। ১৯৮০। মোহনবাগানে টিফিন ভাগ করে খেত লালু-রণ্টু। শেষবেলায় দুর্বল স্মৃতিগুলো ফিরে যাচ্ছে স্মৃতিরোমন্থনের মিডফিল্ডটায়। সেই মোহনবাগান লন, সুদীপদার আশ্বাস, বাবলুদার বকুনি। মনে পড়ছে রন্টুর। ই.সি.জির গ্রাফটা ওঠানামা করছে। ওঠানামা করছে নস্টালজিক চ্যাপ্টারগুলোও। রন্টুর মনে পড়ছে প্রভাত সংঘের হয়ে ক্রিকেট খেলা, গোলকিপিং এ সোনার আংটি, সেখান থেকে অচ্যুত ব্যানার্জীর কোচিং এ প্লে-মেকার হয়ে ওঠা। তারপর পুলিশ-পোর্ট ট্রাস্ট হয়ে মোহনবাগান।পনি বলেছিল তাকে—‘মোহনবাগানে যাচ্ছ যাও,ওখানে কিন্তু রিজার্ভ বেঞ্চেই কাটাতে হবে’। তারপর কিছুবছর কাটে। ঘোলাটে হয়ে জমাট হয়ে আসে স্মরণীয় বছরটা-১৯৮৫। জীবনদা, পল্টুদা ঘিরে ফেলে তার বাড়ি, সেখান থেকে ইস্টবেঙ্গলে সই। পনির প্রিয় ক্লাব। পনিও তো চেয়েছিল খুব করে—সব মনে পড়তে থাকে। তারপর সেই মহামেডান ম্যাচ। প্রদীপদা নামায়নি তাকে। মনে একরাশ অভিমান। তারপর যখন নামালো, ১৭ মিনিটের একটা ঝড়েই রন্টু শেষ করে দিল মহামেডানকে। দুটো অ্যাসিস্ট, একটা লালুকে দিয়ে আরেকটা জামশিদকে দিয়ে। মনে পড়ে সেদিনের ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কথাগুলো—‘আজ তুমি জিতিয়েছো। আমাদের বুকের ওপর দিয়ে হেঁটে যাবে তুমি’। ভাবতে ভাবতে ছলছল করে উঠল চোখদুটো। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।ভাবতে থাকল আবার। আশির দশকে সান্ধ্যকালীন জিলিপি-সিঙাড়াতে রসস্বাদন করা বাঙালীর আরেকটা নেশা ছিল-কৃষাণু দের বাঁ পাটা। তারপর এলো অন্ধকার দিনগুলো। কার্টিলেজ ছিঁড়ল। রন্টুর মনে পড়ছে সব। তার চোখগুলো কাতরভাবে চাইছে প্রাণাধিক প্রিয় লালুকে। ময়দানের রন্টু-লালু জুটি। একজন মাথা নোয়ালে অন্যজন বুঝে যেত ইনস্টেপ না আউটস্টেপ। এই তো সেদিন, রন্টুর কার্টিলেজ ছিঁড়ল। একজন বিখ্যাত কোচ বলল—‘এই ল্যাঙড়াটা আবার মাঠে নামবে নাকি?’। তারপর সৈয়দস্যার (নইমুদ্দিন), সুদীপদা (চট্টোপাধ্যায়) পিঠে হাত রাখল তার। কামব্যাক করল রন্টু। ১৯৮৯—আবার ইস্টবেঙ্গলে সই-তারপর এয়ারলাইনস কাপ-পাঁচজনকে কাটিয়ে গোল। সংবাদপত্র লিখল—‘ভারতের মারাদোনা’। সব আজও যেন স্পষ্ট। কোথায় গেল বিকাশ (লালু), কোথায় গেল দলবদলের বাজারে সেই নাটকগুলো। ঘোড়ায় চেপে দুজনে সই করতে যেত, কখনও সমর্থকদের পিঠে চেপে। তারপর সেই সেবার, চেন্নাইয়ের হোটেলে অঞ্জনদা আর গড়গড়িদার মধ্যে কৃষাণু-বিকাশ নিয়ে টানাটানি। গড়গড়িদা তো কেঁদে ফেলে বলে ফেলল—‘অঞ্জন, তোমরা চিমাকে নিয়ে নাও, কৃষাণু-বিকাশকে দিয়ে দাও, না হলে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা আমার ঘরে আগুন জ্বালাবে। ‘কি সুন্দর ছিল দিনগুলো, কি সুন্দর ছিল ময়দান। লড়াইটা সামনাসামনি হতো, নোংরা রাজনীতিতে নয়। হারিয়ে গেল দিনগুলো আস্তে আস্তে। হারিয়ে গেল মধ্যবিত্তের হ্যারিকেনের আলো, হারিয়ে গেল সান্ধ্যকালীন জিলিপি-সিঙাড়ার গন্ধ, হারালো পাড়ার রকে রকে ক্যারামের বোর্ডে ময়দানের দলবদল নিয়ে তর্কবিতর্কগুলো। হারিয়ে গেল ট্রামের শব্দ। শচীন-সৌরভের আবির্ভাবে মধ্যবিত্তের জীবন ‘আমি চললাম’ বলে বিদায় জানালো ময়দানকে। সাদা-কালো হয়ে গেল আটনম্বর জার্সির ক্রেইজটাও।
কাট থ্রি
উডল্যান্ড হাসপাতালের সামনে ভিড়টা বেশ জমাট হয়েছে। হয়তো আর বেশীক্ষণ নেই। ভেন্টিলেশনের বাইরে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছেন পনীদেবী। মিথ্যা আশ্বাসদিয়ে বাড়িতে রেখে এসেছেন রুব্বাকে। পালমোনারি এমবোলিজম্-সহজ কথা তো নয়। বাড়িতে কাঁচের জারে রেখে এসেছেন রন্টুর ছেঁড়া কার্টিলেজটাও। ময়দানের রন্টু, তার ভালোবাসার রন্টু, তার রঙীন মহানায়ক আজ আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়ছে। হয়তো আর কিছু মিনিট বা সেকেন্ড বাকী। কাতর রন্টুর চোখ খুঁজে ফিরছে পনি-রুব্বাকে। এইতো এসেছে—আর লালু কই!—ওই বুঝি এগিয়ে আসছে সে—এইতো ড্রিবল করতে করতে এগিয়ে আসছে সে—ডিফেন্ডারটাকে ইনস্টেপে কাটিয়ে বল দে আমাকে, আর তারপর আমি….শেষ ড্রিবলটা আর দিতে পারলেননা। থেমে গেল নস্ট্যালজিক নাইন্টিজের ই.সি.জি গ্রাফটা। ময়দানভোলা তিলোত্তমা কেনিয়াকে সেমিতে হারানোর উৎসবে মজেছে। আর সেই বাজির মধ্যে দূরদেশের আকাশে মিলিয়ে গেল আট নম্বর জার্সিটা। নাকতলার বাড়িটায় তখনও ছোট্ট রুব্বা অপেক্ষা করে আছে, তার বাবা বুঝি এক্ষুনি আসবে।
কাট ফোর
পনিদেবীর বাড়িতে রন্টুর প্রিয় ইলিশ মাছটা আর আনা হয়না। অন্ধকার হয়ে পড়ে আছে নাকতলার বাড়িটা। বারবার অনুরণন হয় কৃষাণুর সেই বেদবাক্যটা, কার্টিলেজ ছিঁড়ে কামব্যাক করার পর মাত্র পঁচিশ হাজারে ইস্টবেঙ্গল সই করাতে এলো, আর রন্টু বলে উঠল—‘টাকা আমি নেব না অশ্রুদা, যদি জার্সির মান রাখতে পারি, তবেই টাকা নেব’। আর বুকের মধ্যে রক্ত চিড়ে দেয় পনিদেবীর কথাগুলো—‘এখনও মনে হয় এই বুঝি রন্টু বারান্দার নীচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। মাথায় রাজেশ খান্নার মতো চুল,মোটা গোঁফ, আর ফর্সা গালে দুটো তিল’।
কে বলে, একা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘মৃত্যুঞ্জয়’ লিখেছিলেন। আমার আপনার ‘মৃত্যুঞ্জয়’ এখনও আট নম্বর জার্সি পড়ে মাঠে নামে, আর ঝলসে ওঠে তার বাঁ পাটা।