ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিকাঠামো আত্মপ্রকাশ করে। সমগ্র উনিশ শতক জুড়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তার শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপগুলিকে সাংগঠনিক রূপ দিতে থাকে। এই সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার দরুণ আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থাও প্রসারিত হতে থাকে। অবশ্য এই আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা প্রসারের জন্য একাধিক প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল। অবিভক্ত বাংলার নদিয়া জেলায় আধুনিক শিক্ষার প্রসারে ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও মিশনারি শিক্ষার অবদান নেহাত কম ছিল না। নদিয়া জেলার নবদ্বীপ তো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে পরিচিত ছিলই। কৃষ্ণনগর, শান্তিপুরের মতো জনপদও মধ্যযুগ থেকে বাংলার শিক্ষা সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নবদ্বীপে বহু সংস্কৃত পণ্ডিতের বাস ছিল। আর কৃষ্ণনগর শহর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল মধ্যযুগে। রাজা রাঘব মাটিয়ারি ছেড়ে রেউই (কৃষ্ণনগর) গ্রামে তার রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। সেখানে রাজদরবারকে কেন্দ্র করে বিদ্যানদের সমাগম ছিল লক্ষণীয়। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে এহেন নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে সরকারি মহাবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়, যা আধুনিক ও পাশ্চাত্য শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ঐতিহ্যমন্ডিত কৃষ্ণনগর কলেজ ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে তার পথচলা শুরু করে এবং সময়ের সাথে সাথে বাংলার শিক্ষাব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করে তুলতে এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
অবিভক্ত নদিয়া জেলা আয়তনে স্বাধীনোত্তর নদিয়া জেলার প্রায় দ্বিগুণ ছিল। অবিভক্ত নদিয়া জেলা রানাঘাট, কৃষ্ণনগর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া এই পাঁচটি মহকুমা নিয়ে গঠিত ছিল। কৃষ্ণনগর কলেজ নদিয়া জেলার প্রাচীনতম কলেজ তো ছিলই, বাংলারও প্রাচীনতম কলেজগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল। গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জের আমলে (১৮৪৪- ১৮৪৮ খ্রিঃ) এই মহাবিদ্যালয় স্থাপিত হয়। কৃষ্ণনগর কলেজ আক্ষরিক অর্থে পথ চলা শুরু করে বা এর আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠাকাল হল ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি। জাতপাত নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের জন্য এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি উন্মুক্ত ছিল। বিখ্যাত শেক্সপেরিয়ান স্কলার D.L. Richardson ছিলেন এই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ। তিনি ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে নভেম্বরই অধ্যক্ষের দায়িত্বভার পেয়ে যান। সেইসময় কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল ও কৃষ্ণনগর কলেজ অভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম যৌথ শিক্ষকমণ্ডলীর মধ্যে অধ্যক্ষ ডি.এল. রিচার্ডসন ছাড়াও আরো তিনজন ইউরোপীয় শিক্ষক ব্রাডবুরি, বিটসন ও বিনল্যান্ড ছিলেন এবং ছিলেন দশজন ভারতীয় শিক্ষক। এহেন সমৃদ্ধ ফ্যাকাল্টি নিয়েই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান কৃষ্ণনগর কলেজ পথ চলতে শুরু করেছিল।

কৃষ্ণনগর কলেজ এবং কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল প্রথমে মাসিক ১২৫ টাকা দিয়ে একটি ভাড়া বাড়িতে শুরু হয়। প্রথম বছরে কলেজ এবং স্কুলের মোট ছাত্রসংখ্যা ছিল ২৪৬ জন। এর মধ্যে মাত্র ৮ জন ছিল কলেজ বিভাগে। ডি.এল. রিচার্ডসনের পর এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হন Mr. Rochfort, যার সময় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভালো অগ্রগতি হয়। তিনি ১৮৪৬-এর ডিসেম্বর থেকে ১৮৫৫-র ডিসেম্বর পর্যন্ত অধ্যক্ষ ছিলেন। এই সময় ১৯৪৭ সালের শেষে মোট ছাত্রসংখ্যা বেড়ে হয় ২৫৮ জন, যার মধ্যে ২ জন মুসলমান ও ২ জন খ্রিস্টান ছাত্র ছিল বলেও জানা যায়। কৃষ্ণনগর কলেজ পরিচালনার জন্য প্রথমে একটি লোকাল কমিটি নিযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু ১৮৪৮ সালের ২২ জুন কলেজ পরিচালনার দায়িত্ব এই লোকাল কমিটির হাত থেকে স্থানান্তরিত করা হয় Council of Education-এর হাতে। Council of Education-এর তরফ থেকে Mr. Drinkwater Bethune ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনগর কলেজের বার্ষিক পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। তার বক্তৃতায় কৃষ্ণনগর কলেজের মাধ্যমে নদিয়া ও প্রতিবেশী জেলাগুলিতে আধুনিক শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর ব্রিটিশ উদ্দেশ্য নদিয়াবাসীর কাছে স্পষ্ট হয়। বেথুন সাহেব নদিয়া জেলায় স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার ও সমাজে নারীদের বিশেষ অধিকার দেওয়ার প্রসঙ্গে বক্তব্যও রাখেন। এই সকল ঘটনাবলীর মাধ্যমে নদিয়া জেলায় আধুনিক শিক্ষা ও চিন্তাধারা বিস্তারের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।
কৃষ্ণনগর কলেজের ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে বারংবার সেখানকার রাজা ও রাজপরিবার সম্পর্কিত কিছু ঘটনা প্রসঙ্গক্রমে চলেই আসে। রাজা গিরীশচন্দ্রের দত্তক পুত্র মহারাজা শ্রীশচন্দ্রের কথা এখানে বলতেই হয়। রাজা শ্রীশচন্দ্র তাঁদের পারিবারিক প্রথার অবহেলা করে নিজের জ্যেষ্ঠ পুত্র কুমার সতীশচন্দ্রকে কৃষ্ণনগর কলেজে পাঠদান করেছিলেন। ইতিপূর্বে এদেশের পুরাতন রাজবংশোদ্ভূত ভূম্যধিকারীরা নিজেদের পুত্রদের কোনো কলেজে বা স্কুলে দিতেন না। কারণ সেখানে তাদের সাধারণ বালকদের সাথে একাসনে বসতে হবে ও কলেজের সাধারণ নিয়ম পালন করতে হবে। কিন্তু রাজা শ্রীশচন্দ্র এবিষয়ে ব্যতিক্রমী ছিলেন। আগাগোড়াই ইউরোপীয় রীতিনীতি জানার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। কিন্তু পিতার ভয়ে নিজের মনোমত কাজ করতে পারেন নি। তিনি নিজে ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ইংরাজি ভাষা পড়তে আরম্ভ করেছিলেন। রাজা গিরীশচন্দ্রের পরলোকগমনের পর রাজা শ্রীশচন্দ্র তাঁর পুত্র সতীশচন্দ্রকে কলেজে পাঠান এবং নিজেও কলেজ কমিটির সভ্য হন। তিনি এই কমিটির প্রতি অধিবেশনকালে উপস্থিত থেকে সভার কার্য নির্বাহ করতেন এবং প্রতি বছর ছাত্রদের বঙ্গভাষার পরীক্ষার ভার নিতেন।

সমকালীন একাধিক ঘটনার সাক্ষী কৃষ্ণনগরের এই কলেজ গৃহ। রাজা শ্রীশচন্দ্র ইংরেজ গভর্নমেন্টের থেকে মহারাজা উপাধির ফরমান লাভ করেছিলেন কৃষ্ণনগর কলেজ গৃহে। গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুলাই এই ফরমান পাঠান। নদিয়া জেলার কালেক্টর সাহেব কৃষ্ণনগরের কলেজ গৃহে বহু সমারোহের সাথে সভা করে রাজা শ্রীশচন্দ্রকে ঐ ফরমান প্রদান করেন। রাজা সতীশচন্দ্রের সাথেও কৃষ্ণনগর কলেজের বিশেষ সম্পর্ক ছিল, অথবা এমনটি বললে আরো সঠিক হবে যে তাঁর সাথে কলেজের পরিচালকদের বিশেষ সখ্যতা ছিল। তাঁর অকাল প্রয়াণ সকলকে বেদনা দিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে কৃষ্ণনগর কলেজে ছাত্রদের পারিতোষিক প্রদানের যে সভা হয়, সেখানে কলেজের অধ্যক্ষ স্যামুয়েল লব সাহেবের বক্তব্যটি এখানে উল্লেখনীয়। তিনি সেদিন বলেছিলেন— “এখানকার ইংরাজ ও বাঙালীদিগের মধ্যে মহারাজা গ্রন্থিস্বরূপ ছিলেন, তাঁহার অভাবে সেই গ্রন্থি ছিন্ন হইয়াছে, এবং অচিরাৎ আর কেহ যে ঐরূপ গ্রন্থিস্বরূপ হইবেন তাহারও প্রত্যাশা নাই।”
এবার কৃষ্ণনগর কলেজের নতুন ভবনটির নির্মাণ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলা যাক। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনগর কলেজ তার নবনির্মিত ভবনে স্থানান্তরিত হয়েছিল, বর্তমানে সেই ভবনটিই আমরা দেখতে পাই। এই নতুন ভবনটি নির্মাণ করতে সে সময়ে খরচ হয়েছিল ৬৬,৮৭৬ টাকা, যার মধ্যে ১৭,০০০ টাকা নদিয়া জেলার বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের থেকে অনুদান হিসেবে পাওয়া গিয়েছিল। আর কলেজের নতুন জায়গার ১০০ বিঘা জমির দুই তৃতীয়াংশ নদিয়ার মহারাজ শ্রীশচন্দ্র রায় ও কাশিমবাজারের মহারাণী স্বর্ণময়ীর দান থেকে পাওয়া যায়। কৃষ্ণনগর কলেজের নতুন ভবন নির্মাণে নদিয়া-রাজের বিশেষ ভূমিকা ছিল। এমনিতেই নদিয়া তথা বাংলার শিক্ষা-সংস্কৃতির বিবর্তনের সাক্ষী এই রাজবংশ। দেওয়ান কার্ত্তিকেয়চন্দ্র রায় মহারাজা শ্রীশচন্দ্র সম্পর্কে লিখেছেন- “সংস্কৃত ও ইংরেজি উভয় বিদ্যার উন্নতি বিষয়ে তাহার যথেষ্ট উৎসাহ ও যত্ন ছিল। অধ্যাপকগণকে যথাসাধ্য আনুকূল্য করিতেন এবং তাহাদের টোলের ব্যয়ের জন্য বার্ষিক বৃত্তিও দিতেন। কৃষ্ণনগর কলেজ গৃহ নির্মণার্থ এ জেলার সমস্ত ভূম্যধিকারী অপেক্ষা, অধিক অর্থ প্রদান এবং ঐ বাটীর জন্য, তাহার অধিকারস্থ যে ভূমির প্রয়োজন হয়, তাহা দান করেন।”

কৃষ্ণনগর কলেজের নতুন ভবনে আনুষ্ঠানিক ভাবে কাজকর্ম শুরু হয় ১৮৫৬ সালের ১ জুন। কলেজের নতুন অধ্যক্ষ হয়ে আসেন Mr. R.Lodge। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত (১৮৫৭ খ্রি.) হওয়ার পর কৃষ্ণনগর কলেজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও সরকার কর্তৃক গ্রান্ট ইন এড্ সিস্টেম চালু করা হলে কৃষ্ণনগর কলেজ উক্ত সাহায্য লাভ করে। বর্ধিত কর্মচারীর মাধ্যমে ১৮৬৫ সালে বি.এ. এবং ল ক্লাস শুরু হয়। কলেজের সিনিয়র ডিপার্টমেন্টে ছাত্রসংখ্যা ১৮৬৪ সালে ছিল ৬১, যেটা ১৮৭০ সালে বেড়ে হয় ১২৭। কিন্তু এই ছাত্রদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন জমিদার বংশের সন্তান। তবে ধীরে ধীরে সাধারণ ঘরের সন্তানরাও উচ্চশিক্ষার দিকে আকৃষ্ট হয়। কৃষ্ণনগর কলেজে এম.এ. ক্লাস শুরু হয় ১৮৭০ সালে এবং সার্ভে ডিপার্টমেন্ট খোলা হয় ১৮৭২ সালের আগস্ট মাসে। এক বছর পর First Arts পরীক্ষার জন্য কেমিস্ট্রিকে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়।
অবিভক্ত নদিয়া জেলা তথা সমগ্র বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতিতে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষগণ, অধ্যাপকবর্গ এবং অবশ্যই কৃতী ছাত্রবৃন্দকে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে সুপ্রসিদ্ধ ডি.এল. রিচার্ডসন সাহেব প্রথম অধ্যক্ষ হয়ে আসেন। রামতনু লাহিড়ী একশত টাকা বেতনে দ্বিতীয় শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। কৃষ্ণনগরের লাহিড়ী পরিবার নদিয়ায় আধুনিক শিক্ষা ও চিন্তাধারা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এই বংশেরই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন বাবু রামতনু লাহিড়ী, যিনি কৃষ্ণনগর কলেজ তথা বাংলার শিক্ষা-সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। লাহিড়ী বংশের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন বরেন্দ্রভূমির অর্থাৎ রাজশাহী পরগণার কুলীন ব্রাহ্মণ। অনুমান সেখান থেকে বিবাহসূত্রে তাঁরা কৃষ্ণনগরে এসেছিলেন। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের সভাকবি ভারতচন্দ্র তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’-এ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার যে বর্ণনা দিয়েছেন, সেখানে রাজার পারিষদবর্গের মধ্যে লাহিড়ী পরিবারের দুই ভাইয়ের উল্লেখ রয়েছে—
“কিঙ্কর লাহিড়ী দ্বিজ মুনসী প্রধান।
তার ভাই গোবিন্দ লাহিড়ী গুণবান।।”

রামতনু লাহিড়ীর সহোদর শ্রীপ্রসাদ লাহিড়ী দেশের বালকদের ইংরেজি শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিজ বাসভবনে একটি ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন এবং নিজেই সেখানে শিক্ষা দিতেন। ‘ক্ষিতীশ-বংশাবলী-চরিত’-এ দেওয়ান কার্ত্তিকেয়চন্দ্র রায় লিখেছেন— “১২৪৩ কি ৪৪ বাঃ অব্দে, কৃষ্ণনগরনিবাসী দেশহিতৈষী শ্রীযুক্ত শ্রীপ্রসাদ লাহিড়ি নিজ নিকেতনে এক অবৈতনিক ইংরাজী বিদ্যালয় স্থাপন করেন। …তিনি আন্তরিক যত্ন ও পরিশ্রমপূর্বক অধ্যাপনা করিতেন এবং দরিদ্র ছাত্রগণকে পাঠ্যপুস্তক ও কাগজ কলম দিতেন। এই সকল কারণে, অনতিকাল মধ্যে, তাহার বিদ্যালয়ে অনেক বালক পড়িতে লাগিল। ইদানীং এ প্রদেশে ইংরাজি বিদ্যা শিক্ষার যেরূপ আগ্রহ হইয়াছে, তদানীং সেরূপ ছিল না, তথাপি, ছাত্রের সংখ্যা প্রায় এক শত হইয়াছিল।”
বাবু রামতনু লাহিড়ী এবং মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রথম থেকেই কৃষ্ণনগর কলেজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বাবু রামতনু লাহিড়ীর মতো জ্ঞানদীপ্ত শিক্ষক থাকার দরুণ ছাত্রদের মানসিকতা উন্মুক্ত হওয়া স্বাভাবিক ছিল। রামতনু লাহিড়ী সমাজচিন্তা ও শিক্ষাচিন্তায় হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর পথকেই অনুসরণ করেছিলেন। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত রামতনু লাহিড়ী আধুনিক সমাজব্যবস্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। রামতনু লাহিড়ীর সান্নিধ্যে কৃষ্ণনগর কলেজের ছাত্ররা হিন্দু বিধবাদের পুনঃবিবাহের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার পবিত্র শপথ গ্রহণ করেন। কৃষ্ণনগর কলেজের ছাত্ররা বাবু রামতনু লাহিড়ীর কাছ থেকে আধুনিক চিন্তাধারা ও কুসংস্কার মুক্ত জীবনযাপন প্রণালী অধ্যয়ন করেন। রামতনু লাহিড়ী বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষকতা করেছিলেন। তবে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার সময় তিনি কৃষ্ণনগর কলেজেই ছিলেন। ১৮৬৫ সালের নভেম্বর মাসে পেনসন নিয়ে তিনি কর্ম থেকে অবসর নেন। তিনি যখন পেনসনের জন্য আবেদন করেন তখন কৃষ্ণনগর কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন মি. আলফ্রেড স্মিথ। লাহিড়ী মহাশয়ের আবেদন ডিরেক্টারের কাছে প্রেরণ করার সময় স্মিথ সাহেব লিখেছিলেন— “In parting with Baboo Ram Tanoo Lahiri I may be allowed to say that Government will lose the services of an educational officer, than whom no officer has discharged his public duties with greater fidelity, zeal and devotion, or has laboured more assiduously and successfully for the moral elevation of his pupils.” এর থেকেই কৃষ্ণনগর কলেজের শিক্ষক হিসাবে রামতনু লাহিড়ীর গুরুত্ব অনুভব করা যায়।

উনিশ শতকের ষাটের দশকে কৃষ্ণনগর কলেজকে সঙ্কটের মুখে পড়তে হয়েছিল। এইসময় শহরে মহামারী এবং ম্যালেরিয়ার প্রকোপে কলেজের ছাত্রসংখ্যা কমতে থাকে। ১৮৭১ সালে বি.এ. ক্লাসের পতন হবার সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্যমন্ডিত প্রতিষ্ঠানটি তার প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা হারায়। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান খুব দ্রুত এই সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিল। তিন বছর পর যখন লেফটেনেন্ট গভর্নর স্যার রিচার্ড টেম্পেল এই প্রতিষ্ঠানে আসেন তখন তিনি বেশকিছু শর্তের বিনিময়ে পুনরায় বি.এ. ক্লাস চালু করেন। এর সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণনগর কলেজ তার হৃত গৌরব পুনরায় ফিরে পায় এবং প্রথম শ্রেণীর কলেজের মর্যাদা লাভ করে। এই সকল উদ্যোগের সাথে সাথে কৃষ্ণনগর কলেজ তার পরবর্তী উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে পা বাড়ায়।
লেখক : আঞ্চলিক ইতিহাস লেখক, নদিয়া।
অধ্যাপক দীপাঞ্জন দে এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ফলবতী হচ্ছে এই প্রবন্ধবলির প্রকাশের মাধ্যমে। আসুন আমরা এই গুরু উদ্যোগকে সাফল্য মন্ডিত করি।
আমার প্রণাম নেবেন। আশীর্বাদ করবেন।
Very nicely recorded with past references. Well stated.Needs more in formation about the growth of the college including opening of morning section.
Centenary festival lathi charge of police removal of National Zac of British rule are the happenings there.please refer to news papers published then.
Very happy
Thanks a lot sir for the comments and information.
কৃষ্ণনগর সরকারি কলেজ,সূচনা পর্ব,তথ্য নির্ভর সুখপাঠ্য প্রবন্ধ।
অভিনন্দন।
অপেক্ষায় রইলাম কিভাবে কেনো বিশ্ববিদ্যালয় হতে হতে হলো না সে ,বঞ্চিত কোন হতভাগ্য কোন অভিশাপে?? কলম কি তুলে আনে ইতিহাস?? যুক্তি বা রহস্য…
আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুব ভালো লাগলো দিদি।
We are proud for the performance of Mr.Dipanjan De.We shall overcome.Thanks my brother .
Thank You.
কৃষ্ণনগর কলেজের মত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এমন গবেষণালব্ধ সাবলীল লেখা পড়ে খুব ভালো লাগল। আরও এরকম লেখা নিশ্চয়ই পাব।
ধন্যবাদ। নিশ্চয় পাবেন। আপনার মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
স্যার অসাধারণ অনেক কিছুই জানতাম না সেগুলো জানলাম আমি এটা আমাদের কলেজ গ্রুপেও শেয়ার করলাম।????
তোমার ভালো লেগেছে জেনে খুব ভালো লাগল।
খুব ভালো লাগলো, অনেকটা সমৃদ্ধ হলাম স্যার।
অনেক ধন্যবাদ।
I am proud as a student of this college. Also thanks for disclose the real history, which will help the present generation to know about own and try to maintain it.
Thank You Sir. Please also read the next part of this article.