‘কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজ : সূচনা পর্ব’ — এই বিষয়ে একটি লেখা ইতিপূর্বে প্রকাশিত হওয়ায়, এখানে কিছুটা পথ পেরিয়ে কলেজের কথা শুরু করলাম। লেখার খেই ধরতে এই স্মরণিকার পাঠকদের আগের লেখাটি (গুগল সার্চে মিলবে) পড়ে দেখতে অনুরোধ করবো। … ১৮৭৪-১৮৭৭ সাল পর্যন্ত কৃষ্ণনগর কলেজের (তখন ‘কৃষ্ণনগর কলেজ’ নামটিই ব্যবহৃত হতো) অধ্যক্ষ ছিলেন Sir Roper Lethbridge. তাঁর মতো প্রতিভাবান ব্যক্তিত্বের অধীনে এই প্রতিষ্ঠানের উন্নতি হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। তিনি অক্সফোর্ড থেকে ক্লাসিকস ও ম্যাথম্যাটিকসে ডবল অনার্স নিয়ে পাশ করেছিলেন। সেই সময় থেকে কলেজের ছাত্রসংখ্যা পুনরায় বাড়তে থাকে। কলেজে বিজ্ঞান ও কলা উভয় বিষয়েই শিক্ষা দেওয়া হতে থাকে। এমনকি বিজ্ঞানের বাড়তি চাহিদা মেটাতে ১৮৮০ সালে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নবিদ্যার জন্য ল্যাবরেটরি খোলা হয়। এই ল্যাবরেটরি ১৯০৪ সালে পুনরায় বর্ধিত করা হয়। বিংশ শতকে কৃষ্ণনগর কলেজের কলেবর এভাবে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।
কৃষ্ণনগর কলেজের ছাত্রদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করার জন্য কয়েকটি পুরষ্কারের প্রচলন করা হয়েছিল। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি এবিষয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগের কথাও স্মরণ করতে হয়। ১৮৮৩ সালে বাবু মোহিনী মোহন রায়ের উদ্যোগে ৮০ টাকা অর্থমূল্যের পুরষ্কারের প্রচলন হয়। এই পুরষ্কারটি সেই কৃতী ছাত্রকে দেওয়া হত যে ছাত্রটি সেই বছরে বি.এ. এবং এম.এ. পরীক্ষাতে সবথেকে সফল ছিল। বাবু শ্যামাচরণ মৈত্র ৮ টাকা অর্থমূল্যের একটি পুরষ্কারের সূচনা করেছিলেন বলে জানা যায়। এই পুরষ্কারটির নাম ছিল ‘Smith and Macdonell Prize’ (Bengal District Gazetteers : Nadia, J.H.E. Garrate)। এই পুরষ্কার বছরে একবার দেওয়া হত সেই ছাত্রকে, যে এফ.এ. পরীক্ষায় সবথেকে বেশি সফল হত এবং বি.এ. ক্লাসে পড়াশোনা চালাতে আগ্রহী হত। এইসকল পুরষ্কার সেসময় ছাত্রদের পড়াশোনার প্রতি বাড়তি আগ্রহ যুগিয়েছিল ধরা যেতে পারে। অসংখ্য কৃতী ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় ভালো ফল করে কৃষ্ণনগর কলেজের নাম উজ্জ্বল করেছিলেন।

১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয় আইন (Indian Universities Act of 1904) পাশ হয়। অতঃপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯০৮-০৯ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনগর কলেজের পরিকাঠামোগত মানোন্নয়ন ঘটাতে বদ্ধপরিকর হয় এবং এই কলেজের হাল শক্ত হাতে ধরে। ১৯০৮ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশে কৃষ্ণনগর কলেজ ও কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল পৃথক হয়ে যায়। কৃষ্ণনগর কলেজ তার বর্তমান ভবনটিতেই থাকে, যেটি ১৮৫৬ সালে নির্মিত হয়েছিল। আর কলেজিয়েট স্কুল কলেজের পাশেই হৈমন্তী ভবনে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। অতঃপর এম.এ. এবং বি.এল. কোর্স বন্ধ করা হয়। আই.এসসি. এবং বি.এসসি. পরীক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা অনুমোদিত হয়। ইংরেজি ও অঙ্কে অনার্স কোর্স এবং অর্থনীতি ও দর্শনে পাশ কোর্সের সূচনা করা হয়। কৃষ্ণনগর কলেজের প্রসিদ্ধ অধ্যক্ষগণ যথা রায়বাহাদুর জ্যোতিভূষণ ভাদুড়ী (১৮৯৮-১৯০৬ খ্রি.), সতীশচন্দ্র দে (১৯০৯-১৯১৬ খ্রি.) এবং R.N. Gilchrist (১৯১৬-১৯২১ খ্রি.)-এর আমলে কলেজ তার সমৃদ্ধি বজায় রাখে। ১৯০৮-০৯ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনগর কলেজ পরিচালনা সমিতি নিযুক্ত করা হয় এবং কলেজ কর্মচারী সভার সূচনা করা হয়। এই সময় কলেজ গ্রন্থাগার ও ল্যাবরেটরিকে আরো সমৃদ্ধ করা হয়। ছাত্র তহবিল শুরু হয় ১৯২৯ সাল থেকে। কলেজের উন্নতি বাবদ প্রতি ছাত্র তাদের মাসিক মায়না থেকে এক আনা করে এই তহবিলে জমা করত। এছাড়া আরো নতুন তহবিলও গড়ে উঠতে দেখা যায়। এর মধ্যে দেবেন্দ্রনাথ সিংহ রায় তহবিলের কথা স্মরণ করা যায়।
১৯০৫ সালে ছাত্রদের কমনরুম তৈরি করার সাথে সাথে কলেজ নতুন উদ্যমে জেগে ওঠে। এই কমনরুমের একটি অংশ হিসেবেই ১৯০৭ সালে ছাত্র ইউনিয়নেরও আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯০৮ সালে প্রথম কৃষ্ণনগর কলেজ পত্রিকা শুরু হয়। এই পত্রিকার নাম প্রথমে ছিল ‘Life and Light’ (Krishnagar College : Centenary Commemoration Volume)। তবে পরবর্তীতে এটি যখন ১৯১৫-র জুলাই মাসে প্রথম ছাপানো হয় তখন এটি কলেজ পত্রিকা নাম নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন হেমন্তকুমার সরকার (শান্তিপুরের বাগআঁচড়া গ্রামে জন্ম, বিস্মৃতপ্রায় বিপ্লবী)। এই বালক পরবর্তীকালে একজন অন্যতম বিপ্লবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য দলের প্রধান হুইপ ছিলেন তিনি।

১৯২১ খ্রিস্টাব্দে অসহযোগ আন্দোলনের সময় কৃষ্ণনগর কলেজের পড়াশোনা অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল। এইসময় টানা একমাস কলেজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। এই অবস্থায় সমগ্র বাংলা তথা ভারতবর্ষে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজমান ছিল এবং কৃষ্ণনগর কলেজ পরিচালনা করা রীতিমত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবুও অধ্যক্ষ Egerton Smith ১৯২২ সালে তাঁর অফিসিয়াল রিপোর্টে নদিয়া জেলায় কৃষ্ণনগর সরকারি কলেজের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের আবশ্যকতা সম্পর্কে মত প্রকাশ করেছিলেন। ১৯২৭ সালের ১১ই জুলাই কৃষ্ণনগর কলেজের হিন্দু ছাত্রাবাস তার বর্তমান ভবনটিতে স্থানান্তরিত হয়। কৃষ্ণনগর কলেজের এই হিন্দু ছাত্রাবাসের নতুন ভবনটির উদ্বোধন করেন মহারাজা ক্ষৌণীশচন্দ্র রায়। এই হিন্দু ছাত্রাবাস প্রথমে ২০ জন ছাত্রকে নিয়ে শুরু হয়েছিল ১৮৭৬ সালের জুন মাসে। আর কৃষ্ণনগর কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাস ১৯১৫ সালের জুলাই মাসে মাত্র চারজন ছাত্রকে নিয়ে শুরু হয়। পরবর্তীতে স্যার আজিজুল হকের দ্বারা ১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে এই মুসলিম ছাত্রাবাসটি ‘অ্যান্ডারসন মুসলিম ছাত্রাবাস’ নাম নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। ১৯৩৮-৪০ সালের মধ্যে কৃষ্ণনগর কলেজ আরো কিছুটা সম্প্রসারিত হয়। ১৯৩৮ সালে কলেজে বিদ্যুতেরও ব্যবস্থা করা হয়।
১৯৩২ সালে অধ্যক্ষ আর.এন. সেন পরীক্ষামূলকভাবে কৃষ্ণনগর কলেজে কো-এডুকেশনের সূচনা করেছিলেন। এটি শুরু হয় মাত্র একটি ছাত্রীকে নিয়ে এবং ক্রমে এই সংখ্যা ১৯৪৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬। এরপর জে.এম. সেন মহাশয় অধ্যক্ষ হন। তিনি অধ্যক্ষ থাকার সময় কৃষ্ণনগর কলেজ একাধিক বিষয়ে উন্নতি লাভ করেছিল। তিনি ১৯৩৭ সাল থেকে এই কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তার সময় থেকে কৃষ্ণনগর কলেজে একাধিক কোর্স শুরু হয়। জে.এম. সেন মহাশয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অবদান হল তিনি কৃষ্ণনগর কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ৩২টিরও বেশি স্কলারশিপ, বৃত্তি, পুরষ্কারের ব্যবস্থা করেন। এছাড়াও তিনি ছাত্রদের কমনরুম লাইব্রেরি, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি প্রভৃতি বিষয়ে ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষ্ণনগর কলেজের ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় কৃষ্ণনগর কলেজের ছাত্ররা তাদের সাধ্যমতো অংশগ্রহণ করেছিল। সেই সময় সুরেন্দ্রনাথ ও বিপিনচন্দ্রের বক্তৃতা শোনার সৌভাগ্য অনেকের হয়েছিল। কৃষ্ণনগর কলেজের ছাত্ররা প্রায়ই স্বদেশী শোভাযাত্রায় যোগ দিত। এই সময় কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন রায়বাহাদুর জ্যোতিভূষণ ভাদুড়ী। কলেজের ছাত্রদের মধ্যে দুটি গান খুবই জনপ্রিয় ছিল — “মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই” আর “একবার তোরা মা বলিয়া ডাক”। গান্ধীজী যখন সমগ্র দেশকে ১৯৩০-র ২৬শে জানুয়ারি ‘স্বাধীনতা দিবস’ পালন করবার জন্য আহ্বান জানান তখন কৃষ্ণনগর কলেজে সেই দিনটি পালন করা উপলক্ষে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। ছাত্ররা সমগ্র শহরের মোড়ে মোড়ে তোরণ নির্মাণ করেন এবং প্রধান রাস্তা ধরে মিছিল করে ‘স্বরাজ পার্ক’ (মোমিন পার্ক)-এ সমবেত হয়ে মূল অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। তবে কলেজ হোস্টেলে জাতীয় পতাকা (তখন কংগ্রেসের পতাকাকে জাতীয় পতাকা বলা হত) উত্তোলন নিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ছাত্রদের গণ্ডগোল হয়। পরেরদিন কলেজের অধ্যক্ষ হোস্টেলের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ছাত্রকে (লোকেন মুখোপাধ্যায়, রঘুনন্দন বিশ্বাস, হরিচরণ প্রামাণিক) হোস্টেল থেকে বহিষ্কার করেন। এর প্রতিবাদে কৃষ্ণনগর ছাত্র সমিতির নেতৃত্বে কলেজের হোস্টল ও পরে কলেজ ধর্মঘট শুরু হয়। তিনমাস ধরে চলা কৃষ্ণনগর কলেজ ধর্মঘট সারা বাংলায় আলোড়ন ফেলে দেয়। তখনকার বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক Liberty-তে ‘Professors before empty benches’ শিরোনামে এই ধর্মঘট সম্পর্কে লেখাও প্রকাশিত হয়। বাংলার ছাত্রনেতারা কৃষ্ণনগরে এসে সংগ্রামী ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান। নদিয়ার ছাত্ররা প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রাদেশিক ছাত্র সংগঠন বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র সমিতি (B.P.S.A) এবং নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতি ( A.B.S.A) উভয়েরই সহযোগিতা লাভ করে। এরপর গান্ধীজীর ঐতিহাসিক ডান্ডি অভিযানের সময় কৃষ্ণনগর কলেজের একদল ছাত্র (জগন্নাথ মজুমদার, কেদারনাথ মুখোপাধ্যায়, স্মরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্নদানন্দ দাশগুপ্ত ও অমরেশ বিশ্বাস) জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক তারকদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে সত্যাগ্রহী স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ ও সত্যাগ্রহের বার্তা নদিয়ার গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার সংকল্প নিয়ে জেলা সফরে যান। এইভাবে কৃষ্ণনগর কলেজের কৃতী ছাত্ররা শিক্ষা অর্জনের সাথে সাথে বিভিন্ন সময়ে দেশের কাজে এগিয়ে আসেন।
কৃষ্ণনগর কলেজের ছাত্র উমেশচন্দ্র দত্ত প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় যুগের এক কৃতী ছাত্র ছিলেন। ইংরেজি সাহিত্যে তাঁর সুগভীর জ্ঞান ছিল। তিনি রামতনু লাহিড়ীর অনুজ শ্রীপ্রসাদ লাহিড়ীর অবৈতনিক ইংরাজি বিদ্যালয় থেকে কৃষ্ণনগর কলেজে এসেছিলেন। ‘ক্ষিতীশ-বংশাবলি-চরিত’ থেকে জানা যায় যে, লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তৃক কৃষ্ণনগর কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে, শ্রীপ্রসাদ লাহিড়ী নিজের ছাত্রদের সেখানে প্রবিষ্ট করে নিজের স্কুল উঠিয়ে দেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে শ্রীযুক্ত উমেশচন্দ্র দত্ত ছাড়াও, শ্রীনাথ সেন প্রভৃতি কয়েকজন কলেজের প্রথম বছরের পরীক্ষাতেই জুনিয়ার ছাত্রবৃত্তি পান। উমেশচন্দ্র দত্ত ১৮৪৯ সালে সিনিয়র স্কলারশিপ পরীক্ষায় বাংলার ছাত্রদের মধ্যে প্রথম হন। Council of Education-এর সদস্য বেথুন সাহেব কৃষ্ণনগর কলেজের বার্ষিক পুরষ্কার বিতরণী সভায় উমেশচন্দ্র দত্তের ভূয়সী প্রশংসা করেন। উমেশচন্দ্র দত্ত পরবর্তীকালে এই কলেজের অধ্যক্ষও হয়েছিলেন। বাংলার সুপ্রসিদ্ধ ব্যারিস্টার মনমোহন ঘোষ কৃষ্ণনগর কলেজের থেকে শিক্ষালাভ করেছিলেন। ১৮৬০ সালে নীল বিদ্রোহ চলাকালে তিনি অত্যাচারিত নীলচাষীদের পক্ষে লেখনী ধারণ করেন। ১৮৬১ সালে তিনি ‘Indian Mirror’ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯২৭ সালে মনমোহন ঘোষের বাসভবনে কলেজিয়েট স্কুল স্থানান্তরিত হয়। তার ভাই লালমোহন ঘোষও কৃষ্ণনগর কলেজের ছাত্র ছিলেন। তিনি পরবর্তীকালে কংগ্রেসের মাদ্রাজ অধিবেশনে (১৯০৩ খ্রি.) সভাপতিত্ব করেন। লালমোহন ঘোষ জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (‘চক্রবর্তী দেওয়ান’-এর বংশ হেতু ‘রায়’ উপাধি) কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৮৭৮ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করেন এবং ১৮৮০ সালে কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে স্কলারশিপ নিয়ে এফ.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীকালে ১৮৮৬ সালের ২৫শে ডিসেম্বর সেন্ট্রাল প্রভিন্সে সার্ভে ও সেটেলমেন্ট অফিসে ডি.এল. রায় (সাহেবিয়ানার ফলে ‘ডি.এল. রায়’ নামই বেশি ব্যবহৃত হত। তৎকালে তাঁর প্রকৃত নাম পরিবর্তিত হয়েছিল ‘Mr. Dwijen Lala Ray’-এ) ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পি.এন. বোস, সতীশচন্দ্র আচার্য, ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরাও কৃষ্ণনগর কলেজেরই ছাত্র ছিলেন। বাংলার সুপরিচিত বিজ্ঞানী পি.এন. বোস জামশেদপুরের কাছ থেকে আকরিক লোহা আবিষ্কার করেন। তিনি কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে এফ.এ. পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেছিলেন। সতীশচন্দ্র আচার্য মহাশয় বি.এ. পরীক্ষায় সংস্কৃততে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। ইনি পরবর্তীকালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হন। শ্রদ্ধেয় ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এফ.এ. পরীক্ষায় এই কলেজ থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেন। বিখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীও একসময় কৃষ্ণনগর কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। কবি ও সাংবাদিক বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় কৃষ্ণনগর সরকারি কলেজে ছাত্র থাকাকালীন অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন।

অবিভক্ত নদিয়া জেলায় ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কৃষ্ণনগর সরকারি মহাবিদ্যালয়ই একমাত্র কলেজ ছিল। প্রতিবেশী জেলাগুলির শিক্ষার্থীরাও এই কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছিলেন। এই কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাশ্চাত্য তথা আধুনিক শিক্ষার প্রসার দ্রুতগতিতে হতে থাকে। অবিভক্ত বাংলার নদিয়া জেলায় এই কলেজের আবির্ভাব উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়াতে থাকে। কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে পাশ করা মেধাবী ছাত্ররা পরবর্তীতে বাংলার বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, ব্যারিস্টার, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, খেলোয়াড়, স্বাধীনতা সংগ্রামী ইত্যাদি নানা ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কৃষ্ণনগর কলেজের কৃতী শিক্ষার্থীরা নদিয়া জেলা তথা বাংলার গৌরব বৃদ্ধি করেছেন। কৃষ্ণনগর কলেজ তার প্রথিতযশা শিক্ষক, পরিশ্রমী ছাত্রবর্গ ও নদিয়াবাসীর আন্তরিক সহযোগীতাকে সাথে নিয়ে প্রথম একশত বছরের পথ সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করে। আজ এই কলেজ তার দুইশত বছর অতিক্রম করার পথে। সূচনাকাল থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া কালে কৃষ্ণনগর কলেজকে একাধিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্মুখীন হতে হয়। তবে সেই সকল সংকটময় পরিস্থিতি কাটিয়ে কৃষ্ণনগর কলেজ তার সমৃদ্ধি বজায় রাখতে সচেষ্ট হয়েছিল। এবার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর সেই গুরু দায়িত্ব বর্তাবে।
লেখক: আঞ্চলিক ইতিহাস লেখক, নদিয়া।
সুন্দর এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস পড়ে খুশি হলাম। আরও জানার ইচ্ছে রইল।
পরবর্তী কিস্তিতে আরো কিছুটা জানা যাবে। ধন্যবাদ।
খুব সুন্দর, তথ্য বহুল লেখা।
ভালো লাগলো।
খুব ভালো একটা তথ্য সমৃদ্ধ লেখা। অভিনন্দন রইল
বন্ধুবর, অভিনন্দন গ্রহণ করলাম।
খুবই সমৃদ্ধ হলাম। আপনাকে শুভেচ্ছা রইল, ভালো থাকবেন স্যার।
জেনে ভালো লাগলো। অনেক স্নেহাশীষ।
খুব ভালো প্রতিবেদন। অনেক শুভকামনা এত সুন্দর তথ্য সমৃদ্ধ লেখা সকলের সামনে প্রকাশ করার জন্য। আশা করবো এভাবেই এগিয়ে চলবে লেখনী। ঈশ্বর মঙ্গল করুন ।
স্যর, আপনার এই মূল্যবান মন্তব্যই আমার অনুপ্রেরণা। চেষ্টা করবো ভালো লেখার।
Enriched reading such a beautiful publication. God bless you. Hope your ñext writings will also give us such pleasure.
Thank you very much Sir. I will try my best.