সময়ের চাকা ঘুরে আবার এক নতুন বছরের শুরু হলো — ২০২৪ সাল। আর তারই সঙ্গে সঙ্গে এলো ‘কৃষ্ণনগর হেরিটেজ ওয়াক’-এর আমেজ আরেকবার। এবার দ্বিতীয় বর্ষে হেরিটেজ ওয়াক। ঠিক এক বছর আগে ‘কৃষ্ণনগর হেরিটেজ ওয়াক’ প্রথম সংগঠিত হয়েছিল। দিনটি ছিল ২২ জানুয়ারি ২০২৩ (রবিবার)। সেইদিন ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু একদল মানুষ কৃষ্ণনগরের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলির গুরুত্ব অনুধাবন করতে সরেজমিনে বেরিয়ে পড়েছিল। গতবছরের সেই ধারা বজায় রেখে এই বছরও ‘কৃষ্ণনগর হেরিটেজ ওয়াক’-এর পরিকল্পনা করা হয়।
নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগর এক ঐতিহাসিক জনপদ হওয়া সত্ত্বেও এর ইতিহাস নিয়ে খুব বেশি চর্চা বা গবেষক, ঐতিহাসিক মহলে কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতা পরিলক্ষিত হয় না। সেই দিক থেকে ‘কৃষ্ণনগর হেরিটেজ ওয়াক’-এর মতো কর্মকাণ্ডের আয়োজন অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ও এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ বলাই যায়। রেউই গ্রাম থেকে কৃষ্ণনগরে রূপান্তরিত এই জনপদ মধ্যযুগ থেকেই তার নাগরিক চরিত্র লাভ করতে থাকে। আর এই নাগরিক চরিত্রের ক্রমবিকাশ এই জনপদের ভূ-প্রকৃতির আমুল পরিবর্তনও ঘটায়। ক্রমান্বয়ে ইট পাথরের নগর তার সাম্রাজ্য বৃদ্ধি করে, ঔপনিবেশিককালে শ্বেতাঙ্গদের আনাগোনাও এখানে কম ছিল না। কৃষ্ণনগরেও ছিল হোয়াইট টাউন এলাকা। সেই সময়কার একাধিক ঐতিহাসিক ভবনে ইউরোপীয় স্থাপত্য শৈলীর নিদর্শনও চোখে পড়ে। তবে স্থানীয় জনগণ বা বহিরাগত পর্যটক কারও কাছেই এখন মনে হয় সেই ঐতিহাসিক স্মারকগুলি আর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে না। আঞ্চলিক ইতিহাসের সেইসব অমূল্য পাথুরে উপাদানগুলি একপ্রকার অবহেলিতই রয়ে গেছে। সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ এবং যথাযথ পর্যটন ব্যবস্থাপনার অভাবে কৃষ্ণনগরের মতো একাধিক জনপদের ইতিহাস কালের নিরিখে হারিয়ে যেতে বসেছে।
‘কৃষ্ণনগর হেরিটেজ ওয়াক’-এর মতো উদ্যোগ গ্রহণের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো নিজেদের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আঞ্চলিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলি সম্পর্কে সকলকে সচেতন করা এবং সেগুলির প্রতি যত্নবান হওয়ার দায়িত্বটি সকলকে অনুধাবন করানো।

২০২৪ সালে ‘কৃষ্ণনগর হেরিটেজ ওয়াক’ (দ্বিতীয় বর্ষ) সংগঠিত হয় ২৩ জানুয়ারি (মঙ্গলবার)। এই বছরও নদিয়া জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হেরিটেজ ওয়াকে অংশগ্রহণ করে। তাদের সঙ্গে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলি পরিভ্রমণের এই কর্মযজ্ঞে সাগ্রহে যুক্ত হয়েছিলেন কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষও। ছুটির দিন হওয়ায় অংশগ্রহণকারীদের এর সঙ্গে যুক্ত হতে সেরকম কোনও অসুবিধে হয় নি। কেবলমাত্র দুটি নিদর্শন দেখতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়েছিল— একটি হলো বাবু রামতনু লাহিড়ীর বসতভিটে এবং অন্যটি হলো কৃষ্ণনগর কলেজ। কৃষ্ণনগরের ঐতিহাসিক স্থানগুলি ঘুরে দেখার এই বিষয়টি ২০২৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে শুরু হয়। পায়ে হেঁটে এবং টোটো গাড়িতে করে সকাল থেকে শুরু হয় ঐতিহাসিক পরিভ্রমণ। যার নাম দেওয়া হয়— ‘হেরিটেজ ওয়াক কৃষ্ণনগর’। একটি নির্দিষ্ট পথ নির্দেশিকা মেনে পুরো পরিক্রমাটি সাজানো হয়। সেই সুনির্দিষ্ট পথ ধরে হেরিটেজ ওয়াকের সঙ্গীরা একসঙ্গে প্রতিটি ঐতিহাসিক নিদর্শন পরিদর্শন করেন এবং তাদের সঙ্গে থাকা আঞ্চলিক ইতিহাস বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সেগুলির ঐতিহাসিক গুরুত্ব জেনে নেন।
২৩ জানুয়ারি ২০২৪ (মঙ্গলবার) সকাল ন’টায় কৃষ্ণনগরের পুরনো বাসস্ট্যান্ড থেকে ‘হেরিটেজ ওয়াক কৃষ্ণনগর’ দলের পরিভ্রমণ শুরু হয়। প্রথমেই যাওয়া হয় মৃৎশিল্প ও মৃৎশিল্পী সমাজের রাজধানী হিসেবে পরিচিত কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণিতে। ঘূর্ণির মৃৎশিল্পের সুনাম সর্বজন বিদিত। আমাদের দেশের বিভিন্ন জায়গায়, এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘূর্ণির কারিগরদের তৈরি ভাস্কর্য দেখতে পাওয়া যায়। হেরিটেজ ওয়াকে অংশগ্রহণকারীরা এদিন মৃৎশিল্পীদের ঘাঁটিতে গিয়ে তাদের তৈরি মাটির কাজগুলি ঘুরে ঘুরে দেখেন। পুতুলপট্টি মোড়ে দাঁড়িয়ে হেরিটেজ ওয়াক দলের সদস্যদের কাছে কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পের ইতিহাস সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হয়। শিল্পীদের কাছ থেকেও তাদের কাজের বিশেষত্ব সম্পর্কে জেনে নেওয়ারও সুযোগ পাওয়া যায়।

ঘূর্ণির পুতুলপট্টি থেকে যাওয়া হয় পরবর্তী হেরিটেজ সাইট কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে। একদা এটি ছিল বিখ্যাত ব্যারিস্টার মনোমোহন ঘোষের নিবাস। মনমোহন ঘোষ (১৮৪৪-১৮৯৬ খ্রি.) ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম ভারতীয় ব্যারিস্টার। কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে মনোমোহন ঘোষ ও তাঁর পরিবার সম্পর্কে এবং এই স্কুল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে জেনে নেওয়া হয়। কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল স্থাপিত হয় ১৮৪৬ সালে। একই সঙ্গে কৃষ্ণনগর কলেজও প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে তিনজন ইউরোপীয় শিক্ষক এবং দশজন ভারতীয় শিক্ষক নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের পঠনপাঠন শুরু হয়। বঙ্গের গৌরব ব্যারিস্টার মনোমোহন ঘোষ তাঁর বাড়িটি স্কুলকে দান করেন। পরবর্তীতে সেখানেই স্কুল স্থানান্তরিত হয়। এখানে শিক্ষকতা করেছেন রামতনু লাহিড়ী, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, বেণীমাধব দাসের মতো ব্যক্তিরা।
কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল থেকে যাওয়া হয় সমসাময়িক কালে প্রতিষ্ঠিত শহরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কৃষ্ণনগর এ ভি হাইস্কুলে। বিশিষ্ট শিক্ষক বাবু ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায় ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনগরের নেদিয়ার পাড়ায় অ্যাংলো ভার্নাকুলার হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লোকমুখে ‘ব্রজবাবুর পাঠশালা’ নামেই পরিচিতি পেয়েছিল। ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন কৃষ্ণনগরের অন্যতম পুরনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সি এম এস স্কুলের শিক্ষক। পরবর্তীতে তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে স্বতন্ত্র একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ২০২৩ সালে কৃষ্ণনগর এ ভি হাইস্কুল তার ১৭৫তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহু কৃতি ছাত্র পাস করে বার হয়েছে। বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ওরফে বাঘাযতীন কৃষ্ণনগরের অ্যাংলো ভার্নাকুলার হাইস্কুল থেকেই ১৮৯৮ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এন্ট্রান্স পাস করেন। বিখ্যাত নাট্যকার ও কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এ ভি হাইস্কুলের প্রাথমিক বিভাগে পড়তেন বলে জানা যায়। শহীদ অনন্তহরি মিত্র, স্বাধীনতা সংগ্রামী অমৃতেন্দু মুখার্জি প্রমুখরাও এই বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।

এরপর এই শহরের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন কৃষ্ণনগর ব্রাহ্মসমাজ দেখতে যাওয়া হয়। কিন্তু এই হেরিটেজ ভবনটি বর্তমানে জরাজীর্ণ। কৃষ্ণনগর ব্রাহ্মসমাজের বর্তমান ভবনটি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৭৬৯ শকাব্দে (অর্থাৎ ১৮৪৭ খ্রি.) নির্মিত হয়েছিল। নদিয়া-রাজ শ্রীশচন্দ্র রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় কৃষ্ণনগরে প্রথম ব্রাহ্মসমাজ স্থাপিত হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে রাজা বিশেষ কারণে মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন এবং কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি থেকে ব্রাহ্মসমাজ উঠে এসেছিল। পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন কৃষ্ণনগরের আমিনবাজার এলাকায় অবস্থিত ব্রাহ্মসমাজের বর্তমান ভবনটিকে হেরিটেজ সৌধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
কৃষ্ণনগরে আগত সকল পর্যটকদের কাছে সাধারণত এখানকার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলির মধ্যে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি দেখার আগ্রহ থাকে সবথেকে বেশি। ব্রাহ্মসমাজ দেখার পর হেরিটেজ ওয়াকের সঙ্গীদের নিয়ে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে যাওয়া হয়। প্রথমেই দেখে নেওয়া হয় রাজবাড়ির নহবৎখানা। সম্প্রতি এই ঐতিহাসিক সৌধে সিমেন্ট বালির আস্তরণ চাপিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। নহবৎখানার দেওয়ালগুলি এলা রং (হলুদ ও লাল) দিয়ে রঞ্জিত করা হয়েছে। নদিয়া-রাজের রাজধানী মাটিয়ারী থেকে কৃষ্ণনগরে স্থানান্তরিত হওয়ার পর সেখানে রাজপ্রাসাদ, চক, নহবৎখানা প্রভৃতি নির্মাণ করা হয়। মহারাজা রুদ্র রায়ের আমলে মাটি, চুন সুরকির গাঁথনিতে ইটের তৈরি চারমিনার বিশিষ্ট তোরণরূপী এই নহবৎখানাটি নির্মিত হয়েছিল। নহবৎখানা দেখার পর সেখান থেকে হেঁটে রাজবাড়ির সিংহদরজা, বাগানের সম্মুখে রাখা কামান, বারোদোল মেলা প্রাঙ্গণ প্রভৃতি দেখে নেওয়া হয়। হেরিটেজ ওয়াকের সঙ্গে সঙ্গে জায়গাগুলির ইতিহাস অনুসন্ধানের কাজও চলতে থাকে।

নদিয়া রাজবংশের সূচনা ধরা হয় ভবানন্দ মজুমদারের সময় থেকে। রামচন্দ্র সমাদ্দারের চার ছেলে ছিল। যাদের মধ্যে সবথেকে বড় ছিলেন ভবানন্দ। তিনি বাগোয়ান থেকে মাটিয়ারীতে রাজধানী স্থানান্তর করেছিলেন। পরবর্তীতে নদিয়া-রাজ রাঘব রায় সিংহাসনে বসে মাটিয়ারী থেকে রেউই গ্রামে রাজধানী স্থানান্তর করেন। রেউই গ্রামে ছিল গোপেদের বাস। সেই সময় মুঘল সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন সম্রাট শাহজাহান। মহারাজা রাঘব রায়ের পরে তাঁর পুত্র রুদ্র রায় সিংহাসনে বসেন। মহারাজা রুদ্র রায়ের রাজত্বকালে (১৬৭৬-১৬৯৩ খ্রি.) রেউই থেকে কৃষ্ণনগর নামকরণ হয়। রেউই গ্রামের অধিবাসী গোপেরা ঘটা করে শ্রীকৃষ্ণের পুজো করতেন। সে কারণেই মহারাজা রুদ্র রায় রেউই গ্রামের নাম রাখেন কৃষ্ণনগর। এভাবেই মধ্যযুগে কৃষ্ণনগর শহর জন্ম নেয়। সেই সময় মুঘল সম্রাট ছিলেন ঔরঙ্গজেব।
হেরিটেজ ওয়াক কৃষ্ণনগর (দ্বিতীয় বর্ষ)-এর রুট ম্যাপে একটি অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান ছিল রামতনু লাহিড়ীর বসতবাড়ি। কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ থেকে বার হয়ে সেই যুগের বিশিষ্ট স্থপতিকার আলাল দোস্তের সমাধি পীরতলা দেখে প্রায় অবলুপ্ত বাবু রামতনু লাহিড়ীর বসতবাড়িটি দেখতে যাওয়া হয়। কৃষ্ণনগর রেল স্টেশনের সন্নিকটে এটি অবস্থিত। ১৯৮১ সাল থেকে রামতনু লাহিড়ীর এই বাড়িতে ‘কৃষ্ণনগর একাডেমী’ নামে একটি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল স্থাপিত হয়েছে। এদিনের পরবর্তী গন্তব্য ছিল বাংলার প্রখ্যাত কবি সাহিত্যিক নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মভিটে পরিভ্রমণ। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পিতা ছিলেন নদিয়া রাজবংশের দেওয়ান কার্ত্তিকেয়চন্দ্র রায়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের পৈত্রিক ভিটের কিয়দংশ রয়েছে কৃষ্ণনগর রেলস্টেশন সংলগ্ন একখণ্ড জমিতে। সেখানেই এদিন যাওয়া হয়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্মভিটে দেখে রাস্তার (স্টেশন রোড) অপর দিকে দ্বিজেন্দ্র স্মৃতিধন্য দ্বিজেন্দ্র পাঠাগারেও যাওয়া হয়। দ্বিজেন্দ্র পাঠাগারের সম্মুখে স্থাপিত এই পরিবারের তিন প্রজন্মের বিখ্যাত তিন মনীষীর মূর্তিতে (যথা— কার্ত্তিকেয়চন্দ্র রায়, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং দিলীপকুমার রায়ের) শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হয়।

এরপর যাওয়া হয় নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য কৃষ্ণনগরের অন্যতম হেরিটেজ সৌধ গ্রেস কটেজে। কৃষ্ণনগরের এই বাড়িটিতে কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় আড়াই বছর (১৯২৬-১৯২৮ খ্রি.) সপরিবার বসবাস করেছিলেন। নজরুলের পুত্র বুলবুলের জন্ম হয় এখানে। ‘দারিদ্র’ কবিতা, ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসের রচনা এই বাড়িতেই। এখানেই সৃষ্টি হয় প্রথম বাংলা গজল গানের। হেরিটেজ ওয়াকে অংশগ্রহণকারী বন্ধুরা আগের বছর গ্রেস কটেজের সংস্কারকার্য চাক্ষুষ করতে পেরেছিলেন। কৃষ্ণনগরের সাংস্কৃতিক সংস্থা সুজন বাসরের উদ্যোগে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল হেরিটেজ কমিশন’ গ্রেস কটেজের সংস্কারকার্য ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছে। তাই এই বছর হেরিটেজ ওয়াকের বন্ধুরা নবরূপে সজ্জিত গ্রেস কটেজ দেখতে পায়। ২০২২ সালের শেষ দিকে সংস্কারের কাজ শুরু হয় এবং ২০২৩ সালের মাঝ বরাবর শেষ হয়। সনাতন পদ্ধতিতে চুনসুরকি দিয়েই গ্রেস কটেজ সংস্কারের কাজ সম্পূর্ণ হয়।
গ্রেস কটেজ থেকে যাওয়া হয় রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য রানিকুঠিতে। কৃষ্ণনগরে রবি ঠাকুরের স্মৃতিধন্য একটি হেরিটেজ ভবন হলো রানিকুঠি। এটি ছিল সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীদের পৈতৃক নিবাস। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫ এপ্রিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কৃষ্ণনগরে এসেছিলেন এবং এই বাড়িটিতে তিন চার দিন ছিলেন বলে জানা যায়। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন রানিকুঠিকে ‘হেরিটেজ সৌধ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ভবনটির ছাদ অনেকটাই ধসে পড়েছে। এহেন ঐতিহাসিক ভবনের ভগ্নপ্রায় দশা দেখে সকলেই বিস্মিত হন। হেরিটেজ ওয়াকের পরবর্তী গন্তব্য ছিল কৃষ্ণনগর ক্যাথিড্রাল এবং খ্রিস্টমন্দির। নদিয়া জেলার একটি অন্যতম প্রাচীন গির্জা হলো কৃষ্ণনগর ক্যাথিড্রাল। এটি গঠন ও নকশার দিক থেকে অন্যান্য গির্জার থেকে অনেকটাই আলাদা। গথিক, নিও-ক্লাসিক্যাল বা ভিক্টোরিয়ান নয়, একাধিক স্থাপত্য শৈলীর সংমিশ্রণে ১৮৯৯ সালে কৃষ্ণনগর ক্যাথিড্রালের বর্তমান ভবনটি নির্মিত হয়। কয়েক বছর আগে কৃষ্ণনগর ক্যাথিড্রালের প্রায় সম্মুখে নির্মিত হয়েছে আরেকটি বিশাল স্থাপত্য। যার নাম দেওয়া হয়েছে খ্রিস্টমন্দির। এর পাশ দিয়েই বয়ে গিয়েছে কৃষ্ণনগরের লুপ্তপ্রায় জলধারা অঞ্জনা। কৃষ্ণনগরে এই নদী বর্তমানে নালায় পরিণত হয়েছে। অঞ্জনার লুপ্তপ্রায় নদীখাতও এদিন হেরিটেজ ওয়াকের সঙ্গীদের দেখানো হয়। কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো সাহিত্যিকদের কলমে অঞ্জনা নদীর পরিচয় পাওয়া যায়।

‘হেরিটেজ ওয়াক কৃষ্ণনগর (দ্বিতীয় বর্ষ)’-এর শেষ গন্তব্য ছিল কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজ। কৃষ্ণনগর কলেজ (বর্তমান নাম কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজ) হলো নদিয়া জেলার প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর সমগ্র বাংলার মধ্যে এটি হলো তৃতীয় প্রাচীন কলেজ। গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জের সময়কালে (১৮৪৪- ১৮৪৮ খ্রিঃ) এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কৃষ্ণনগরে স্থাপিত হয়। বিখ্যাত শেক্সপিরিয়ার বিশেষজ্ঞ স্যর ডি এল রিচার্ডসন ছিলেন এই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ। তিনি ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ নভেম্বর অধ্যক্ষের দায়িত্বভার পেয়ে যান। যদিও কৃষ্ণনগর কলেজের প্রতিষ্ঠাকাল হলো ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি। জাতপাত নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের জন্য এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি উন্মুক্ত ছিল। কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল ও কৃষ্ণনগর কলেজ একসঙ্গেই পথচলা শুরু করেছিল। এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম যৌথ শিক্ষকমণ্ডলীর মধ্যে অধ্যক্ষ ডি এল রিচার্ডসন ছাড়াও আরো তিনজন ইউরোপীয় শিক্ষক ছিলেন— ব্রাডবুরি, বিটসন ও বিনল্যান্ড। এছাড়াও ছিলেন দশজন ভারতীয় শিক্ষক। ‘হেরিটেজ ওয়াক কৃষ্ণনগর’ ছুটির দিনে সংগঠিত হওয়ায়, বিশেষ অনুমতি নিয়ে এদিন কলেজ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করা হয়। কৃষ্ণনগর কলেজের ইতিহাস রোমন্থনের মধ্যে দিয়ে দ্বিতীয় বর্ষের হেরিটেজ পরিভ্রমণ সমাপ্ত হয়।

‘হেরিটেজ ওয়াক কৃষ্ণনগর’-এ যে সকল শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছিল, তারা হলো— রুম্পি ব্যাপারী, শুচিস্মিতা ঘোষ, মৌমিতা, খাতুন, মৌসুমী খাতুন, আশা খাতুন, অস্মিতা সেন, সানিয়া খাতুন, ইসমা খাতুন, হিরা খাতুন, রোকেয়া খাতুন, মৌসুমী খাতুন, নিমিষা সাহা, মনিফা খাতুন, পাপিয়া খাতুন, দীপান্বিতা ঘোষ, নিপবিথী মৈত্র, পূজা ঘোষ, প্রীতি সাহা চৌধুরী, উষাণ বিশ্বাস (এ ভি হাইস্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র) এবং শর্মিলা মণ্ডল। এছাড়াও ছিলেন লেখিকা ও বিশিষ্ট শিক্ষিকা মমতা বিশ্বাস, অভিভাবক রিঙ্কি বিশ্বাস, ‘উড়িধান’ পত্রিকার সম্পাদক ও বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব স্বপন বিশ্বাস এবং ইতিহাস গবেষক সুরজ পাল। এই ‘হেরিটেজ ওয়াক কৃষ্ণনগর’-এর সংগঠক ছিলেন দীপাঞ্জন দে। ফি-বছর এই ধরনের ইতিহাস সচেতন পরিভ্রমণ আয়োজন করা যেমন জরুরি, তেমনি আঞ্চলিক ইতিহাসের স্মারকগুলি যাতে যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় সে বিষয়েও আমাদের নজর দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে স্থানীয় মানুষদের সংগঠিত করে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয় ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলি সংরক্ষণের দাবি তোলা উচিত।
লেখক : আঞ্চলিক ইতিহাস লেখক, নদিয়া।
খুব সুন্দর উদ্যোগ। এভাবেই শহরকে চিনতে থাকি আরও ভালো ভাবে …
অনেক ধন্যবাদ। এই মন্তব্য যথেষ্ট প্রেরণাদায়ক।
খুব ভালো লাগলো। এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে একদিন ঠিক ফল পাওয়া যাবে। সকল উদ্যোগীদের অনেক ধন্যবাদ জানাই।
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। এভাবেই পাশে থাকবেন। আগামী হেরিটেজ ওয়াকে সম্ভব হলে অবশ্যই অংশগ্রহণ করতে অনুরোধ করবো।