৫ অক্টোবর, ২০২৩ (বৃহস্পতিবার) ‘জাতীয় গাঙ্গেয় ডলফিন দিবস’-এর দিন থেকে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার ইন্ডিয়া ও বন দফতর যৌথভাবে পূর্ব বর্ধমানের নলিয়াপুরে ভাগীরথী নদীপাড়ের মানুষদের নিয়ে ‘প্রকৃতি বন্ধু’ দল গঠন করে আনুষ্ঠানিকভাবে গাঙ্গেয় ডলফিন সংরক্ষণের কাজ শুরু করল। ভাগীরথীর অপর পাড়েই নদিয়া জেলার কালীগঞ্জের ফুলবাগান, বল্লভপাড়া, ভাগ্যবন্তপুর, কালিকাপুর এলাকা, যা শুশুকদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র। ছোটো-বড়ো একাধিক নদ-নদীর অস্তিত্ব, কৃষিজমির প্রাচুর্য্য, যথেষ্ট বনাঞ্চল, নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু প্রভৃতির সমাহার নদিয়া জেলাকে জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে বিশেষ উল্লেখযোগ্য করে তোলে। তবে ক্রমবর্ধমান পরিবেশ দূষণের কারণে জীবজগৎ এখন বিশেষ সংকটে। উদ্ভিদ এবং প্রাণীকুলের বহু সদস্যই বর্তমানে বিপন্নতার শিকার। এরকমই একটি বিপন্ন জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণী হলো শুশুক। বৈজ্ঞানিক নাম ‘Platanista gangetica gangetica’। অঞ্চল ভেদে এদের নামের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তবে ‘গাঙ্গেয় ডলফিন’ নামেই এরা সমধিক পরিচিত।
গতবছর অর্থাৎ ২০২২ সালের মার্চ-এপ্রিল মাস নাগাদ নদিয়া জেলার কালীগঞ্জে সাতটি শুশুক শাবকের দেখা মিলেছিল। এতে এলাকার মানুষেরা এবং জেলার পশুপ্রেমীরা বেশ আনন্দিত হয়েছিলেন। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক বার্তা মিলেছিল। কারণ বহু পূর্বে গঙ্গার বুকে গাঙ্গেয় ডলফিনের এমন বিচরণ স্বাভাবিক হলেও, বিগত বছরগুলিতে এমন দৃশ্য দেখা যায়নি। এক সময় নদিয়ার কালীগঞ্জ ব্লকের বল্লভপাড়ায় ভাগীরথীতে নৌকা পারাপার হতে গিয়ে বহু মানুষ শুশুক দেখেছেন। দীর্ঘদিন পর আবার সেই অভিজ্ঞতা হওয়ায় এলাকাবাসী খুবই আপ্লুত হন। যাইহোক, জেলা বন দফতরের কর্মীদের অনুমান নয়াচর, কালিকাপুর, ফুলবাগান চর এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৩১টি শুশুক ও তাদের শাবকেরা রয়েছে।

নদিয়া জেলার কালীগঞ্জের চর বালিয়াডাঙায় লুপ্তপ্রায় শুশুক ও ভোঁদরের মতো প্রাণীর অস্তিত্ব মিলেছে। সে কারণে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অতি সম্প্রতি (২০২৩ সালের মার্চ মাসে) চর বালিয়াডাঙাকে বায়ো ডাইভারসিটি হেরিটেজ সাইটের তকমা দেওয়া হয়েছে। কৃষ্ণনগরের অন্যতম ঐতিহাসিক বনভূমি কোম্পানি বাগানকেও একই সঙ্গে বায়ো ডাইভারসিটি হেরিটেজ সাইটের তকমা দেওয়া হয়। কারণ নদিয়া জেলার উদ্যানপালন দফতরের অধীনে প্রায় চারশো বিঘা জমি নিয়ে বিস্তৃত কোম্পানি বাগানে এমন অনেক উল্লেখযোগ্য ও বিরল প্রজাতির গাছপালা রয়েছে, যা শুধুমাত্র নদিয়া জেলা নয়, রাজ্যের প্রায় অন্য কোথাও নেই। সেই হেরিটেজ সাইটের তালিকায় কোম্পানি বাগানকে ‘স্টেট হর্টিকালচার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টেশন ইন কৃষ্ণনগর’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বায়ো ডাইভারসিটি বোর্ডের নদিয়া জেলার দফতর ২০১৯ সাল থেকে চর বালিয়াডাঙায় ও কোম্পানি বাগানে জীববৈচিত্র্যের নথি তৈরির সমীক্ষা শুরু করেছিল। সেই সমীক্ষায় শুশুক, ভোঁদরের মতো লুপ্তপ্রায় প্রাণীর হদিশ মিলেছিল। সমীক্ষার রিপোর্ট নির্দিষ্ট দফতরে জমা করা হয়েছিল। এরপরেই ২০২৩ সালে নদিয়া জেলার দুটি জায়গা রাজ্য সরকার কর্তৃক বায়ো ডাইভারসিটি হেরিটেজ সাইটের তকমা পায়। রাজ্য সরকার ঘোষিত আমাদের রাজ্যের মোট চারটি বায়ো ডাইভারসিটি হেরিটেজ সাইটের তালিকায় এই দুটি ছাড়াও আর যে দুটি রয়েছে, সেগুলি হলো— দার্জিলিংয়ের নামথিং পোখারি এবং আমি উড ফসিল পার্ক।
নদিয়া জেলার একটি অন্যতম প্রধান নদী জলঙ্গি, যার ঘরোয়া নাম হলো খড়ে নদী। জলঙ্গি হলো পদ্মা এবং ভাগীরথীর সংযোজক নদী। দুই দশক আগে পর্যন্ত বর্ষাকালে জলঙ্গি নদীতে বহু শুশুক দেখা যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই পরিমাণটা কমেছে। আর এখন জলঙ্গি নদীতে শুশুক দেখা যায় না বললেই চলে। পূর্বে গ্রামাঞ্চলে তো বটেই, জেলা সদর কৃষ্ণনগরেও জলঙ্গি নদীর ঘাট থেকে বহু মানুষ শুশুক দেখেছেন। বর্ষাকালে জলঙ্গির ঘোলা জল থেকে ‘ভুস ভুস’ শব্দ করে শুশুকের লাফ মারা দেখে সেই যে রোমাঞ্চিত হওয়া— তা আজও অনেকের স্মৃতিতে সুস্পষ্ট।

জলঙ্গি নদীর প্রত্নতত্ত্ব অনুসন্ধান করতে খুব বেশি পিছোতে হয় না। মিনহাজ উদ্দিন সিরাজের ‘তবাকত-ই-নাসিরী’ (১২৬০ খ্রিস্টাব্দ) গ্রন্থ থেকে ইখতিয়ার উদ্দিন মহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির নদিয়া আক্রমণের বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে গঙ্গা নদীর উল্লেখ থাকলেও, জলঙ্গি নদীর উল্লেখ নেই। আবার চৈতন্যদেবের তিরোধানের (১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দ) পর তাঁকে নিয়ে ভক্তরা যেসব জীবনী গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, সেগুলিতেও কোথাও জলঙ্গি নদীর উল্লেখ নেই। সে দিক থেকে ভ্যান জ্যাক ব্রুক সাহেবের মানচিত্রেই প্রথম জলঙ্গি নদীর প্রামাণ্য আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল বলা চলে (১৬৬০ খ্রিস্টাব্দ)। তারপর থেকে জলঙ্গি দিয়ে বহু জল গড়িয়েছে, সে একাধিকবার নিজের খাত পরিবর্তন করেছে। কিন্তু একদা সেই খরস্রোতা খড়ে নদীটি এখন নিজের চরিত্রটাই পাল্টে ফেলেছে। এখন সে অবরুদ্ধ। নদীর গতিপথে বহু জায়গায় অবৈধভাবে বাঁধাল দেওয়া হয়েছে। জেলেরা অতিরিক্ত লাভের আশায় মশারি জাল নিয়ে ছোটো বড়ো সব মাছ ধরে ফেলছে। এতে বহু শুশুকেরও প্রাণসংশয় ঘটেছে। স্বভাবতই জীবনানন্দের কবিতায় বা বিজয়লালের কবিতায় জলঙ্গির যে রূপ বর্ণিত হয়েছে, আজ সেটা খুঁজতে গেলে নেহাতই হতাশ হতে হয়। আসলে আজকের জলঙ্গি হলো দূষিত, রুগ্ন, অনেকটা প্রাণহীন প্রকৃতির।
তবে ভারতের জাতীয় জলজ প্রাণী শুশুকের এই সংকটাপন্ন অবস্থা হঠাৎ করে একদিনে হয় নি, দীর্ঘদিন ধরেই তাদের অস্তিত্ব সংকটে। জল দূষণের ফলে নদীতে মাছ কমে যাওয়া হলো এর অন্যতম কারণ। শুশুকের প্রধান খাদ্যই হলো মাছ। বিগত দুই তিন দশকে জলঙ্গি নদীর দূষণ এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, মাছের প্রজনন ব্যাপক ভাবে হ্রাস পেয়েছে। সাথে সাথে শুশুকের সংখ্যাও কমেছে। শুধু তাই নয়, অবৈধভাবে বহু শুশুকের শিকার করা হয়েছে। অনেকেরই বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে, শুশুকের দেহের চামড়া থেকে প্রাপ্ত তেল নাকি বাতের যন্ত্রণা নিরসনে মহৌষধি। যদিও এর কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কিন্তু এই ভুল ধারনার বশবর্তী হয়েই দিনের পর দিন নদী থেকে শুশুক ধরা হয়েছে এবং নির্বিচারে তাদের হত্যা করা হয়েছে। এদিকে শুশুক ধরা এবং তাঁর দেহাবশেষ ব্যবহার করা হলো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিন বছরের জেল এবং পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু সবই ভ্রান্ত বলে মনে হয়, যখন চোরাশিকারিরা নির্দ্বিধায় শুশুক হত্যা করে বিষয়টিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে যে, শুশুক নামক প্রাণীটি এখন প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে। নদীতে যত্রতত্র বাঁধাল দেওয়াও শুশুকের বিলুপ্তির একটি কারণ। এসবের ফলে শুশুকের স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া এবং বংশবৃদ্ধি বহুলাংশে ব্যাহত হয়।

পদ্মার শাখা নদী জলঙ্গিতে শুশুকের ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণই হলো— নদীর হারানো স্বাস্থ্য এবং শুশুক শিকার। জলঙ্গি নদীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হলেও, প্রসঙ্গত একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন— বৃহৎ জলযান অনেক সময় জলজ প্রাণীদের দুর্ঘটনার কবলে ফেলে। গাঙ্গেয় ডলফিনদের বিশেষভাবে সেই সংকটের সম্মুখীন হতে হয়েছে। শুশুকরা সাধারণত দল বেঁধে থাকে। তাদের বিচরণ ক্ষেত্র হলো উপকূলবর্তী ও সমুদ্র অঞ্চল। কিন্তু বর্ষাকালে জল বৃদ্ধি পেলে ঘোলা জলে শুশুকদের বড়ো নদীতে চলে আসতে দেখা যায়। এরা চোখে মোটেই দেখতে পায় না। শব্দ সংকেতের মাধ্যমে এরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে। শিকারের সময়ও এরা শব্দ সংকেত ব্যবহার করে শিকারের অবস্থান বুঝতে পারে। কিন্তু বৃহৎ জলযানের শব্দে এরা অনেক সময় দিকভ্রান্ত হয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। এতকিছু সত্ত্বেও আধুনিক মানুষ পুরোপুরি উদাসীন। সামাজিক গণমাধ্যম থেকে অর্জিত লাখো লাখো সংস্কৃতির গেরোয় পড়ে, তারা যেন বিভ্রান্ত। যাইহোক, সময়মতো মানুষ সচেতন না হলে জলঙ্গি নদী কিংবা তাতে বসবাসকারী শুশুক— কোনওটিকেই সম্ভবত আর বাঁচানো যাবে না।
লেখক: সম্পাদক, ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’ (ত্রৈমাসিক)।