১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ (রবিবার) নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরে কবি হেমচন্দ্র বাগচীর ১১৯তম জন্মজয়ন্তী পালন করা হলো। ‘কবি হেমচন্দ্র বাগচী স্মৃতিরক্ষা সমিতি’-র পক্ষ থেকে এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। কৃষ্ণনগরে হেমচন্দ্র অনুরাগীরা ফি-বছর কবি হেমচন্দ্র বাগচীর জন্ম দিবস ও প্রয়াণ দিবসে কবিকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা-স্মরণ করে থাকেন। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাংলা সাহিত্যের কল্লোল যুগের কবি হেমচন্দ্র বাগচী (১৯০৪-১৯৮৬ খ্রি.) সমকালীন অন্যান্য কবি সাহিত্যিকদের তুলনায় অনেকটাই বিস্মৃত। তাঁর কলম থেকে জন্ম নেওয়া সাহিত্য-নিদর্শনগুলি বিদ্যালয়ের পাঠক্রম থেকে বাদ গিয়েছে অনেক আগেই। মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের শিক্ষার্থীরাও হেমচন্দ্র বাগচী নামটির সঙ্গে পরিচিত নন। এমনকি বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা সাহিত্যের মাস্টারমশাইরাও হেমচন্দ্র বাগচীর সৃষ্ট সাহিত্যগুলি সম্পর্কে খুব বেশি ওয়াকিবহাল নন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসচর্চায় কবি হেমচন্দ্র বাগচী এখনো অনেকটাই অবহেলিত বলে মনে হয়। এভাবেই বছরের পর বছর অতিবাহিত হচ্ছে। হেমচন্দ্র বাগচী অচর্চিতই থেকে যাচ্ছেন। এর পশ্চাতে একাধিক কারণ থেকে থাকতে পারে। সেই কারণগুলি সবিস্তারে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। এখানে সবকটি বিষয় আলোচনা করে এই প্রতিবেদনকে ভারাক্রান্ত করা সঠিক হবে না। তবে বিভিন্ন সাহিত্যসভায় হেমচন্দ্র বাগচী এখনো যে ব্রাত্য, সেকথা বলার অবকাশ রাখেনা। তাঁর কবিতাগুলি সেখানে পাঠ করা হয় না, তাঁর রচিত গল্প, অনুবাদ সাহিত্যগুলি নিয়েও আলোচনা হয় না। সরকারি হোক, বা বেসরকারি — কোনও সংস্থা, প্রতিষ্ঠান তাঁকে সেভাবে স্মরণ করে না। এই সীমাবদ্ধতাগুলি দীর্ঘকাল ধরে কবি হেমচন্দ্র বাগচীকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রেখেছে।

দুই বছর আগে — ২০২১ সালে কৃষ্ণনগরে ‘কবি হেমচন্দ্র বাগচী স্মৃতিরক্ষা সমিতি’-র জন্ম হয়। কবি হেমচন্দ্র বাগচীকে শ্রদ্ধা-স্মরণের মধ্যে দিয়ে আবার চর্চায় ফিরিয়ে আনা হলো এই স্মৃতিরক্ষা সমিতির অন্যতম লক্ষ্য। কালের নিরিখে তিনি বিস্মৃতির অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছেন। হেমচন্দ্রের জীবনী পাঠ, তাঁর রচনাগুলি সম্পর্কে জনমানসে আগ্রহ তৈরি করা, তাঁর দুর্লভ সাহিত্যসম্ভার পুনরায় মুদ্রণ প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে ‘কবি হেমচন্দ্র বাগচী স্মৃতিরক্ষা সমিতি’-র সদস্যরা এগিয়ে চলেছেন। কৃষ্ণনগরে হেমচন্দ্র অনুরাগীরা সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও, তাঁদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় খুব বেশি ঘাটতি খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিয়ম করে তাঁরা হেমচন্দ্র বাগচীকে স্মরণ করে থাকেন। বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে বছরভর কবিকে শ্রদ্ধা-স্মরণ করা হয়।

কবি হেমচন্দ্র বাগচীর ১১৯তম জন্মজয়ন্তীর সকালে ঘূর্ণির পুতুলপট্টি মোড়ে স্থাপিত কবির আবক্ষ মূর্তির সম্মুখে কবি অনুরাগীরা একত্রিত হন এবং ছোটো একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কবির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। কবির ১১৯তম জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান দুটি পর্বে সাজানো হয়েছিল। সকালে কবির আবক্ষ মূর্তিতে মাল্য অর্পণ ও পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করা হয়। বিশিষ্ট কৃষ্ণনাগরিক ও লেখক সম্পদনারায়ণ ধর কবির মূর্তিতে মাল্য অর্পণ করে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। কবি অনুরাগীদের অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সকলে কবির আবক্ষ মূর্তিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করেন। কবির আবক্ষ মূর্তির সম্মুখে দাঁড়িয়ে এদিন সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন সম্পদনারায়ণ ধর, মলয় বিশ্বাস, পার্থ স্বর্ণকার প্রমুখরা। কবিতা পাঠ করেন কবি অনুরাগী অমৃতাভ দে ও শর্মিষ্ঠা আচার্য। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তরুণকুমার সাহা, সতীনাথ ভট্টাচার্য, সর্বাণী দত্ত, কল্যাণ বিশ্বাস প্রমুখরা। অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন দীপাঞ্জন দে।

কবি হেমচন্দ্র বাগচীর ১১৯তম জন্মজয়ন্তীর দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠান হয় আরেকজন কবির বাসভবন — কৃষ্ণনগরের গ্রেস কটেজে। কৃষ্ণনগরের এই ঐতিহাসিক বাড়িটিতে কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় আড়াই বছর (১৯২৬ থেকে ১৯২৮ সাল) সপরিবার বসবাস করেছিলেন। ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ (রবিবার) বিকেল পাঁচটা থেকে সেখানে ‘কবি হেমচন্দ্র বাগচী শ্রদ্ধা-স্মরণ’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। ‘সুজন-বাসর’ ও ‘কবি হেমচন্দ্র বাগচী স্মৃতিরক্ষা সমিতি’-র যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠান হয়। গ্রেস কটেজে এদিন এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। প্রায় দুই ঘন্টার অনুষ্ঠানে কবির জীবন ও সাহিত্যকর্মের একাধিক বিষয় নিয়ে চর্চা হয়। শুরুতেই কবিপুত্র সুবীর বাগচীর আকস্মিক প্রয়াণের সংবাদে কিছুক্ষণের নীরবতা পালন করা হয়। উল্লেখ্য, কবি হেমচন্দ্র বাগচীর পুত্র সুবীর বাগচী (কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণি নিবাসী) তাঁর পিতার ১১৯তম জন্মজয়ন্তীর দিন অর্থাৎ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ভোররাতে ইহলোক ত্যাগ করেন। এদিন তাই অনুষ্ঠান শুরুর আগে কবিপুত্রকে স্মরণ করা হয়। গ্রেস কটেজে এদিনের বৈকালিক সভার সভাপতি হিসেবে বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব দেবাশিষ মণ্ডলের নাম প্রস্তাব করেন দীপাঞ্জন দে। প্রস্তাবটি সমর্থন করেন কবি রতনকুমার নাথ। সভাপতি আসন গ্রহণ করলে সভা শুরু হয়। কবি অনুরাগী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে এদিন গ্রেস কটেজে এক মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান হয়। স্বাগত বক্তব্যে কবি হেমচন্দ্র বাগচী স্মৃতিরক্ষা সমিতির পক্ষ থেকে সম্পাদক দীপাঞ্জন দে সংক্ষেপে কবির কর্মময় জীবন সম্পর্কে ও তাঁর বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে কিছু কথা বলেন এবং বিশদে তাঁদের তৈরি স্মৃতিরক্ষা সমিতির বছরভর কর্মসূচির বর্ণনা দেন।

এরপর কবি অনুরাগী রতনকুমার নাথ কবির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে হেমচন্দ্রের প্রকৃতিপ্রেম ও সাহিত্য বিষয়ে এক মনোজ্ঞ ও বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করেন। পাশাপাশি তিনি স্মৃতিরক্ষা সমিতির কাছে কবিকে স্মরণ করে নিয়মিত একটি পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তাবও পেশ করেন। লেখক সম্পদনারায়ণ ধর তাঁর বক্তব্যে এই ধরণের উদ্যোগকে কুর্ণিশ জানান এবং বিস্মৃত অন্যান্য মনীষীদের ক্ষেত্রেও এমন উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি বলেন। তিনি হেমচন্দ্রের জলঙ্গি-প্রীতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদ্মা-প্রীতির সাদৃশ্যর বিষয়টি উত্থাপন করে প্রাসঙ্গিক আলোচনা করেন। সুজন সতীনাথ ভট্টাচার্য কবি হেমচন্দ্র বাগচীর সাহিত্যকর্মের কিছু নতুন দিক সম্পর্কে সকলকে অবহিত করেন। কবি অনুরাগী শর্মিষ্ঠা আচার্য এদিন কবির অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে বক্তব্য রাখেন। শিক্ষক পার্থ স্বর্ণকার কবির স্মৃতিরক্ষার জন্য এই রকম উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। এদিনের সভায় ‘কবি হেমচন্দ্র বাগচী স্মারক গ্রন্থ’ থেকে হেমচন্দ্রকে নিয়ে একটি কবিতা পাঠ করেন বীথিকা মল্লিক। কবি হেমচন্দ্রের লেখা একটি কবিতা পাঠ করেন সুজন জয়িতা সাহা। কবির লেখা একটি গজল পাঠ করে শোনান সম্পাদক অমৃতাভ দে। এদিনের সভার অন্যতম আকর্ষণ ছিল কবি হেমচন্দ্র বাগচীর লেখায় সুজন-বাসরের সভাপতি দীপঙ্কর দাসের সুরারোপিত সংগীত পরিবেশন। গানটির কথা ছিল এইরূপ — “সখী এবারে হলো না গান গাওয়া”। সবশেষে এদিনের সভার সভাপতি দেবাশিষ মণ্ডল তাঁর বক্তব্য রাখেন। তিনি এদিনের সমগ্র আয়োজন সম্পর্কে এবং হেমচন্দ্র বাগচীকে দেখার তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেন।

২০২১ সালেও কবি হেমচন্দ্র বাগচীর ১১৭তম জন্মজয়ন্তী এবং স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল নজরুল স্মৃতিধন্য এই গ্রেস কটেজে। সেই বছর নদিয়া জেলার ভূমিপুত্র কবি হেমচন্দ্র বাগচীর ১১৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ‘কবি হেমচন্দ্র বাগচী স্মৃতি রক্ষা সমিতি’-র পক্ষ থেকে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের (১৭-১৯ সেপ্টেম্বর) আয়োজন করা হয়েছিল। কবির জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানের প্রথম দিন অর্থাৎ ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ (শুক্রবার) বিকেল পাঁচটায় গ্রেস কটেজে ‘কবি হেমচন্দ্র বাগচী স্মারক গ্রন্থ’টি প্রকাশ পেয়েছিল। স্মারক গ্রন্থে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা মুদ্রিত হয়েছিল। স্মারক গ্রন্থটি বিশিষ্ট লেখক পার্শ্বনাথ রায়চৌধুরী ও নদিয়া জেলা পরিষদের সচিব সৌমেন দত্তের হাত দিয়ে প্রকাশ পেয়েছিল। স্মারক গ্রন্থটি প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিল। এদিনের সভায় পুনরায় সেই স্মারক গ্রন্থটির প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয় এবং স্মৃতিরক্ষা সমিতির পক্ষ থেকে আগামীদিনে সেটি প্রকাশের বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করা হবে বলে জানানো হয়।
স্বল্প পরিসরে হলেও, এদিনের অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও কবি হেমচন্দ্রের অনুরাগীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং নির্বাচিত কিছু কবিতা, গান ও কবি সম্পর্কে মুল্যবান বক্তব্য পরিবেশনের মধ্যে দিয়ে কবির ১১৯তম জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানকে বিশেষ স্মরণীয় করে রাখলেন। কবি হেমচন্দ্র বাগচীকে শ্রদ্ধা-স্মরণের পাশাপাশি এদিনের আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমন্তকুমার সরকার, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, শঙ্খ ঘোষ, ক্ষুদিরাম দাশ, সুধীর চক্রবর্তী প্রমুখের কথাও উত্থাপিত হয়। ‘কবি হেমচন্দ্র বাগচী স্মৃতি রক্ষা সমিতি’-র পক্ষ থেকে সম্পাদক দীপাঞ্জন দে কবি হেমচন্দ্র বাগচী সম্পর্কে আরও বেশি চর্চার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন এবং নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কেও সকল কবি অনুরাগীকে অবহিত করেন।
লেখক: সম্পাদক, কবি হেমচন্দ্র বাগচী স্মৃতি রক্ষা সমিতি।
Khub vlo ajoyon. Kobi Hemchandra Bagchi amr dadur baba chilen. Uni amr khub sammaniya manus chilen.
ধন্যবাদ। কবিকে প্রণাম।
খুব ভালো লাগলো। অনেক সমৃদ্ধ হলাম।
জেনে ভালো লাগলো।
সত্যি তো,আমাদের এত কাছের মানুষ হেমচন্দ্র বাগচী বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছিলেন… আপনাদের এই প্রচেষ্টা সত্যি প্রসঙ্সনীয়..????????????????????
অনেক ধন্যবাদ। এভাবেই সঙ্গে থাকবেন।
Khub sundor…
অনেক ধন্যবাদ।
প্রবন্ধটি যথাযথ৷। প্রবন্ধটি যথাসময়ে প্রকাশ্ করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।