বাড়ির পুজোর সংখ্যাও কম নয়। সাবেকিয়ানা বজায় রেখে পুজো হয় বেশিরভাগ বারোয়ারিতে। থিমের প্যাণ্ডেল মন ছুঁলেও, কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী প্রতিমার রূপ মুগ্ধ করে, প্রতিমার সাজও মন ছুঁয়ে যায়। ডাকের সাজ, শোলার সাজ, মাটির সাজের প্রতিমা বিশ্ববাসীর কাছে বিশেষভাবে ধরা দিয়েছে। ঘটবিসর্জন (বিভিন্ন ধরনের মডেল প্রদর্শন), প্রতিমা নিরঞ্জনের বিশেষ ধরণ (আড়ং/শোভাযাত্রা/গাড়িতে কিংবা বেহারেদের কাঁধে) কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। চাষাপাড়ার বুড়িমা, কাঁঠালপোতার ছোটো মা বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। চাষাপাড়ার বুড়িমাকে ঘিরে ভক্তদের ঢল নামে। সোনার গহনায় সারা শরীর ভরে থাকে বুড়িমার। বহু ভক্তের মানত থাকে সেখানে। নুড়িপাড়া বারোয়ারিতে একমাত্র পুজো হয় চার দিন। হাতারপাড়া বারোয়ারি, কলেজস্ট্রিট বারোয়ারি, উকিলপাড়া, বারোয়ারি আনন্দময়ীতলা বারোয়ারি, বাগদিপাড়া বারোয়ারি, শিবতলা বারোয়ারি, ঘূর্ণি বারোয়ারি, চকেরপাড়া বারোয়ারি, গোলাপট্টি বারোয়ারি, মালোপাড়া বারোয়ারি প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে পুজো করে থাকে আজও। এই পুজাকে ঘিরে প্রত্যেকের এক নস্টালজিক অনুভূতি।
অতীতের পুজোর সাথে এসময় পুজোর পার্থক্য হয়তো অনেকখনি কিন্তু পুরনো অ্যালবাম ওল্টালেও চোখে পড়ে এসময় পুজোকে ঘিরে তৈরি হওয়া উন্মাদনার স্থিরচিত্র। আসলে জৌলুস বাড়ে, আড়ম্বর বারে হয়তো অনেকখানি, কিন্তু সবটা পাল্টে যায় না। গোলাপট্টি বারোয়ারির সানাইবাদ্য, মালোপাড়া বারোয়ারির বিশেষ যজ্ঞ, পায়েস বিতরণ, বুড়িমার ভোগ নেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইন — আজও একইরকম আছে। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক গবেষক সুধীর চক্রবর্তী ‘জগদ্ধাত্রী সংস্কৃতি’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন — “সমারোহে, সজ্জায়, প্রতিমাশিল্পে, আড়ং-এর জাঁকে, নাচে-বাদ্যে, ঢাকের জৌলুশে আর কোন্ পাড়ার পুজো কত পুরোনো তা জানান দিতে যা সব কান্ড-কারখানা চলে তা ভাবলে ভারি মজা লাগে। আর একটা নতুন উঠেছে কোন্ প্রতিমাকে কত গয়না আর সোনার টিপ পরানো যায়। কোন্ দেবী কত জাগ্রত। আগে জনগণকে দেওয়া হতো মায়ের খিচুড়িভোগ আর এখন পোলাও। আগে ছিল ডাকের সাজ, এখন শোলার সাজ। আগে ছিল কার্বাইডের স্নিগ্ধ বহুমুখী আলো, এখন জমকালো উজ্জ্বল বিদ্যুৎপ্রভা। আগে ছিল ঢোল সানাইয়ের সাথে খ্যামটা নাচ আর এখন ঢাক- বাদ্যির জমকালো আর বিসর্জনের ব্যাঞ্জো-বাজনা। তবে সেই সঙ্গে যে দ্রুতগামী উদ্দাম নাচের আলোড়ন যুবসমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে রক্ষণশীল কেউ কেউ ভয় পাচ্ছেন।…. কেউ কেউ নাকি দুর্গাপুজোয় নতুন প্যান্টশার্ট শাড়ি কিনে তুলে রাখে জগদ্ধাত্রী পুজোয় পরবে বলে। এখন আবার মায়ের কত রকমের নামকরণ হয়েছে — বুড়িমা, আদিমা, খুড়িমা, চারদিনিমা, বালকেশ্বরী, আলোকেশ্বরী, স্বপ্না মনেও পড়ে না।”
২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে দেবব্রত মিত্র সম্পাদিত ‘লিপি নাগরিক’ পত্রিকার একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছিল। বিষয় ছিল — ‘জগদ্ধাত্রী পুজো কৃষ্ণনগর বনাম চন্দননগর’। জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রাক্কালে ‘লিপি নাগরিক’-এর প্রতিনিধি মুখোমুখি হয়েছিল নদিয়া রাজবংশের উনচল্লিশতম পুরুষ ও মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নবম বংশধর সৌমীশচন্দ্র রায়ের। সৈকত মুখোপাধ্যায়কে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে অনেক অজানা কথা উঠে এসেছে। “জগদ্ধাত্রী পুজার সূচনা নিয়ে বিতর্ক সর্বজনবিদিত — এ বিষয়ে বিতর্ক নিষ্প্রয়োজন। বিতর্কিতভাবে নদিয়া রাজবংশের ৩০তম পুরুষ মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র এ-পুজোর সূচনা করেন। নিজেদের প্রয়োজনে গরিমালাভের ইচ্ছায় কেউ হয়তো এ বিতর্কে আগ্রহী।
১৭৫৪ সালে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রাজস্ব দিতে না পারায় তৎকালীন বাংলার নবাব আলীবর্দী খাঁ তাঁকে মুঙ্গেরে কারাগারে বন্দি করে রাখেন। সময়টা ছিল দুর্গাপুজোর ঠিক আগে। স্বপ্ন-সম্বন্ধে দ্বিমত আছে। কেউ বলেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র বন্দিদশায় স্বপ্নাদেশ পান। আবার কেউ বলেন, রাজস্ব মিটিয়ে মহারাজা যখন ছাড়া পান তখন দুর্গা নবমী প্রায় শেষ। কৃষ্ণনগরে ফেরার সময় ক্লান্ত রাজা নৌকাতে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমের ভিতর তিনি স্বপ্নাদেশ পান — কৃষ্ণনগরে ফিরে দেবীর পুজো করার। রাজা স্বপ্নে দেবীকে কুমারী রূপিনী দেখেন। সিংহবাহনা, রক্তিম বস্ত্র পরিহিতা, চতুর্ভূজা, শঙ্খ-চক্র-ধনু-বাণ-ধারিণী-কুমারীরূপিনী দেবী স্বপ্নে আবির্ভূত হয়েছিলেন। রাজগুরু ছিলেন বৈষ্ণবাচার্য। তিনি যদি শক্তি পূজায় মত না দেন বা বাধা দেন তাই তিনি মেড়তলার তান্ত্রিকাচার্য কালিশঙ্কর মৈত্র-র কাছে যান। উনি ব্যাখ্যা করে বোঝান যে এই কুমারী দেবী হলেন সাক্ষাৎ জগদ্ধাত্রী।তারপর পণ্ডিতরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন শুক্লা-নবমীতে এই দেবীর পুজো করার। উনি পুজোর দায়িত্ব পুত্র শিবচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড়ের হাতে অর্পণ করে চন্দননগরে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর কাছে গেলেন।ওর উদ্দেশ্য ছিল পুজোর দিন একবারে উপোস করে চন্দননগর থেকে ফিরে অঞ্জলি দিলে পুজোর সময় বৈষ্ণবাচর্য রাজগুরু অথবা অন্যান্য বৈষ্ণবাচার্যদের সঙ্গে শক্তিপুজো নিয়ে বাক্-বিতণ্ডা এড়ানো যাবে। চন্দননগরে তৎকালীন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র বন্ধুবর ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীকে এই স্বপ্নাদেশ, দেবীর রূপ এবং পূজাপদ্ধতির কথা বলেন।” এই আসলে ইতিহাস।
আমার শিক্ষক বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক কবি বিদ্যুৎ হালদার তাঁর একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “আমাদের ছোটোবেলায় জগদ্ধাত্রী পুজো নিয়ে আজকের মতো কৃষ্ণনগর তেমন হইচই ছিল বলে মনে পড়ে না। ছ’য়ের দশকের শেষ দিক থেকে সাতের দশক পর্যন্ত শহরের উপর দিয়ে ভয়ঙ্করভাবে বয়ে যাওয়া রাজনৈতিক ঝঞ্ঝা এর একটা কারণ হতে পারে।যদিও বড়োদের কাছে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো নিয়ে ছোটোবেলাতেই অনেক উন্মাদনার গল্প শুনেছি। আগে নাকি দলে দলে গরুর গাড়ি চেপে গ্রাম-গঞ্জ থেকে লোক আসত, সারারাত জেগে জগদ্ধাত্রী পুজোর আড়ং অর্থাৎ বিসর্জনের শোভাযাত্রা দেখতে। সাতের দশকের ঝড়ঝঞ্জা স্তিমিত হয়ে এলে আমরাও দেখেছি, জগদ্ধাত্রী পুজার বিসর্জনের দিন ঠাকুমার ঘরের মেঝেতে দু-তিনটে বিছানা পাতা হত। ছোটো কেউ নয়, চারপাশের গ্রামগঞ্জ থেকে বেশ বয়স্ক কয়েকজন আসত আড়ং দেখতে। তারা ঠাকুমার সম্পর্কে লতায়-পাতায় কেউ হত। সারা বিকেল-সন্ধে ঠাকুমার সঙ্গে বসে বসে তারা সুখ-দুঃখের গল্প করতো। বাড়ির বড়োরা বা ছোটোরা কেউই বিসর্জনের দিন রাত জেগে ঐ শোভাযাত্রা দেখতে যেতাম না। শুধু মারামারি নয়, তবে মারামারি ভয় তো একটা ছিলই। দুটো পাড়ার শোভাযাত্রা মুখোমুখি হলে অথবা একটা পাড়া শোভাযাত্রা অন্য পাড়ার শোভাযাত্রাকে জোর করে অতিক্রম করতে গেলে কখনো মারামারি বেধে যেত। তবে একটু বড় হলে আমি কিন্তু যতক্ষণ না পাড়ার প্রতিমা কাঁধে নিয়ে সুবিশাল মিছিল বেশ কতগুলো ঢাকাসহ দৌড়াতে দৌড়াতে পারা ছেড়ে বেরিয়ে না যায় ততক্ষণ পর্যন্ত সিংহাসন থেকে নামিয়ে সাঙ-বাঁশের উপর প্রতিমার বাঁধা-ছাঁদা এবং চারপাশের মানুষগুলোর মধ্যে আলো-আঁধারি থমথমে যুদ্ধপ্রস্তুতি ভাব ঘুরে ঘুরে দেখতাম। দেখে রোমাঞ্চ জাগত মনে।”
খুব ভালো লাগলো পড়ে। অনেক অজানা ইতিহাস, যেগুলি মোহিত রায়ের লেখায় পড়েছিলাম, জানলাম।