বিদ্যুৎবাবুর এই লেখা পড়তে পড়তে আমারও মনে পড়ে যাচ্ছে বহু কথা। আসলে ‘বেহারাদের কাঁধে চেপে গ্যাস বাতির নরম আলোয় আলোকিত হয়ে টানা টানা অশ্রুসজল চোখ নিয়ে’ প্রতিমা আজও হইহই করে এগিয়ে আসে। প্রতিমার সামনে বিশাল মিছিলের ভেতর কোনো কোনো দুঃসাহসীর মুখের কেরোসিন তাদের হাতের জ্বলন্ত মশালের উপর পড়ে হঠাৎই শব্দ করে গাঢ় আগুন লাফিয়ে ঠেলে ওঠে ওপরে। ‘সত্যিই যুদ্ধ করতে যাওয়া যেন।’ আজও কৃষ্ণনগর শহরের প্রতিটি বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো উপলক্ষে আত্মীয় স্বজনেরা আসেন। বুড়িমার কাছে অঞ্জলি দেওয়ার ভিড় আজও একই রকম।কালিনগর রেনবো ক্লাবের মাঠে, ঘূর্ণি ভাই ভাই সংঘের মাঠে, শক্তিনগর এনএমবির মাঠে, ঘূর্ণি একতা ক্লাবের মাঠে, রাধানগর প্রতিভা ক্লাবের মাঠে বিরাট বড় মেলা বসে। হাজারো দোকান, নাগরদোলা, ফুচকা, ভেলপুরি, পানের স্টল, চায়ের স্টল, বেলুনওয়ালা গল্প হয়ে ওঠে। চাষাপাড়ার রাস্তা জুড়ে বুড়িমার ফটোর দোকান, তিলেখাজা, নতুন গ্রামের শিল্পীদের তৈরি কাঠের পেঁচা, কাঠের পুতুল টুকরো টুকরো কবিতা হয়ে ওঠে। এই জগদ্ধাত্রী পুজোকে ঘিরে কত মানুষের স্বপ্ন… কিছু উপার্জনের আশা। অসংখ্য ঢাকি ছুটে আসে এই শহরে এই পুজোর সময়। নতুন জামা অথবা নতুন গামছা, আর পেট ভরে কদিন খাওয়া আর কিছু অর্থ। জগদ্ধাত্রী মাকে কাঁধে করে নিয়ে যাবার জন্য হাজার হাজার বেহারার ভিড় বিসর্জনের দিন, কষ্ট হলেও মনে থাকে অদ্ভুত এক আনন্দ। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঠাকুরকে কাঁধে করে নিয়ে যাবার জন্য ছুটে আসে এরা। সাঙের বাঁশ বাধার রীতি একেবারেই অন্যরকম। বিশেষভাবে বাঁধা হয় সাঙ, বেশ পরিশ্রমের কাজ। পেট ভরে টিফিন তারপর ঘাটে বিসর্জনের পর পেট-পুরে খাওয়া,কিছু অর্থ নিয়ে বাড়ি ফেরে তারা।
যে সমস্ত পুজো কমিটি সাঙে করে ঠাকুর নিয়ে যান তাঁদের এর জন্য একটা বিরাট অঙ্কের বাজেট ধার্য করা থাকে। ঘট বিসর্জনে তৈরি হয় বিভিন্ন মডেল, সেই মডেলের জন্য অনেকেই সাজিয়ে গুছিয়ে তুলে দেওয়া হয় বিভিন্ন গাড়িতে। একদিকে বিভিন্ন বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে তোলার প্রয়াস চালান বিভিন্ন পূজা কমিটি, পাশাপাশি এই ঘট বিসর্জনকে কেন্দ্র করে অনেকের কিছু উপার্জনও হয়। কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো এখন হয়ে গেছে থিম-নির্ভর যদিও সাবেকিয়ানা বজায় আছে অনেকটাই। বিভিন্ন পুজোউদ্যোক্তা অনেকদিন আগে থেকেই থিম নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। কৃষ্ণনগরের শিল্পীদের জগৎজোড়া খ্যাতি, তাই চিন্তাভাবনায় থাকে অভিনবত্বের ছাপ। কিন্তু সব ছাপিয়ে যায় কৃষ্ণনগরের প্রতিমাশিল্প। দুর্গার পরেই লক্ষ্মী, কালী, কার্তিক, জগদ্ধাত্রী, সরস্বতী। নানারূপে সেজে ওঠে প্রতিমা, পুতুলনগরী কৃষ্ণনগরের প্রতিমাশিল্প এবং সাজশিল্প যে বাংলার অহংকার।
একসময় কৃষ্ণনগর শহরেও শুধু জার্মানি থেকে এসে পৌঁছতে রাংতা। সেই রাংতাকে বলতো জামির। ডাকযোগে আসতো বলে নাম ডাকের সাজ। সেই রাংতার উপর বসানো হতো জরি চুমকি। সেই চুমকি হত মেটালিক-সোনা কিংবা রুপোর। থাকতো জরির কাজ। কী সুন্দর তার নাম! বুলান, সলমা প্রভৃতি। তৈরি হতো অসামান্য সব মুকুট। অনেক মূল্য তার। তবু সেই ডাকের সাজেই সেজে উঠত কৃষ্ণনগরের প্রতিমা। সেসব দিন গেছে। ডাকের সাজ বলে আজ যা আছে, তাতে বদল ঘটেছে অনেক। কোথায় সেই রাংতা, কোথায় সেই সোনা বা রূপোর চুমকি। এখন ব্যবহার করা হয় প্লাস্টিকের চুমকি। মুকুটের শোভা বৃদ্ধি পায় ঠিকই, শাড়ির আঁচলের চকমকি ভাবও বেড়েছে ঠিকই, নানা ধরণের মেটালিক আলোয় প্রতিমার শরীর থেকে নানান আলোর রশ্মি ঠিকরে বেরোলেও সাবেকিয়ানা চোখে পড়ে না। তবুও আছে ডাকের সাজ ভিন্নভাবে ভিন্নরূপে এটাই সান্ত্বনার। কৃষ্ণনগর শহরের বাগদীপাড়া, রথতলা, চকেরপাড়া, তাঁতিপাড়ার অনেক শিল্পী ডাকের সাজ তৈরি করেন, তাতে নাই বা থাকল সোনা বা রূপোর চুমকি! কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী প্রতিমার সাজ সত্যিই মুগ্ধ করে। বিভিন্ন বারোয়ারির প্রতিমার সাজ বিভিন্ন। সবচেয়ে আকর্ষণ করে ঠাকুরের মুকুট। সেসব মুকুটের মূল্যও অনেক। আকর্ষণ করে প্রতিমার চালি। কত না সূক্ষ্ম কাজ তাতে।
কবি দেবদাস আচার্যের ভাষায় — “কৃষ্ণনগরের পুজো মানে জগদ্ধাত্রী পুজো।কী যে তার উন্মাদনা,কী যে তার জৌলুস, — সে বলে বোঝানো যাবে না। অনেক অনেক বর্ণনা করেও না।… সাত বছর বয়স থেকে কৃষ্ণনগরে আছি। তাই ঐ বয়স থেকে জগদ্ধাত্রী পুজো দেখছি। অর্থাৎ দেখা জগদ্ধাত্রী পুজোর সেকাল-একাল বলতে প্রায় ষাট বছরের রূপান্তরের ইতিহাসও। বলা ভালো, বহিরঙ্গে বিবর্তনের ইতিহাস। সে ছিল গ্যাসবাতির যুগ, এখন হয়েছে জেনারেটরের যুগ। সে ছিল রং-বেরং-এর সঙ-তামাসার, পাড়ায়-পাড়ায় টক্করের যুগ হয়েছে। এখন হয়েছে ঘটবিসর্জনের সময় থিম-চর্চার অলৌকিক নাটকীয়, দৃষ্টিনন্দন, জীবন্ত বিষয়ের উপস্থাপনার চলন্ত প্রদর্শনীর যুগ। অভিনব সব বিষয়ের নাট্যরূপ ও অভিনয়সহ চলন্ত প্রদর্শনী ভূভারতে আছে কিনা, আমার জানা নেই। শুধু এই প্রদর্শনী দেখার জন্য আমি বহিরাগতদের কাছে আহ্বান জানিয়ে রাখলাম। এরপর প্রতিমা। শুধুই কি প্রতিমা? — এ তো প্রাণবন্ত শিল্প। কী করে যে মানুষ বুক বেঁধে প্রতিমা জলে ভাসিয়ে দেয়, বুঝে পাই না! ভুবনখ্যাত সব শিল্পীর রচনাএ প্রতিমা — এক-একটা মহান সৃষ্টি। এ মূর্তি দেখার জন্য আমি বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানিয়ে রাখলাম। এবার আসা যাক আলোর জৌলুসে। — এ কথা ঠিক যে চন্দননগরকে টেক্কা দেওয়া মুশকিল। তবে কিনা চুঁচড়ো-চন্দননগর থেকে আলোকশিল্পীরা চলে এসে আলোকসজ্জাকেও বর্তমানে তুল্য-মূল্য করে তুলেছে। এ হল একালের কথা। মণ্ডপ-সজ্জাতেই এসেছে ‘থিমের’ হাওয়া। — কিন্তু সেই বহুমুখী গ্যাসবাতি যুগের জৌলুসও কি কম ছিল কিছু? সে ছিল এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। দু’পাশে বহুমুখী গ্যাসবাতির মিছিল। প্রতিমার সামনে। তার স্নিগ্ধ আলোর লহরি লকলকে জিভগুলি কাঁপিয়ে এগিয়ে এগিয়ে আসছে। সামনে শতাধিক ঢাকের — ‘চল প্রতিমা জলে চল’ বাদ্য। বুক ডিব ডিব করত।”
কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোরগুলির মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় রাজবাড়ির পুজোর কথা। মা জগদ্ধাত্রীর বাহন ঘটকমুখী সিংহ। তারপর আসে রায়বাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোর কথা। রাজবাড়ির সূত্রেই এ বাড়িতে পুজো শুরু হয়েছিল। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দ্বিতীয় পুত্র ভৈরবচন্দ্রের তিন কন্যার বিবাহ হয়েছিল রায়বাড়ির তিনটি পরিবারে। পারিবারিক ইতিহাস থেকে জানা যায় পুজো শুরু হয় আনুমানিক ২৫০ বছরেরও আগে। প্রাচীন প্রথা মেনেই এখনও এখানে পুজো হয়। বড়ো, মেজো এবং ছোটো তিন তরফই একত্রে ঠাকুরদালানে এই পুজো করেন। মা জগদ্ধাত্রীকে আমিষ ভোগ দেওয়া হয়।