বিশেষভাবে তো উল্লেখ করতেই হয় চাষাপাড়ার ‘বুড়িমা’র জগদ্ধাত্রী পুজোর কথা। অমল অধিকারী তাঁর একটি লেখায় লিখেছেন — “১৭৭২ সালে চাষাপাড়ায় কিছু প্রজা ঘট ও পটে জগদ্ধাত্রী পূজা শুরু করে। ১৭৯০ সালে গোবিন্দ ঘোষ পটের পরিবর্তে প্রতিমা নিয়ে আসেন।”
এছাড়া কৃষ্ণনগরের উল্লেখযোগ্য বারোয়ারিগুলো হলো — কাঁঠালপাতো, আমিনবাজার, বাগদীপাড়া, নুড়িপাড়া, চৌরাস্তা, চকের পাড়া, তাঁতিপাড়া, কাঁসারিপাড়া, সাপুড়িয়াপাড়া, নতুন বাজার, মল্লিকপাড়া, দর্জিপাড়া, চৌধুরীপাড়া, রাজারোড ষষ্ঠীতলা, সেগুনবাগান, পাঁচমাথা মোড়, ঘূর্ণি শিবতলা, রাধানগর নতুন বারোয়ারি, শিবমন্দির বারোয়ারি, রাধানগর আদি বারোয়ারি, গোলাপট্টি বারোয়ারি, কাঠুরিয়াপাড়া বারোয়ারি, কুর্চিপোতা, নেদিয়ারপাড়া, রায়পাড়ামালিপাড়া, আনন্দময়ীতলা, পল্লীশ্রী, বেজিখালি, নতুনপল্লী, বৌবাজার, বেলেডাঙ্গা, গোবিন্দসড়ক, বনশ্রীপাড়া, বাঘাডাঙ্গা, হাতারপাড়া, আদি ঘরামিপাড়া, নাজিরাপাড়া, মল্লিকপাড়া, ঘূর্ণি-দাসপাড়া, কলেজস্ট্রিট, মালোপাড়া, গেটরোড, কদমতলা ইত্যাদি।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখি কৃষ্ণনগরের বিভিন্ন বারোয়ারির জগদ্ধাত্রী প্রতিমা খুব সুন্দর সুন্দর নামে চিহ্নিত হয়েছেন। যেমন — মালোপাড়া বারোয়ারি (মা জলেশ্বরী), চাষাপাড়া বারোয়ারি (বুড়িমা), চকেরপাড়া বারোয়ারী (আদিমা), আনন্দময়ীতলা বালকেশ্বরী (প্রাচীন মা), তাঁতিপাড়া বারোয়ারি (বড় মা), নেদিয়ারপাড়া বারোয়ারি (জগৎ মাতা),কাঁঠালপোতা বারোয়ারি (ছোট মা), বাঘাডঙা বারোয়ারি (বাঘা মা), নুড়িপাড়া বারোয়ারি (চারদিনি মা), কলেজস্ট্রিট বারোয়ারি (মেজো মা), বৌবাজার বারোয়ারি (মা মহেশ্বরী) গোলাপট্টি বারোয়ারী (তাসের রাণী), উকিলপাড়া বারোয়ারি (মা সর্বমঙ্গলা), কাঠুরিয়াপাড়া বারোয়ারি (সোনা মা), শিবতলা বারোয়ারি (সুন্দরী মা), ঘূর্ণি বারোয়ারি (ঘূর্ণি মাতা), বনশ্রীপাড়া বারোয়ারি (দেবী মা), প্রভাত সংঘ (মা শেরাবালী), হাতারপাড়া বারোয়ারি (মা মধ্যমণি)। কৃষ্ণনগরের উল্লেখযোগ্য ক্লাবের পুজোগুলো হলো — একতা ক্লাব, নবারুণ সংঘ, শক্তিনগর আমরা কজন, ক্লাব সংহতি, ঘূর্ণি ভাই ভাই সংঘ, ক্লাব প্রতিভা, প্রীতি সম্মিলনী, বিশ্বরূপা, স্বীকৃতি ক্লাব, যুবগোষ্ঠী, রাজদূত ক্লাব, এসবিসি, কালিনগর রেনবো, ভেনাস, অনন্যা, শক্তিনগর এমএনবি, ঘূর্ণির স্মৃতি সংঘ, ঘূর্ণি উদয়ন সংঘ। আসলে ক্লাব-বারোয়ারি এবং বাড়ির পুজো মিলিয়ে জগদ্ধাত্রী পুজোর সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে।

সদ্য কলেজ-পেরোনো তরুণ দেবাশ্রিত বিশ্বাস ছোটো থেকেই জগদ্ধাত্রী পুজোর জন্য পাগল।ওর কথায় — “ফেসবুক স্ট্যাটাস আর পোস্ট থেকে বর্তমানে একটা চলতি হাওয়ার আভাস স্পষ্ট যে — “কলকাতায় বিসর্জন আর কৃষ্ণনগরে আগমন”, মা জগদ্ধাত্রীর আগমন। এককথায় কৃষ্ণনগরের আবেগ, ঐতিহ্য, বুনোট, প্রতীক, অপেক্ষা ইত্যাদি ইত্যাদি। সময় গড়িয়েছে কালের হাওয়ায়। আদি প্রজন্মের হাত থেকে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে নবপ্রজন্ম। কিন্তু রীতিনীতি, আবেগ বদলায়নি বরং বেড়েছে। জ্ঞান হওয়া থেকে মোটামোটি বিশ বছরের অভিজ্ঞতা অন্তত তাই বলছে। বছরের আর কখনো হোক না হোক, এখনো বিজয়া দশমীর তারিখ পার হলেই প্রতিটি পাড়ায় তরুণ থেকে যুবকদের খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়ে যায় কোথায় কোন থিম, ঘট বিসর্জনের মডেল কী? কোন পাড়ায় ঢাক কত? কোন পাড়ার বেহারা কোথাকার, ঢাক কোথাকার ইত্যাদি ইত্যাদি। জলঙ্গী জনপদের শহরের পুজো একদিনের ‘ওয়ান-ডে’। পুজোর আগের দিন থেকে গমগম করে ওঠে রাজপথ। রাতভর হুল্লোড় আর ঠাকুর দেখা, মাঝরাতে পাড়ার সবার হঠাৎ বেরিয়ে পান্থতীর্থের চায়ের দোকানে অস্থায়ী ঠেক আর সন্ধ্যে থেকে পাড়ার ঢাকীর প্রায় ১০০-২০০ জনের দল নিয়ে রাজপথে বেরিয়ে ঢক্কা মহড়ার শক্তি প্রদর্শন। পুজোর দিন অপরাহ্ন পুজোর পর শোভাযাত্রা সহকারে চিনি-ঘট নিয়ে নিকটবর্তী কালীমন্দিরে যাওয়া, সবকিছুতেই জড়িয়ে সেই সুদীর্ঘ ২৫০ বছরের প্রথা, আবেগ বজায় রাখার শক্তি। বিসর্জনের দিন হঠাৎই সুসজ্জিত আলোকসজ্জায় মোড়া শহরের বুক থেকে রাতারাতি উধাও আলোকসজ্জার গেট। ধীরে ধীরে শুরু হয় ঘট বিসর্জন। সুসজ্জিত ট্যাবলো আর ঢাকের বোলে কল্ললিত হয় রাজপথ। চাঁদ উঠলে শুরু হয় ঐতিহাসিক রাজবাড়ি প্রদক্ষিণের মাধ্যমে ঐতিহ্যময় সাং-বহণে প্রতিমা নিরঞ্জন। শতাধিক ঢাক, প্রতিমা কাঁধে বেহারাদের ছুট, সামনে পাড়ার অগণিত সমর্থকদের রাজপথ-কাঁপানো দৌড় আর সুবিখ্যাত শক্তি প্রদর্শনকারী ডায়ালগ-“আসছে কারা সেরার সেরা…” ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রথম বিসর্জন যখন শেষ হয় তখন হেমন্তের দিকসূর্য অনেকটা উদিত হয়।ক্লান্ত শহর তার পরানের শেষ কোহিনুর রাজরাণি বুড়িমাকে বিসর্জন দেয় জলাঙ্গী গর্ভে। সরাসরি সামনাসামনি না হলেও আট থেকে আশি সকলেরই বুকটা করে ওঠে। এক অদ্ভুত শূন্যতা গ্রাস করে শহরটাকে। আবার এক বছরের প্রতীক্ষায়।”

সুদূর নিউজার্সি থেকে কৃষ্ণনগরের এক উজ্জ্বল তরুণ, রসায়নের গবেষক কবি সোহম চক্রবর্তী তার অনুভবের কথা আমাকে শোনায়। তার মর্মস্পর্শী সেই লেখা দিয়েই শেষ করি এই নিবন্ধ —

“…আপামর বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোর আদিগন্ত জমক-জৌলুস, গাঁ-গঞ্জ-শহর-মফস্বলে অনির্বাণ প্রদীপের মতো জেগে ওঠা লক্ষ্মীপূর্ণিমার ছোট ছোট ঘর-গেরস্থালি, কালীপুজো-দীপাবলির হিমেল রাত্রিবেলা মোম-টুনি-আতসবাজিতে ঝলমলিয়ে ওঠা আলোক-রোশনাই – সবটুকু পার ক’রে সারারাজ্য, সারাদেশ তথা সারাটি পৃথিবীর বাঙালি যখন বছরভর উদযাপনের দেউটি নেভায়, তখনই ঠিক — পলাতকা হেমন্তের আঁচল-বিছানো মৃদুমন্দ শীতে — বৃহত্তম উৎসবে তার জেগে ওঠে আমাদের ছোট্ট জনপদ। জলাঙ্গী-তীরের শহর — তার সব পাড়ায়-পাড়ায়, অলিতে-গলিতে উদাত্ত মাইকেরা ঘোষণা ক’রে চলে ‘কৃষ্ণনগরের শারদোৎসব’, জগদ্ধাত্রীপুজো — সমাসন্ন আজ। ‘কৃষ্ণনগরের শারদোৎসব’ — এহেন দৃপ্ত, সাহসী, ব্যতিক্রমী শব্দবন্ধ এ-শহরের সমুন্নত স্বাতন্ত্র্যবাহী সগর্ব অনুভবে-বোধে আমাকে উদ্বেল ক’রে এসেছে একেবারে শুরুর শৈশব থেকেই। যে-দুর্গাপুজোয় গোটা বিশ্বের বাঙালি তার সর্বস্ব উজাড় করে যথাসাধ্য উদযাপনে, যে-কালীপুজো-দীপাবলির রাত আকাশকে নিভতে দেয় না — এমনতর আলোয় ঝিকমিক, আমার এই ছোট্ট জনপদের কোণায়-কোণায় তখন যেন প্রবল সংযম, অল্প-অল্প আলো-অন্ধকার; ক’দিন পরেই আগল ভেঙে উপচে পড়বে লাগামছাড়া আনন্দজল — তারই যেন এক নিবিড় প্রস্তুতি, সঞ্চয়, প্রতীক্ষমাণতা। ইতিহাস যখন কিছুই জানি না, তখনই এই দীপ্ত ব্যতিক্রম আমার মধ্যে বপন করেছে নিজস্ব জনপদ ঘিরে আশ্চর্য এক অস্মিতার বীজ। দুর্গাপুজো-কালীপুজোয় মোটের উপর অন্ধকার থাকা সমস্ত অলিগলি এই যে আলোয় নতুন ক’রে ভ’রে উঠছে আজ, মাইকে-মাইকে ক্লাব-বারোয়ারী-কর্মকর্তাদল সগৌরবে জানান দিচ্ছে অনর্গল দর্শনার্থীর ভিড়, দু-দিনের বিসর্জন ঘিরে এই যে পাগলপ্রায় উদ্দীপনার ঢেউ ধাক্কা দিচ্ছে আমার শহরে — এই সমস্তটাই যে অন্য সব জনপদের থেকে সম্পূর্ণ এক আলাদা বৈশিষ্ট্যে উন্নীত করছে আমাদের, এ-গর্ব আমার চিরকালীন। ক্রমে ক্রমে পরে ইতিহাস জেনেছি।

জগদ্ধাত্রীপুজো ঘিরে আপন শহরের অস্মিতার বোধ আরও দৃঢ় ভিত্তি পেয়েছে তাতে। কৃষ্ণনগর-চন্দননগরের ঝগড়ায় গলা ফাটিয়ে জানিয়ে দিয়েছি সগর্বে, বারবার — আমরাই প্রাচীন, আমরাই সনাতন, এ-উৎসবের আমরাই প্রকৃত ধারক ও বাহক। কৃষ্ণনগর — আঠেরো শতকের অখণ্ড বাংলার সাংস্কৃতিক রাজধানী; সনাতন বাঙালি কৃষ্টি-সংস্কৃতি-রীতি-ঐতিহ্য-বিশুদ্ধতার আধুনিকতম নবজাগরণের সূতিকাগৃহ — অগ্নিহোত্রী বাজপেয়ী মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর নবরত্ন সভাকে কেন্দ্র ক’রে যেখানে স্বপ্ন দেখছেন সমুন্নত সাংস্কৃতিক এক পুনর্জাগৃতির। প্রকৃত প্রস্তাবে জগদ্ধাত্রীপুজো আমার শহরের সেই সুপ্রাচীন স্বতন্ত্র সংস্কৃতিরই সাক্ষ্যবাহী অমল জাগরণ। বহু-বহু পুজো ঘিরে এত-এত কাহিনী-উপকথা, এত-অজস্র ঋদ্ধ লোকাচার, জনশ্রুতি, প্রগাঢ় বিশ্বাস — আসলে তা তুলে ধরে প্রাচীন এ-শহরের সমৃদ্ধ ও স্বতন্ত্র আঞ্চলিক ইতিহাসের কৌলীন্যকেই। অন্য সকলের থেকে আমাদের — কৃষ্ণনাগরিকদের — এই যে সগর্ব তফাত, এই যে স্বাতন্ত্র্য — জগদ্ধাত্রীপুজো তারই এক সমুজ্জ্বল স্বাক্ষর। ব্যক্তিগতভাবে জগদ্ধাত্রীপুজোকে আমি আমার এই প্রাণপ্রিয় আপন জনপদের এহেন এক জ্বাজল্যমান ‘কালচারাল সিগনেচার’ হিসেবেই দেখি, প্রবল গৌরবে দেখি।…”