এমন একটি বিষয় নিয়ে লিখতে বসেছি যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস এবং আবেগ। বাঙালির সবচেয়ে বড়ো উৎসব দুর্গাপুজো। সমগ্র বাঙালি জাতি মেতে ওঠেন এই উৎসবে। জলাঙ্গী নদীতীরের কৃষ্ণনগর শহরের আবেগ-উদ্দীপনা দুর্গাপুজো-পরবর্তী জগদ্ধাত্রী পুজোকে কেন্দ্র করে। সাহিত্য-সংস্কৃতির পীঠস্থান কৃষ্ণনগর। মৃৎশিল্প- ভাস্কর্যে জগতসভায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ আসন দাবি করে এ শহর। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের হাত ধরেই একসময় এখানে শুরু হলো জগদ্ধাত্রী পুজো। ঐতিহ্য-পরম্পরা মেনে আজও কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। বহুদিন এই শহরে আছি। খুব কাছে থেকে দেখেছি এই উৎসব। প্রখ্যাত শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় জগদ্ধাত্রীর মূর্তি, বিশিষ্ট সাজশিল্পীদের তৈরি সাজে সজ্জিত হয়ে ওঠেন জগদ্ধাত্রী মা।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুধীর চক্রবর্তী ‘মুদ্রা’ পত্রিকার ‘মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও সমকাল’ সংখ্যায় (২০১৯) ‘জগদ্ধাত্রীর সন্ধানে’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রবন্ধটি ‘কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো’ বিষয়ক একটি উল্লেখযোগ্য রচনা। প্রবন্ধটিতে লেখক তাঁর নিজের অনুভূতির কথার পাশাপাশি তুলে ধরেছেন কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজার ইতিহাস এবং শাস্ত্রে ও ভাস্কর্যে জগদ্ধাত্রী মূর্তি ও পূজাপদ্ধতি সম্পর্কে যেসব কথা উল্লেখিত হয়েছে। পাশাপাশি চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজা সম্পর্কেও উঠে এসেছে নানা কথা।তিনি লিখেছিলেন — “লোকমুখে শুনেছিলাম জগদ্ধাত্রী পুজো নিয়ে এত যে জাঁক,এত গান,এত আড়ংয়ের ঘটা, তার মূলে ছিল রাজবাড়ির উৎসাহ এবং আনুকূল্য।তার অকাট্য প্রমাণ দেখতাম,বিসর্জনের সময় যখন সব পাড়ার বিগ্রহ মিছিল করে যেত শহরের দক্ষিণ প্রান্তে রাজবাড়িতে, তারপরে সম্পূর্ণ উল্টো দিকে উত্তর প্রান্তের জলাঙ্গী নদীতে নিরঞ্জন হত। রাজবাড়ি যাওয়া হতো রাণীমাকে ঠাকুর দেখাতে। রাণীমা যেসব প্রতিমা দেখে খুশি হতেন তাদের দিতেন অর্থ পারিতোষিক আর তার প্রতিমাশিল্পীকে দিতেন একটা কাঁসার ঘড়া। শহরের চারিদিকে ছড়ানো বিচিত্র সব নামের পল্লী — চকেরপাড়া, নুলিয়াপাড়া, বাগদীপাড়া, তাঁতিপাড়া, মালিপাড়া, হাতারপাড়া, চাষাপাড়া, বাঘাডাঙ্গা, ধোপপাড়া, মালোপাড়া, কাঁসারিপাড়া, দর্জিপাড়া। সব পাড়াতেই হত একটা করে দৃষ্টিনন্দন জগদ্ধাত্রী পুজো ও উৎসব। নানা বিচিত্র বৃত্তিজীবীদের বসবাস ঘিরে পল্লীর বিন্যাস আমার চোখে বেশ নতুন লেগেছিল। রাজার সামন্ত ব্যবস্থার পরিকল্পনায় যে এমন নানা নামের পাড়ার উপনিবেশ গড়ে ওঠে সেই জানাটাও ছিল একেবারে আনকোরা অভিজ্ঞতা। কিশোর বয়সের কৌতূহলে ঘুরে ঘুরে দেখতাম রাজবাড়ির কাছে নতুনবাজারে, কুমোরপাড়ায় আর ঘূর্ণি অঞ্চলে শহরের মোট তিন জায়গায় গড়া হত প্রতিমা মূর্তি। এক-মেটে, দো-মেটে করে ঠাকুরের ফিনিস পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে দেখতাম।প্রতিমাশিল্পীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। আনন্দময়ীতলা, চৌরাস্তা আর বাগদীপাড়ায় তৈরি হতো ঠাকুরের চুল, সাজসজ্জা, মুকুট ও কল্কার কারুকার্য। শহরের দক্ষিণপ্রান্তে বৈকুণ্ঠসড়কে জগদ্ধাত্রী পুজোর আগের রাতে বসত ঢোল-সানাইয়ের বাজার। বিভিন্ন পাড়ার উৎসাহী যুবকরা ধরাধরি করে নিয়ে আসত বাধ্যকারদের, কারণ খেমটা গানের সঙ্গে সঠিকভাবে সানাই না বাজালে জমবে কেন? দলে দলে এবং শয়ে শয়ে ঢাকীরা আসত মুর্শিদাবাদের গাঁ থেকে। তারপর শুরু হত একদিনের জগদ্ধাত্রী পুজো এবং তার করুণ মধুর সমাপ্ত পরের দিনে সারারাতব্যাপী বিসর্জনের আড়ংয়ে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত জগদ্ধাত্রী পুজো এই শহরের নিজস্ব উৎসব। স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল, মূর্তি-শিল্পের নন্দনমূল্যে অসামান্য জনসমাবেশ মুখরিত এবং নিরঞ্জন মিছিলের আলোকিত অনন্যতায় দৃষ্টিশোভন। “এই লেখাটি পড়তে পড়তে আমিও ফিরে যাচ্ছিলাম আমার ছোটোবেলায়। বড়ো হয়েছি কৃষ্ণনগর শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে।জলঙ্গী নদীর ধারের সেই গ্রামে একটি জগদ্ধাত্রী পুজো হত তখন। সেই পুজাকে ঘিরে উৎসাহ-উদ্দীপনার সীমা ছিল না। আমার বাবা আর তাঁর বন্ধুরা দীর্ঘদিন ধরে সেই পুজো পরিচালনা করতেন। সেই পুজোকে ঘিরে ছিল নাটক-যাত্রা-কবিগানের আসর, সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠান। বন্যপাড়ার মাঠে বসত মেলা। তবু কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো আকর্ষণ করত কোনো এক জাদুতে। ছোটবেলায় একটা টান অনুভব করতাম কৃষ্ণনগরের এই উৎসবের প্রতি। বিসর্জনের দিন কিছুটা সময় কৃষ্ণনগর পোস্টঅফিস মোড়ে দাঁড়িয়ে জগদ্ধাত্রী পুজোর আড়ং দেখে আবার ফিরে যেতাম গ্রামে। সে কী উন্মাদনা। কাঁধে করে ঠাকুর নিয়ে ছুটছে কয়েকশো বেহারা। ঠাকুরের গা ভর্তি গহনা, ডাকের সাজ, শোলার সাজের অপূর্ব সব মূর্তি। ঠাকুরের মুকুট, ঠাকুরের চালি অপূর্ব কারুকার্যে ভরা। রাস্তায় মানুষের ঢল, পুলিশ প্রশাসনের ব্যস্ততা, কয়েকশো ঢাকির একসঙ্গে ছুটে যাওয়া, দুই পাড়ার ঠাকুরের মুখোমুখি হওয়ার সময় চরম গন্ডগোল — এসব দেখতে দেখতে শিহরিত হতাম। বাবা বলতেন গোলমাল শুরু হলো বলে, চলো ফিরি। ফিরে চলা গ্রামের পথে, অনেক অনেক ছবির কোলাজ নিয়ে। তারপর এই শহর হল আমার ঠিকানা। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় কাটছে এই শহরে। বাসা বদল হয়েছে অনেকবার। প্রথমে কেটেছে মাটির পুতুলের দেশে, ঘূর্ণিতে, প্রতিমাশিল্পীদের আঁতুরঘরে। ষষ্ঠীতলার পালপাড়ায় কেটেছে অনেকদিন পরবর্তী সময়ে। চোখের সামনে তৈরি হতো জগদ্ধাত্রী প্রতিমা। সাজশিল্পীরা তৈরি করতেন ঠাকুরের সাজ, মুকুট। সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ির সামনে অক্ষয় পালের মূর্তি গড়া দেখতাম। দেখতাম ষষ্ঠীতলার নিমাই পালের তৈরি ঠাকুর, অলোক পালের তৈরি অসামান্য মাটির সাজ। পরবর্তী সময়ে ঘূর্ণি হল আমার স্থায়ী ঠিকানা। ঘূর্ণির প্রখ্যাত শিল্পীরা হয়ে উঠলেন আমার প্রতিবেশী। একসময় ঘূর্ণি শিব তলা বাড়ির প্রতিমা তৈরি করতেন প্রখ্যাত শিল্পী শ্রদ্ধেয় বীরেন পাল। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আমার বড্ড কাছের শিল্পী সুবীর পাল তৈরি করেন শিবতলা বারোয়ারির অসামান্য জগদ্ধাত্রী প্রতিমা। বাড়ির পাশেই শিল্পী বুড়ো পাল এবং তাঁর ছেলে জুয়ান পাল তৈরি করেন জগদ্ধাত্রী প্রতিমা। একটু এগোলেই শংকর পালের স্টুডিও। তাঁর হাতের তৈরি জগদ্ধাত্রী প্রতিমার খ্যাতি তো সারা দেশ জুড়েই। সুতরাং জগদ্ধাত্রী পুজোকে ঘিরে আমার এই পাড়া মেতে থাকে অনেক আগে থেকেই। প্রসঙ্গত একটি বিষয় মনে রাখা দরকার সেটি হল কৃষ্ণনগরের সমস্ত বারোয়ারির প্রতিমাই বারোয়ারি মণ্ডপেই তৈরি হয়। শিল্পীরা কাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে প্রতিমার সাজসজ্জা পর্যন্ত পুরোটাই করেন মণ্ডপে।
কৃষ্ণনগরের প্রতিটি মানুষের কাছে জগদ্ধাত্রী পুজো সবচেয়ে বড়ো উৎসব। সমগ্র কৃষ্ণনগর মেতে ওঠে এই উৎসবে। দুর্গা পুজোকে ঘিরে কৃষ্ণনগরে মাতামাতি অনেকটাই কম। মাত্র একদিনের জগদ্ধাত্রী পুজো হলেও তাকে ঘিরে কৃষ্ণনাগরিকদের আবেগ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যদিও মনে রাখতে হবে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো আর এখন এক দিনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, রীতি মেনে পুজো হয় একদিনে কিন্তু তার বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই সাজো সাজো রব শহরজুড়ে। আলোকমালায় সেজে ওঠে রাস্তাঘাট। দোকানপাটের পসরা বসে যায় রাস্তাজুড়ে। সমগ্র নদিয়া জেলা তথা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন এখানে। বিভিন্ন বারোয়ারি পুজোর পাশাপাশি ক্লাব, সংগঠনও আয়োজন করে জগদ্ধাত্রী পুজোর। (ক্রমশঃ)
পড়লাম। চলুক।