| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ক্রিয়াযোগ : রতন কর্মকার

Reporter
রতন কর্মকার / ১৭১৯ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১১ মার্চ, ২০২২

“শাস্ত্রণ্যাধীত্যাপি ভবন্তি মূর্খাঃ যস্তুক্রিয়াবান্ পুরুষঃ স বিদ্বান্।”

শাস্ত্র অধ্যয়ণ করেও লোক মুর্খ থাকে কিন্তু যিনি ক্রিয়াবান তিনিই বিদ্বান। যোগ শব্দটি বহু প্রাচীন। ঋগ্বেদেই এই শব্দটির প্রথম ব্যবহার হয়। শাস্ত্রানুযায়ী “যোগ” অর্থ যুক্ত হওয়া বা সংযোগ সাধন। বর্তমান কালে “যোগ” শব্দটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন অংকশাস্ত্রে “দুই বা ততোধিক সংখ্যার সংযুক্তি করণের প্রক্রিয়াকে যোগ বলা হয়।” আবার সমধর্মবিশিষ্ট একাধিক বস্তুর সংযোগকেও যোগ বলা হয়। সাংখ্যদর্শনের মতে, “অনাদি পুরুষের সঙ্গে প্রকৃতির মিলনকে যোগ বলা হয়।” হিন্দু দর্শনশাস্ত্রে, “পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলনকে যোগ বলা হয়।” শৈবগণের মতে — “শিব এবং শক্তির মিলনকে যোগ বলা হয়।” বৈষবগণের মতে, “রাধা এবং কৃষ্ণের মিলনকে যোগ বলা হয়।” শ্রীমদ্ভগবদগীতায় যোগের সংজ্ঞা বলা হয়েছে, “সিল্কসিন্ধেদ্ধঃ সমম্বা সমত্ব যোগ উচ্যতে” (২/৪৮)

অর্থাৎ,কর্মের সিদ্ধি এবং অসিদ্ধিতে সমভাব জ্ঞানই যোগ। আবার অন্যত্র বলেছেন, “যোগঃ কর্মসুকৌশল।” অর্থাৎ কর্মের সুকৌশলই যোগ। যে অবস্থা লাভ করে সাধক অন্য লাভকে অধিক বলে মনে করেন না, যে অবস্থায় স্থিত হলে অতিরিক্ত দুঃখ দ্বারাও বিচলিত হন না, সেই দুঃখ সংযোগের বিয়োগরুপ অবস্থাকেই যোগ বলা হয়। জ্ঞানসঙ্কলিনী তন্ত্রে বলা হয়েছে— “সর্বচিন্তা পরিত্যাগে নিশ্চিন্তে যোগ উচ্যতে।” অর্থাৎ সর্বচিন্তা পরিত্যাগকেই যোগ বলে।

পাতঞ্জল যোগ দর্শনের ভাষায় বলা যায়, “যোগশ্চিত্তবৃত্তি নিরোধঃ।” অর্থাৎ চিত্তের বৃত্তিগুলোর নিরোধকেই যোগ বলা হয়। শিব সংহিতার মতে,— “মন্ত্রযোগে হঠলৈ লয়যোগস্তৃতীয়তঃ। চতুর্থো রাজযোগঃ স্যাৎ স দ্বিধাভাব বর্জিতঃ।।”

অর্থাৎ যোগ প্রধানত চার প্রকারঃ

(১ ) মন্ত্রযোগ, (২ ) হঠযোগ, (৩ ) লয়যোগ, (৪ ) রাজযোগ

এছাড়াও ভারতবর্ষে সাধকসমাজে বহু প্রাচীনকাল থেকে আরও বহু প্রকার যোগ পথের নির্দেশ পাওয়া যায়। তার মধ্যে প্রায় সবই ছিলেন সাধু-সন্ন্যাসী মহলে অতি গুপ্ত। সে সব যোগের প্রক্রিয়া সাধারণ গৃহীদের যেমন নাগালের বাইরে ছিল তেমনি দুঃসাধ্যও ছিল। সাধারণ মানুষ যারা প্রাচীনকালের কঠিন যোগ ক্রিয়া করতে সমর্থ নয়, সেই সমস্ত সাধারণ গৃহীদের জন্য কাশীবাসী যোগিরাজ শ্ৰীশ্ৰীশ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয় যে সহজ যোগক্রিয়া প্রচলন করেছিলেন তাই “ক্রিয়াযোগ” বা “ক্রিয়া” নামে পরিচিত। শাস্ত্রমতে এই সাধন পথকে আত্মবিদ্যা, অধ্যাত্মবিদ্যা বা ব্রহ্মবিদ্যা বলা হয়। অনেক সিদ্ধ মহাপুরুষের মতে আজ পর্যন্ত যে সব মুক্তির উপায় বের হয়েছে তার মধ্যে এই ক্রিয়াযোগই হচ্ছে সর্বাপেক্ষা সহজ। ক্রিয়াযোগ প্রকৃতপক্ষে যে এক প্রকার যোগ বা সাধন প্রণালী তা নয়। গীততাক্ত শ্রীকৃষ্ণ যে সুপ্রাচীন যোগমার্গ প্রিয় শিষ্য অর্জুনকে শিক্ষা দিয়েছিলেন যা আবালবৃদ্ধবনিতা এমন কি জরাবৃদ্ধ গৃহস্থ লোকেও সহজে এ কৌশল অবলম্বন করতে পারে। ত্রিকালজ্ঞ ঋষি শ্ৰীশ্ৰীবাবাজী মহারাজ বহু যুগের বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে সেই সুকৌশল ১৮৬১ সালে কাশীবাসী যোগিরাজ শ্রীশ্রীশ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়কে রাণীক্ষেতের জঙ্গলে অলৌকিক কৌশলে ডেকে নিয়ে সেই যুগোপযোগী ক্রিয়াযোগের সহজতর কৌশল শিখিয়ে জনসমাজে লোকশিক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলেন। সেই কৌশল আজও সারা বিশ্বে “ক্রিয়াযোগ” নামে পরিচিত। সত্যিকারের আত্মজ্ঞান পিপাসু লোকের কাছে এই ক্রিয়াযোগ সাধন গুরুমুখী বিদ্যারূপে প্রিয় জিনিসের মত সমাদর পেয়ে আসছে।

সেই শুভদিনে শ্রীশ্রীবাবাজী মহারাজ শ্রীশ্রী লাহিড়ীমহাশয়কে ক্ৰিয়াদীক্ষা দেবার সময় গীতার অনুকরণে বলেছিলেনঃ “আজকে এই উনবিংশ শতাব্দীতে তোমার হাত দিয়ে আমি জগৎকে যে ক্রিয়াযোগ দান করছি তা হচ্ছে সেই একই বিজ্ঞানের পুনরুজ্জীবন, যা শ্রীকৃষ্ণ হাজার হাজার বছর আগে অর্জুনকে দিয়েছিলেন।” শ্রীভগবান গীতায়া বলেছেন—

ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তনহমবষম্। বিবস্বান্মনবে প্রাহ মনুরিক্ষৰাকহেরবীৎ।। এবং পরম্পরা প্রাপ্তমিমং রাজয়ো বিদুঃ। স কালেনেহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ।। —গীতা ( ৪১-২ )

অর্থাৎ আমি সুৰ্য্যকে এই অক্ষয় এবং অব্যয় যোগ বলেছিলাম। সূৰ্য্য (স্বপুত্র) মনুকে এবং মনু (স্বপুত্র) ইক্ষাকুকে বলেছিল। নিমি, জুনকাদি, রাজর্ষিগণ এরূপে পুরুষ পরম্পরা প্রাপ্ত এ যোগ জেনেছিলেন। হে পরন্তপ, ইহলোকে সেই যোগ দীর্ঘকাল পরে নষ্ট হয়েছে। শ্রীভগবান তার এক প্রাচীনতম অবতার কালে এ অব্যয় এবং অক্ষয় যোগ সাধন প্রণালী প্রাচীন প্রনালী বিবস্বানকে দিয়েছিলেন (বিবস্বান থেকে যে বংশের উৎপত্তি তাকেই সূৰ্য্য বংশ বলে। কেননা বিবস্বান শব্দে সূর্য্য বুঝায়) বিবস্বান মনুকে দান করেন (মানবধর্ম শাস্ত্র বা মনুসংহিতার রচয়িতা)। এ সকল মানবধর্ম শাস্ত্রানুমোদিত রীতিনীতি বা প্রথা আজও ভারতবর্ষের নানা জায়গায় প্রচলিত আছে। মনু আবার তার নাসাপুট থেকে উৎপন্ন পুত্র ইক্ষাকুকে এ জ্ঞান দান করেন। এভাবে জড়যুগ পর্যন্ত বংশ পরম্পরাক্রমে এ যোগ সাধন প্রণালী মুনিঋষিদের দ্বারা প্রচারিত হয়ে আসছে। বহু কাল ধরে এভাবে যোগ প্রচারিত থাকার পর কালক্রমে মুনি ঋষি এবং ব্রাহ্মণদের মন্ত্রগুপ্তি আর মানুষের ধর্ম পিপাসার অভাবের দরুন এই পরম পবিত্র যোগ ক্রমশঃ সাময়িকভাবে বিলুপ্ত হয় অর্থাৎ ভস্মাচ্ছাদিত আগুনের মত লুকিয়ে থাকে। চিরন্তন সত্য চিরদিনের মত কখনও বিলুপ্ত প্রাপ্ত হয় না। একেই গীতায় কালক্রমে যোগনষ্টের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রাচীনকালে এ যোগক্রিয়াগুলো মুনি ঋষির অভ্যাস করতেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মানব দেহে জন্মের আগেও এ যোগের প্রচলন ছিল। বর্তমানেও আছে, চিরকাল থাকবে।

এ যোগের নাম অমর যোগ। কাল প্রভাবে মাঝে মাঝে যখনই মলিন হয় তখনই কোন মহাপুরুষের আর্বিভাব হয়ে এ যোগের পুনঃস্থাপন করেন। শ্ৰীশ্ৰীলাহিড়ী মহাশয় প্রচারিত ক্রিয়াযোগ প্রকৃতপক্ষে যে অন্য এক প্রকার যোগ বা শাস্ত্রে বহিভূত যোগ বা সাধন প্রণালী তা নয়। পাতঞ্জল যোগদর্শনে এই ক্রিয়াযোগের উল্লেখ আছে।

“তপঃ স্বাধ্যায়ের প্রাণিধানানি ক্রিয়াযোগঃ।” (সাধন পাদ ১ সূত্র) অর্থাৎ “তপস্যা, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর প্রাণিধানই হচ্ছে ত্রিয়াযোগ।”

যোগসিদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রক্রিয়া সহকারে পরমাত্মার সহিত সংযোগ স্থাপনই ক্রিয়াযোগ। তার ভাষায় ক্রিয়াযোগ সম্বন্ধে আরও বলা যায় –“ক্রিয়াযোগ হচ্ছে অতি দ্রুত সকল দুঃখ ক্লেশমুক্ত সকল বাধা বন্ধনহীন অনাদি অনন্তু পরমাত্মার স্বরূপ দেখতে পাওয়ার চাবিকাঠি। যার দ্বারা দেহকারাগারের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হওয়া যায়। ” তান্ত্রিক এবং বৈদিক উভয় মতেই ক্রিয়াযোগ সাধন প্রণালী একই প্রকার। এবং ক্রিয়াযোগ পথৈঃ পুমান বৈদিক তান্ত্রিককৈঃ। অন্যভয়তঃ সিদ্ধিং মন্দ্রো বিন্দত্যভাপসিতাম্।। — শ্ৰীমদভাগবদ ১১ স্কন্ধ। (২৭-৪৯) অর্থাৎ, এই প্রকার ক্রিয়াযোগ পথে বৈদিক ও তান্ত্রিক সাধকগণ উভয়ে অর্চণা করে স্ব স্ব অভীষ্ট সিদ্ধিলাভ করেন। বলাবাহুল্য এই ক্রিয়াযোগ একটি অধ্যাত্ম কর্ম, যার দ্বারা আত্মজ্ঞান লাভ করা যায়। গীতায় শ্রীভগবান আবার বলেছেন— “এষা তেহভিহিতা সাংখ্যে বুদ্ধিযোগেমিং শৃণু। বুদ্ধ্যা যুক্তো যয়া পার্থ কর্মবন্ধং প্রহাস্যসি।।”

অর্থাৎ, জ্ঞানীদিগের এই মত যে জ্ঞান প্রাপ্তির জন্য চৈতন্য প্রকাশক ক্রিয়ায় নিযুক্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ এর দ্বারা সমস্ত কর্মবন্ধন হতে মুক্ত হওয়া যায়। এই ক্রিয়াযোগই গীতোক্ত কর্মযোগ। প্রাণাপানয়ো কর্মোতি। — প্রাণ ও অপানের কৰ্ম্মই ক্রিয়া।

“যোগঃ কসু কৌশল।” (গীতা ২/৫০ ) ক্রিয়াযোগ শাস্ত্রোক্ত পরমজ্ঞান লাভের এক বিজ্ঞান সম্মত সাধন প্রণালী।

“জানং বিজ্ঞান সহিতং যজ জ্ঞাত্বা মোক্ষ সেহশুভাৎ।” — বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করলে সংসার বন্ধন হতে মুক্তি প্রাপ্ত হওয়া যায়।

ক্রিয়াযোগ সাধনে অনুভবসিদ্ধ অজ্ঞান প্রাপ্তি হয়। এটিই বিজ্ঞান সম্মত উপায়। অর্থাৎ, প্রত্যক্ষ জ্ঞানানুভূতিমূলক আত্মবিজ্ঞান। ক্রিয়াযোগের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ অনুভূতি লাভ করা যায় এবং ক্রমে পরমাত্মার সঙ্গে একীভূত হওয়া যায়। যা মনুষ্য জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তখন যে কী আনন্দ তা বলে বা লিখে প্রকাশ করা যায় না। কারণ বলার কোন উপায় থাকে না। সেই অপার শাশ্বত আনন্দ শুধু নিজ বোধগম্য। শ্রদ্ধেয় আনন্দ মোহন লাহিড়ীর মতে, “ক্রিয়াযোগ এবং ইহার বিজ্ঞান সম্মত বিস্ময়কর পরিণতির কথা ভারতীয় যেগিগণ সবিশেষ অবহিত আছেন কিন্তু অনেকেই ভুলে গেছেন যে এই ক্রিয়াযোগ মূলতঃ ঈশ্বরে পরানুরক্তিমূলক আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তির স্বাভাবিক ফলস্বরূপ সাধন প্রয়াস। যদিও আত্মিক উন্নয়নের প্রচেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে যুগপৎ দেহমনের পরিবর্তন স্বতঃই হয়ে থাকে, তবু ইহা পরীক্ষা — নিরীক্ষার দ্বারা জানবার চেষ্টা চলছে যে দৈহিক মানসিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে আমরা চৈতন্য রাজ্যে ফিরে যেতে পারি কিনা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ অনেকেই অন্তর্মূখীন শেষ লক্ষ্যের কথা বিস্মৃত হয়েছেন এবং আত্মানুসন্ধানের লক্ষ্যপথে প্রযত্নশীল না হয়ে ঐন্দ্রজালিকরূপে রূপান্তরিত হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে যোগসাধন বিষয়টিকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়, তা যেন ভগবদ্ সম্পর্ক লেশহীন স্বতন্ত্র এক বিজ্ঞান চর্চা মাত্র।” পরমহংস যোগানন্দের মতে — “এই ক্রিয়াযোগের বিধি সনাতন। এ গণিতশাস্ত্রের মতো একেবারে অভ্রান্ত যোগ বিয়োগের সহজ প্রণালীর মত ক্রিয়াযোগের বিধিও কখন নষ্ট হতে পারে না। গণিত শাস্ত্রের সমস্ত পুস্তক অগ্নিতে আহুতি দিলেও যুক্তিবাদী মন যেমন এর সত্য সব ঠিক পুনরায় আবিষ্কার করে ফেলবে, তেমনি যোগশাস্ত্রের সমস্ত বই নষ্ট করে ফেললেও যদি একজন প্রকৃষ্ট যোগী আবির্ভূত হন – যার মধ্যে যদি শুদ্ধাভক্তি ও শুদ্ধাজ্ঞানের সমন্বয় ঘটে তাহলে তিনি মূলবিধি সবই পুনরায় আবিষ্কার করে ফেলতে পারবেন।” যোগিরাজের শিষ্য শ্ৰীযুক্তেশ্বর গিরি মহারাজ বলেছেন — “ক্রিয়াযোগ হচ্ছে এমন একটি উপায় যার দ্বারা মানব জাতির বিবর্তন খুব দ্রুত সাধিত হতে পারে। প্রাচীন যোগীরা আবিষ্কার করেছিলেন যে, ব্রহ্মজ্ঞানলাভের রহস্য শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রনের সঙ্গে খুব ঘনিষ্টভাবে বিজড়িত।

গত দুই পর্বে ১ম থেকে ৪র্থ ক্রিয়ানুভূতি নিয়ে লিখেছিলাম। তবে যোগী যোগ্যতা অনুযায়ী এ সকল অনুভূতির তারতম্য হতে পারে।

আজ চলুন জেনে নিই, ৫ম ও ৬ষ্ঠ ক্রিয়ার অনুভূতি সম্পর্কে।

পঞ্চম ক্রিয়াঃ

পঞ্চম ক্রিয়ায় সাধক তার লঘু মস্তিষ্কে দিব্য অনুভূতি পেয়ে থাকেন। সাধক ক্রমশঃ আপ্রাণ চেষ্টা করে, তার ভেতর প্রবেশ করার। যেমন মেঘ বৃষ্টির সময় বিদ্যুৎ চমকায় ঠিক তেমন আলোর ঝলকানি মূলাধার থেকে উঠে সাধকের সমস্ত পৃথিবী আলোয় ভরে দেয়, সাঙ্গে ধ্বনি জ্যোতি ও কম্পন দিব্য অনুভূতি সাধককে ঈশ্বর প্রেমে মাতোয়ারা করে দেয়। সে তখন বুঝতে পারে যে সে স্বয়ং ঈশ্বরের জীবন্ত প্রকাশ। পঞ্চম স্তরের এই সমাধিকে “সন্তোৎপত্তি সমাধি” বলা হয়। আত্মা প্রকাশিত হচ্ছেন ও পিনিয়াল গ্রন্থিতে প্রবেশ করতে প্রচেষ্ট হচ্ছেন। অর্থাৎ সাধক নির্বিকল্প সমাধির কাছাকাছি এসে গেছেন। পঞ্চম ক্রিয়ার দ্বারা সাধক যন্ঠ ক্রিয়ার সমাধি প্রাপ্ত করতে পারেন, এই সমাধিকে “পদার্থভাবিনী সমাধি” বলা হয়। অর্থাৎ, সাধক প্রজ্ঞান এর কাছাকাছি এসে গেছেন। এই অবস্থায় সাধকের বিশ্ব ব্রহ্মান্ড বোধ আর থাকে না। সাধক বোধ করেন যে ঈশ্বরের দরজা খোলা কিন্তু ধ্যানের দ্বারা অবলোকন করেন যে, ঈশ্বর সকল মানুষ, জীবজন্তু, লতা, গাছ, বৃক্ষ সকলের মধ্যে সমান ভাবে হয়েছেন। পঞ্চ মহাভূতের মধ্যে ভগবান রয়েছেন। সাধক ঈশ্বরের সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে যান ও ব্রহ্ম চেতনায় লীন হয়ে যান।

৬ষ্ঠ ক্রিয়াঃ

৬ষ্ঠ ক্রিয়া হচ্ছে দিব্য রাজ্যে বাস করা। সাধক প্রতিমুহূর্তে ঈশ্বর চেতনায় মাগ্ন থাকেন। কোনও বিশ্ববোধ থাকে না। জীবন্ত প্রজ্ঞান অবস্থা। অর্থাৎ, সাধক বিশ্বকে অনুধাবন করছেন না, শুধুমাত্র সত্যকে জানতে চাইছেন। সাধক বিশ্ব সত্ত্বা থেকে আলাদা নয়, সাধক ও সর্বশক্তিমান এক। যে কোনও মুহূর্তে সাধক নির্বিকল্প সমাধিতে প্রবেশ করতে পারেন। অর্থাৎ, সাধক পৃথিবীতে আছেন অথচ নেই এমন একটা পরিস্থিতি সাধক যে কোনও মুহূর্তে শ্বাস রহিত ও হৃদস্পন্দন রহিত অবস্থায় পৌঁছতে পারেন। এই স্থিতিকে “তুরীয় সমাধি” বলা হয়, যার অর্থ হল—ভগবানের সাথে এক হয়ে যাওয়া। এই অবস্থাতে, কোনও শারিরীক বা মানসিক দুঃখ বা ব্যথা থাকে না, কারণ সাধকের সম্পূর্ণ সত্ত্বা ও আত্মা ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ব হয়ে গেছে। সাধক তাঁর দৈনন্দিন জীবনে ঈশ্বরকে তাঁর স্কুল, সূক্ষ্ম ও কারণ, এই তিনটি শরীরের মধ্যে দেখতে পায় অনুভব করে ও পরিপূর্ণতা অর্জন করে। সাধক বুঝতে পারেন যে, সে ঈশ্বর, পরম পিতা বা পরমেশ্বরের সাথে মিলেমিশে একাকার। সাধক নিজের অন্তকরণে সদা সর্বদা ঈশ্বরের প্রকৃত প্রেম অনুভব করতে থাকেন। সুতরাং, ঈশ্বর সর্বদা সাধকের সঙ্গেই থাকেন। এইরূপে ষষ্ঠ ক্রিয়া সম্পূর্ণ ঈশ্বর উপলব্ধির কৈবল্যমুক্তি এবং শরীর, মন ও আত্মার সার্বিক উন্নতি সাধন করে।

প্রথম ছয়টি স্তরের সমাধিকে একত্রিত সবিকল্প সমাধি বলে। সাধকের বােধ ও চৈতন্য এক্ষেত্রে পার্থিব জগতের সঙ্গে যুক্ত থেকে যায়। কিন্তু সাধক প্রতিটি চক্রের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, আত্মা ঈশ্বরে নিমজ্জিত থাকে। তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম ক্রিয়ার দ্বারা ঈশ্বরের প্রতি গভীর প্রেম জন্মায়, ঈশ্বর প্রেমে মাতােয়ারা হয়ে যায়, সাধক খুঁজে পান যে এই ছোট্ট শরীরের মধ্যে তিনটি শরীর কার্যশীল হয়ে রয়েছে অথচ বহির্জগতে ঈশ্বরের প্রেমের মহানুভবতাও উপলব্ধি করেন। ষষ্ঠ ক্রিয়া এবং সপ্তম সমাধিতে সাধক অনন্ত অসীমে গিয়ে মিশে যান, সব কিছু ছাড়িয়ে। ঈশ্বরের প্রতি অটুট বিশ্বাস জন্মায়, এই একমাত্র আশা ও তার প্রখর দীপ্তি, ভয় সন্দেহ ও অজ্ঞানতার মায়াজাল সম্পূর্ণ ছিন্ন করে দেয়।

রতন কর্মকার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “ক্রিয়াযোগ : রতন কর্মকার”

  1. বাসুদেব শিকারী says:

    আমি কতকগুলি যোগক্রিয়া পর্যায়ক্রমে অভ্যাস করি। এতে শরীর ও মন ভাল থাকে। এবং অবচেতন মনের স্বয়ংক্রিয়তা অনুভব করতে পারি। কিন্তু আত্মা অনুভব করতে পারি না।
    আপনি কি কি পরিসেবা কিভাবে দেন জানালে সংযুক্ত হ ওয়া পরিকল্পনা করতাম।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev