প্রকৃতির রূপ পরিবর্তন, ঋতু পরিবর্তন, দিনরাত্রি পরিবর্তন, চন্দ্র সূর্যের উদয় অস্ত, জীবজন্তু বৃক্ষলতাদির জন্ম মৃত্যু আদিম মানুষকে তার জীবন সম্পর্কে সচেতন করে তোলার জন্য আচার অনুষ্ঠানের নিয়ম শুরু করে। মানুষ দেখল যে, জলবায়ু ও ঋতুর যে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, সেই পরিবর্তনে নানা সমস্যা বা জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে এই সমস্যা থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য ধরিত্রীকে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা করতে মানুষ যে সমস্ত উপায় আবিষ্কার করেছিল বা পথ বেছে নিয়েছিল তার মধ্যে ব্রত পালন একটি অন্যতম উপায়। ধরিত্রীর উর্বরতা বৃদ্ধি করতে এমনি একটি ব্রতের নাম ক্ষেত্রব্রত। এই ব্রত পালন কেন করা হয়, তাই নিয়ে একটি লৌকিক গল্প প্রচলিত আছে।
এক দেশে এক গরিব ব্রাহ্মণ তার একমাত্র পাঁচ বছরের ছেলে আর ব্রাহ্মণীকে নিয়ে বাস করতো ।হঠাৎ একদিন ব্রাহ্মণ মারা গেলে গরিব ব্রাহ্মণী তার ছেলেকে নিয়ে এসে বাপের বাড়িতে উপস্থিত হয়। গরীব বিধবা বোনকে ভাই, ভাইয়ের বউ দেখেই রেগে গেলো। প্রথমেই তারা কাজের লোকটাকে ছাড়িয়ে দিল, ননদ কে দিয়ে সংসারের সমস্ত কাজ করাতে লাগলো। এরপর রাখাল বালককে ছাড়িয়ে দিয়ে ব্রাহ্মণীর ছেলেকে দিয়ে মাঠে গরু চরাতে লাগলো। ব্রাহ্মণীর ছেলের নাম বিষ্ণুপদ, তাকে সকলে বিষ্ণু, বিষ্ণু বলে ডাকত। বিষ্ণু আর তার মা দিনরাত প্রাণপাত পরিশ্রম করে সংসারে ঝাঁট পাট দেওয়া রান্নাবান্না গোয়াল পরিষ্কার, ঘুঁটে দেওয়া, বাসন মাজা যাবতীয় কাজ করতে থাকে। এভাবেই কষ্ট দুঃখের দিন কাটে।
বিষ্ণু কিছুটা বড় হয়ে উঠলে, মামা তাকে দিয়ে চাষ করাতে লাগলো। বিষ্ণুর কষ্টের সীমা নেই সমস্ত দিন রোদ বৃষ্টি মাথায় করে মাঠে কোদাল পাড়ে, ঘাস কাটে, লাঙল দেয় তারপর ক্লান্তি হয়ে বাড়ি ফিরে আসে। তার শুকনো মুখ দেখলে শত্রুর মনেও মায়া জন্মায়। এত খাটাখাটনির পর ঠিকমতো খাবার জোটে না। কোনদিনও সামান্য তরকারি ভাত তবু বিষ্ণু মামার ক্ষতি হবে বলে কাজে মোটেও ফাঁকি দেয় না।
ব্রাহ্মণী বারোটার সময় ছেলের জন্য এক ঘটি জল, মুড়ি-মুড়কি, চাল ভাজা, শসা, কলা যেদিন যা পায় তাই নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠে দিয়ে আসতো। হাতমুখ ধুয়ে ক্ষেত্রদেবীকে উৎসর্গ করে তবেই বিষ্ণু খেত। ভগবানে অসীম বিশ্বাস বিষ্ণুর।
একদিন বিষ্ণুর খাওয়ার খুব কষ্ট হল, পাতে ছড়ানো ভাত যেগুলো শুকিয়ে চাল হয়ে গেছে কিছু উচ্ছিষ্ট তরকারি ছিল। সামনেই দুধ জ্বাল দেওয়া হচ্ছিল। ব্রাহ্মনী সেদিন নিজেকে ঠিক রাখতে পারল না। দুধের উপর সরটুকু ছেলের পাতে দিল। কিন্তু মন্দ কপাল, মামীর চোখে তা পড়ে গেল। দারুণ অপমান করে মা-ছেলেকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিল। সেদিন ছিল অগ্রহায়ন মাসের শুক্লপক্ষের বৃহস্পতিবার। মা আর ছেলে সমস্ত দিন খেতে না পেয় কাঁদতে কাঁদতে মাঠের ধারে গিয়ে এক গাছের তলায় বসলো। তাদের কষ্ট দেখতে না পেয়ে ক্ষেত্রদেবী বুড়ি বামনীর রূপ ধরে এসে বিষ্ণুকে বলল, ‘তোমার কোন ভয় নেই। তোমার সাপে বর হয়েছে, এবার তোমার সব কষ্ট দূর হবে।’
এই বলে সেই বৃদ্ধা কতগুলি ধান তার হাতে দিয়ে বলল এর অর্ধেকটা মুদির দোকানে দিয়ে কিছু মুড়ি-মুড়কি কিনে খাও। আর বাকি ধানের বীজ দিয়ে ওই যে জলার ধারে বাড়িটা দেখা যাচ্ছে সেখানে গিয়ে জলার চার ধারে ছড়িয়ে দাও, আর তোমরা ওই বাড়িতেই এখন থেকেই বসবাস করো। দেবীর কথা অনুযায়ী, বিষ্ণুপদ অর্ধেক ধান দিয়ে মুড়ি-মুড়কি কিনে আনলো আর অর্ধেক ক্ষেত্রদেবীকে স্মরণ করে ক্ষেতে ছড়িয়ে দিল।
পরের দিন সকালে দেখে এ কি অবাক কান্ড! সেই ধান বীজ থেকে যে ধান গজিয়েছে তাতে দুলছে সোনার ধান। খবর পেয়ে জমিদার তার পার্ষদদের নিয়ে সোনার ধান দেখতে ছুটে এলেন কি করে সম্ভব হয়েছে।
বিষ্ণুকে সব জিজ্ঞাসা করে জানলেন এবং বুঝলেন ক্ষেত্রদেবীর কৃপা বর্ষিত হয়েছে এই গরীব ছেলেটির উপর। বিষ্ণু ও তার মাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে নিজের কন্যার সঙ্গে বিয়ে দিলেন আর সেই জমি বিষ্ণুকে যৌতুক স্বরূপ উপহার দিলেন জমিদার। বিষ্ণু বিয়ের পর মা আর স্ত্রীকে নিয়ে সেই জমির ধারে কুঁড়েঘরে ফিরে এলো আর জমির সোনার ধান বাজারে বিক্রি করে প্রচুর অর্থ লাভ করল। দেখতে দেখতে সোনার ধানের কৃপায় রাজার মত সাত মহলা বাড়ি তৈরি হলো বিষ্ণুর। তার জমিদারির নাম হল বিষ্ণুপুর।
এদিকে বিষ্ণু আর তার মাকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর মামার অবস্থা দিনের পর দিন খারাপ হতে লাগলো। গরু বাছুর মরে গেল, চাষের অবস্থাও খারাপ হলো। অবশেষে খেতে না পেয়ে কাজের জন্য দোরে দোরে ঘুরতে ঘুরতে একদিন উপস্থিত হল বিষ্ণুপুরে। বিষ্ণুর মহল তৈরি করার কাজে যারা ইট বইছিল তাদের মধ্যেই একদিন মামা মামীকে দেখতে পেল বিষ্ণু। তাদের পরিচয় দিয়ে বিষ্ণু বলল, অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষে বৃহস্পতিবার ক্ষেত্রদেবীর পুজা সম্পন্ন করে তার জীবনের সুদিনের আগমন হয়েছে। বিষ্ণুর কথা মত তার মামা ক্ষেত্রব্রত পালন করে সমস্ত সম্পত্তি ফিরে পেল। দেশ-বিদেশে ব্রতের কথা প্রচারিত হলো ।
এই ব্রত পূজায় কোন মূর্তি নেই। ক্ষেত্রদেবীকে লক্ষ্মী দেবীর রূপ বলে বিশ্বাস করা হয়। অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষে বৃহস্পতিবার এই ব্রত পালনের কথা বলা হয়েছে আবার ড. শিলা বসাকের ক্ষেত্র সমীক্ষা অনুযায়ী অগ্রহায়ণ বা মাঘ মাসে যেকোনো শনিবার বা মঙ্গলবার দিন পূর্বাহ্নে এই ব্রত পালন করতে হয়। ব্রত পালন কারীকে আগেরদিন নিরামিষ আহার গ্রহন করতে হয়। বাড়ির উঠানের খানিক জায়গা লেপে পরিষ্কার করে শিটকি (স্থানীয় গাছ), শেওড়া ও চেঙ্গা গাছের তিনটি ছোট ডাল পুঁতে তার সামনে কলাপাতায় নৈবেদ্য সাজানো হয়। নৈবেদ্য হিসেবে দেওয়া হয় বিবিধ ফল, ফুল, দূর্বা, তুলসী আটপদ ভাজা (যেমন–খই, চিঁড়ে, আতপ চাল, বুট, মটরশুঁটি, সিমের বিচি, মুগডাল, অড়হর ডাল ভাজা)। এই ব্রতে যা কিছু উপকরণ সংগ্রহ করা হয় তার মধ্যে কিছু উপকরণ ভিক্ষে করে আনতে হয়। অযুগ্ম সংখ্যক (৩,৫,৭ ) বাড়ি থেকে এবং বাদবাকি সব নিজের ঘর থেকে দিতে হয়। বিভিন্ন ধরনের ফসল বৃদ্ধির কামনায় এই ব্রত পালন করা হয়।
আজও কৃষকদের কাছে ধন বলতে ধান। ধানের সবচেয়ে বড় বন্ধু হল বৃষ্টি। মাটি দেয় ফসল, আকাশ জল। ফসল আর জল বৃষ্টির কামনা করে এই ব্রত পালন করা হয়। আগে বছর আরম্ভ হতো অগ্রহায়ণে। তাই এখনো অগ্রহায়ণে মা লক্ষ্মীকে স্মরন করে ক্ষেত্রব্রত পালন করা হয়।