ক্লাসে রসায়নের একটি জটিল এক্সপেরিমেন্ট করাচ্ছেন অধ্যাপক, বি এ ক্লাসের ছাত্ররা মাঝে মধ্যে থিয়েটার দেখতেও যায়। ক্লাসে স্যারের এক্সপেরিমেন্ট সুন্দরভাবে বোঝানোর পর এক প্রগলভ ছাত্র চিৎকার করে উঠলো— ‘ব্রাভো বদ্রুবাহন, ব্রাভো’। বিস্মিত অধ্যাপক কিছুক্ষণ স্থির— তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। পরে ছাত্রকে সস্নেহে তিরস্কার করে বলেছিলেন উচ্ছ্বাস প্রকাশের ক্ষেত্রে স্থানের গুরুত্ব বুঝেই চলা উচিত। আসলে তিনিও বুঝতে পেরেছিলেন মঞ্চের সেই আর্কষণীয় দৃশ্য ও জনপ্রিয় নৃত্যগীত ছাত্রদের অল্প বয়সের জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। উৎসাহ আরও বাড়ে যদি তারা সেই সব আর্কষণীয় দৃশ্যের স্রষ্টাকে সামনাসামনি দেখে, সে সময় কলকাতায় মানুষের মুখে মুখে ‘চিচিং ফাঁক’ কিংবা ‘ছিঃ ছিঃ এত্তা জঞ্জাল’। বদ্রুবাহনের জনপ্রিয় গানগুলি তখন মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। আর এইসব মজাদার সংলাপ ও গীতের রচয়িতা দিনের বেলায় কলেজে এসে পড়াচ্ছেন রসায়নের জটিল তত্ত্ব। কলেজে তিনি অধ্যাপক ক্ষীরোদপ্রসাদ ভট্টাচার্য আর মঞ্চে তিনিই নাট্যকার ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ, যাঁর হাতেই নবজন্ম হয়েছে বাংলা রঙ্গালয়ের।
অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় লিখেছেন— ‘‘অলিবাবা’ প্রভৃতির অভিনয় দেখিতে দেখিতে বিডন স্ট্রিটের দর্শকবৃন্দ বোলচাল কাটিয়া শিষ দিয়া, দুই একটা অসঙ্গত ইয়ার্কি কপচাইয়া একটু হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। অমরেন্দ্রনাথ থিয়েটারকে একটি সর্বজাতীয় আমোদাগারে পরিণত করিলেন। থিয়েটার যেন বুরোক্রেসির রাজত্ব ছিল, অমরবাবু থিয়েটারকে ডেমোক্রেট করিয়া তুলিলেন। ফলে দাঁড়াইল, ক্লাসিকে যখন ‘বাদুড় ঝোলে’— স্টারের বেঞ্চ তখন শূন্য।’’
১৮৯৭ এর ১৬ই এপ্রিল এমারেল্ড থিয়েটার উঠে যাবার পর সেখানেই ক্লাসিক থিয়েটার চালু করেন অমরেন্দ্রনাথ দত্ত। তবে প্রথম দু-একটি নাটক জনপ্রিয় না হওয়ায় চিন্তিত অমরেন্দ্রনাথ, সে সময় কোনো শো’তে সাতশো আটশো টাকার টিকিট বিক্রি হলেই তাকে হাউসফুল বলা হতো। ফুলশয্যার মতো একটি কাব্যনাটকের রচয়িতা ক্ষীরোদপ্রসাদ সে সময় রিচার্ড বার্টনের অনুবাদের ভিত্তিতে লিখে ফেলেছেন আলিবাবা, তাঁর নিজের ভাষায় রঙ্গনাট্য— প্রচুর গানে জমজমাট। অথচ স্টার থিয়েটারের স্বত্বাধিকারী অমৃতলাল বসু নাটকটি অভিনয়ের অনুপযুক্ত বলে বাতিল করে দিলেন, আসলে নবাগত নাট্যকারের রচনার নাট্য প্রযোজনা নিয়ে ঝুঁকি নিতে রাজি হননি অমৃতলাল। অমরেন্দ্রনাথ শুনলেন সে কথা— যোগাযোগ হলো নবীন মঞ্চ স্বত্বাধিকারীর সঙ্গেনতুন নাট্যকারের। দুইয়ের যোগাযোগে অভিনয় উপযুক্ত করে তৈরি করা হলো আলিবাবাকে। গিরিশচন্দ্র ঘোষের পরামর্শ নেওয়া হলো। তিনি যুক্ত করলেন ‘বাজে কাজে আর মিনসেকে যেতে দেব না’ এই গানটি। শুরু হলো মহড়া। হুসেনের চরিত্রে অভিনয় করলেন অমরেন্দ্রনাথ, আলিবাবা ও তার দাদা কাশেমের চরিত্রে পূর্ণচন্দ্র ঘোষ ও হরিভূষণ ভট্টাচার্য। দস্যু- সর্দার অতীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, বাবা মুস্তাফা অজয়কুমার চক্রবর্তী ও আবদাল্লার চরিত্রে নৃপেন্দ্রচন্দ্র বসু। মর্জিনার চরিত্রে কুসুমকুমারী। ফতেমা আর সাকিনা হয়েছিলেন রানীসুন্দরী ও ভূষণকুমারী। বিজ্ঞাপনে নৃত্যগীতের সঙ্গে সঙ্গে রোমাঞ্চকর গুহা দৃশ্যের বিশেষ উল্লেখ ছিল। ২০শে নভেম্বর ১৮৯৭-তে বাংলা নাটকের ইতিহাসে রঙ্গমঞ্চে হলো এক বিস্ফোরণ, তার সাক্ষী ছিলেন সামান্য কয়েকজন। তারপর লোকের ভিড় এতোটাই বৃদ্ধি পেল যে কোনো কোনো শো’তে দিনে আঠারোশো টাকার টিকিট বিক্রি হতো। ‘আলিবাবা’র অভিনয়ের ফলে অমরেন্দ্রনাথ দত্ত সে সময়ে লক্ষাধিক টাকা লাভ করেছিলেন।
অমরেন্দ্রনাথ পেলেন সম্মান আর ক্ষীরোদপ্রসাদ পেলেন নাট্যকার হিসাবে প্রতিষ্ঠা। তবে ক্ষীরোদপ্রসাদের ‘আলিবাবা’ আরব্য কাহিনীর অবিকল নকল ছিল না। ক্ষীরোদপ্রসাদ নাটকটিকে সমসাময়িক কালের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নির্মাণ করেছিলেন। ক্ষীরোদপ্রসাদের ঝোঁক ছিল কল্পকাহিনীর দিকে, রোমান্স রচনায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ক্ষীরোদপ্রসাদ নাটকের সংলাপে মেশালেন ইংরাজী শব্দ। যেমন, ‘ব্র্যান্ডি লে আও, হুইস্কি লে আও’। ক্ষীরোদপ্রসাদ সামান্য অদলবদল করেছেন কাহিনীর বিন্যাসেও। হুসেন চরিত্রটি মূল নাটকে প্রায় গৌণ। তার একমাত্র কাজ ছিল দস্যু সর্দারকে গৃহে আমন্ত্রণ করা আর শেষ দৃশ্যে বাবার নির্দেশে বাঁদীকে বিয়ে করা। কিন্তু এই চরিত্রটিকেই কখনও বোকা একরোখা, কখনও লাজুক এবং সর্বোপরি রোমান্টিক নায়কের চেহারা দেন ক্ষীরোদপ্রসাদ। তাই আলিবাবার চেয়েও তার চরিত্রটি বেশি আর্কষণীয় হয়ে উঠেছিলো। অমরেন্দ্রনাথ দত্ত এই চরিত্রে অভিনয় করতেনও খুবই দক্ষতার সঙ্গে। সেই সঙ্গে ক্ষীরোদপ্রসাদ বদলে ছিলেন আবদাল্লার চরিত্রটিকে। তার মুখ দিয়ে বলিয়েছেন বন্ধ সমাজচিত্র উন্মোচনকারী সংলাপ, যেমন মর্জিনাকে আবদাল্লা বলছে— ‘ঝড় বাইরেই হু হু করে— বাঁধা ঘরের জানালায় গিয়ে বাঁশি বাজায়, তুই বাঁদী— তোরও বাঁধা বরাত আর আমি বান্দা— আমারও নিটোল দুঃখ’। এখানেই সমাজের চিরন্তন বঞ্চনার চিত্রটি উন্মোচন করেন ক্ষীরোদপ্রসাদ, মর্জিনার চরিত্রটিতেও ক্ষীরোদপ্রসাদ যুক্ত করেন নতুন মাত্রা। সে ধনী দরিদ্রের অবস্থানগত ফারাকটাকে সংলাপের মধ্য দিয়ে প্রকট করে বলে ওঠে— ‘আমি বাঁদী- তোমরা স্বাধীন গেরস্ত। টাকার ধাক্কা সইতে পারলে না, আমি সইতে পারবো? তোমরা পাগল হলে দেখবার লোক আছে, আমার কে আছে? পাগল বাঁদী কানাকড়ি দিয়েও কেউ কিনবে না।’ এই সংলাপের মধ্যেই রয়েছে শ্রমজীবীর নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিতও। মর্জিনা আর আবদল্লার নাচগান দর্শককে যেমন আমোদ দিয়েছিল তেমনি সচেতন দর্শককে ভাবিয়েছিল, নৃপেন্দ্রচন্দ্র ও কুসুমকুমারীর নাচগানের জন্য আলিাবাবা দর্শকচিত্ত জয় করেছিল।
ক্ষীরোদপ্রসাদের আলিবাবাও আরব্য কাহিনীর চেয়ে আলাদা। সে বলে ওঠে— ‘‘আমরা অনেক টাকা পেয়েছি, তার নেশা আমরা কেউ বরদাস্ত করতে পারছি না।’’ দস্যুসর্দার বলে ওঠে— ‘টাকা কি আর ভোগ হবে বলে রোজগার করছি? খোদার খাজাঞ্জিখানা, আমরা তাঁর তসিলদার, কতকাল ধরে আমাদের এই গুপ্তভাণ্ডারে ধন সঞ্চয় হচ্ছে। আমাদের মধ্যে কে জানে? একজনের পর একজন, তারপর আরো একজন, এইরকম কত হাত ফিরে, শেষে এই ধনাগারে ধন সঞ্চয়ের ভার আমাদের হাতে পড়েছে। তারপর আমাদের হাত থেকে হাত বদলে এভাব দুনিয়ার শেষ পর্যন্ত চলে যাবে। ভোগ করবে কে?’’ বোঝা যায় একটা যন্ত্রের মতো কাজ করতে করতে সে-ও ক্লান্ত এবং তার মধ্যেও জন্ম নিয়েছে সংশয়। কাজেই নাটকের নিজস্ব পরিভাষায় কনফিক্ট বা দ্বন্দ্ব কেবলমাত্র আলিবাবা আর ৪০সঙ্গী সহ দস্যুসর্দারেরই নয়— দ্বন্দ্ব রয়েছে সব চরিত্রের মধ্যেই। কাজেই কেবলমাত্র বিনোদনই নয় একটি উন্নত নাটক হিসাবেও ক্ষীরোদপ্রসাদের আলিবাবা সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেছিল। আর নাটকটি দর্শকমহলে জনপ্রিয়তার পিছনে ছিল অমরেন্দ্রনাথের অসাধারণ অভিনয় যাকে উপেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ বলেছেন— ‘‘যাঁহারা অমরেন্দ্রনাথের হুসেনের ভূমিকায় অভিনয় দেখিয়াছেন ও অনান্য অভিনেতার ঐ ভূমিকায় অভিনয় দেখিয়াছেন, তাঁহারা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করিয়াছেন অমরেন্দ্রনাথের কণ্ঠস্বরে ও সাত্বিকতায় এক অদ্ভুত অভিনব অনুনকরণীয় ভাব উদ্ভাসিত।’’
‘আলিবাবা’ বললেই ‘চিচিং ফাঁক’-এর কথা মনে পড়ে। সেটি কিন্তু একান্তই ক্ষীরোদপ্রসাদের আবিষ্কার। ইংরেজিতে বার্টন বলেছিলেন ‘ওপেন সিসেম’। হিন্দিতে তা থেকেই করা হয়েছিল ‘খুল যা সিমসিম’। ক্ষীরোদপ্রসাদ অদ্ভুতভাবেই এটির রূপান্তর করে করলেন চিচিং ফাঁক। তারপর এরসঙ্গে কাশিমের গলায় শোনা গেল— ফাঁক ফাঁক, ঢেড়শ ফাঁক, রাই ফাঁক, সর্ষে ফাঁক, তিল ফাঁক, মসনে ফাঁক, গম ফাঁক, অড়র ফাঁক, মটর ফাঁক, ভুট্টা ফাঁক। কাশিমের অসহায়তাও সে সময় তুমুল হাস্যরসের উদ্রেক করে। আর সে কারণেই বাংলা রঙ্গমঞ্চের কালজয়ী নাট্য প্রযোজনার মধ্যে অন্যতম হিসাবে বিবেচিত হয়েছে ‘আলিবাবা’ ক্লাসিক থিয়েটারের পরও মঞ্চে, চলচ্চিত্রে বারবার পুনঃনির্মাণ হয়েছে ক্ষীরোদপ্রসাদের এই অনুপম সৃষ্টি।
একসময় ‘আলিবাবা’-কে বাতিল করেছিল স্টার। আলিবাবার পরবর্তী সময়ে জুলিয়া (১৮৯৯), দক্ষিণা (১৯০১), সপ্তম প্রতীক্ষা (১৯০২), সাবিত্রী (১৯০২), বঙ্গের প্রতাপ আদিত্য (১৯০৩), এবং বৃন্দাবন বিলাস (১৯০৩) স্টার থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়। আর ‘রঘুবীর’ (১৯০৩) মঞ্চস্থ হয় মিনার্ভায়। এর মধ্যে ‘বঙ্গের প্রতাপ আদিত্য’ ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রযোজনা। অনেকেই এই নাটকটিকে ‘জাতীয় জীবনের ইতিহাস’ বলে বর্ণনা করেছেন। আর বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছিল পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে যাত্রাপালার আঙ্গিকে লেখা বদ্রুবাহন (১৮৯৯)।
নাট্যকার হিসাবে এই জনপ্রিয়তায় অবশ্য ব্যক্তিজীবনে তৈরি হলো সঙ্কট। ক্ষীরোদপ্রসাদ ছিলেন জেনারেল অক্টারলি কলেজের রসায়নের অধ্যাপক। কলেজের অধ্যক্ষ রেভারেন্ড জন মরিসন ডেকে বললেন হয় নাটক ছাড়তে হবে, নয় ছাড়তে হবে কলেজ। কলেজের চাকরি ছাড়লেন ক্ষীরোদপ্রসাদ। ১৯০৩-এর পর থেকে তিনি হলেন স্বাধীন নাট্যকার। পেশার জন্য বেছে নিলেন অম্ল অজীর্ণ ডিসপেপসিয়ার ওষুধ ‘লাইমোডাইম’ তৈরি, চেষ্টা করলেন কেমিক্যাল গোল্ড তৈরির। কারণ বাস্তব জীবনে তো আর চিচিং ফাঁক বললেই প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান হবে না। আর পেটের চাহিদা মেটাতে ফরমায়েস মতো লিখতে শুরু করলেন নাটক। কোনো কোনো বছরে ছয়খানা নাটকও লিখে ফেলেছেন। ১৯০৮-এ লেখা নন্দকুমার, দাদা ও দিদি, অশোক, বাসন্তী, বরুণা ও ভূতের বেগার কোনোটাই কালজয়ী হয়নি। এর মধ্যে বাসন্তী রচিত হয়েছিল দোলযাত্রার দশদিন আগে মাত্র দুই দিনে। নাট্যকার ভালো করেই জানতেন এই নাটকগুলি আসলে উচ্চমানের হচ্ছে না। পরে বন্ধু মহেন্দ্রনাথ চৌধুরীকে চিঠিতেও লিখেছিলেন ‘‘কতকগুলো অর্বাচীনের মতের তলায় নিজের চিরপোষিত কল্পনাকে বিকৃত করিতে পারিব না’’। নিজেকে কর্ণের মত ‘দৈব নিগৃহীত’ চরিত্র বলে মনে করতেন জীবন সায়াহ্নে।
ক্ষীরোদপ্রসাদের নাট্য জীবনের গোড়ায় ছিলেন গিরিশচন্দ্র। সায়াহ্নে শিশিরকুমার। নলিনীকান্ত সরকার লিখেছেন স্টার থিয়েটারে গিরিশচন্দ্রের ‘পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাস’ নাটকে শিশিরকুমারের অভিনয় ম্যাডান কোম্পানির কর্তা রুস্তমজীর নজরে পড়ে। শিশিরকুমার তখন মেট্রোপলিটন কলেজের ইংরাজীর অধ্যাপক। অধ্যাপকের বেতনের চারগুণ বেতন দিয়ে রুস্তমজী শিশিরকুমারকে রাজি করালেন। আর, মোটা মাইনের ‘রজতশৃঙ্খলে বাঁধলেন’ রসায়নের ভূতপূর্ব অধ্যাপক ক্ষীরোদপ্রসাদকে। ১৯২১-এর ১০ই ডিসেম্বর কর্নওয়ালিশ রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হলো ‘আলমগীর’। নামভূমিকায় শিশিরকুমার। নাট্যকার ক্ষীরোদপ্রসাদ এই নাটকে মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের জীবনকাহিনীকে সুস্থ মনস্তাত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এই প্রযোজনা দেখে শম্ভু মিত্র মন্তব্য করেন, ‘‘নাটকটি যখন আমি প্রথম পড়ি এবং ভাদুড়ীমশাই কীভাবে সেটিকে মঞ্চোপযোগী করার জন্য কেটেছেন ও সাজিয়েছেন সেটা দেখি তখন যে কী পরিমাণে মুগ্ধ হয়েছিলাম তা বলা যায় না। এবং আমার বিশ্বাস আজও যদি কেউ দেখেন তো তিনিও মুগ্ধ হবেন’’।
১৯০৩সালে ক্ষীরোদপ্রসাদ লিখেছিলেন ‘রঘুবীর’। ১৯২২-এ সেই নাটকে রঘুবীরের ভূমিকায় অভিনয় করেন শিশিরকুমার। নলিনীকান্ত লিখেছেন—‘‘নবাব জাফরের সম্মুখে জিঘাংসার প্রতিমূর্তি ভীলসর্দার রঘুবীরের আকস্মিক আবির্ভাব, নবাবের প্রতি কঠোরতম নিষ্ঠুর উক্তির সঙ্গে রুদ্রতাণ্ডব অভিব্যক্তি দর্শকদের চিত্তেও একটা আলোড়ন সৃষ্টি করতো’’।
পরে অবশ্য ম্যাডানে ক্ষীরোদপ্রসাদ যোগ্য সম্মান পাননি। নাট্যকার হিসাবে হেমেন্দ্রকুমার রায় সুযোগ পেলে তিনি এও বলেন যে—‘‘ম্যাডানদের সাঙ্গোপাঙ্গরা আমাকে তাড়াতে চায়। তাই ওরা আপনার নাটক নিয়েছে’’। এভাবেই বারবার বিড়ম্বিত হতে হতে একসময় তীব্র হতাশা আর গ্লানিতে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন ক্ষীরোদপ্রসাদ। জীবন সায়াহ্নে নিজের শেষ নাটক ‘নরনারায়ণ’ লিখতে গিয়ে কোনো সমঝোতা করেননি। কর্ণের চরিত্রের মনোজগতের সঙ্কটকে তুলে ধরেছিলেন ক্ষীরোদপ্রসাদ। ১৯২৬-এর ১লা ডিসেম্বর নাট্যমন্দির প্রযোজনায় ‘নরনারায়ণ’ প্রথম মঞ্চস্থ হলো। নাটকটি দেখে শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত মন্তব্য করেন— ‘‘আসলে নরনারায়ণ কবির লেখা নাটক, নানা ত্রুটিবিচ্যুতি সত্বেও অসামান্য কাব্যনাট্য। ক্ষীরোদপ্রসাদের কাব্যসম্পদ অপরেশচন্দ্রের চেয়ে বেশি ছিল এবং কাব্যবৃত্তিতে নাট্যাচার্য ও তার শিষ্যরা অধিকতর দক্ষ ছিলেন বলেই নরনারায়ণে বেশি জটিলতা থাকলেও নাট্যাচার্য তাকে সার্থক সৃষ্টি করে তুলতে পেরেছিলেন’’।
আসলে ক্ষীরোদপ্রসাদ ছিলেন কবি, বি এ পরীক্ষার তিন বছর আগে ‘রাজনৈতিক সন্ন্যাসী’ নামে একটি আখ্যান কাব্য রচনার মধ্য দিয়েই তাঁর সাহিত্যজীবনের শুরু। পরে নাট্যরচনা প্রাধান্য পেলেও জন্মভূমি, জাহ্নবী, বাণী, ভারতবর্ষ, উদ্বোধন, মাসিক বসুমতীতে তিনি কবিতা লিখতেন। লিখেছেন বেশ কয়েকটি উপন্যাস ও গল্পও। যুক্ত ছিলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গেও, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন — ‘‘বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে ক্ষীরোদপ্রসাদ বহু ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও সামাজিক নাটকের সাহায্যে বাংলাদেশের রসিক সমাজকে শুধু নয়, জনসাধারণকেও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলেন।’’ তিনি ছিলেন গিরিশচন্দ্রের আদর্শের অনুসারী, প্রাচীন মূল্যবোধে বিশ্বাসী, তবে দর্শক ও মালিকদের চাপে অনেকসময়ই চটুলতায় তার সৃষ্টিগুলি গভীরতা হারাতো, সে বিষয়ে তিনি সচেতনও ছিলেন। ‘আলিবাবা’-র মতো দর্শকদের মধ্যে হইহুল্লোড় ও লাগামহীন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে রঙ্গমঞ্চে আর কোনো নাটক পেরেছে কিনা সন্দেহ। তার বহু নাটকই জনপ্রিয় হয়েছিল মনভোলানো আমোদপ্রমোদের জন্যই।
বাংলা রঙ্গমঞ্চের এই অসামান্য নাট্যকারের জন্মের সার্ধশতবর্ষ ২০১২। জন্মেছিলেন খড়দহের শিরোমণি বংশে ১৮৬৩-এর ১২ই এপ্রিল। বাবা গুরুচরণ ভট্টাচার্য। ১৮৮১-তে বারাকপুর গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে প্রবেশিকা। ১৮৮৩-তে পরবর্তী কালের কর্মক্ষেত্র জেনারেল এসেম্বলি কলেজ থেকে এফ এ। মেট্রোপলিটন কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন নিয়ে বি এ। ১৮৮৯-তে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এম এ, কলেজে চাকরি করেন ১১ বছর। ১৮৯২ থেকে ১৯০৩। ক্ষীরোদপ্রসাদ ভট্টাচার্যের নাট্যকার হিসাবে প্রথম আর্বিভাব ১৮৯৪-তে। শেষ নাটক প্রযোজিত হয় ১৯২৬। ৩২ বছরে লিখেছেন ৪৬টি নাটক এবং ১১টি উপন্যাস। সাহিত্যের আকর্ষণে কিংবা তাঁর নিজের ভাষায় সাহিত্যের ‘নেশায়’ ছেড়েছেন নিরাপদ জীবন।
নিরাপত্তাহীনতার জীবনে বাঁচবার তাগিদে বারবার আপস করেছেন। বুঝেও নিজের সৃষ্টিকে হালকা চালে পরিবেশন করেছেন। কুণ্ঠিত হয়েছেন, জীবনের শেষে নিজেকে মনে করেছেন ‘দৈবনিগৃহীত’। নাট্যকারের জীবনও যেন একটা নাটক যেখানে শেষ দৃশ্যে ‘নরনারায়ণ’ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নাট্যকার পিছন ফিরে দাঁড়ান আর বলে যান চাপল্য কিংবা আমোদই নয়, ‘আলিবাবা’ কিংবা কোনো অগভীর মজাদার রঙ্গনাট্য নয় তিনি আরও গভীর জীবনবোধসম্পন্ন নাটক উপহার দিতে পারতেন। পারেননি কেবলমাত্র বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য। ক্ষীরোদপ্রসাদের এই আত্মপরিচয়ের সঙ্কট সম্ভবত প্রায় প্রতিটি পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রী, রঙ্গমঞ্চ কর্মীরই সঙ্কট। ১৯২৭-এর ৪ঠা জুলাই বাঁকুড়ার গ্রামে ক্ষীরোদপ্রসাদের প্রয়াণে সেই সঙ্কটের অন্তিম পরিণতি।
সূত্র : গণশক্তি