খামখেয়ালী সম্রাট বলেই ইতিহাসখ্যাত মহম্মদ বিন তুঘলক। সম্রাটের মৃত্যুও হয়েছিল খেয়ালীপনার জন্যই। সিন্ধুপ্রদেশ জয় করে দিল্লি ফেরার পথেই তিনি মারা গিয়েছিলেন। নদীপথে ফেরার সময় তাঁর হঠাৎ মাছ খেতে ইচ্ছে হয়েছিল। সুলতানের ইচ্ছে অনুসারে তাঁকে যথেচ্ছ মাছ খাওয়ানো হলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পৃথিবীর মায়া কাটান। সৈয়দ মুজতবা বলেছিলেন, ইলিশে দৈবের বশে তুঘলকের প্রাণবায়ু নিশ্বেষ হয়েছিল।
মোহাম্মদ বিন তুঘলকের মতো ইলিশকে মহিমান্বিত করে রেখে গিয়েছেন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ। তিনি ইলিশ ও খাবেন আবার পোলাও। যা একসঙ্গে হতে হবে। তাঁর হেঁশেলে বাবুর্চিরা ছিল পুর্ববাংলার। ফরমায়েশ পেয়ে তাঁরা নবাবের ইলিশ পোলাওয়ের জন্য যে দস্তরখান সাজিয়েছিলেন তার নাম মাহি পোলাও। মুর্শিদাবাদে এখনও তা টিকে আছে।
মুজতবা আলির মতে, ইলিশের আকর্ষণ ঐন্দ্রজালিক। ইলিশে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান লুপ্ত হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি এক পাঞ্জাবি অধ্যাপকের সঙ্গে খাওয়া নিয়ে গল্প বলেছিলেন। মুজতবা আলী সরু চালের ভাত আর গঙ্গার ইলিশই শ্রেষ্ঠ খাবার মনে করেন। অন্যদিকে পাঞ্জাবি অধ্যাপক বিরিয়ানিকে শ্রেষ্ঠ বলেছিলেন। এর পর মুজতবা আলী নাকি রাগে ওই অধ্যাপকের সঙ্গে সাতদিন কথা বলা বন্ধ রেখেছিলেন।
রসনাবিলাসী মুজতবা আলী খাওয়ার স্বাদ আর সহবত জানতেন। তাই পান থেকে চুন খসলে তিনি খুবই বিরক্ত হতেন। একবার এক নিমন্ত্রণে একাধিক মাংসের পদের সঙ্গে ইলিশ মাছ দেখে তিনি বেজায় চটে যান। তাঁর মতে, ইলিশের সঙ্গে অন্য কিছু যায় না। তিনি বলেন, একটা আস্ত ইলিশকে মাঝ বরাবর ফেড়ে মসলা মাখিয়ে কলাপাতায় মুড়ে ভাপে সেদ্ধ করলে তা স্বর্গীয় সুখ দেয়।
জলের এই মহারাজের অনেক নাম। চট্টগ্রামের মানুষ ইলিশকে বলেন চিটা। ইলিশকে কুমিল্লা নোয়াখালিতে বিল্লি, খাল্লিশ, বাম পাইটে, সকড়ি ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়। কোথাও আবার নদী থেকে বিলে এসে কুল হারানো ইলিশ হয়ে যায় বিলিশ। উড়িষ্যার মানুষ ইলিশকে বলে ইলিশি। আসামে সেই ইলিশ আবার হয়ে যায় হিলসা। বিহারে বলে ইলসা। গুজরাটে স্ত্রী আর পুরুষ ইলিশকে আলাদা আলাদা নামে ডাকা হয়। স্ত্রী মাছ মদেন আর পুরুষ মাছ পালওয়া। সিন্ধিরাও ইলিশ খুব পছন্দ করে। ওরা বলে পাল্লা। ইলিশের আরো চমৎকার কিছু নাম আছে: জলতাপী, কাজলগৌরী, মুখপ্রিয়া।
ইলিশের প্রথম বৈজ্ঞানিক নামকরণ করেছিলেন হ্যামিলটন বুকানন সাহেব। ১৮২২ সালে তিনি যখন বঙ্গোপসাগেরের মাছ নিয়ে গবেষণা করছিলেন তখন তিনি নাম দেন হিলসা ইলিশা। দিগেন বর্মণ তাঁর বই ‘ইলিশ পুরান-এ জানাচ্ছেন যে, দ্বাদশ শতকে পন্ডিত জীমূতবাহন ইলিশ নামকরণ করেছিলেন। অন্যদিকে সর্বানন্দের ‘টীকাসর্বস্ব’-তে রয়েছে ইল্লিষ-এর উল্লেখ। কবি ভারতচন্দ্র বলেছেন ‘পাঙ্গাস ইলিশা’। ১৭১১ সালে রামেশ্বর চক্রবর্তী মহাশয়ের ‘শিবায়ন’-এ ইলিশের সামান্য উল্লেখ আছে। তার কিছু পরে রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে কাশীর গঙ্গায় ইলিশ পাওয়ার কথা পাওয়া যায়। ১৮৯৭ সালে রচিত ‘কষ্টিপাথর’ নাটকে মেলে ইলিশের উল্লেখ।

এরপর পদ্মা গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। ইলিশের মাহাত্ম জায়গা পেয়েছে কবিতা, ছড়া, গল্প, লোকগানে। রসরাজ অমৃতলাল বসু ইলিশের তেলকে কড লিভার অয়েলের সঙ্গে তুলনা করে গান লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ ছড়াও লিখেছেন আবার উপমাও করেছেন। তাঁর ইলিশপ্রীতি শিলাইদহের বাড়িতে এক ভোজের আয়োজনে জানা যায়। বাজার করার ব্যাপারে খুব আনাড়ি বুদ্ধদেব বসু ৬৫ বছর বয়সে রান্নাবান্না নিয়ে ‘ভোজন শিল্পী বাঙালী’ নামে যে বই লিখেছিলেন তার দ্বিতীয় পরিচ্ছদে তিনি ইলিশকে উল্লেখ করেছেন মনিসত্তম হিসাবে।
কমলকুমার মজুমদার অবশ্য পদ্মার ইলিশকে বিশেষ পাত্তা দেন নি। তাঁর মতে পদ্মা নয় গঙ্গার ইলিশই উপাদেয়। এর কারণ হিসাবে তাঁর ব্যাখ্যা গঙ্গার ইলিশ দুশো বছর কোম্পানির (বৃটিশের) তেল খেয়েছে। তাই তেলতেলে হতে বাধ্য। সাহিত্যিক লীলা মজুমদারের সাফ কথা: কাঁচা ইলিশের ঝোল রাঁধুক তো ঘটিরা! লেখিকা জ্যোস্না দত্ত লেখেন, ঘটিদের উদ্ভাবন দই ইলিশ। পূর্ববঙ্গে তো দইয়ের চলই নেই।
বঙ্গ খাদ্যসংস্কৃতিতে পুর্ববাংলা এক বিশিষ্ট অবদান রেখেছে। বুদ্ধদেব বর্ণনা অনুযায়ী রজতবর্ণ মনোহরদর্শন মৎস্যকুলরাজ মহান ইলিশের দেহ এতটাই প্রতিভা ধারণ করে যে, শুধু তাকে দিয়েই তৈরি হতে পারে একটি পঞ্চপদী নানা স্বাদযুক্ত ভোজনের মতো ভোজন। ইলিশের ত্রিসীমানায় তারা পেয়াজ আর আদাকে ঘেঁষতে দিতে নারাজ। শুধু কি পেয়াজ আর আদা। আলুও নৈব নৈবচ। কিন্তু ঠাকুরবাড়ীর মেয়ে মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতনী প্রজ্ঞাসুন্দরী আবার ইলিশের স্বাদ খোলতাই করতে আদা আর পেয়াজ সঙ্গতে প্রত্যয়ী। তিনি যে ইলিশমাছের ঝোল রাঁধার প্রণালী বাতলেছেন তাতে রয়েছে বিলাতি বেগুন, তেমতি বা টোমাটো, সাথে ছটি পেঁয়াজ, দুখানা তেজপাতা, ছ’গ্রাম আদা এবং ধনেশাক। প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবীর ভাষায় ইলিশের রক্তই এর তেল। তাই মাছ ভালো করে ধুরে তবেই কাটতে হবে।
ইলিশ ধরতে যাওয়ার আগেও নানা আচার-অনুষ্ঠান করে থাকেন মৎস্যজীবী আর তাদের পরিবারের সদস্যরা। এপার বাংলার ধীবরেরা প্রথম ধরা মাছটিকে একটি থালায় নিয়ে জালের ওপর রাখেন। তারপর সিঁদুর ও হলুদ মাখিয়ে বরণ করেন। অনেকে আবার বাতাসা চিনি দিয়ে ধূপ জ্বালিয়ে পূজার মতো অনুষ্ঠান করেন। এরপর মাঝের অংশ কেটে নৌকার গলুইয়ের ওপর রাখেন বা পুঁতে দেন।
মরসুমের প্রথম ইলিশটিকে কেউ মসলাবাটার নোড়ার সঙ্গে বিয়ে দেন। এখনো ওপার বাংলার বর্ধিষ্ণু হিন্দু জমিদার পরিবারে এই রেওয়াজ রয়েছে। বছরে প্রথম ইলিশ বাড়িতে আনা হলে তাঁরা এটা করে থাকেন। এপার বাংলায় সরস্বতী আর লক্ষ্মীপূজায় ঠাকুরকে জোড়া ইলিশ নিবেদন করা হয়। কোনো কোনো জায়গায় পৌষ মাসেও সেটা করা হয়। আর সেই ইলিশ কেনার সময় দামদর করা হয় না। তবে দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পর থেকে সরস্বতী পূজা পর্যন্ত ইলিশ খাওয়া হয় না।
দারুণ লেখা, সমৃদ্ধ হলাম।
খুব ভালো লেখা। অনেক অজানা তথ্য জানলাম।
ইলিশ তো কেবল মাছ নয়, ইলিশ বাংলা আর বাঙালির সংস্কৃতি, পরম্পরা, ঐতিহ্য, যা যুগ যুগ ধরে বহমান।