| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কোচবিহার রাজবাড়ির কুলদেবী : শৌনক দত্ত

Reporter
শৌনক দত্ত / ৯৩৮ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

সমগ্র বিশ্বে নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্রটি ভয়ংকর। বিশ্বে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ, হত্যা আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, গত কয়েক বছরে পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলোতে নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুলাংশে। একই সাথে সামাজিকভাবে নারীকে বিভিন্ন জায়গায় হেনস্ত হতে দেখা যাচ্ছে আগের থেকে অনেক বেশি। সম্প্রতি সময়ে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনায় সরগরম রাজ্য। কয়েকমাস পরেই বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজা যেখানে আরাধ্য মহিষাসুরমর্দিনী। সেই যুদ্ধে অসুরেরা দুর্গার বিরুদ্ধে রক্তবীজ নামের অসুরকে লেলিয়ে দেয়। রক্তবীজ দৈত্যের বৈশিষ্ট্য হল, তার দেহ থেকে মাটিতে যত ফোঁটা রক্ত পড়বে, ততগুলিই নতুন অসুর জন্ম নিয়ে দুর্গার বিরুদ্ধে লড়াই করবে। এ হেন রক্তবীজের রক্ত যাতে মাটিতে এক ফোঁটাও না পড়ে, তার জন্য দুর্গা নিজের দেহ থেকেই কালীকে সৃষ্টি করেন। মা কালী রক্তবীজের শরীরের সমস্ত রক্ত পান করেন। নতুন অসুরের সৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়। এবং তার পরে বাদবাকি সব অসুরদের নিধন করেন দুর্গা। যা দেখে শুম্ভ মা দুর্গাকে হুঙ্কার দেন যে, “তুমি গর্ব করো না। কারণ, তুমি অন্যের সাহায্য নিয়ে যুদ্ধে জিতেছ। উত্তরে দুর্গা বলেন, “একা আমিই এ জগতে বিরাজিত। আমি ছাড়া দ্বিতীয় কে আছে? রে দুষ্ট, এই সব দেবদেবী আমারই বিভূতি! দ্যাখ, এরা আমার দেহে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এর পর অন্যান্য সব দেবী, যাঁদের দেবী দুর্গা, মা কালীরও আগে সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁরা সবাই দুর্গার দেহে বিলীন হয়ে যান। এবং‌ দুর্গা যুদ্ধে শুম্ভকে পরাজিত করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, দুর্গা কেন বলেছেন; ‘এ জগতে একা আমিই বিরাজিত?’ আসলে দুর্গা মানেই তো শিব বা মহেশ, আবার মহেশ মানেই পরমব্রহ্ম। শ্রীকৃষ্ণ একই কথা বলছেন, গীতা-র সপ্তম অধ্যায়ে। যার মূল কথা, এই জগতে সব কিছুই ‘আমি’ হতে উৎপত্তি। জগতে এমন কিছুই নেই যাতে ‘আমি’ নেই। কৃষ্ণ আবার এমন কথা বলছেন কেন? কারণ, তিনি বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার। অর্থাৎ কৃষ্ণ মানে বিষ্ণু। যে বিষ্ণু আবার পরমব্রহ্ম। আর ব্রহ্মা যেহেতু সৃষ্টিকর্তা, চারদিকে সর্বদা নজর রাখতে হয় তাঁকে। তাই ব্রহ্মার কাঁধের উপরে চার দিকে ঘোরানো চারটে মাথা। এবং তার সঙ্গে মিলিয়ে ব্রহ্মার নারীশক্তির সরস্বতী হলেন জ্ঞানের দেবী। বিষ্ণু পালনকর্তা, কিন্তু কিছু পালন করতে হলে দরকার ধনসম্পদ। বিষ্ণুর তাই নারীশক্তি মা লক্ষ্মী, ধন-সম্পদের দেবী। শিব নিজেই হলেন ধ্বংসকারী। তাঁর নারীশক্তি তাই দেবী দুর্গা। যিনি অসুরদের নিধন করেছেন। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীশক্তির এক অমোঘ উদাহরণ হয়েই পূজিত হন তাই দেবী দুর্গা। যিনি বাঙালির মননে যতটা দেবী বা মা তার চেয়ে অনেক বেশি ঘরের বিবাহিত মেয়ে রূপে পূজিত।

আমরা জানি, ভারতীয় ঐতিহ্যে ‘ধর্ম’-এর ধারণা বিবিধ ও ব্যাপক। ‘রিলিজিয়ন’ বলতে যেমন ‘সাম্প্রদায়িক ধর্ম’ তথা সুসংহত কিছু প্রথা-রীতিনীতি-বিশ্বাসের সমষ্টি বোঝায়, এ তেমন নয়। আবার তাকে অস্বীকারও নয়। কখনও কখনও ‘ধর্ম’ বলতে ভারতীয় শাস্ত্রসমূহে বোঝানো হয়েছে ‘সদাচরণ’—কিছু ‘চিরন্তন’ ও ‘সর্বজনীন’ নীতিবোধ। এ-হেন ‘ধর্মবোধ’ ব্যক্তির অন্তরের ব্যাপার। আবার ধর্মশাস্ত্রসমূহ ‘ধর্ম’ বলতে বর্ণ, শ্রেণি, আশ্রম প্রভৃতি ভেদে আইন, বিধি ও কর্তব্যমালাও নির্দেশ করেছে। ‘ধর্ম’ এ ক্ষেত্রে বাইরের নির্দেশ — শ্রেণি বা গোষ্ঠী ও লিঙ্গভেদে কী করণীয় ও কী নিষিদ্ধ তার তালিকা। বলা হয়েছে, ‘ধর্ম হল তা-ই, যা মানুষকে অধঃপতন থেকে রক্ষা করে’; আবার ‘ধর্ম হল প্রাকৃতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলার ধারক, যার অভাবে (অধর্ম) সেই শৃঙ্খলা বিপন্ন হয়’। ভারতীয় ঐতিহ্যে চারটি ‘পুরুষার্থ’-র কথা বলা হয় — ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ। এর মধ্যে চতুর্থটি আধ্যাত্মিক—পারমার্থিক মুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। বাকি তিনটি মূলত ইহজাগতিক (যদিও মোক্ষলাভের প্রচ্ছন্ন ছায়া সেখানে আছে)। পুরুষার্থ-র অন্যতম ‘ধর্ম’ হল ‘কর্তব্য, ধর্মীয় আচারবিশ্বাস, ধর্মীয় গুণাবলী, নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব, ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আইন’। ‘অর্থ’ হল ধনসম্পদ, রাজনৈতিক ক্ষমতা, লাভ-লোকসান এবং সাফল্য। ‘কাম’-এর অন্তর্গত প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, সুখ — শুধু যৌনসুখ নয়, নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক রসাস্বাদনও বটে (ওয়েন্ডি ডনিগার)। মহাভারতকার লিখে গেছেন, ‘ধর্ম থেকেই অর্থ ও কাম উৎসারিত — কেন ইহা অনুশীলন করিবে না?’ অতএব, বৃহৎ অর্থে চারটি ‘পুরুষার্থ’-ই ধর্ম ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বহমান ধারার বৃহৎ রশ্মির কোনো একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে মাথা গলিয়ে দিলেই হিন্দুধর্মের ক্রমবিবর্তনের ধারাটিকে উদ্ধার করা যাবে না। প্রচলিত প্রবাদ দিয়ে কথাটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে: যেমন কোনো ধনুকের ছিলায় তীর যোজনা করেই ছেড়ে দিলে তা কখনও দূরবর্তী হবে না: তবে ছিলাটিকে যত পেছনে টেনে তীরটিকে ছোঁড়া হবে, তার, দূরবতী হওয়ার সম্ভবনা ততই বেড়ে যাবে। তাই, আজকের এই দেবী কল্পনার মধ্যে শ্রীশ্রী দুর্গাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে, একটু পেছন থেকেই শুরু করা উচিত।

দুর্গার বর্তমান যে রূপের মূর্তি আমরা বাঙালির আরাধনায় দেখি তার সাথে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের রাজবাড়ির কুলদেবী বড়দেবীর রূপ একদম ভিন্ন অথচ বর্তমানে যে সকল দেবীর উপাসনা ও উৎসব বাংলার হাজার হাজার বছরের শক্তি আরাধনার পদ্ধতি অপরিবর্তিত রেখে এখনও স্বমহিমায় টিকে রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো কোচবিহারের রাজগৃহের কুলদেবী বড়দেবীর আরাধনা। তিনি উত্তরবঙ্গের বাঙালি ও অন্যান্য জনজাতির মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় দেবী। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে কোচবিহারের বড় দেবীর আরাধনা আনুমানিক ৪০০ বছরের পুরনো। জনশ্রুতি আছে বিশ্বসিংহ ওরফে বিশু, শিশু বয়সে চিকনার জঙ্গলে তেরো জন বালকবন্ধু-সহ একটি ময়নাগাছের তলায় এক টুকরো ডাল পুঁতে দেবীর আরাধনায় লিপ্ত হন। পূজা শেষে প্রতীকী বলি হিসেবে এক বালক বন্ধুকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে কুশ ঘাস দিয়ে তার গলায় কোপ দিলে বালকের শিরচ্ছেদ ঘটে। উপস্থিত বালকেরা তাতে ঘাবড়ে যায়। তখন দেবী আবির্ভূত হন। সেই থেকে দেবীপুজোর সাথে জুড়ে যায় ময়না কাঠ। ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে রাজবাড়ীর মদনমোহন মন্দির প্রাঙ্গনে ময়না গাছের ডাল পুঁতে দেবীপুজো শুরু করেন। বড়দেবীর রূপ খুব ভীতিপ্রদ। দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী দেবীর গাত্রবর্ণ লাল, অসুরের গাত্রবর্ণ সবুজ। দেবীর বাহন সিংহরাজ অসুরের এক পায়ে কামড়ে ধরেছে, অসুরের অপর দিকে হাতে কামড়ে ধরেছে ব্যাঘ্র। দেবীর দুই পাশে দেবীর দুই সখী জয়া ও বিজয়া। তাদের হাতে রয়েছে জ্বলন্ত মশাল। রাজবাড়ির বড়দেবী ছাড়া আর কোথাও এমন দুর্গা মূর্তির দেখা পাওয়া যায় না এবং এর পূজার বিধিও প্রচলিতধারার সাথে মেলে না কিন্তু কেন? যথার্থ উত্তর দেবার জন্য যেসব তথ্য দরকার তা এই দীর্ঘ সময় পরে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ব্যর্থতাই হাতে এসেছে তবে অনুমান করি কামতাপুরীদের নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতির ধারায় বেদ সরাসরি প্রবেশ করতে না পারলেও তার ছায়া পড়েছে। তবে এটা নিশ্চিত করে বলাই যায় কোচবিহার রাজারা সম্প্রীতির সূত্র হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করেছিলেন খুবই সতর্কতার সাথে আর তারই ফলে ময়না গাছের ডাল থেকে বড়দেবীর স্বপ্নরূপ অতি অবশ্যক ছিল, কেন বলছি এই কথা প্রশ্ন করতেই পারেন। ইতিহাস বলছে শরৎকালের অকালবোধনে দুর্গা পূজার উল্লেখ বাল্মিকীর সংস্কৃত রামায়নে না থাকলেও বাংলায় কৃত্তিবাসকৃত রামায়ণে আছে। অনুষ্টুপ ছন্দে রচিত বাল্মিকীর মূল রামায়ণের রচনাকাল যীশু খ্রীষ্টের জন্মের আগে, বাল্মীকি রামায়ণের রচনাকাল আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী হলেও বাংলায় চর্যাপদের সময়কাল (৮ম – ১২শ শতাব্দী) পেরিয়ে এর রচনাকাল মোটামুটি ১৪০০-১৫০০ খৃষ্টাব্দ। তবে কৃত্তিবাস বিরোচিত রামায়ণের আখ্যান বাংলার সংস্কৃতি চরিত্র ও ভৌগলিক প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রামায়ণের রচনা মূলত পুঁথি নির্ভর। সারা বাংলায় ২০২২টি পুঁথির সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলায় লিখিতভাবে এই রামায়ণের প্রকাশ ঘটে ১৮০২ সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে উইলিয়াম কেরির বদান্যতায়। কবে, কখন, কোথায় প্রথম দুর্গাপূজো শুরু হয়েছিল–তা সঠিকভাবে কিছু জানা যায় না। এ বিষয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। তবে সময়কাল যাই হোক একটা বিষয় অনুমান করতে পারি কোচ রাজার স্বপ্নে পাওয়া বড়দেবীর মূর্তি রূপ আদতে সচেতন ভাবেই ধর্মের মোড়কেই গড়া! আমরা যদি ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরাই দেখবো দেবী কান্তেশ্বরী বা কামতেশ্বরী-এর (চন্ডী, ভবানী বা গোসাঁই নামেও পরিচিত) নামানুসারে কামতাপুর শহরটি প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বসিংহের বাবা হরিদাস চিকনার জঙ্গলে পার্শ্ববর্তী ভূঁইয়া তুর্ক কোতোয়ালের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হন। বন্দি পিতাকে উদ্ধার করতে শিশু বিশ্বসিংহ জঙ্গলে ঢুকে এক রমণীর কাছ থেকে একটি ‘কৃষ্ণপট’ লাভ করেন। তার পরেই তিনি তুর্ক কোতোয়ালকে পরাজিত করে রাজক্ষমতার অধিকারি হন। সেই ‘কৃষ্ণপট’ বা ‘কৃষ্ণপট দেহড়’টি আজও কোচবিহারের মদনমোহন বাড়িতে রক্ষিত রয়েছে। অন্য একটি জনপ্রিয় গল্পে পাই মহারাজা নরনারায়ণের ভাই সেনাপতি শুক্লধ্বজ ওরফে চিলা রায় নিজে রাজা হওয়ার জন্য নরনায়ারণকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন। সেই অভিসন্ধি নিয়ে এক দিন প্রকাশ্য রাজসভায় তরবারি নিয়ে হাজির হন তিনি। দেখেন, স্বয়ং দেবী দুর্গা মহারাজের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন! চিলা রায় এই দৃশ্য দেখে সংজ্ঞা হারান। জ্ঞান ফিরে এলে তিনি এই ঘটনা মহারাজাকে ব্যক্ত করেন। মহারাজা নরনারায়ণ সব শুনে ক্ষুব্ধ না হয়ে মাতৃমূর্তি দর্শনে আকুল হন। তিন দিন-তিন রাত ধ্যানস্থ থাকার পরে মহামায়ার দর্শন পান রাজা নরনারায়ণ। মহারাজা বিশ্ব সিংহের পাওয়া ‘কৃষ্ণপট’ এবং মহারাজা নরনারায়ণের ধ্যানদৃষ্ট মাতৃমূর্তির আঙ্গিক একই, যা আজও মৃন্ময়ী মূর্তিতে ‘বড়দেবী’ রূপে পূজিত হয়। জনপ্রিয় কাহিনীগুলো থেকে ধরে নিতে পারি বিশ্বসিংহ থেকে নরনারায়ণ ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন কিংবা না থাকলেও রাজক্ষমতার অধিকারি হবার পরে তারা ধর্মের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়েন। তাছাড়া রাজক্ষমতার অধিকারি হবার পরে রাজ্য বাড়াতে তারা প্রচুর যুদ্ধবিগ্রহ শুরু করেন। তাই হয়ত পূজার রীতির সাথে নীলকন্ঠ উড়িয়ে রাজ্য জয়ের একটা বিধান দেখতে পাই বহুকাল পর্যন্ত। রাজবাড়ির পুজো এবং দেবীমূর্তি ঘিরে চলে আসা কিংবদন্তির ফলে চারশো বছর আগে উত্তর পূর্ব ভারতের এই অঞ্চলে সংস্কৃতিকরণ সফল ভাবে ঘটে। কামতাপুরের দেবী গোসাইনি বা দেবী-বাড়ির বড়দেবীর আবাহন ভারতের মূল ধারায় নানা জনগোষ্ঠীর আত্তীকরণের পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

হিন্দুদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ হলো বেদ। বেদ যে সময় লেখা হয়েছে সেই সময়কালকে আমরা বৈদিকযুগ বলে অভিহিত করি তারও আগে একটি সভ্যতা প্রাচীন ভারতবর্ষে গড়ে উঠেছিলো: যাকে হরপ্পাযুগ বা সিন্দুসভ্যতা পন্ডিতেরা অভিহিত করেছেন। এর একটি ধারণাও তারা দিয়েছেন যে, এই হরপ্পাযুগের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই গড়ে উঠেছিলো এই বৈদিক সভ্যতা। বৈদিক সমাজ একটি চূড়ান্ত পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। তাই, তাদের দেবদেবীর কল্পনায় দেবতারা যত উজ্জ্বল: দেবীরা ততটাই অনুউজ্জ্বল। বিখ্যাত পন্ডিত ডঃ যোগীরাজ বসু বেদসমগ্র থেকে যেসব দেবীর নাম উদ্ধার করেছেন তাদের নাম, তার ‘বেদের পরিচয়’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। বৈদিক ধারাবাহিকতার সূত্র ধরে এগিয়ে যেতে যেতে আমরাও এক পর্যায়ে আবিস্কার করলাম হিন্দুধর্মও পাঁচটি উপ-সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। এই পাঁচটি উপ-সম্প্রদায় হলো, সৌর, শাক্ত, গাণপত্য, বৈষ্ণব, ও শৈব। একটু চোখ ঘুড়ালেই দেখা যাবে, সারা ভারতবর্ষ ও বাংলায় এই পাঁচটি সম্প্রদায়/উপসম্প্রদায় কোনো না কোনোভাবে এখনও বিদ্যমান। এবং গুপ্তযুগ থেকেই তারা একে অপরের সাথে এমনভাবে মিশে যেতে থাকেন যে, এখন স্বতন্ত্রভাবে এদের চিহ্নিত করতে হলে ধর্মের বিকাশমান ধারাগুলো সম্পর্কে একটু চোখ বুলিয়ে আসতে হবে। যেমন, বাংলায় একসময় গৌড়ীয় বৈষ্ণবধারা খুব বিকাশ লাভ করেছিলো: কিন্তু যেকোনো ভাবে হোক শাক্তধর্ম এর সাথে মিশে গেছে। শাস্ত্রকারেরা চিহ্নিত করেছেন, এই শাক্তধর্ম বা সম্প্রদায় বাংলা থেকেই উদ্ভব। শাক্তধর্মের উদ্ভব যেহেতেু বাংলা থেকে: তাই বাংলায় নারীদেবীর আধিক্যও বেশি। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, পুরুষদেবতার সংখ্যা, এখানে, খুবই নগণ্য।

যাই হোক, দেবী দুর্গা যে, কোনো বৈদিক উৎস থেকে প্রাপ্ত নয় এ কথা বলাই যায়। যদিও কেউকেউ অতিবৈদিক হয়ে দেবীর প্রাচীনত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে ঋকবেদের ১০মন্ডলের ১২৫তম ‘সূক্ত’টিকে উদাহরণ হিসেবে টানেন। এর অন্য নামটি খুবই বিখ্যাত। নামটি হলো ‘দেবীসূক্ত’। ১২৫তম সূক্ত-তে মোট ৮টি মন্ত্র আছে, তার ৩য় মন্ত্রটি দেবীর উদ্ভবের সাথে কেউকেউ মিলিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্ঠা করেছেন। মন্ত্রটি হলোঃ

অহং রাষ্ট্রী সঙ্গমনী বসূনাং চিকিতুষী প্রথমা যাজ্ঞিয়ানাম।

তাং মা দেবা ব্যদধুঃ পুরুত্রা ভ‚রিস্থাত্রাং ভ‚র্যাবেশয়ন্তীম্।৩

(অনুবাদঃ আমি রাজ্যের অধীশ্বরী, ধন উপস্থিত করেছি, জ্ঞানসম্পন্ন এবং যজ্ঞোপযোগী বস্তু সকলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। এরূপে আমাকে দেবতারা নানা স্থানে সন্নিবেশিত করেছেন, আমার আশ্রয়স্থান বিস্তর, আমি বিস্তর প্রাণীর মধ্যে আবিষ্ট আছি। এর একটি অন্য নামও আছে, নামটি হলো: ‘আদ্যাশক্তিস্তোত্র’। কিন্তু আধুনিক পন্ডিতমহল কখনও-ই তা মেনে নেননি। )

তবে, দেবী দুর্গাকে আমরা কোথায় পাই? তার উত্তর হলো ‘মার্কান্ডেয়’ পুরাণের ‘দেবীমাহাত্ম্য’ অংশটুকুতে যার অন্য নাম হলো ‘শ্রীশ্রীচন্ডী’। এখন কথা হলো, মহাভারত, হরিবংশ, দেবীভাগবত, দেবীপুরাণ,কালিকাপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ ও কয়েকটি উপপুরাণেও দেবীর উল্লেখ আছে। কিন্তু এদের মধ্যে কোনটি আগে ও কোনটি পরে রচিত, এ নিয়ে পন্ডিতমহলে বাক্-বিতন্ডা আছে প্রচুর। তাই, ‘মার্কন্ডেয়’ পুরাণের ‘দেবীমাহাত্ম্য’-ই দেবীদুর্গার আসল উৎস, এই ধারণা নিয়েই আমাদেরকে এগুতে হবে। কিন্তু একটি সমস্যা আছে, ‘মার্কন্ডেয়’ পুরাণে তো সরাসরি দেবীদুর্গার উল্লেখ্য নেই। যদিও মহিষাসুর বধ হওয়ার পর দেবী দুর্গাকে উৎসর্গ করে একটি শ্লোক আছে। তবে, শাস্ত্রকারেরা এর ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘শ্রীশ্রীচন্ডী’ বর্ণিত হয়েছে তিনটি চরিত্রের মাধ্যমে। প্রথম চরিত্র ‘মধুকৈটভ বধ’, মধ্যম চরিত্র ‘মহিষাসুর বধ’, উত্তর চরিত্র ‘শুম্ভ-নিশুম্ভ’ বধ। শাস্ত্রকারেরা বলেছেন মধ্যম চরিত্রে মহিষাসুরমর্দিনী-ই দেবীদুর্গা, উত্তর চরিত্রে শুম্ভ-নিশুম্ভমর্দিনী-ই কালী।

শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক শশিভূষণ দাশগুপ্ত মহাশয় তাঁর বিখ্যাত গবেষণা ‘ভারতের শক্তিসাধনা ও শাক্তসাহিত্য’ গ্রন্থে এই বিষয়ে সুন্দরভাবে আলোকপাত করেছেন : “মহিষমর্দিনী দেবী সম্বন্ধে আর একটি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা দেয়া যায়। এই মতে দুর্গা হইলেন ভূমধ্যসাগরাঞ্চলের ব্যাইর্গো দেবী — ইনি সমরপ্রিয়া দেবী। এই ভূমধ্যসাগরাঞ্চলবাসিগণ কর্তৃক মন্-খমের জাতির বিজয়ই মহিষমর্দিনী দেবীর মূর্ত্তির মূল কথা। মন্-খমেরগণ একটি মিশ্র নৃজাতি, খানিকটা ক্যাস্পিয়ান, খানিকটা অস্ট্রলোইড, কিছুটা অ্যালপাইন্। ইঁহাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মহিষের একটা বিশেষ যোগ ছিল। ভারতীয় আর্যগণের মধ্যে গরু যেভাবে পবিত্র হয়ে উঠেছিল মন্-খমেরগণের মধ্যে মহিষও সেইরকম পবিত্র বলে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। মন্-খমের-মর্দনই হল মহিষ-মর্দন ; ভূমধ্যসাগরীয়গণের সমরদেবী হইলেন ব্যাইর্গো বা দুর্গা; তাই, ভূমধ্যসাগরীয়গণ দ্বারা মন্-খমের-বিজয়ই রূপ ধারণ করল দুর্গার মহিষমর্দিনী মূর্ত্তিতে’’।

মহিষমর্দিনী প্রচলিত ধারণায় ব্যাঘ্রবাহিনী নন, সিংহবাহিনী। পরবর্তীকালে খ্রিস্টীয় ৫ম-৬ষ্ঠ শতকে ভারতীয় শিল্প সংস্কৃতিতে সিংহ, ব্যাঘ্রকে পশ্চাদপটে সরিয়ে দিলেও সিংহবাহিনীর মতো ব্যাঘ্রাসীনা দেবীর মূর্ত্তিরও অপ্রচলন ঘটেনি। এমন কি ব্যাঘ্রবাহিনী চন্ডীকার মূর্ত্তিও আছে। মহারাষ্ট্রের তুলজাপুরে, গুজরাটের জুনাগড়ে এবং দুই বাংলার অনেক অঞ্চলেই চন্ডী হলেন ব্যাঘ্রাসীনা। পাঞ্জাবে প্রচলিত লৌকিক চন্ডীকথায় দেবী বাঘের পিঠে চড়ে অসুর নিধন করেছেন, এই রকম প্রচলিত আছে। সুতরাং সিংহবাহিনী যে আদিতে ব্যাঘ্রবাহিনীই ছিলেন এই রকম মনে করা যায়। তাঁর ‘কো কামুখা’ নামটিও এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। (‘কোকা’ অর্থে ব্যাঘ্র; বা শৃগাল)।

মেসোপটেমিয়া থেকে সিন্ধুতীর পর্যন্ত যে-মহামাতৃকা দেবীর আরাধনা করা হতো ইতিহাস-পূর্বকালে, তিনি বহুরূপে কল্পিতা হয়েছিলেন-কখনো সিংহবাহিনী সিবিলী বা ননা, কখনো ব্যাঘ্রবাহিনী সৈন্ধবী দেবী (কি তার নাম ছিল? উম্মু, উমা, হিংলাজ? দুর্গা?) কখনো বা আর কিছু। বাঘ-সওয়ারী দেবী পরে আবার বহু ক্ষেত্রেই সিংহসওয়ারী হয়েছেন, যখন আর্যভাষী বৈদিকরা নিজেদের দেবকুলকে সিন্ধুজলে বিসর্জন দিয়ে পরাভূত সৈন্ধবীদের দেব-দেবীদের-ই শিরোধার্য করে নিয়ে হিন্দু-ধর্মে (সিন্ধু ধর্মের?) প্রবর্তন করলেন। সিন্ধু মাতৃকাদেবীর মতো, সিন্ধুর আদি শিবও হলেন তাঁদের প্রধানতম দেবতা; দেবাদিদেব, মহেশ্বর (মহিষ-ঈশ্বর?)। মহিষ-শৃঙ্গধারী সৈন্ধবী শিবমূর্ত্তি বিবর্তিত হল মহিষ-শৃঙ্গতূল্য চাঁদের ফালির শিরোভূষণ-সম্পন্ন ‘হিন্দু’ শিবের রূপে। পুরাণ কাহিনি মতে,শিবই যে মহিষাসুররূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেই ভাবনার উৎসেও কি মহিষ কাল্টের সঙ্গে শিবের সংযোগ আছে? চন্ডীর পদতলে মহিষাসুরের পড়ে থাকার আরেক রূপই কি কালিকার পদতলে শিবের পড়ে থাকা? ভূমধ্যসাগরীয় জাতিবর্গ (নৃতত্ত্বমতে আদি-দ্রাবিড়রা এর অন্তর্গত) মন্-খমের জাতিবর্গ (আদি-অস্ট্রিকরা যাদের অন্যতম) পরাস্ত ও পদানত করেছে, মহিষাসুরমর্দিনীর কাহিনি সেই ইতিহাসই সূচিত করেছে, এ কথা বলার মতো ‘পাথুরে’ প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেল না ঠিকই। কিন্তু প্রাচীন সিন্ধু রাষ্ট্রের ব্যাঘ্র-কালট্রে অনুসারী মার্তৃকা- উপাসকরা মহিষ-কালট্-অনুসারী পিতৃদেবতার পূজকদের পরাস্ত করেছিল যে, সে সিদ্ধান্ত আর এখন মানতে আপত্তি কী? দেবীর পদতলে মহিষাসুর (তথা শিব) পড়ে আছেন; এই ভাব-কল্পনা ঐ জয়-পরাজয়েরই দ্যোতনা বহন করেছে উত্তরকালে। এ জিনিষ প্রাচীন পৃথিবীর অন্যত্রও ঘটেছে। মিশরবিদ্যাবিদ্ মরেট এবং ডেভি দেখিয়েছেন কেমন করে বাজপাখি-টোটেম-সম্পন্ন গোষ্ঠী কর্তৃক অন্যান্য টোটেম-সম্পন্ন গোষ্ঠীকে পরাভূত করার ইতিহাস ব্যঞ্জিত হয়েছে, বাজপাখির পায়ের তলায় আর সব প্রাণী পড়ে আছে- এই রকম খোদাই করা মূর্ত্তিতে, যা প্রাচীন মিশরের প্রত্ন নিদর্শের মধ্যে বহুলসংখ্যাতেই পাওয়া গেছে। মরেট এবং ডেভি বাজপাখির প্রতীকে হোরাস দেবতা-পূজকদের বিজয় কাহিনীর সাক্ষ্য হিশেবেই সেগুলিকে গ্রহণ করেছেন। হোরাস-উপাসক রাজা মেনেসের বিজয়কথা সেগুলি। মহিষাসুর-মর্দিনীর মিথের অন্তরালে যে কালট্-দ্বন্দ লুকিয়ে ছিল, পরবর্তী সময়ে সেটাই শাক্ত বনাম শৈবদের দ্বন্দে পরিণত হয়েছে, এই সূত্রে তেমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছোনো যায়। আরও একটি আকর্ষণীয় তথ্য এই যে, বহুভূজা দুর্গামূর্ত্তি (আট, দশ, বার এমন কি আঠারটি হাত আছে এমন মূর্ত্তিও দেখা যায়)-উত্তরকালে উপাসিত হচ্ছে, তারও আদি উৎস সিন্ধুর মোহরে : অন্তত চতুভূজা দেবীর মূর্ত্তি সেখানে খোদিত হয়েছে বেশ কটি সীলমোহরের উপর। মহিষাসুর-মর্দিনীর যে-আদি রূপ মহেঞ্জোদড়ো-হরপ্পার সংস্কৃতিতে এই ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তারও একটা আদিতর রূপ নিশ্চয় ছিল।

জনশ্রুতি তে পাই, মহারাজা নরনারায়ণ চোখ খুলে ভগবতীকে দর্শন করে প্রণাম ও স্তুতি করে বলেন, ‘মা, মহিষাসুরের ডান হাত সিংহ দন্তাঘাত করে আছে, কিন্তু তাঁর বাম হাত শূন্য রয়েছে।’‌ দেবী দুর্গা তখন বললেন-‘ওই স্থানে একটি বাঘ দিও।’ রাজা নরনারায়ণ দেবীর অতসী কুসুমাকার বর্ণ দেখে মনে করলেন ভগবতী দেবী দুর্গার লাল রং হলে ভালো হয়। মহারাজা নরনারায়ণ তাঁর স্বপ্নে দেখা সেই রূপেই দেবীর মূর্তি স্থাপন করে শারদীয়া দুর্গা পুজোর প্রচলন করেন। কোচবিহারের বড়দেবী ভীষণদর্শণা, রক্তবর্ণা, আমরা জানি রক্ত বা লাল রঙ হলো উর্বরতার প্রতীক, তাই কৃষিকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় নারীর প্রজননশক্তি ও উদ্ভিদের বিকাশকে এক করেই এই দেবী মূর্ত্তি তৈরী করা হয়েছে। যাকে ইংরেজিতে বলে, “ফ্যার্টিলিটি কাল্ট বা উৎপাদন ধর্মধারা”। অসুরের রঙ সবুজ যাকে প্রকৃতি ধরলে ভুল হবে না। কেননা কোচ রাজবংশের ইতিহাসের সাথে প্রকৃতি বা জঙ্গলের কাহিনী জন্মলগ্ন থেকে জড়িয়ে। অর্থাৎ প্রকৃতিকে পরাজিত করে উৎপাদন ধর্মধাারা বিজয় লাভ করেছে। মশাল ধরে থাকা সখি জয়া বিজয়া অন্ধকার থেকে উৎপাদনের আলোর দিকে যাত্রাকে চিহ্নিত করেছে। সুন্দরবনে যেমন দক্ষিণ রায়ের উপাসনা হয়, উত্তরবঙ্গে রাজবংশীদের কাছে বাঘ তেমনই অনেকটা পরিত্রাতার মতো। বাঘ এখানকার সংস্কৃতিতে, মননে জড়িয়ে আছে। একসময় জলজঙ্গলের দেশ উত্তরবঙ্গ। এখানে সিংহ কখনও আবাসিক ছিল না। ছিল বাঘ। কোচবিহার রাজবাড়ির অদূরে পাতলাখাওয়া জঙ্গলেও বাঘ ছিল বলে শোনা যায়। বাঘের প্রাচুর্য থাকলেও উত্তরবঙ্গে কিন্তু বাঘ-মানুষের সংঘাতের তেমন কোনও ঘটনা কখনও জানা যায়নি। মোটামুটি সহাবস্থানই ছিল। রাজবংশী জনজীবনে বাঘ অনেকটা শ্রদ্ধার আসনেই। সেই বাঘ-সংস্কৃতির ছোঁয়া বড়দেবীর মূর্তি ভাবনাতেও তাই সচেতনভাবে জুড়ে দেয়া হয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় মহারাজা বিশ্বসিংহের মৃত্যুর পর তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মরনারায়ণ সিংহাসনে আরোহণ করেন। নরনারায়ণের রাজত্বকালই কোচরাজশক্তির বিকাশের চূড়ান্ত অধ্যায়। কোচবিহার তখন আর আঞ্চলিক রাজশক্তি নয়, সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চে তার প্রবেশ ঘটেছে। নরনারায়ণ নিজ নামে স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রার প্রবর্তন করেন, ওই মুদ্রা তাঁর নাম অনুসারে ‘নারায়ণী’ মুদ্রা নামে পরিচিত হয় এবং ব্রিটিশ যুগ পর্যন্ত প্রান্তিক উত্তরবঙ্গে, অসমে ও ভুটানে এই মুদ্রার ব্যবহার চলতে থাকে। নরনারায়ণ বিদ্যানুরাগী ছিলেন নিজেও শিক্ষিত ছিলেন তাঁর সময়েই তাঁর উৎসাহে পুরুষোত্তম বিদ্যাবাগীশ ‘প্রয়োগরত্নমালা’ নামে সংস্কৃত ব্যাকরণ ও কবি রাম সরস্বতী শ্ৰীমদভাগবতের পদ্যানুবাদ করেন। তাই অনুমান করতেই পারি বিশাল রাজপাট ও বহু সংস্কৃতির নানা জনগোষ্ঠীর আত্তীকরণের পরম্পরাকে একছাতার নীচে আনতেই তিনি অ্যাকালচারেশ্যন কে বড়দেবীর স্বপ্নরূপেও জুড়ে দিয়েছিলেন ধর্মের মোড়কে সুকৌশলে!

সাধারণত ‘অ্যাকালচারেশ্যন’-ওরফে-সাংস্কৃতিক বিমিশ্রণের পরিণামে দেখা যায় যে, সমাজের ওপরতলার ভাবধারাই নিচের তলার সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে রাখে। নিচের তলার যে-সব দেবতা বা দেবী ব্যাঘ্রবাহন হয়ে থাকলেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে ভারতবর্ষে। যে-দেবীরা ব্যাঘ্রসীনা-তাঁদের প্রায় সবাইকেই চন্ডী বা দুর্গার লৌকিক কোনো রূপান্তর বলে ভাবা হতে লাগল ঐ ‘অ্যাকালচারেশ্যন’-এর সূত্রে। এমনকি যে-বনবিবি ঠাকরুনের সঙ্গে মুসলিম ধর্মাচরণেরও সংমিশ্রণ ঘটে গেছে, অনেক সময়েই তাঁকেও চন্ডী মন্ত্রে আরাধনা করা হয়- দেবী মাত্রেই মহাশক্তির ভাবরূপধারিণী ও মহাদেবীর অংশস্বরূপা-এইরকম যুক্তিবিন্যাস করে! বাংলা মন্ত্রের মধ্যেও দু-চারবার দুর্গা, চন্ডী, মহামায়া-প্রমুখের নামোল্লেখ করে, তাঁকেও তাঁদেরই একটি ব্যক্তরূপ বলে ধার্য করার প্রবণতা অলক্ষিত নয়। বাঘাইচন্ডী, কিংবা বড়দেবীর বির্সজনের পরেই যে দেবীর ঘটা করে পূজা হয় গরীরের দূর্গা বলে সেই ভন্ডানী (বা ভান্ডারনী), কোকামুখা দুর্গা, বনদুর্গা, বনদেবী ইত্যাদি ব্যাঘ্রবাহিনী দেবীদের নিয়ে যেসব লৌকিক কাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে, সেগুলির সর্বত্রই তাঁদেরকে দুর্গার একটি রূপান্তর বলেই দেখানো হয়। কোনো-কোনো ক্ষেত্রে, তিনি সরাসরিই দুর্গাদেবী বলে মান্য; যেমন ভান্ডারনী।

কিন্তু এ-ক্ষেত্রেও, বাঘবাহন দেবদেবীরা প্রায় সকলেই ব্রাহ্মণ্য-ঐতিহ্য বর্জিত (বা, পরিত্যক্ত) সংস্কৃতি-স্তরের অর্ন্তগত হয়ে আছেন। বজ্রধাতেশ্বরী বা মঞ্জুশ্রীর মতো মহাযানী বৌদ্ধদের দেবীরা; অথবা, কোকামুখা, বাঘেশ্বরী, বাঘভৈরব-প্রমুখ উত্তরাপথের বিভিন্ন রাজ্যের উপাসিত লৌকিক ব্যাঘ্রবাহন-বাহনা দেব-দেবীরা সর্বত্রই ক্ল্যাসিক্যাল হিন্দুসংস্কৃতির সীমানাবহির্ভূত সমাজে গন্ডিবদ্ধ হয়ে আছেন-যদিও, ওপরতলায় প্রভাবিত আংশিক ‘অ্যাকালচারেশনের’ পরিণামে দেবীরা মোটামুটি দুর্গা-চন্ডীরই লৌকিক সংস্করণ বলে প্রচারিত হয়ে থাকেন! অর্থাৎ, সিংহ এসে কীভাবে বাঘকে দেবীর পদতল থেকে সরিয়ে দিয়েছে সেটা বুঝতে হলে এই সামাজিক স্তর-বিভাজনের পরিপ্রেক্ষিতটাকে স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে হবে। কিন্তু তারপরেও দুটি প্রশ্ন থেকে যায় : দুর্গা এবং চন্ডী কেমন করে একীভূতা হয়ে গেলেন? এবং, মহিষাসুরমর্দিনীর সঙ্গে তাঁর পুত্রকন্যারা এবং পিতা-মাতা-স্বামী কী করে এলেন? মার্কেন্ডেয় পুরাণে তো তিনি অযোনিসম্ভবা এবং কুমারী বলেই কথিত! (প্রসঙ্গত উল্লেখনীয়, বহুক্ষেত্রেই এখনো দুর্গাপূজার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিশেবে ‘কুমারী’ পূজার রেওয়াজ রয়ে গেছে- যা, এই ধর্মাচরণের অন্তর্বিলীন আদিম উর্বরতাতান্ত্রিক ধ্যানধারণাকেই আভাসিত করে।) রাজা নরনারায়ণের স্বপ্নে পাওয়া দেবীর রূপে অযোনিসম্ভবা এবং কুমারী রূপের ছায়া পড়েছে বলেই হয়ত বড়দেবীর পাশে পুত্রকন্যারা অনুপস্থিত বরং মদনমোহন কুলদেবতা যে রাজপরিবারের সেই রাজার স্বপ্নে দুর্গার পাশে সখী ভাবনা অনেক সহজ ও সমাজবান্ধব।

তথ্যসূত্র :

শ্রীশ্রীচন্ডী — সম্পাদনা, স্বামী বেদানন্দ

লোকায়ত দর্শন (দ্বিতীয় খন্ড) — দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম — রমাকান্ত চক্রবর্তী

পূজা পার্বণের উৎসকথা — পল্লব সেনগুপ্ত

শ্রীরাধার ক্রমবিকাশ (দর্শনে ও সাহিত্যে) — শশিভূষণ দাশগুপ্ত

চৈতন্যোত্তর যুগে গৌড়ীয় বৈষ্ণব — ননীগোপাল গোস্বামী

বেদের পরিচয় — ডঃ যোগীরাজ বসু

বাংলা গানের বিবর্তন — ড. করুণাময় গোস্বামী

দুর্গাপূজা ও কালীপূজা ইতিহাসের দর্পণে — কল্যাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

কিশোর পুরাণ সমগ্র উপদেশনা — ড. রমারঞ্জন মুখোপাধ্যায়

বাংলার লোক সাহিত্যে রাধাকৃষ্ণ প্রসঙ্গ ডঃ গৌরী ভট্টাচার্য

ঋগ্বেদ – সংহিতা (দ্বিতীয় খন্ড) ভূমিকা — শ্রী হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত — ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়র

কোচবিহারের ইতিহাস — ভগবতীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিষয় : কোচবিহার — নৃপেন্দ্রনাথ পাল

কোচ রাজবংশের ইতিহাস — রমনী মোহন বর্মা

কুচবিহারের ঐতিহ্যময় — রাজপ্রসাদ রঞ্জিত দেব

কোচবিহারের ইতিহাস — খাঁ চৌধুরী আমানত উল্লাহ খান

ইতিকথায় কোচবিহার — ড: নৃপেন্দ্রনাথ পাল

কুচবিহারের রাজবংশীবলী ও বর্তমান রাজপ্রাসাদ — হিমাদ্রি শংকর ভট্টাচার্য্য

পেজফোরনিউজ ২০২৪ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev