| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পল্লী গীতিকায় কুলত্যাগিনী : আশুতোষ চৌধুরী

Reporter
আশুতোষ চৌধুরী / ৩৫৯ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

বাংলার পল্লি গায়কদের মুখ হইতে আমরা কতিপয় কুলত্যাগিনী রমণীর রচিত কথা সংগ্রহ করিয়াছি। আধুনিক সমাজের পক্ষে ইহাদের প্রেম নিতান্তই কলঙ্কের ব্যাপার। কিন্তু প্রাচীন কাব্যসাহিত্যে সহজিয়াদের দুর্জয় প্রেম সাধনা অধ্যাত্মরাজ্যের জিনিষ বলিয়া অভিহিত হইয়াছে। এক সময়ে ঐ সহজিয়ারাই সমাজে জাতিগত বৈষম্য এবং শাস্ত্রোক্ত গন্ডীগুলি ভাঙ্গিয়া চূরিয়া একাকার করিয়া দিয়াছিল। তাহাদের মতে প্রেমই মানব ধর্ম। নরনারীর অবাধ মিলনের পথে তাঁহারা জাতি বর্ণ এমন কি দূর্মীতির বিচার করিবারও অবকাশ পান নাই। পরবর্তী যুগে চন্ডিদাসকে দেখিয়াছি। তখন যৌন সম্বন্ধ ধর্মের ভিত্তির উপর অনেকটা সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। কবি আপন দেহটিকে ইন্দ্রিয় প্রভাব বিরহিত শুষ্ক কাঠের মত করিয়াই রামীর সমন্ধে বলিয়াছেন – ‘কামগন্ধ নাই তায়’ ; কিন্তু এই সাফাই দেওয়া সত্ত্বেও তদানীন্তন কঠোর ব্রাহ্মণ্য শাসনের অভিযোগ তিনি এড়াইতে পারেন নাই। আমাদের শাস্ত্রকারগণ যৌন উপভোগের সহিত আধ্যাত্মিক ভাববাদের উপমা দিয়াছেন এবং বিবাহের দ্বারা মন্ত্রপূতঃ হইয়াই যৌন সম্বন্ধ সামাজিক মর্যাদা লাভের অধিকারী হইয়া আসিয়াছেন। শাস্ত্র গ্রন্থে তরুণ তরুণীর উদ্দাম বাসনা নিয়ন্ত্রত করিবার জন্য বিধি ব্যবস্থারও অভাব নাই। ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’ – এই অনুশাসন বাক্য রক্ত মাংসের মানুষ কি ভাবে প্রতিপালন করিয়াছিল জানিনা, কিন্তু ইহা আমরা বলিতে পারি যে – সমাজের অন্ত:স্থল হইতে সহজিয়ার দুর্জয় প্রেম সাধনা কোনদিন অন্তর্হিত হয় নাই। ঐ প্রেম গুপ্ত হইলেও আত্মতৃপ্তির দ্বারা পরিপুষ্ট এবং উহা নীতির দরবারে বিসদৃশ হইলেও একেবারে অঘটনীয় নহে। আবার কখনো কখনো ঐরূপ বিগর্হিত প্রেমের সহজ সাধনা সামাজিক ভন্ডামীর দ্বারা রূপান্তরিত অবস্থার গ্রহণযোগ্য হইয়াছে। প্রকাশ্য সহানুভূতির অভাব থাকিলেও বঙ্গদেশ হইতে সহজিয়াতত্ব বিতাড়িত হইতে পারে নাই। নানাদিক দিয়া ইহার শিকড় গজাইয়া উঠিয়াছে। চাষী কবির একটি পালাগানে আমরা এই সহজিয়া প্রেমতত্বের যে আভাস পাইয়াছি আজ তাহার কিছু কিছু আলোচনা করিব। পালাগানটি এই —

শ্যামরায় একজন জমিদার পুত্র। সে প্রতিবেশিনী নীচ জাতীয় ডোম রমনীর প্রেমে পড়িয়াছে। পালাগায়কের প্রাথমিক বর্ণনা এইরূপ —

কাঁখে কলসী ডুমের নারী জলের ঘাটে যায়

রংমহালে থাইক্যা তারে দেখে শ্যামরায়।

বাডি গুডি ডুমের নারী দীগল আগল কেশ

এহার যৈবন দেইখ্যা যতো পাগল হৈল দেশ।

পিন্ধনে পাটের খুয়া বাঁয়েতে উড়ায়

এরে দেইখ্যা পাগল হৈল মায়ের শ্যামরায়।।

এই সৌন্দর্যের প্রলোভন শ্যামরায়ের চিত্তে গভীর রেখাপাত করিল। সে মনে মনে ভাবিতে লাগিল

আমার যদি হতি লো কইন্যা, করতাম তোরে বিয়া

বাইনদা দিতাম চিরল কেশ সোনা ঝুরি দিয়া।

পিন্ধনে পাটের খুয়া তারে খুসাইয়া

যৈবন ঢাকিয়া দিতাম নীলাম্বরী দিয়া।

আমার যদি হতি লো কইন্যা, পাইতাম মনে সুখ

জ্বালিয়া ঘৃতের বাতি দেখতাম চান্দ মুখ।।

ভোগ বিলাস পুষ্ট এই জমিদার তনয় নিজের উদ্দাম বাসনাকে আর কিছুতেই সংযত রাখিতে পারিলেন না। যথাসময়ে তাহার দূতী কন্যার নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল —

গিরছ কর্ম করলো কন্যা কামে দিছ মন

আমারে পাঠাইলা রায় তোমার কারণ।

আমারে কথা শুনলো কইন্যা একটুখানি রইয়া

তোমার বন্ধু গাঙের পারে আছে দাঁড়াইয়া।

আমি যে আইসাছি কইন্যা ঠেকা বিষম দায়

তোমারি যৈবন দান মাগে শ্যামরায়।।

কন্যার উক্তি…. (আমি নারী পরের অধীন রে)

সন্ধ্যাবেলা আইলে দূতী লো পাছ দুয়ারে খাড়া

এতক অবুলা নারী শ্বাশুড়ী পাহাড়ারে।।

আমি নারী পরের অধীন রে….

সন্ধ্যা বেলা আইলে দূতী লো ঘরে নাই মোর বাতি

বেসাতৃ লৈয়া আইবু এহন পরাণ পতিরে।।

আমি নারী পরের অধীনরে….

ভরা ভাদরে দূতী লো দূতী আমার মাইঝ্ গাঙ্গেতে চড়া

কোন্ ছলে যাইবাম ঘাটে কলসী আমার ভরা রে।।

আমি নারী পরের অধীন রে….

ছানের সময় নয়লো দূতী ছিনানের ছলে

ভরা কলসী ঢাইল্যা রাইখ্যা কেন্নে যাইবাম জলেরে।।

আমি নারী পরের অধীন রে….

নয়া তো গাঙের পানি নয় লো দূতী এ মোর যৌবন

লোট্টায় ভইরা দিতাম বন্ধুর ধুয়াইতে চরণরে।।

আমি নারী পরের অধীন রে….

বনের কুইলা হৈতাম দূতী লো পুষ্পের ভমরী

মধু না আনিবার ছলে যাইতাম উড়ি রে।।

আমি নারী পরের অধীন রে….

ঘরের বাতি নিমি ঝিমি দূতী লো গিহে চইল্যা যাও

আজ না হইবু দেখা বন্ধেরে বুঝাও রে।।

আমি নারী পরের অধীনরে….

আমি নারী পরের অধীন রে….

নয়া তো গাঙের পানি নয় লো দূতী এ মোর যৌবন

লোট্টায় ভইরা দিতাম বন্ধুর ধুয়াইতে চরণরে।।

আমি নারী পরের অধীন রে….

বনের কুইলা হৈতাম দূতী লো পুষ্পের ভমরী

মধু না আনিবার ছলে যাইতাম উড়ি রে।।

আমি নারী পরের অধীন রে….

ঘরের বাতি নিমি ঝিমি দূতী লো গিহে চইল্যা যাও

আজ না হইবু দেখা বন্ধেরে বুঝাও রে।।

আমি নারী পরের অধীনরে….

এইরূপ ক্রমশ দূতীর আনাগোনা বাড়িতে লাগিল। ভিতরে ভিতরে কন্যাও শ্যামরায়কে হৃদয় অর্পণ করিয়া বসিয়াছে এবং বিবাহিতা নারী সমাজ ধর্মের মর্যাদা ভুলিয়া আত্মবলিদানে অগ্রসর হইয়াছে। শেষের দুইটি ছত্রে সে দূতীকে যাহা শুনাইয়াছিল, তাহাতে আমাদের কর্ণে বিষম তাক্ লাগিয়া গেল —

পরের অধীন নারী লো এই সে হৈল দায়

মনে লয় পতিরে কাইট্যা দিতাম বন্ধের পায়।।

দুইটি হৃদয়ের মধ্যেই মিলনাকাঙ্খার উন্মাদনা জাগিয়েছে। নিরালাঘাটে যেদিন প্রথম চারিচোক্ষের মিলন হইল তখন শ্যামরায় একবারেই অধীর কন্যা আত্মসংবরণ করিয়া তাঁহার প্রেমের গভীরতা পরীক্ষা করিতে লাগিল এবং বলিল —

আমি তো ডুমের নারী হাত দিয়োনা গায়

ছোটর সঙ্গে বড়র পীরিত বড়র পীরিত যায়।

বন্ধু বড়র পিরীত যায়রে….

তুমি তো বাগের পুষ্প আমি হৈলাম কাঁটা

জিয়নে মরণে বন্ধুরে দেশে থাকবো খোটা রে

বন্ধু দেশে থাকবো খোটা।।

রাজার ছাওয়াল তুমি রে বন্ধু আমি ডুমের নারী

সমুদ্র সায়র থুইয়া কেন শুক্নায় বাইছো তরীরে

বন্ধু শুক্নায় বাইছো তরী।।

চাঁন্দের সঙ্গে সাফ্লার পীরিত রে বন্ধু

উজান সুতে ভাসা

ছোটর সঙ্গে করলে পীরিত জাতিকুল নাশারে

বন্ধু জাতি কুল নাশা।।

আমড়া খাইলে বুঝিবে কি বন্ধু আমের সুয়াদ

ঘোলে কি পাইবা বন্ধু দধির আস্বাদ।।

রাজার ছাওয়াল বন্ধুরে পুন্নমাসীর চাঁন্

অচ্মান ছাইড়া কেন বন্ধু জমিনে বিছান্ রে

বন্ধু জমিনে বিছান্।।

শ্যামরায় বলিল –

সুন্দর ডুমের নারী লো অল্পে না ছাড়িবু

কলঙ্ক কাজল কইরা দুইনয়ানে দিবু।

দধি দুগ্ধ থুইয়া লো কইন্যা খাইবু বনের ফল

উত্তম বসন থুইয়া পরিব বাকল।।

থাকুক কলঙ্ক লো কইন্যা লোক অপযশ

পাথর নিংড়াইয়া দেখি পাই কিনা রস।।

কন্যা বলিল —

দারুণা শ্বাশুড়ী ঘরে বন্ধু মোরে দিব গালি

না ভরিলাম জলের কলসী কাঁখে রইল খালি।।

সন্ধ্যা তো মিলাইয়া যায় ফিরে যাও ঘরে

কাইল যাইব আমার ডুম বাঁশ কাটিবারে।।

আজিকার রাত্রিরে বন্ধু চিত্তে ক্ষমা দাও

কালুকা নিশিথে বন্ধু আমার বাড়ী যাইও।।

ভাঙ্গা ঘরে যৈবন লৈয়া থাকিমু একেলা

তোমার লাগিয়া রাখ্মু পাছের দুয়ার খোলা।।

সুখেরে কইরাছি বৈরী রে বন্ধু দুঃখের দোসর

তুই বন্ধের পীড়িতে মইজ্যা আপন কইরলাম পর।।

পরদিন রাত্রিতে গোপন অভিসার। শ্যামরায় যথাসময় নির্দেশিত পেছনের দরজায় উপস্থিত হইলেন। কন্যা তখন ভাদ্রের ভরা নদীর মতন বেগবতী। সে কুলত্যাগ করিতেছে কি সতীধর্ম ত্যাগ করিতেছে এই প্রশ্ন মনে উদিত হইবার পর মুহুর্তেই আমরা এই পরানুগামিনী রমনীর অবিচলিত প্রেমসাধনা দেখিয়া খানিকটা সত্মম্ভিত হইয়াছি। সে শ্যমরায়কে বলিল —

পাছ্ দুয়ারে আনাগুনারে বন্ধু খেজালেতে মরি

রাজার ছাওয়াল হৈয়া পরের ঘরে চুরি।।

অভাগ্যা ডুমের নারীরে আমি খাট পালং নাই

তোমারে শুইতে বন্ধু কি দিব বিছাই।।

ঘরে আছে চাটি মাটিরে বন্ধু তাই দিব পাতিয়া

এইখানে ঘুমাত্তরে বন্ধু খাট পালং ছাড়িয়া।।

এই না ভাবে শুইয়া শুইয়ারে বন্ধু যদি পাও ক্লেশ

মেজেতে বিছাইয়া দিমু চাচর চিকন কেশ।।

ফুলের বিছানা বন্ধুরে তোমার কঠিন ঠেকে গায়

কেশের বিছান্ যদি বন্ধু সুখ নাই সে পাও

অবালার বুকে শুইয়া নিরলে ঘুমাও।।

এই কুলত্যাগিনীর আবেগজনিত গীতিকথা স্থানে স্থানে বড়ই মর্মস্পর্শী হইয়াছে। হয়ত ইহার উপর সহানুভূতি জ্ঞাপন করা নীতি বিগর্হিত কার্য, কিন্তু ঐ পূতিগন্ধময় পরিবেশে যে স্বর্ণরেণুর আভা দেখা যাইতেছে তাহা প্রেমেরই সৃষ্টি বৈকি ! গোপন বাসরে কন্যা বলিতেছে –

চক্ষের জলে ধুইয়া পাও বন্ধু কেশেতে মুছাব

সিঁথার সিন্দুর দিয়া চরণ রাঙাইব।

না জ্বালিলাম ঘরের বাতি অন্ধ আমার আঁখি

হাত বুলাইয়া বন্ধু তোমার মুখখান্ দেখি।।

একটু খানি রওরে বন্ধু একটুখানি রও

মুখেতে রাখিয়া মুখ মনের কথা কও।।

আমি যে অবলা নারী বন্ধুরে আর কারে দোষি

বুকেতে আঁকিয়া রাখি বন্ধু তোমার মুখের হাসি।।

এই বিসদৃশ প্রণয় সংবাদ যথাক্রমে শ্যামরায়ের পিতার কর্ণগোচর হইল। তিনি জ্বলিয়া উঠিলেন, পাড়া পড়শীরা কুমন্ত্রণা লাগাইল —

চান্দরায় চান্দরায় কি কর বসিয়া

তোমার পুত্র পাগল হৈয়া ডুম্নি করে বিয়া।।

কানাকানি জানাজানি লোকমুখে শুনি

গোস্যায় জ্বলিল রায় জ্বলন্ত আগুনি।।

লোক লাঠ্যাল ডাইক্যা রায় কি কাম করিল

বাড়ী ঘর ভাইঙ্গা ডুমের সায়রে ভাসাইল।।

তারপর সকলেই শ্যামরায়কে বুঝাইতে লাগিল –

মায়ে বুঝায় ভৈনে বুঝায় বুঝান হৈল দায়

সাচ্চা সাপে খাইবে যারে কি করে ওঝায়।।

সস্থান অস্থান নাই সুজন কুজন

ধুলামাটি বাইছা লও পীরিত বড় ধন।।

আসল পীরিত নাই জানে জরা মরা

দুষমনে কাটিলে অঙ্গ পীরিত লাগায় জোড়া।।

শ্যামরায় এই ডোম রমণীর জন্য পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজন ছাড়িয়া গৃহত্যাগ করিলেন, অতুল ঐশ্বর্য ছাড়িয়া পথের ভিখারী হইলেন। নায়িকাও প্রেমাস্পদের এইরূপ ত্যাগস্বীকারের জন্য একান্ত ম্রিয়মানা ; সে ভাবী দুঃখের কল্পনা করিয়া শেষ মহুর্তেও শ্যামরায়কে সাবধান করিতেছে —

বৈদেশী না হইওরে বন্ধু বৈরাগী না হইও

রাজপাট জমিদারী ছাইড়া নাই সে যাইও।।

আমি ছাইড়া যাইরে বন্ধু তুমি দেশে থাকো

আপনা মায়েরে বন্ধু মা বলিয়া ডাকো।।

আমি যাইরে ভিন্ন দেশে এ দেশ ছাড়িয়া

বাঁচি বা না বাঁচি তোমার পায়ের নিচন লৈয়া।।

ঝাইড়া ফেলাওরে বন্ধু ঐ না পায়ের ধুলা

গজমতি ছাইড়া কেন পর হাড়ের মালা।।

চিত্তে ক্ষমা দাওরে বন্ধু যাও পলাইয়া

শতেক রাজার কন্যা মায় করাইব বিয়া।।

বড়ই আশ্চর্যের বিষয়, এই কুলত্যাগিনী নিজের কথা একটুও ভাবে নাই। তাহার অনুরাগ একনিষ্ঠ এবং করুণাত্বক। জমিদারপুত্র শ্যামরায় উদরান্ন নির্বাহের জন্য যখন মজুরের কাজ আরম্ভ করিয়া দিলেন, তখন কন্যার হৃদয় অভুতপূর্ব বেদনায় ভাঙ্গিয়া পড়িতে লাগিল।

ডুমের বেশেতে নর কাইট্যা আনে রায়

খাড়ি বিউনি বানাইয়া বাজারে বিকায়।।

ফাল্গুনে চৈতের রৈদে রায়ের অঙ্গ জ্বলি যায়

কান্দেরে ডুমের নারী করে হায় হায়।।

অঙ্গ বাইয়া পড়ে ঘাম কেশ দিয়া মুছে

বন্ধুর কপালে মোর এতো দুঃখ আছে।।

এই পালাগানের শেষ দৃশ্য বিয়োগান্তক। পালাইতে পালাইতে নায়ক নায়িকা এক গাবুরের দেশে উপস্থিত হইল।

কদাকার গাবুরিয়া মুখে বড়া দাড়ি

এক এক পুরুষের দশ বিশ নারী ।

আচার বিচার তার রাক্ষসের মত

দৈবযোগে সেই দেশে হইল উপনীত।

গাবুরিয়ার সর্দার এই রূপ লাবণ্যময়ী ডোম রমণীকে দেখিয়া আত্মহারা হইল এবং —

এরে দেইখ্যা গাবুরিয়া কি কাম করিল

ডুমুনীরে ধইরা তবে গৃহেতে আনিল।

হুকুম করিয়া দিল, ‘ডুমেরে দাও শূলে’

রায়েরে বাঁধিয়া তারা নিল হাতে গলে।।

শ্যামরায় অনেক কৌশলে বন্ধনমুক্ত হইয়া পিতার নিকট উপস্থিত হইলেন। পুত্রের দুঃখে পিতার হৃদয় বিগলিত হইল। তিনি সঙ্গে দুইশত লাঠিয়াল দিলেন, উভয় পক্ষ ঘোরতর দাঙ্গা হইল। গাবুরিয়ারা অসভ্য বর্বর, শ্যামরায়ের লাঠিয়ালদেরও অসীম ক্ষমতা।

গাবুরের বাড়ীঘর ভাঙ্গিয়া ফেলায়

বাড়ীঘর ভাইঙ্গা তবে সায়রে ভাসায়।।

দাড়িতে বাঁধিয়া দাড়ি কুবে মুন্ডু কাটে

পালাইতে পথ না পায় গাবুরেরা কান্দে।।

সর্দারেরে ধইরা তারা শূলেতে চড়ায়

গাবুরের লৌয়ে নদী রাঙা হৈয়া যায়া।।

এই দাঙ্গায় গাবুররা সম্পূর্ণরূপে পরাজিত এবং ছত্রভঙ্গ হইল বটে, কিন্তু তাহারা শ্যামরায়ের অঙ্গে যে বিষাক্ত তীর নিক্ষেপ করিয়াছিল তাহাতেই সব শেষ হইয়া গেল। এই সময় আমরা নায়ককে হারাইয়াছি। মৃত্যুর পূর্বক্ষনে শ্যামরায় যে অভীষ্ট মন্ত্র উচ্চারণ করিয়াছিলেন, প্রেমিকের জন্য যদি কোন স্বর্গরাজ্য থাকে তবে সেই মন্ত্রই তাহাকে অক্লেশে বৈতরণী পার করাইয়া দিবে। তাহার শেষ মন্ত্র এই —

আর না দেখিব কইন্যা তোমার মুখের হাসি

জিয়ন্তে না পুরাইলাম মনের অভিলাসী।।

বিরখ্ যুদি হই লো কইন্যা তুমি হইও লতা

বন বিরলে বইস্যা বইস্যা কইবু মনের কথা।।

পক্ষি যুদি হই লো কইন্যা তুমি হইও পক্ষিনী

নদি যুদি হই লো কইন্যা তুমি হইও পানি।।

শুয়া যুদি হই লো কইন্যা তুমি হইও সারি

ভমর যুদি হই লো কইন্যা তুমি হইও ভমরী।।

দুষমণ মানুষ জন্ম কইন্যা আর সে নাই চাই

জিয়নে মরণে কন্যা তোরে যেন পাই।।

এই পালাগানের শেষ দৃশ্য প্রেমাশ্রুর বেদনায় ভরপুর। ডোম রমণী শ্যামরায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনিয়াই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইল। এবং মৃত শ্যামরায়ের মাথাটি ক্রোড়ে তুলিয়া ধরিয়া কাঁদিতে লাগিল।

গলায় ফুলের মালারে বন্ধু না হইল বাসি

আর কি দেখিব আমি তোমর মুখের হাসি।।

মাও বাপ রাজপাটের বন্ধু পায়ে না ঠেলিয়া

বনবাসী হৈলা বন্ধু আমার লাগিয়া।।

সংসার সায়রে বন্ধু আমার কেহ নাই

হাসি মুখে কও কথা পরাণ জুড়াই।।

একদিন না করিলাম রে বন্ধু ভালামতে ঘর

আপনা হৈয়া বন্ধুরে আইজ যে হৈলা পর।।

দেহের মধ্যে পরাণরে বন্ধু পরাণের মধ্যে হিয়া

আগে যদি জানতাম তোরে রাখতাম লুকাইয়া।।

বুকের কলিজারে বন্ধু তুমি হৃদয়ের শাল

কার ঘরে করলাম চুরি কেন খাইলাম গাল।।

দারুণ গাবুরিয়া বন্ধুরে বধিল পরাণ

এ জহর খাইয়া আমি রাখিবু যে মান।।

নায়িকা তাহার এই শেষবাক্য সত্য সত্যই পালন করিল। এই পালা গানটি একটি স্বাধীন প্রেম কাহিনী। আমরা ইহকে স্বেচ্ছাচারিতা বলিব না। এই প্রেম কাহিনীতে নির্ভীকতা এবং সমাজ শাসনের প্রতি বিরাগ কঠোর ঔদাসীন্য দৃষ্ট হয়। ইহার নাটক প্রেমমন্ত্রে দীক্ষিত এবং ত্যাগের কঠোরতায় যোগীর মতন অভ্যস্ত। এই পালার কোনস্থানেই আমরা ইহাকে মেরুদন্ডহীন দেখি নাই। মোটের ওপর এই বিয়োগান্ত কাহিনীর শেষভাগে নায়ক নায়িকার স্বর্গীয় প্রেমধারার সঙ্গে আমদেরও দুই ফোঁটা অশ্রু বৃষ্টিধারার ন্যায় মিশিয়া গিয়াছে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev