সব উপাসনার মূলে রয়েছে ভালোবাসা। সংসারে মাতা, পিতা, পুত্র, সখা, প্রণয়ী ইত্যাদি সম্বন্ধ বা ভাব নিয়ে আমরা পরস্পরকে ভালোবেসে থাকি। আমাদের সনাতন শাস্ত্র বলছে- ‘কেউই নিজ সন্তানকে অথবা আর কাউকে তাদের জন্য ভালোবাসে না, আত্মা বা সত্তার জন্যই ভালোবেসে থাকে।’ ‘জগতে যা কিছু রয়েছে, তা সব প্রেমস্বরূপ ভগবানের সত্তায় সত্তাবান; তারই বিভিন্ন রূপ প্রকাশ’, ‘তিনি জগৎ রূপে প্রকাশিত আবার তিনিই জগতের অতীত।’
ধর্মের আচার্যগণ বলে থাকেন— ‘ভগবান যেন এক বৃহৎ চুম্বক-প্রস্তর, আমরা যেন লৌহচূর্ণের ন্যায়। আমরা সবাই সদাসর্বদা তার দ্বারা আকৃষ্ট হচ্ছি। তিনিই আমাদের ভালোবাসার আদর্শ। তিনি বাক্য ও মনের অগোচর হলেও শুদ্ধ মন ও শুদ্ধ বুদ্ধির গোচর।’
উপাসনার সুবিধার্থে এবং রুচি ও প্রকৃতির বৈচিত্র্যবশত ভক্ত উল্লিখিত বিভিন্ন ভালোবাসার সম্বন্ধ (মাতা, পিতা ইত্যাদি) ভগবানের প্রতি আরোপ করে থাকেন। ‘মা’ নাম অত্যন্ত মধুর ও পবিত্র। সন্তান মাকে সর্বশক্তিময়ী মনে করে, ভাবে- মা সব করতে পারে। মায়ের কাছে থাকলেই তার নির্ভয়তা ও আনন্দ। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন- মাতৃভাব শুদ্ধভাব। দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মানুষ্ঠান; মাতৃভাবে ঈশ্বরের উপাসনা ও তাকে ভালোবাসার প্রয়াস। কুমারী পূজা এর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গানুষ্ঠান।
সাধারণত দুর্গাপূজার অষ্টমীতে কুমারী পূজা করা হয়। তবে শাস্ত্রমতে সপ্তমী, নবমীতেও করা যেতে পারে। এক থেকে ষোলো বছরের অজাতপুষ্প বালিকাদের কুমারী পূজার জন্য নির্বাচন করা হয়। বয়সভেদে কুমারীর বিভিন্ন নাম যেমন- সন্ধ্যা (১ বছর), সরস্বতী (২ বছর)… সুভগা (৫ বছর)… অম্বা (১৬ বছর)। কুমারীকে বস্ত্রালংকারে সুসজ্জিত করে বিধিমতো নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে পাদ্য, অর্ঘ্য, ধূপ, দীপ, গন্ধ, পুষ্প, নৈবেদ্য ইত্যাদি ষোড়শোপচারে বাহ্যপূজা করা হয়।
আবার হৃদয়ে ধ্যানের মাধ্যমে মানসপূজাও করা হয়। কুমারীর একটি ধ্যান মন্ত্রে আছে : যিনি ত্রিনয়নী, চন্দ্রশোভিত যার মস্তক এবং দেহকান্তি তপ্তকাঞ্চনতুল্য, যিনি নানাবিধ অলঙ্কার বিভূষিতা, রক্তবস্ত্র ও রক্তমাল্য পরিহিতা এবং রক্তচন্দনাদি দ্বারা চর্চিত যার দেহ, যার বাম ও দক্ষিণ হস্তদ্বয় যথাক্রমে বর ও অভয় প্রদানের জন্য প্রসারিত- সেই পদ্মাসীনা কুমারীকে ধ্যান করি।
পুরাণে ঋষিগণ ধর্মের সূক্ষ্ম দার্শনিক বিষয়গুলো আখ্যানের মধ্য দিয়ে অপেক্ষাকৃত সহজ করে উপস্থাপন করেছেন। এতে ধর্মের আনুষ্ঠানিক ব্যাপারগুলো আমাদের কাছে অধিকতর মননযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হয়। বৃহদ্ধর্মপুরাণ বলেছে, রাবণবধের জন্য জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে দেবগণসহ ব্রহ্মা দেবীর স্তব করেন। স্তবে তুষ্টা দেবী কুমারী রূপে দেবতাদের সম্মুখে আবির্ভূত হলেন। কন্যারূপী দেবীই বিল্ববৃক্ষমূলে দেবীর বোধন করার জন্য দেবতাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন। দেবীর অনুগ্রহে রামচন্দ্র সবংশে রাবণ নিধন করে সীতাদেবীকে উদ্ধার করেছিলেন।
আমাদের যুক্তিবাদী ও অনুসন্ধিৎসু মন পৌরাণিক আখ্যানে অনেক সময় সন্তুষ্ট নয়, অনুষ্ঠানের তাৎপর্য ও দর্শন সম্পর্কে অবগত হতে চায়। ভক্তও মনে করেন আধ্যাত্মিক দর্শন ঠিকভাবে জানতে পারলে আমাদের ভালোবাসার আদর্শকে যথার্থভাবে ভালোবাসা যায়। জগজ্জননীকে কুমারীরূপে পূজা করতে হবে কেন? কুমারী ও কুমারী পূজা সম্পর্কে শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন ভক্তের সংশয় দূর করে।

শ্রীরামকৃষ্ণ বলেন, ‘সব স্ত্রীলোক ভগবতীর এক-একটি বিশেষ রূপ। শুদ্ধসত্ত্ব কুমারীতে ভগবতীর প্রকাশ বেশি।’ প্রেমাস্পদ জননীর যেখানে বেশি প্রকাশ, সেটিই ভক্তের পূজা ও উপাসনার শ্রেষ্ঠ প্রতিমা- এটা বলাই বাহুল্য। কুমারী পূজার বিশেষত্ব হল- কাঠ, মাটি বা পাথরের প্রতিমা, অথবা কোনো প্রতীকের সাহায্যে উপাসনা নয়। চেতন কুমারীতে চৈতন্যময় ঈশ্বরের উপাসনা।
এত ঘটা করে পূজা, এত আয়োজন, কোনো ফল লাভই যদি না হয়, তাহলে এর সার্থকতা কোথায়? তন্ত্র আমাদের আশ্বস্ত করছে। তন্ত্র বলছে, কুমারী পূজার দ্বারা হোমাদি কর্মের কোটিগুণ ফল লাভ হয়। কুমারীকে একটি পুষ্পদানে সুমেরু পরিমাণ ফল লাভ হয়। কুমারীকে ভোজন করালে ত্রিলোকবাসী সবাইকে ভোজন করানো হয়, ইত্যাদি।
শ্রীশ্রীচন্ডীতে আছে, ‘সৈষা প্রসন্না বরদা নৃণাম ভবতি মুক্তয়ে’- মহামায়া সন্তানের প্রার্থনায় প্রসন্ন হয়ে সন্তানকে জাগতিক ঐশ্বর্য কিংবা মুক্তি প্রদান করে থাকেন। আখ্যানে আছে, রাজা সুরথ মহামায়ার পূজা করে হৃতরাজ্য ফিরে পেয়েছিলেন এবং সমাধি বৈশ্য জগৎ সংসার থেকে মুক্ত হয়েছিলেন।
যথার্থ ভক্ত মায়ের কাছে কিছু চান না। কারণ তিনি মনে করেন, ধর্ম কোনো দোকানদারি নয়, কেনাবেচা নয়। দেনা-পাওনার ব্যাপার ভালোবাসা নয়, স্বার্থপরতা। ভয়ে বা কিছু পাওয়ার জন্য নয়, তার জন্যই তাকে ভালোবাসা- এটিই ভালোবাসার আদর্শ। ভক্ত তাকে ভালোবাসে কেন? কারণ তিনি তার সন্তান। মাকে কেন্দ্র করে শিশুর সব ব্যবহার ও কর্ম হয়ে থাকে, মায়ের ওপর সব ভার দিয়ে শিশু নিশ্চিন্ত থাকে। ভক্তও তেমনি সর্বদা ময়ের শরণাগত থাকেন। ভক্ত দেখেন, ভালো-মন্দ তিনিই সব হয়েছেন।
ধর্মাচার্যগণ বলেন, ‘মায়ের কাছে প্রতিনিয়ত অকুণ্ঠ শরণাগতিই আমাদের শান্তি দিতে পারে। ‘ভালোয়-মন্দে- সর্বত্রই তাকে সমভাবে দেখা’- এরূপে যখন আমরা তাকে অনুভব করি, তখনই আসে সমত্ব ও চিরশান্তি। এটিই মায়ের স্বরূপ। যতদিন এই অনুভূতি না হয়, ততদিন দুঃখ আমাদের অনুসরণ করবে। মায়ের কোলে বিশ্রাম করতে পারলেই আমরা নিরাপদে থাকি।’’ দুর্গাপূজা ও এর অঙ্গানুষ্ঠান কুমারী পূজার মাধ্যমে আমরা জগজ্জননীকে আপন করে নেয়ার ও তার শরণাগত হওয়ারই প্রয়াস পাই।
কিন্তু সমষ্টি জীবনে এর সার্থকতা কোথায়? আমাদের শাস্ত্র ও আচার্যগণ বলেন, পূজা ও উপাসনার ফলে আমাদের চিত্ত শুদ্ধ হয়, আমরা অধিকতর স্পষ্টভাবে ভগবানের মহিমা এবং আমাদের যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারি। শুদ্ধচিত্ত ভক্ত উপলব্ধি করেন, তার উপাস্য ভালোবাসার আদর্শ তার অন্তরে ও সবার মাঝে বিরাজ করছেন। তার ভালোবাসা নিজ ক্ষুদ্র ব্যক্তি সত্তা ও পারিবারিক সম্বন্ধের গণ্ডি অতিক্রম করে বিশ্বজনীন প্রেমে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমরা সবাই জগজ্জননীর সন্তান- এ ভাব অনুভব করে জগতের সবাইকে তিনি আত্মার আত্মীয় বোধ করেন, তার কর্ম ও ব্যবহারে সেই বোধেরই প্রতিফলন ঘটে। সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এরূপ ব্যক্তি অন্যের জন্য আদর্শ ও অনুপ্রেরণার উৎস বলে বিবেচিত হন।
আমরা অন্তরের ইচ্ছা ও আদর্শকে বাইরে স্থুলরূপে পূজা করি। কুমারী সরলতার, ভালোবাসার, নিরহঙ্কারের ও মানবতার প্রতীক। শিশুর ভালোবাসার ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, ছোট-বড় কোনো বৈষম্য নেই। পরিবারের ছোট শিশুটি ছোট-বড় সবার কাছে যেতে পারে, সবার মাঝে প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। মাতৃভাবের চর্চা মানে শুধু মাতৃরূপের উপাসনা নয়, হৃদয়ে সহনশীলতা, ভালোবাসা, নিরভিমানতা ইত্যাদি মূল্যবোধেরও চর্চা ও বিকাশ।
এ পূজাকে কেন্দ্র করে সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে যে মিলনমেলা তৈরি হয় তা সমাজে সম্প্রীতি ও সংহতির ভাবকে দৃঢ় করে। দুর্গাপূজা তথা কুমারী পূজার মাধ্যমে সব নারীর প্রতি মাতৃভাব হৃদয়ে ধারণ এবং জীবনে এর চর্চা আমাদের ব্যষ্টি ও সমষ্টি জীবনে শান্তি ও সম্প্রীতি বয়ে আনতে পারে। মাতৃরূপে ভালোবাসার আদর্শ জগজ্জননীকে প্রণাম :—
যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।।
লেখক : সন্ন্যাসী, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, ঢাকা