কুমারটুলির ইতিহাস অনেক পুরনো। কলকাতার বহু সম্ভ্রান্ত লোকের বাস ছিল এখানে। কুম্ভকারদের জায়গা বলে কুমারটুলি নাম, এই ধারণা সর্বাংশে সত্যি নয়।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ আছে, ‘কুমার’ শব্দটির অন্যতম প্রধান অর্থ হল ‘ঘোড়ার সহিস’।
১৭৫২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টরদের নির্দেশমাফিক কলকাতার জমিদার জন জেফানিয়া হলওয়েল সাহেব কলকাতার পেশাভিত্তিক স্থানবিভাজন করেছিলেন। মুচিপাড়া, ডোমটোলা, দর্জিপাড়া, আহিরিটোলা, কলুটোলা, আর্মানিটোলা, শুঁড়িপাড়া, গোয়ালাপাড়া, কেরানিপাড়া, কুমারটুলি ইত্যাদি অঞ্চলের সৃষ্টি হয়।
যে যে পেশার লোক তাকে তার নির্দিষ্ট অঞ্চলেই থাকতে হবে, এই নিয়ম চালু হল।
কুমারটুলির আদি বাসিন্দা কুম্ভকার বা কুমোর, না কুমার তথা ঘোড়ার সহিস, তা বলা দুষ্কর। ১৭৫৭য় শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা রাজা নবকৃষ্ণ দেব কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীদের কলকাতায় আনেন নিজের বাড়ির দুর্গাপ্রতিমা তৈরির জন্যে। পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের পর লর্ড ক্লাইভ ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন তিনি সেই পুজোয়। সেই সমস্ত মৃৎশিল্পী তথা পটুয়াদের উত্তর কলকাতায় এখন যেখানে কুমোরটুলি, সেই অঞ্চলে নাকি থাকতে দেওয়া হয়। ক্রমশ তারা সংখ্যায় বাড়তে থাকে। কলকাতায় বারোয়ারি পুজোর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণনগর থেকে বহুসংখ্যায় মৃৎশিল্পীর আগমন ঘটতে থাকে। কুমোর আর পটুয়া সমার্থক।দুর্গাপ্রতিমার চাহিদাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কুমার বা পটুয়ার সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য প্রতিমাও তৈরি করতে থাকে এই পটুয়ার দল। সরস্বতী, লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, কালী ইত্যাদি ঠাকুরের মূর্তির চাহিদাও বাড়তে থাকে। তাই প্রতিমাশিল্পীদের মহল্লা হিসেবে কুমারটুলি তথা কুমোরটুলির খ্যাতি উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে।
আবার কলকাতার ঘোড়ার সহিসদের কথাও মনে পড়বে সকলের। সহিসরা ঘোড়ার দেখাশোনা বা রক্ষণাবেক্ষণ করে। কোচোয়ান বা কোচম্যানদের হাতে ঘোড়ারগাড়ির ঘোড়ার লাগাম থাকে। এক ঘোড়ায় টানা ঘোড়ার গাড়িকে টমটম বা টাঙ্গা বলে। দুই ঘোড়ায় টানা ঘোড়ার গাড়িকে জুড়িগাড়ি বলে। সহিসদের কাজ হল হেঁটে হেঁটে ঘোড়ার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা, সঠিক পথে নিয়ে যাওয়া। তাই তাদের অশ্ববারকও বলে। তাদের ভালো নাম হল কুমার।পুরনো কলকাতার বনেদিবাড়ির লোকজন জুড়িগাড়ি করে বেড়াতে বেরোত, সাহেবরাও তাই। সাধারণ মানুষ টমটমের বা টাঙ্গা চড়তেই অভ্যস্ত ছিল। এছাড়া ব্রুহ্যাম, ল্যান্ডো, গিগ নামের ঘোড়ার গাড়িও ছিল কলকাতায়। রাধারামণ মিত্র তাঁর লেখা বই ‘কলিকাতা-দর্পণ’-এ লিখেছেন, “সব রকম গাড়ির নিয়মই ছিল এক, ‘যতগুলো ঘোড়া ,ততগুলো সইস’।”
কলকাতার সিমলার ছেলে নরেন্দ্রনাথ দত্ত তথা বালক স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, বড় হলে তিনি ঘোড়ার সহিস হবেন।
অবন ঠাকুর তো তাঁর লেখায় সমশের কোচোয়ান, রামু কোচোয়ান আর আক্কেল সহিসের কথা বারবার বলেছেন।
তবু যেন সহিসরা কাব্যে উপেক্ষিত।
উত্তর কলকাতায় ঘোড়ার আস্তাবলগুলি ক্রমশ অবলুপ্ত হচ্ছে। তবে ঘোড়াদের জল খাওয়ার বাঁধানো পাত্রগুলো রাস্তার পাশে কোথাও কোথাও চোখে পড়ে।
কুমারটুলি অঞ্চলে অতীতে কলকাতার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির আবাসবাটি ছিল। ১৭০০ সালে কুমারটুলির নন্দরাম সেন কলকাতার প্রথম কালেক্টর নিযুক্ত হন।এঁকে ব্ল্যাক ডেপুটি বলা হত। কুমারটুলিতে বর্তমানে তার নামে একটি রাস্তা আছে। পরবর্তী ব্ল্যাক ডেপুটি গোবিন্দরাম মিত্র এই অঞ্চলে ১৬ একর জমিতে এক প্রাসাদোপম অট্টালিকা নির্মাণ করেন। তাঁর তৈরি ব্ল্যাক প্যাগোডা নামক নবরত্ন মন্দির কলকাতার অন্যতম দ্রষ্টব্য। ১৭৩৭-এর প্রলয়ঙ্কর ঝড়ে তার চুড়ো ভেঙে পড়েছিল।
লৌকিক ছড়ায় উল্লিখিত বনমালী সরকার বাড়ি ঊনিশ শতক পর্যন্ত কুমারটুলিতে অবস্থিত ছিল। কুমারটুলিতে তার নামে একটি বিখ্যাত গলি রয়েছে।
এই সমস্ত নামীদামি ব্যক্তির বাড়িতে ঘোড়ার গাড়ি যেমন মজুত ছিল, ঘোড়ার সহিস ও কোচোয়ানও ছিল। বাগবাজার, শোভাবাজার ও শ্যামবাজারের বনেদিবাড়ির ঘোড়ার গাড়ির সহিসদের আস্তানা ছিল কুমারটুলিতে। কুমার মানে যে সহিসও হয়, তা কলকাতাবাসী ভুলতে বসেছে।