১৮৮৫ সাল। দেশে ফিরে এলেন জগদীশচন্দ্র বসু। যোগ দিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে, পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে। সে কাজ সহজ ছিল না। বাংলার পাবলিক ইন্সট্রাকশনের ডাইরেক্টর আলফ্রেড ক্রফট সেটা চান নি। লর্ড রিপনের অনুরোধে ক্রফটকে জগদীশচন্দ্রের নিয়োগের ব্যাপারে রাজি হতে হল। কলেজের অধ্যক্ষ চার্লস হেনরি টনিও অধ্যাপক হিসেবে চান নি জগদীশচন্দ্রকে। এ রকম প্রতিকূল পরিবেশে কর্মজীবন শুরু করলেন তিনি। দেখলেন জাতিগত বৈষম্যের রূপ। দেশীয় অধ্যাপকদের ইংরেজ অধ্যাপকদের চেয়ে কম বেতন দেওয়া হত। দেশীয় অধ্যাপকদের গবেষণার সুযোগ ছিল না। কারণ শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তারা মনে করতেন দেশীয়দের গবেষণা করার বিদ্যেবুদ্ধি নেই।
কিন্তু জগদীশচন্দ্র বাধার কাছে হার মানবেন না। গবেষণা তাঁকে করতেই হবে। প্রমাণ করতে হবে দেশীয়দের বিদ্যেবুদ্ধি কম নয়। মাত্র ২৪ বর্গফুট ছোট একটা ঘরে তিনি শুরু করে দিলেন গবেষণা। নিজের তৈরি যন্ত্রপাতি দিয়ে।
এমনি সময়ে একটা বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল তাঁর। কুন্তলীন পুরস্কারের বিজ্ঞাপন। মাথায় মাখার সুগন্ধি তেল কুন্তলীন। জগদীশচন্দ্র জানেন সে তেলের কথা। এ দেশের এক উদ্যোগপতি তৈরি করেছেন এই তেল। নাম তাঁর হেমেন্দ্রমোহন বসু (১৮৬৬—১৯১৬)। জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর একটা আত্মীয়তার সূত্র আছে। ১৮৬৪ সালে ময়মনসিংহের জয়সিদ্ধি গ্রামে তাঁর জন্ম। হরমোহন বসু তাঁর পিতা। গ্রামের স্কুলে পড়াশোনার পরে তিনি আসেন কলকাতায়। ভর্তি হলেন কলেজে। বি এ পরীক্ষা দেওয়ার আগে ডাক্তারিবিদ্যা পড়ার ইচ্ছে হল। ভর্তি হলেন মেডিকেল কলেজে। সেখানে গবেষণাগারে কাজ করার সময়ে চোখে ঢুকে যায় অ্যাসিড। সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তি হারালেন হেমেন্দ্রমোহন। পরবর্তীকালে চিকিৎসায় দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলেও তিনি আর প্রথাগত পড়াশোনায় অংশগ্রহণ করেন নি।
রসায়ন ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়। গন্ধদ্রব্য নিয়ে শুরু করে দিলেন গবেষণা। ১৮৯০ সালে তৈরি করলেন সুগন্ধী কেশতেল কুন্তলীন। কলকাতার ৫২ নম্বর আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িতে। হেমেন্দ্রমোহনের দাবি ছিল কুন্তলীন বিলিতি macasser oil-এর চেয়ে অনেক ভালো। ৬ আউন্স শিশিতে তিন রকমের সুগন্ধি তেল পাওয়া যেত ; মিষ্টি গন্ধতেলের দাম ১টাকা, পদ্মগন্ধ তেলের দাম দেড় টাকা, গোলাপ গন্ধতেলের দাম ২ টাকা। এই তেলের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য ব্যবহার করা হত :

“কুন্তলীন তৈল আমরা দুই মাস কাল পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছি। আমার কোন আত্মীয়ের বহুদিন হইতে চুল উঠিয়া যাইতেছিল, কুন্তলীন ব্যবহার করিয়া এক মাসের মধ্যে তাঁহার নতুন কেশদাম হইয়াছে। এই তেল সুবাসিত এবং ব্যবহার করিলে ইহার গন্ধ ক্রমে দুর্গন্ধে পরিণত হয় না।”
কুন্তলীনের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথের কবিতার কয়েকটি লাইন ব্যবহার করা হত :
কেশে মাখ কুন্তলীন
রুমালেতে দেলখোশ।
পানে খাও তাম্বুলীন
ধন্য হোন এইচ বোস।।
হেমেন্দ্রমোহন পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিলেন আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছরের আগে। প্রবাসী, আনন্দবাজার প্রভৃতি পত্রিকায় থাকত কুন্তলীন তেলের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের সঙ্গে থাকত সেকালের কিছু বিখ্যাত মানুষ, যেমন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, লালা লাজপত রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি ও মন্তব্য। ছবি আঁকতেন পূর্ণচন্দ্র ঘোষ। কুন্তলীনকে জনপ্রিয় করার জন্য হেমেন্দ্রমোহন প্রতিষ্ঠা করেন কুন্তলীন প্রেস ও কুন্তলীন পুরস্কার। এই কুন্তলীন পুরস্কার বাংলার প্রথম সাহিত্য পুরস্কার। যাঁরা কুন্তলীন পুরস্কার পেতেন, তাঁদের লেখা ছাপা হত কুন্তলীন পত্রিকায়। তবে একটা শর্ত মেনে চলতে হত লেখকদের। তাঁদের লেখায় ‘কুন্তলীন’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে ; কিন্তু এমন কৌশলে ব্যবহার করতে হবে যাতে সেটা বিজ্ঞাপন বলে মনে না হয় এবং লেখার সৌকর্য বজায় থাকে। জগদীশচন্দ্র বসু, দীনেন্দ্রকুমার রায়, মানকুমারী বসু, শশিভূষণ দত্ত, প্রসন্নকুমার ঘোষাল, সুরেশচন্দ্র সাহা, হরকুমারী সেন, বিনয়ভূষণ সরকার, কামিনীকান্ত রায়, সুরেন্দ্রলাল গুপ্ত, হেমন্তকুমারী গুপ্ত, সরোজনাথ ঘোষ, কুসুমকুমারী রায়, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, ইন্দিরা দেবী, বিন্দুবাসিনী দেবী, আশুতোষ তরফদার, রাজশেখর বসু, প্রতিভা দেবী, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত প্রভৃতি লেখকরা কুন্তলীন পুরস্কার লাভ করেছিলেন।
১৮৯৬ সালে প্রবর্তন করা হয় কুন্তলীন পুরস্কার। মজার কথা, প্রথম বছরের পুরস্কার যিনি পেলেন তিনি সাহিত্যিক নন, একজন বিজ্ঞানী। পুরস্কারের আর্থিক মূল্য ছিল ৪০ টাকা। যে গল্প লিখে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন তার নাম পলাতক তুফান। পরে অবশ্য গল্পের নাম পরিবর্তন করে নাম রাখা হয়েছিল নিরুদ্দেশের কাহিনি।

জগদীশের গল্পটি দুটি পরিচ্ছেদ বিভক্ত। প্রথম পরিচ্ছেদে বিগত বৎসরের এক ভৌতিক কাণ্ডের কথা বলা হয়েছে। সিমলার আবহাওয়া অফিস এক ভয়ংকর ঝড়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল। ১ অক্টোবর পূর্বাভাস অনুযায়ী আকাশ মেঘাবৃত হয়। কিন্তু বিকেল ৪টার সময় আকাশ মেঘমুক্ত হয়, ঝড় যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। তখন আবহাওয়া অফিসের অপদার্থতা নিয়ে মানুষ আমালোচনায় মুখর হয়।
গল্পের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে আছে গল্প কথকের বিবরণ। তিনি জ্বরে শয্যাশায়ী ছিলেন। জ্বরের ফলে তাঁর মাথার চুল পড়ে যায় এবং তাঁর অষ্টমবর্ষীয়া কন্যা তাঁকে কুন্তলীন তেল মাথার পরামর্শ দেয়। এতে না কি চুল গজাবে। ডাক্তারের পরামর্শে কথক ২৮ সেপ্টেম্বর সমুদ্রযাত্রা করেন। ১ অক্টোবর সমুদ্র রুদ্ররূপ ধারণ করে। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে কথকের মনে পড়ে যায় কুন্তলীন তেলের কথা। তাঁর মেয়ে তাঁর ব্যাগে সেই তেলের শিশি ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কথক সেই তেলের শিশি ঢেলে দেন উত্তাল সমুদ্রে। সমুদ্র শান্ত হয়। মাস ছয়েক পরে সায়েন্টিকফিক আমেরিকান পত্রিকায় এই ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়।
কারও কারও মতে জগদীশচন্দ্রের এই গল্পটিতে সায়েন্স ফিকশনের বীজ আছে। সে দিক থেকে তিনি জয়ন্ত নারলিকর, অশোক বাঙ্কার, গৌতম ভাটিয়া, তাশান মেহেতা, সত্যজিৎ রায়, লাবণ্য লক্ষ্মীনারায়ণ, ইন্দ্রপ্রমিত দাসের পূর্বসূরী।
কুন্তলীন তেল ও জগদীশ চন্দ্রের এ গল্পের সংযোগের কথা জানা ছিলনা। ভালো লাগলো লেখাটি
ধন্যবাদ নন্দিনী অধিকারী ।