| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

সন্তোষকুমার ঘোষ-এর ছোটগল্প ‘কুসুমাদপি’

Reporter
সন্তোষকুমার ঘোষ / ৮৪০ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১৭ আগস্ট, ২০২২

ঊর্মিলা বলল, তোর ভয় করে না?

সঙ্গে সঙ্গে উত্তর ‘কিসের ভয়?’

নিরালা ওই রকমই। যখন বলে ‘কিসের ভয়’, তখন অবার, চোখ দু’টি আর কোনও ফুটি-ফুটি ফুলের পাপড়ি নয়। বরং যার থেকে রোদ্দুর ঠিকরে পড়ছে এমন ঝকঝকে আয়না। যে জিজ্ঞেস করছে তারই চোখে ধাঁধা লাগে। সেই চোখ ঘুরিয়ে নিতেই হয়।

ঊর্মিলাকেও নিতে হল। ফের যখন মুখ ফেরাল, তখন কোথায় আয়না নিরালার চাউনি যেন নিষ্পাপ, জল। এমন টলটলে আর গভীর যে, নির্ভয়ে বুঝি ডুব দেওয়াও যায়।

তবু, বলতে হয় তাই ঊর্মিলা বলেই গেল। স্রেফ দায়িত্বজ্ঞান থেকে। বলল, ‘যেমন নাম, বাসাও নিয়েছিস সেই রকম। ওই নতুন হলিডে কমপ্লেক্সের একদম কোনের কটেজে। খুব নিরালা না?’

হাই তুলে একটু হেসে নিরালা বলল, ‘খুব কই আর। পেছনে নদীর বাঁধ, তার এদিকে কম্পাউন্ডটা কাঁটাতারে ঘেরা। তা ছড়া সোনাপুরি, পারুল, শিসল—গাছের পর গাছ আমার পাহারাদার। তিনটে তালগাছও মাথায় পাগড়ি বেঁধে সটান দাঁড়িয়ে আছে। সামনের শিউলি, আর নাগকেশর—তাদের না হয় বাদই দিলাম। সব গাছ ফুল লতা পাতা আর পাখিদের নামও জানি না। কলকাতায় ফিরে এবার বটানি আর ওরনিথলজির খান কয়েক বই পড়ে বিদ্যেটা ঝালাই করতে হবে। কিন্তু তাতে বোধহয় সব ল্যাটিন নাম। বিদেশি। কালিদাস কোনটাকে কী নামে ডাকতেন রবীন্দ্রনাথ বিভুতিভূষণ, জীবনানন্দ কি বনফুল অন্য কোনও নাম দিয়েছেন কি না, ঊর্মিদি, ওসব বই থেকে সেসব তো ঠিবা বোঝা যাবে না!’

ঊর্মিলা শুনছিল আর কেমন একটা স্নেহভালবাসার জালে জড়িয়ে যাচ্ছিল। মেয়েটা সাহসী আর সহজ। তাই তো এত অল্প দিনের আলাপে ওর সঙ্গে ‘তাই-তুমি’র অন্তরঙ্গতা অনায়াসে সম্ভব হল।

একটা হালকা চাদর গায়ে জড়িয়ে খাটে পা তুলে বসে ছিল ঊর্মিলা। নিরালা, একটা মোড়ায়, কাছাকাছি কিন্তু একটু নীচে। তার হাতে উলের বল।

এটা বছরের সেই সময় যখন হেমন্ত তার পাঁশুটে চাদরের তলায় শরতের নীলকে টেনে মিলিয়ে মিশিয়ে দিতে চায়, আর তার খানিক পিছনেই ধোঁয়া আর আগুন তৈরি কররে বলে শীতের জড়োসড়ো বুড়ো নুয়ে নুয়ে শুকনো পাতা কুড়োয়, হয়রান হয়ে থেকে হিম-হিম নিশ্বাস ছাড়ে।

ঊর্মিলা উঠে গিয়ে কফি তৈরি করে আনল। ছোট্ট চুমুক গেলাসের কানায় ঠোঁট রেখেই বলল, ‘তবু—একেবারে একা’।

‘দোকা আর পাব কোথায়’। কষ্টের কথা, কিন্তু নিরালার গলায় ঝর্ঝর জলের ফোঁটার মতো স্বচ্ছ স্ফটিক হল। —‘দুজন তো হয়েছিলাম ঊর্মিদি। থাকতে পারলাম না তো। কপালে নেই কি না, তাই তিন বছর না পুরতেই একজন হাওয়া। যে -কে-সেই, আবার’।

নিরালা তার মুখ লুকোতে কোলের উলের বলটা গড়িয়ে দিল মেঝেয়। তারপর কুড়িয়ে তুলতে ব্যস্ত হৃল।

ওর থুতনি ধরে তুলল ঊর্মিলা। এবার নিরালার দু চোখ টলমল। নীল জলের উপরে সাদা দু’টি ফোঁটা। সে-ও জল। আর এত ঘনিষ্ঠ আলাপেও ঊর্মিলার কাছে এখনও স্পষ্ট হল না যে, নিরালা বিধবা, না বিচ্ছিন্না।

হাতের পিঠে মুছে নিয়ে নিরালা বলল, ‘যাক ভাবনা বেশি নেই তাই ভয়ও না। গয়না যা ছিল তা তো সেফটি লকারে। বলো, আমার তবে আর পরোয়া কী?’

ঠিক তখনই বাইরে একটা গাড়ি জ্বলজ্বলে দুটো আলো, একটু বাদেই দোরগোড়ায় মশমশ। ধাঁচটা ঊর্মিলার জানা। স্বরূপের।

প্রথমেই সে খুলে ফেলল কান-ঢাকআ টুপি। চাঁদিতে টাক। টাক আছে বলেই ভুরু জোড়া আর ঘন গোঁফটা কেমন বুনো বুনো দেখায়।

তক্ষুনি উঠে দাঁড়াল নিরালা। বলল, ‘ঊর্মিলা আমি এখন যাই’।

‘কেন রে। দাঁড়া আলাপ করিয়ে দিই’।

সন্ধে হয়ে গেছে যে। কাজের মেয়েটাকে এখন ছেড়ে দিতেই হবে। আজকাল দিন ক্রমেই ছোট। বেশ কিছুটা দূরে দেহাতে ওর ডেরা’।

আঁচল ভাল করে জড়িয়ে নিরালা ততক্ষণ উঠে দাঁড়িয়েছে। জড়ালো বলেই ঊর্মিলার খেয়াল হল, জোড়া হেডলাইট শুধু কি গাড়িতেই! আর ও অনেক জায়গায় বাতি নিবিয়ে গা-ঢাকা দিতে চায়, দিয়ে থাকে।

স্বরূপের শার্টের চেন একটু ফাঁক হলেই ঘন বন, আর সেই বন যে তপোবন নয় তা বুঝে ফেলতে খোলা চোখ আর এক লহমাই যথেষ্ট। একটা পুরুষালি জমাট গন্ধ। চোখ দু’টো খয়েরি, কালো চশমা খুলতেই সেটা টের পাওয়া যায়। খয়েরও বুঝি আসলে শুকনো নয়, ভিজে ভিজে; তা থেকেও লালচে রস চুঁইয়ে গড়ায়?

তবু সমস্ত মনের জোর জড়ো করে ঊর্মিলা, যখন বলল, ‘যাবি না। ঘরে কে এল জেনে যাবি না? জানাতে চাইছি আমারই গরজে। নইলে পাছে ভেবে বসিস রাধার ঘরে চোর ঢুকেছে চুড়োবাঁধা এক মিনসে?’

হালবা হাসি দিয়ে ঊর্মিলা দমবন্ধ ঘরে এক, ঝলক হাওয়া আনতে চাইল।

‘বুঝেছি’। বলে নিরালা শুকনো একটা নমস্কারে সামাজিক সৌজন্যের নেহাত নিয়মরক্ষা করল।

ঘড়ঘড়ে গলায় স্বরূপ যখন বলল, ‘মেয়েটা কে?’ নিরালা দ্বুতখন অনেক দূরে।

‘কলকাতার মেয়ে। ওই কলোনিতে ছুটিতে এসেছে। উঠেছে কোণের—পিছন দিককার একটা কটেজে’।

চুকচুক। শোনা না গেলেও চুকচুকটা চুকচুকই ইঁদুর মাত্রেই ইঁদুর।

নখ দিয়ে আঙুল খুঁটছিল ঊর্মিলা, মাথায় চিন্তা ঘুর ঘুর করছে একটাই; গয়না মেয়েটা না হয় রেখে দিয়েছে ব্যাঙ্কের ভলটে। কিন্তু রূপ? রূপ জমা দেওয়ার সেফটি লকার কোথায়? একটি মেয়ে শয্যালীনা। নিরাভরণা হলেও সেই তো হিরে সোনা পান্না। গহনার চেয়ে সে কি কিছু কম দামি? বড় গাঢ় একটা শ্বাস পড়ল ঊর্মিলার।

একটু পরে।

‘তুমি যে আজ?’

‘কেন, আসতে নেই?’

‘হঠাৎ কি না, তাই বলছি। বলেছিলে এবার পূজোয় তোমার হোম-এর ছেলেমেয়েদের নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকবে’।

‘ছিলাম তো। কিন্তু ওরা একটু তাড়াতাড়িই ফিরে এল যে, ইট হ্যাজ বিন, আ রিচ হারভেস্ট, আই মাস্ট সে। ইভন ইউ উড, ঊর্মি ডার্লিং’।

‘হারভেস্ট?’

‘না। এক্সকিউজ মি। ওটা স্লিপ। আই মেণ্ট টু সে এক্সকারশন। এটা হারভেস্টের সিজন তো, তাই কথাটা একটু এলোমেলো হয়ে গেল।’

‘আহ, থামো। একটা ছোট্ট ভুল নিয়ে এত বৈগফয়ত দিচ্ছ বেল্প, বলো তো খাবে, না ধেয়ে এসেহ? ‘

‘খাবো’।

‘তবে মুখটা নামিয়ে আনো। আরও কছে, আরও নীচে’।

‘অসভ্য’।

ধড়াচুড়ো পরেই বিছানায় টানটান হয়ে স্বরূপ ধোঁয়ার রিংয়ের পর রিং তৈরি করে সিলিংয়ের দিকে পাঠাতে থাকল। ওর মোজায় ঢাকা পায়ের আঙুলও নাচছিল। মাঝে মাঝে আঙুলগুলোকেও লাঙুল মনে হয়—কেন যে।

খাবার টেবিলে উর্মিলা যখন বৌল, ডিশ-টিশ সাজাচ্ছে, তখন দেখল স্বরূপ নাক ডাকিয়ে ঘুমের তলায়। তৃপ্ত বুড়বুড়ি নাক ডাকার আকার নিয়ে উঠে আসছে।

একবার দু’বার ডাকতেই ধড়মড় করে উঠে বসল স্বরূপ। ধড়াচুড়ো পরা অবস্থায় তার ঘুমিয়ে পড়া যেমন, একটা কি দুটো ডাকে জেগে ওঠাও তেমনই। কোথায় যেন, কী যেন, অস্বাভাবিক। চোখের রং লাল।

যাতে বাথরুমে গিয়ে মুখে ঘাড়ে জল ঢালতে পারে তাই পাজামা একটা চেয়ারের উপরেই রেখে দিয়েছিল ঊর্মিলা।

সেদিকে না তাকিয়েই স্বরূপ খাবার টেবিলে বসল। নুয়ে পড়ে শুরু করল ভাত-ডাল-তরকারি চটকাতে। গ্রাসের পর গ্রাস মুখ দিয়ে ঢুকে, গলা, বুক, পেট, পাকস্থলী পর্যন্ত পৌঁছে স্বচ্ছ কোনও চোখে যেন দেখতে পাচ্ছে ঊর্মিলা।

খেয়ে প্রকাগু একটা ঢেকুর। পুরো এক গ্লাস জল।

‘পেট ভরল?’

ঊর্মিলার চোখে চাপা হাসি। সেই রাস্তার জামা কাপড়েই ফের সটান হল স্বরূপ, ঊর্মিলার হাসিটাকে আলাদা ধরনের হাসি দিয়ে শোধ দিল। ফের পায়ের বুড়ো আঙুলটা নাচাতে নাচাতে বলল ‘পেট? তা ভরেছে। তবে সে তো ওপরের পেট। এখনও একটুখানি বাকি’।

‘মানে? রান্না ভাল হয়নি’।

‘আরে, না না। রান্না তো তোমার ভালই’।

‘তা হলে?’

‘পেটের নীচে আর একটা পেট আছে জানো না? সেটা যে, খা খাঁ করছে। তারও তো খাসা খানা চাই’।

উঁচু হয়ে উঠেছিল স্বরূপের জোড়া ভুরুর মাঝখানে যে জরুলটা থাকে, সেইটে।

ঊর্মিলা বলল, ‘ছিঃ’।

কিসের ছিঃ আর কাকে ছিঃ। ততক্ষণে হাত বাড়িয়ে স্বরূপ ঊর্মিলাকে বুকের মধ্যে নিয়েছ, চওড়া বুকের মধ্যে তার সুগন্ধি মাথটা ঠেসে, ঘষতে ঘষতে বলেছে, ‘এই বুকের রোমে যদি সত্যিই একটা জঙ্গল তৈরি হতে পারত, তবে কবে সেখানে লুকিয়ে রাখতাম আমার এই তুলতুলে নরম খরগোসটাকে। এসে তাড়াতাড়ি’।

তারপর যত তর সইছে হাতে স্বরূপ হ্যাঁচকা টানে ঊর্মিলাকে খুলতে থাকল, তাতে বার বার শক্ত হয়ে উঠতে থাকল ওর শরীর। কোনও পোলট্রিতে কি এর চেয়ে দ্রুত ব্যাস্ত, অভ্যস্ত, কুশল হাতে মুরগির ছাল ছাড়ানো হয়ে থাকে? কী জানি। আর গোয়েন্দা আঙুলে ভর দিয়ে যখন ওর জানু, ঊরু, কটি, বুক, গ্রীবারা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন ঊর্মিলার চোখে ভেসে উঠছে মাংসের দোকন। আংটায় ঝোলানো ছাল-ছাড়ানো ভেড়া কি বকরি। যদিও গাঢ় চাপা অদ্ভুত গলায় স্বরূপ বলে চলেছে, ‘প্রকাশিত হও, প্রকাশিত হও, আমি তোমাকে পুরোপুরি আবিষ্কার করি’, তবু ঊর্মিলার কন ঝাঁ-ঝাঁ। সে বারবার ফিরে যাচ্ছে সেই মাংসের দোকনটাতেই। কোনও ধৈর্যহীন খদ্দের যেন হাত বুলিয়ে বুলিয়ে ঠাউরে নিচ্ছে, কোন অংশটা সবচেয়ে মুখরোচক গর্দান, সিনা, না রাং?

গলার নালীতে বুড়ো আঙুল চেপে ঊর্মিলা কোনও ক্রমে উথলে ওঠা বমি সামলাতে থাকল। কিন্তু চোখের কোণে উছলে ওঠা জল? তাকে সহজে সামলানো যায় নাকি?

চোখ বুজে মনে মনে আউড়ে গেল, তোমার মনে আছে স্বরূপ, সেই যে ক’বছর আগেই। পুলিশের তাড়া খেয়ে আমরা একটা গঞ্জে চার ধারে ছড়িয়ে পড়ি? অন্ধকারে একটা আটচালার তলায় খালি তুমি আর আমি। বাইরে বৃষ্টি, বাইরে বুট, দৌড়োদৌড়ি, গুলির আওয়াজ। ধপাস। কে যেন পড়ল। ঝপাং। কে যেন না দেখে ঝাঁপ দিয়েছে, তলিয়ে যাচ্ছে পাঁকাল পুকুরে। তারপর অনেক—অনেকক্ষণ চুপচাপ, যদি ঝিঁ ঝিঁ আর আঁতকে-ওঠা এক-একটা রাতপাখির ডাককে হিসেবের মধ্যে না ধরি। সারা রাত জেগে আমাকে পাহারা দিয়েছ, সারা রাত জেগে তুমি। টিনের ঝাঁপে পিঠ ঠেকিয়ে—শেষ রাত্তির অবধি। তারপর যখন একটু ঝিমিয়ে পড়েছি, তখন আমার হাত ধরে জোরসে টান: ছোটো। ছুটতে পারবে এখন? এর পর সব ফরসা হয়ে যাবে কিন্তু। তখন আরও মুশকিল। সমস্ত রাত্তিরের মধ্যে এই যে হাত ধরে টানা সেই প্রথম ছোঁয়া। তার আগে কাছে থেকে তোমার বুকের ওঠা-পড়া নিশ্বাস পেয়েছি, কিন্তু ছোঁয়া তো দূরে থাক, এগিয়েও আসোনি। আমার নিশ্বাসের সঙ্গে তোমার নিশ্বাস মিলে গেছে। বিয়ে যদি বলো তো ওটাই বিয়ে। আসল মিলন। বাইরে তখনও অন্ধকার, আমার হাঁটুতে ব্যথা, পাঁজাকোলা করে তুলে তুমিও পার হচ্ছ ঝোপ ঝাড় এবড়েখেবড়ো মাটি আর মাঠ, হাইওয়ে নয়ানজুলির ধার ঘেঁষে ঘেঁষে রেল ক্রসিং। মনে হচ্ছিল, শেষ নেই এমন দূরত্ব আমাদের অতিক্রম করতে হচ্ছে, আরও হবে। এত দূর অথচ তখনই আমরা সবচেয়ে কছাকাছি। আলিঙ্গন? অঙ্গবিহীন—সেই গানের মতন? হবে। আমার সমস্ত চেতনাই তখন যে গান।

কিন্তু কী হল, কী হচ্ছে এখন? টের পাচ্ছি, আবার পাচ্ছিও না। আমাকে নিয়ে যা খুশি তাই করো, কী যায়, আসেই বা কী, সমস্ত দেহে কিংবা মনে, সম্ভবত দুটোতেই, যখন অসাড় মূর্ছা, পক্ষাঘাত? চিল-শকুন-শেয়াল যখন একটা লাশকে ঠুকরে, ছিঁড়ে খায়, তখন লাশটার একটুও লাগে না তো। সে সবকিছুর বাইরে। আমি এখনও লাশ নই, পুরোপুরিই, তাই, তাই আমার এখনও লাগছে। দয়া করো, এবার নামো, রেহাই দাও আমাকে।

স্বরূপ নামল সত্যিই। হাঁপাচ্ছিল। ঊর্মিলাকে ঠেলে দিয়ে বলল ‘এবার যা-ও। তোমার খাওয়া হয়নি, না? এবার অন্য খিদে মিটিয়ে নাও’।

ঊর্মিলা দেখল, একটা লোক, ঢকঢক করে পুরো এক গ্লাস জল শেষ করছে। তারপর, পাতলুনের হিপ পকেটে হাত ঢুকিয়ে ফুলে-ফেঁপে ওঠা একটা পার্স ছুড়ে দিয়ে বলছে ‘নাও’।

পাতলা ছবির মতো একটা হাঁসি বেঁকিয়ে দিল ঊর্মিলার ঠোঁটের কোণ।

‘নেব? সবটা’?

‘সবটা’।

‘আমার দাম’?।

‘বাজে কথা বললে এই পেপারওয়েটটাও ছুড়ে মারব কিন্তু’।

‘লাগবে না। অন্তত এই পেটমোটা টাকায় ব্যাগটার যতটা লাগল, তার চেয়ে বেশি না। কিন্তু এত টাক তুমি পেলে কোথায়’?

‘হোমের। ছেলেরা এনে দিয়েছে’।

‘হোমে তো ঘরের টাকাই যায় শুনেছি। কিংবা সরকারি গ্র্যাণ্টের। অনাথ ছেলেমেয়েদের মানুষ করার জন্যে। তারা আবার টাকা আনবে কী’?

‘পারে, পারে। ছেলেমেয়েদের আমি মোড়ে মোড়ে দাঁড় করাই যে! কিংবা স্টেশনে। পুজো পার্বণে চাঁদার বই হাতে নিয়েও—’

‘তার মানে, যে-পুজো নেই সেছৃ পুজোর চাঁদার বই ছাপিয়ে’—

‘দোষ কী’।

‘এ তো চুরি’।

‘আর সব্বাই যে পুকুরচুরি করেছে’।

‘সব্বাই করেছে বলে তুমিও করবে’?

‘আমি সবার বাইরে নাকি?’

মোক্ষম যুক্তি। স্বরূপের চোখের দিকে চেয়ে ঊর্মিলা মানতে বাধ্য হল, বাইরে নয়। আলাদা নয়। অথবা এই স্বরূপ আলাদা, যে-স্বরূপকে চিনে এসেছে, তার থেকে। তবে তো, তবে তো, এ সে নয়, যার সঙ্গে নিরিন্দ্রিয় বন্ধনে ঊর্মিলা মুগ্ধ উপাযাচিক, এক দিন বাঁধা পড়ে। বিনা মন্ত্রের সেই নিরুচ্চার বিয়েও তো বিয়েই। কিন্তু আজ? এ কে? একে চেনে না তো সে। পরপুরুষ। একটি পরপুরুষের দ্বারা ভুক্ত, তার লুব্ধ লালসায় সর্বাঙ্গ ভিজে গেছে। এই গ্লানিতে ঊর্মিলা কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকল।

খাবার খায়নি সে, খেতে পারেনি। অন্যমনে ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া করছে শুধু। তারপর বাথরুমে গিয়ে গায়ে পায়ে জল ঢালতে গিয়েই—ওয়াক।

আরও একবার মুখ ধুতে হল।

ফিরে আসতে আসতে ঊর্মিলা অনেকখানি স্থির, ফিরে পেয়েছে অনেকখানি সাহস। তার সত্তা, ব্যাক্তিত্ব। খানিকটা ঘৃণা খানিক করুণা মেশানো দৃষ্টিতে সে এ খন স্বরূপের দিকে তাকিয়ে। স্ব-রূপ। এত দিনে। কে জানে কর কোন রূপ। আসলটা চাপা থাকে। একটা সাপ যে খোলস ছাড়া, সে কি হঠাৎ, নাকি একটু একটু করে? জানা হয়নি। খোলস-ছাড়া জীব কি সেই জীব, না অন্য? পরজন্মেরও হতে পারে। একটা প্রেতের সঙ্গে তার একটু আগে সহবাস ঘটেছে মনে হতেই ঊর্মিলার শরীর সিঁটিয়ে উঠল। সেই ভাবটা জোরও দিচ্ছে তাকে। একটা প্রেতের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েও জ্যান্ত বেরিয়ে আসতে পেরেছে যে, তার নিজের শক্তিও কম নাকি? একটা সংজ্ঞাছুঢ প্রত্যয় শিখার মতো লেলিহান হয়ে ঊর্মিলার চোখে জ্বলতে থাকল।

এই লোকটা আদর্শের জন্যে একদিন নির্ভয়ে ঘর ছাড়ে। নির্ভয়, জিতেন্দ্রিয় নির্লোভ। তারপর প্রবল ধাক্কায় প্রথম উচ্ছ্বাস যখন থিতিয়ে গেল, তখন খুলল একটা অনাথ আশ্রম। পার্টি বলল, এটা ছদ্মবেশ। এই আশ্রমটা আসলে একটা আশ্রয়। দিনকতক বিশ্রাম নিয়ে এখান থেকেই আবার শুরু হতে পারে। তলায় তলায় গড়তে থাকো, এই বলে ঊর্মিলাকে সে এখানে পাঠাল। নিজের বিশ্বাস বিকিয়ে দিয়ে দলের মারমুখী, কিন্তু আপাতত মার খাওয়া ছেলেদের বিশ্বাস কিনল।

কিন্তু আজ? বিশ্বাসের কতটা বিকিয়ে দিয়েছে স্বরূপ? সবটাই? নাকি তলানির মতো পড়ে আছে একটু? থাকলে কতটা, জ্বলজ্বল চাউনি মেলে ঊর্মিলা সেটাই যেন প্রাণপণে পরখ করতে চাইছে।

তার সন্দেহ হল, কিছু নেই কিছু নেই। স্বরূপের চেনা এক এম-এল-এ-কে হাত করে সরকারি অনুদান আদায় করেছে সে।

‘চাপ দিয়ে গ্র্যান্টটা এবার আরও রাডিয়ে নিয়েছি জানো?’

নির্বাক তবু স্বরূপের হা-হা হাসি ঊর্মিলা যেন শুনতে পেল। কই সেই হাসিতে লজ্জার লেশটুকুও তো নেই। স্বরূপ বলছে, ‘বাড়িয়ে নেব না কেন? মস্ত মস্ত বুলি যে কপচাত আমাদের সেই মন্তাদা এখন মস্ত্রী, ঝন্টু পঞ্চায়েত প্রধান, লাল হয়ে উঠেছে সব্বাই, আমরাই বা তবে যতটা পারি ততটা দুইয়ে নেব না কেন?’

তখন ঊর্মিলার আর সন্দেহ রইল না যে, এই ফোঁপানো ফুলে ওঠা ব্যাগটায় স্বরূপ গ্র্যান্টের টাকাও মিশিয়েছে নিশ্চয়। আর ছলেমেয়েদের রোজগার—সে তো আছেই। কে জানে, মেয়েদের স্বরূপ হয়তো একটু অন্যভাবেও খাটায়। আহ্!

দু’ আঙুলে কপালের দুটো রগ টিপে ঊর্মিলা ওই বিছানাতেহ উপুড় হয়ে পড়ল। এসব ছেলেমেয়েদের অনেকে খোঁড়া, কানাও বানিয়ে দেয় নাকি। অনাথ বাচ্চাদের যারা বিকলাঙ্গ করে তারা নিজেরাও পঙ্গু ছাড়া আর কী। ঊর্মিলা যেন একটা হাত-পা দোমড়ানো মানুষকে দেখছে স্বচক্ষে।

আর ভিখিরি দিয়ে টাকা উপায় করে যারা পকেট ভরে, তারাও তো ভিখিরি। একটা ভিখিরির, একটা মানুষের কাছ থেকে, হাত পেতে টাকা-ভর্তি ব্যাগটা নিতে হবে? ভাবতেই ঊর্মিলার গা গুলিয়ে উঠল।

শুনল, স্বরূপ বলছে, ‘এসব হল পেটি বিজনেস। এর পরে আরও বড় একটায় হাত দেব ভাবছি’।

‘আরও বড়? সেটা কী?’ ঊর্মিলা শুকনো, নিরুৎসুক গলায় বলল। ‘হুঁ হুঁ। ভাবতেও পারবে না। মড়া পাচার। বিদেশে বেওয়ারিশ লাশ চালান। অনেক টাক। সুলক সন্ধান পেয়েছি, এখনও একটু বাকি। তা ছাড়া এতে আইন যদিও ভাঙে, তবু পাপ নেই তো। অ্যাফ্লুয়েন্ট কান্ট্রিতে করপস এক্সপোর্ট মানে তো বিজ্ঞানেরই সহায়তা। ওরা ডিসেক্ট করে চিকিৎসাশাস্ত্রের কত নতুন দিক খুলে দিতে পারে, তাই না?’

ঊর্মিলা যেন পচাগলা লাশের গন্ধ পাচ্ছিল। সায় দেওয়ার সাধা নেই। অথচ ‘না’ শব্দটাও গলায় ফুটছে না।

দুই

টকটকে একটা সূর্যকে এইমাত্র কে যেন অঞ্জলি দিল। যেন বিপুল একটা পলাশ ফুল, টলতে টলতে খানিক ভেসে তলিয়ে গেল অস্তজলে।

নিরালা এই সময়টায় রোজই দ্যাখে, আজও দেখল। বাঁক ফিরতে গিয়ে কলোনির ধার-ঘেঁষা এই নদীটা এখানে সহসা বিশাল।

যতখানি জায়গা জুড়ে খাত, ঠিক ততখনি ভাসিয়েই স্রোত নেই অবিশ্যি। মাঝে মাঝে শুকনো বালির স্তূপ, কাছে দুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কত রকম গাছগাছালি, বুনো ঝোপ, চরের ধার যেন মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখা, ধার ঘেঁযে ডিঙ্গি চালাল কাঁকড়ার পায়ের ছোপ থেকে কচ্ছপের ডিম। দেখা যায়, পাওয়া যায়। বোধ হয়।

ঠিক তখনই ঘাড়ের কাছে ঘন শ্বাস। একটু তপ্ত। অন্ধকার জমে জমে কোথাও কোথাও বুঝি ভালুক হয়ে যায়।

ঘাড় ফিরিয়ে এক পলক তাকতেই চমক। নাকের ঠিক উপরে, দুই ভুরুর মাঝখানে জড়ুলটাকে চিনতে নিরালার এক লহমাও লাগেনি। সঙ্গে সঙ্গে ছুট।

ছুট, ছট, ছুট। আঁচল উড়ছে, পা ছড়ে যাচ্ছে স্নেহময় গাছগুলোই এখন বাধা সব চেয়ে, তার আগে মান, তার আগে প্রাণ, পেছনে থপথপ, অনুসারী হন্যে জুতোর আওয়াজ, পা ছড়ে যাচ্ছে, কোয়ার্টার আর কত দূর?

ভাঙাচোরা একটা রাস্তা জানা ছিল নিরালার, পিছনের শব্দ যখন আরও কাছাকাছি, তখনই সে চট করে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে এই জ্যোৎস্নায়, আশ্চর্য, যতটা দেখা যায়, সাদা শরীর আর শাড়ি ততটাই মিশে যায়। তবু ধরে ফেলল, এই ফেলেছে বুঝি, না, না, না, তো।

নিরালা সম্বিৎ ফিরে পেল যখন, তখন সে তার ঘরটায়। যান্ত্রিক হাত খিলও তুলে দিয়েছে। তবু, তবু নিরালার ঘরটাও যে নিরালা। দু’চার ধাক্কায় খিলটা ভেঙে পড়তে কতক্ষণ?

কিছুক্ষণ বসে রইল নিরালা, যেন কখন দরজায় অধীর হাতের ঠেলা পড়বে, এই অপেক্ষা, কিন্তু কই সব যে চুপ। কউ নেই, কউ আসছে না, এই ধারণায় থিতু হয়ে নিরালা উঠল, চোখে মুখে জল দিয়ে ধাতস্থ হল। গ্রিল দেওয়া জানালা, ঝিরঝিরে বাতাস, আর কে জানে সেই হাওয়ায় মুচকুন্দ না নাগকেশর, কোন ফুলের সুবাস। শিউলিরও হতে পারে।

সদর দরজার চাতালটার ঠিক বাইরেই এক ঝাড় শিউলি গাছ। তলায় রাশ-রাশ ফুল, এই জ্যোৎস্নায় দিব্যি দেখা যায়। উড়ে উড়ে সিঁড়ি আর চাতালেও পড়ছে, যেন ঘিরে রাখছে।

জ্যোৎস্না বলেই নিরালা দেখতে পেল। ধাওয়া করা লোকটা ওই তো, ছায়ার মতো ওই ওখানে। এগোচ্ছে না তো। মানুষটা এই মুহর্তে যেন প্রোথিত।

নিরালা দেখতে পেল, বিহ্বল লোকটা হঠাৎ বসে পড়ল হাঁটু মুড়ে যেন ঘ্রাণ নিল, মাটির‌; মাটির, না ফুলের? মুঠো মুঠো শিউলি জড়ো করে, এই তো নিরালা দেখতে পাচ্ছে, ছায়া-অবয়বটি উপরে দু’হাত তুলে এলোমেলো হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল। অদৃশ্য কোনও দেবীর পায়ে অঞ্জলির মতো।

তারপর? চাঁদ যখন পারুল গাছটার ঠিক মাথার উপরে লোকটি ঘুরে, ধীরে ধীরে ফিরে গেল। ফুলের গণ্ডির বাইরে থেকেই। গন্ধে নেশাগ্রস্ত, সন্মোহিত, বিভোর, তার চলার ধরনটা টলমল টলমল। ঝরা শিউলিগুলো যেমন উড়ছিল তেমনই উড়তে থাকল এবার তারা বুঝি ওর পিছু নিয়েছে, আর রাশরাশ ফুল আগের মতোই নিঃশন্দ পাহারায়, অথবা হত্যে দেওয়ার মতো করে, পড়ে রইল।

তিন

মাঝরাতে স্বরূপ কাঁপতে কাঁপতে জড়িয়ে ধরল ঊর্মিলাকে। তার ভঙ্গি থেকেই ঊর্মিলা বুঝল এই আঁকড়ে ধরাটা কামনার্ত নয়, বরং ভয়ার্ত।

‘কী হয়েছে?’

‘ঊর্মি, আমার খুব শীত করছে’।

ওর গায়ে ঊর্মিলা একটা চাদর টেনে দিল।

‘আর তো শীত নেই?’

‘ভয় আছে। ঊর্মি আমার ভয় করছে’।

ওর মাথায় আঙুল বুলিয়ে ঊর্মিলা বলল, ‘ভয়? কিসের ভয়?’

‘ওরা আসছে। শুনতে পাচ্ছ না, কিছু শুনতে পাচ্ছ না তুমি?’

‘কেউ না, কিছু না। তোমার মনের ভুল, শোনার ভুল’।

‘না না না। ওরা আসছে। জানতাম ওরা আসবেই’। খাট থেকে লাফ দিয়ে পড়ল স্বরূপ। পরনে যে শুধু একটা জাঙিয়া, সে খেয়ালও নেই। থরথর কাঁপতে থাকল। তার মুখে শুধু ‘আসছে, আসছে’, ‘ওই এল বলে’।

বিরক্ত, কঠিন মুখ ঊর্মিল্লার। ‘কারা, সেটা খুলে বলবে তো’।

‘আমার পরের ওরা। সমুদ্রের পাড়ে ঢেউ আছড়ে পড়ে জানো না। লোকে বলে, আবেগে। ওসব কিছু না। পেছনের ঢেউগুলো আগেরগুলোর পিছু নেয়, তাড়া করে বলেই তারা মুখে ফেনার মতো গ্যাঁজলা তুলে মরে। আমাকেও ওরা মারবে’।

খুঠ বিষণ্ণ, করুণ দেখাল স্বরূপের মুখ। ঊর্মিলা শীতল স্থির গলায় বলল, ‘ভুল, ভুল সব ভুল। আসলে অন্যায় করে এসেছ তুমি। সেই পাপই আয়নার ফুটে উঠে তোমাকে ভয় দেখাচ্ছে’।

কী শাণিত, কী নিষ্ঠুর। স্বরূপ শুনল। মুখের রক্ত শুকিয়ে ফ্যাকাশে, তাকে দেখাচ্ছে অবিকল কলে-পড়া ভীরু ইঁদুরের মতো, ক্লান্ত, নীরক্ত স্বরে স্বরূপ বলল, ‘হবে হয়তো। তুমি যা বলছ তাও ঠিক। তবে একমাত্র সেটাই সবটা নয়। মনের জুজু আছে সত্যি, কিন্তু বাইরের জুজুও আছে। এক্ষুনি দেখবে ওরা এসে পড়বে। আলো নেবাও ঊর্মি, আলো নেবাও। তোমার একটা খিড়কির দরজা আছে না? কোন দিকে? টর্চ দাও’।

কাতর অনুনয় করতে থাকল স্বরূপ।

‘টর্চ কেন, তোমার তো রিভলভারও আছে একটা। এই দেরাজে। আর খিড়কি কেন, সেই রিভলভার নিয়ে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াও। আগে স্বরূপ, সেই কতকাল আগে, তুমি তো সদরে গিয়েই মহড়া নিতে। আজ খিড়কি, গর্ত খুঁজবে কেন, ছিঃ! পুরুষ না তুমি’?

দু’হাতে মুখ ঢেকে স্বরূপ বলল, ‘পারব না, আমি পারব না। ফুরিয়ে যাচ্ছি, গেছি। ঊর্মিলা, ওরা দলে অনেক ভারী, সংখ্যায় অনেকে। রিভলভার পিস্তল ওদেরও দেদার। তার পাশে আমার এই একটা তো টিনর খেলনা। সম্বল মোটে গোটা কয় গুলি। আমি চালালে ওরা আরও খেপে উঠবে, আমার কলজে ফসফুস সব ঝাঁঝরা করে দেবে। আহ, পায়ে পড়ি আলো নেবাও, অন্ধকার করে দাও সমস্ত, আর খিড়কি, কোন দিকে, দেখিয়ে দাও’।

‘তা হলেই সেফ?’

‘তা হলেই। অন্তত আজকের মতো। যা হোক একটা জবাবদিহি তুমি ওদের কাছে দেবে। ভুলেও কিন্তু আমি যে এসেছিলাম, সেটা কবুল কোরো না’।

মিনতির সেই চিঁচিঁ স্বরে হাসতে গেল ঊর্মিলা, পারল না। সে দেখতে পেয়েছে, স্বরূপের চোখের কোণে জল, এমনকী, এমনকী জাঙিয়াটাও ভিজে।

হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল স্বরূপ, ‘কই, তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি। আর যে বেশি সময় নেই’।

সময় ছিল না সত্যিই। একটুও না। কয়েক সেকেন্ড বাদেই বারান্দায় ধপধপ, অনেকগুলো পায়ের। দরজায় দড়াম দড়াম ধাক্কা।

‘এই শুয়োরের বাচ্চা বেরিয়ে আয়!’ একসঙ্গে অনেক চাপা গলা। আওয়াজে আদেশ।

ছিটকিনি ছিটকে পড়ল কয়েক পলকে। দরজাটা অবাক হাঁ। স্বরূপ তখন হামাগুড়ি দিয়ে খাটের তলা খুঁজছে। শেষবারের মতো ঊর্মিলা দেখল খাটের তলায় ভীষণ ভয় পাওয়া একটা মুখ। দু’হাত বাড়িয়ে সে যেন জন্তুর মতো অব্যক্ত বলতে চাইছে ‘মেরো না, মেরো না’। দৃশ্যটা গা গুলিয়ে দিতেই ঊর্মিলা মুখ ফিরিয়ে নিল। সে কালো-পাথর স্থাপত্যের মতো স্থাপিত ও প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঝলসে উঠল তিন চারটে টর্চ, পর পর কয়েকটা গুলির বিজলি। ঠান্ডা নলে মুখ রেখে একজন কেমন গলায় বলল, ‘ব্যস খেল খতম। বদলা শেষ। আমাদের ঠকিয়ে শালা এখানে ঘাপটি মেরে ছিল, একদম নিকেশ’।

মাথায় এক রকম কালো ঠুলি, ফোকর খালি দুটো চোখের আর ঠোঁটের কাছটিতে। মুখের কছে ঝাঁঝালো কোনও ওষুধমাখা ন্যাকড়া, তাই তার রুদ্ধকণ্ঠও মেঘের আড়াল থেকে গোঁ-গোঁ, গোঁয়ারের মতো যেন দমকে দমকে ধমক। ঊর্মিলা দু’চোখ চাপা দিল।

এক কোণে দাঁড়িয়ে ঊর্মিলা। যেন কঠিন ধাতুতে তৈরি কোনও প্রতিমূর্তি। হাতড়ে হাতড়ে রিভলভারটা সে কখন টেবিলের টানা থেকে বের করেও নিয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সব স্থির, শুধু ঊর্মিলা, তার হাতের নিস্পন্দ আগ্নেয়স্ত্রটা, আর স্বরূপের গুলিতে ঝাঁঝরা লুটিয়ে পড়া শরীরটাই নয়, টিক টিক টিক সেকেন্ডগুলো জুড়ে জুড়ে যে সময় তৈরি হয়, সেই সময়টাই এখন এখানে নিঃশব্দ, নিশ্চল, নিথর পাথর। যা ঘটছে, ঘটে গেল, এইমাত্র, তা কি সত্যি! অথবা ঊর্মিলা চলচ্চিত্র দেখছে? অথবা সে মহামায়ার কোনও নিদ্রায় অভিভূত নয় তো?

ঊর্মিলা দেখছে, লোকগুলো তাদের মুখোশ এঁটে নিল আগে পরিপাটি করে তারপর বারান্দায় ফের সেই ঝুপঝাপ। কাকে যেন ঊর্মিলা ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলতেও শুনল, ‘এত চটপট শেষ করা যাবে ভাবিনি’।

‘না। ভাবিনি। হারামিটা আমাদের ক্যাশ ফাঁক করে এখানে পাচার করতে এসেছিল।’

‘এবার ওর লাশটা পচবে’।

‘পচবে না। ঘরের কোণে গুরু আমি যেন একটা মেয়েছেলেকেও দেখলাম’।

‘দেখলি? তবে ওটাকেও হাপিশ করলি না কেন? চুকচুক ছুঃ। একটা সাক্ষী রয়ে গেল’।

‘পারতাম না। হাতের নিশানা কি ঠিক ছিল? আরও সময় নিত। গুরু, মেয়েটা কে হবে বটে?’

‘কে জানে। লুচ্চা জোচ্চোরটা হয়তো ওই খানকিটার নাং।’

‘কিন্তু আশ্চর্য। ঝলসে ওঠা আলোয় ওর হাতেও একটা রড দেখেছি। ঝকঝকে ইস্পাত, রিভলভার। ছুঁড়ল না, একটা গুলিও না?

‘আ বে, ওই তো মজা। ভয়। গুলির মায়া। ভাগিয়ে আনা চিজ, আশনাইয়ের মাল ওমনি হয়। চলবে চল’।

ধপ ধপ শব্দ। একটু পরে, একটু দূরে সদর সড়কে একটা জিপ গাড়ির স্টার্ট নেওয়ার আওয়াজ। ঊর্মিলা কান পেতে শুনল।

তারপর স্বরূপের শরীরটা টেনে হিঁচড়ে বাইরে আনল, সে কতক্ষণ পরে? হিসাব নেই। থেমে থাকা সময় ঘূর্ণির দহ তৈরি করে তাকেও টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মেঘের আড়ালে চাঁদটা এইমাত্র অস্ত গেল। কেমন অস্বাভাবিক, খয়াটে। বুনো-বুনো রং—বিশ্বাসই হয় না যে, এই চাঁদটাই কখনও কখনও ভরে উঠে গোল হয়। আস্ত।

ঘোর কাটেনি, তাই ঊর্মিলা ঠিক করতে পারছে না এখন তার কী কর্তব্য। ঠান্ডা বাতাস খালি হি-হি হাসতেই জানে, ভুতুড়ে ধরনে। কখনও উচিতের দিকটা দেখিয়ে দেয় না।

হয়তো নিয়ম পুলিশকে খবর দেওয়া। লাশ ছোঁবার আগে সেটাই ঠিক কাজ ছিল। কিন্তু কী বলবে ঊর্মিলা ফাঁড়িতে গিয়ে? ধরা গলায়, না না ধরা গলায় নয়, বড় জোর হাঁপাতে হাঁপাতে ওখানে অফিসার, পাহারাদার যে থাকে, যাকে, সামনে পায়, তাকে বলবে কি যে, ‘দেখুন কণ্ডটা। যারা বদলা নিয়ে ফিরে গেছে, তারা কী বোকা। একটা মরা মানুষকে মারতে খামোখা পাঁচ-ছটা গুলি নষ্ট করে দিল!’

হ্যাঁ, যে স্বরূপ একদিন অন্ধকারে ইন্দ্রিয় পথের চূড়ান্ত নমুনা দেখিয়েছে, ইদানীং অন্য মেয়েমানুষের দিকে সে জুলজুল চোখে তাকাত। লালা গড়াত ওর চোখ দিয়ে। হ্যাঁ স্যার, আগের দিন সন্ধ্যাবেলাতেই আমি দেখেছি,ঊর্মিলা থানাদারদের বলবে। এই স্বরূপ কি সেই স্বরূপ, যে ছিল আদর্শবাদী, প্রবল, প্রচণ্ড? আজ সে অনাথ আশ্রমের নাম করে সরকরি গ্র্যাণ্ট আদায় করে, ধরনা দেয় চেনা মন্ত্রী আর এম এল এর দরবারে। তারপর সেই অনাথ ছেলেদের ভিখিরি বানায়, সেখানকার মেয়েদের আরও খারাপ ব্যবসায় লাগায়, তারপর তাদের রোজগারের পয়সা হাতায়; সেই টাকায় ফেঁপে উঠে, বিদেশে মড়া চালানের মতলব যে ভাঁজে, সে নিজেই কি জ্যান্ত? তাই তো বললাম স্যার, ও অনেক আগেই মরেছিল। মরাকে মারতে ওরা বেশ ক’টা গুলি কেন যে খরচ করল!

ওরা—রাতের ওই চড়াও-হওয়া আততায়ীরা কারা? অফিসার জেরা করলে ঊর্মিলা বলবে, জানি না। তবে ওদের স্বরূপ নাকি ঠকিয়েছিল। কিন্তু যে-স্বরূপ আর নেই, তাকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিতে জিপে চড়ে হাঙ্গামা হুজ্জত, ছ্যাঃ। গাধারা জানে না, ওরাও কী ঠকা না ঠকল। আহ খাটের তলা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে জান বাঁচাতে সে কী কাকুতি! স্যার যদি শুনতেন। দেখাচ্ছিল ঠিক যেন খোঁচা-খাওয়া শুয়োর কি কলে-পড়া নেংটি ইঁদুর। স্যার যদি দেখতেন!

নিজেরই হা-হা হাসি ঊর্মিলাব নিজের কানেই কেমন বেখাপ্পা ঠেকল। বাইরেটা ফ্যাকশে ফরসা। দিনের এই সময়টাতে মরা চাঁদ আর উঠি-ডঠি সূর্যের অবিকল এক রং।

নীচে তাকিয়ে দেখল স্বরূপের কপালে, একটা ফুটো, রগের কাছে আর একটা। বুকের কাছটাও ভিজে, জবজবে।

থানায় গিয়ে মৃত্যুর এজেহার সে দেবে, কিন্তু ওরা কি বিশ্বাস করবে? ঊর্মিলার এখন চোখ-মুখের যা দশা হয়তো উড়িয়েই দেবে, পাগল বলে। তা হলে? হ্যাঁ। প্রমাণ চাই। প্রমাণের একটু নমুনা ঊর্মিলা তো সঙ্গে করে নিয়ে যেতেই পারে। হাঁটু পেতে সে নিজেকে স্বরূপের বুকে হাত দিত দেখল। আঙুলের ডগায় রক্ত। এটাই প্রমাণ। আরও একটু নিতে হবে। তা হলেই যথেষ্ট। ঊর্মিলা বুক পকেটের গভীরে হাত ঢুকিয়ে দিল। আরে, এ কী? গোটা কতক পাপড়ি। ছোট ফুলও থেঁতলানো। রক্তে মাখামাখি। গন্ধরাজ, চাঁপা, না শিউলি?

হঠাৎ ঊর্মিলার হাত-পা ঠান্ডা, বুকের রক্ত হিম। পারবে না, সে একা পারবে না এজেহার দিতে যেতে। ফাঁড়িটা যে অনেক দূর।

তবু ছুটছে ঊর্মিলা, ছুটছে। ঘোরে; জ্বরের বিকারে। কোথায় কোন দিকে খেয়াল নেই। আঙুলের ডগায় বাসি রক্ত। এই শবদেহের কাছ থেকে পালাতে হবে, তার নিজের কাছে থেকেও। কিন্তু এ কী, সে কোথায়?

সহসা ঊর্মিলা টের পায়, সে নিরালার বাড়ির দরজায়। নিজেই এল, নাকি এখানে তাকে টেনে নিয়ে এসেছে কোনও নিয়তি? ভালই হয়েছে।

থানায় যদি যেতেই হয়, তবে অন্তত এক জন সাথি পাওয়া যাবে।

সবে ভোর। বাগানে ঘুরছিল নিরালা। আঁচলখোলা দিশেহারা ঊর্মিলাকে টলমল করে এগোতে দেখে সে ছুটে গিয়ে ধরে ফেলল। বসিয়ে দিল বাগানের ঘাসেই। ঊর্মিলা তখনও কাঁপছে। কপালে ঘাম। নিরালা মুছে দিল।

‘কী হয়েছে?’

‘বলছি। আগে, একটু জল দে’।

নিরালা এক গ্লাস জল এনে দিল। এক ঢোঁকে সবটা শেয করে ঊর্মিলা একটু সুস্থ। সামনে, চাতালের প্রায় সবটাই জুড়ে ছড়ানো ফুল। ঊর্মিলার সন্ধানী চোখ ঘুরে ঘুরে কী যেন খুঁজছিল, দেখছিল।

জল খেয়ে কতকটা সুস্থ ঊর্মিলা তার স্থির দৃষ্টি স্থাপিত করল নিরালার মুখে।

‘তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব। ঠিক উত্তর দিবি?’

নিরালা শুধু ঘাড় নাড়ল।

ঊর্মিলার চোখ অপলক, হাতে কোনও মৃতদেহের বুকপকেট হাতড়ে তুলে আনা চটকানো পাপড়ি।

‘তোর এখানে কাল কেউ এসেছিল’?

মাথা নিচু করে নখ দিয়ে শাড়ির পাড় খুঁটছে নিরালা। চট কয়ে জবাব দিল না।

‘বল’।

‘এসেছিল। আবার আসেওনি’।

‘হেঁয়ালি করবি না। সোজাসুজি বল। কখন?’

‘কাল সন্ধে হতে না হতে। নদীর পাড় থেকে আমার পিছু নেয়, তাড়া করে। ছুটে, ছুটে, ছুটে আছাড় খেতে খেতে, খেতে আমি কোনওরকমে আমি পালিয়ে আসি। ঘরে ঢুকে খিল তুলে দিই’।

‘ব্যস! হয়ে গেল।’ ঊর্মিলা খিলখিল করে হেসে উঠল। ‘যে মানুষটা খ্যাপা জন্তু, যে মরিয়া, সে তো খিল ভেঙেও ঢুকতে পারত’।

এতক্ষণে নিরালা মুখ তুলে তাকাতে পারল। ‘ওইখানেই তো অবাক ব্যাপার ঊর্মিদি। সারা রাত না ঘুমিয়েও আমি বুঝে ডঠতে পারিনি। লোকটা’—

‘তুই লোকটাকে চিনিস? চিনতে পেরেছিলি?’

উত্তর না দিয়ে নিরালা ফের মুখ নিচু করল।

‘বুঝলাম। ও কথা যাক। তারপর?’

‘তারপর কিছু না। সে এগোল না। হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। কী যেন শুঁকল দাওয়ায়। ভরা জ্যোৎস্নায় তো ভেসে যাচ্ছিল সব, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম’।

‘বল। বলে যা’।

‘বললাম তো আর কিছু নেই। একবার নুয়ে পড়ে সে কী যেন দেখল, বোধহয় ওই ফুলগুলো কুড়িয়েও নিল দু’একটা, তারপর যেন কেমন হয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে ফিরে গেল। ওর পা টলমল করছিল’।

‘তবে তো, তবে তো, সে মরেনি। নিরালা ওই ফুলগুলো বাঁচিয়েছে তোকে। মরা, ঝরা শিউলির গণ্ডি যে ডিঙোতে পারে না, কে জানে ওই ফুলগুলোই চাঁদের আলোয় ওর কাছে মস্ত বাধা হয়ে উঠেছিল কি না। একটি মেয়েকে, একটি মেয়েকে জোর করে নষ্ট করতে যে হাত বাড়িয়েছে, সুকুমারী কুঁড়ি পিষে এগোতে তার পা সরেনি, আশ্চর্য। ফুলেরা পিকেটিং করছে তাদের শরীর আর সুবাস নিয়ে, তাদের মাড়িয়ে পা বাড়াতে যার সাহস ছিল না, তার একটা দিক চাঁদের মতো মরা হতে, পারে, আর-একটা দিক ছিল থরথর জীবন্ত’।

‘ছিল কেন বলছ ঊর্মিদি’।

‘বলছি এই জন্যে যে, সে আর নেই। ফোঁপানো কান্নার মতো শোনাল ঊর্মির গলা। ‘অথচ অমি ভেবেছিলাম, সে মরে গেছে। যখন বাঁচার ককুতি-মিনতি করছে, তখন থুথু ছিটোতে ইচ্ছে হয়েছে। সেই থুতু আমি এখন আমার গায়ে ছিটাই?’

‘কেন ঊর্মিদি’।

‘এই জন্যে যে, আমার হাতেও তো রিভলভার ছিল। বাঁচাতে না পারি, একটুখনি বেঁচে যে আছে, তাকে আর একটু বাঁচিয়ে রাখতে একটা দুটো গুলি কি আর ছুঁড়তে পারতাম না? পারতাম। ছুঁড়িনি। কারণ, ওর ওই ভিখিরি, চোর-চোর চেহারা দেখে আমার খুব ঘেন্না হয়েছিল কি না? ভেবেছিলাম, হামলাদারদের মোকাবিলা করতে সদরের দিকে সটান না এগিয়ে যে খিড়কির রাস্তা খোঁজে, প্রাণ দেওয়ার সাহস যার নেই, প্রাণ রাখারও অধিকার কি তার আছে?’

‘সবটা জানি না। বুঝতে পারছি না। কিন্ত গুলি ছুঁড়লে কি ওকে রক্ষা করতে পারতে?’

‘না। কিন্তু চেষ্টা? তাও যে আমি করিনি। যে ফুলের গণ্ডি পার হতে পারল না, তার অন্তত একটা মুহূর্ত এমন সংবেদনার্ত হয়ে উঠেছিল তো? কিন্তু, কিন্তু, আমি ধরে নিয়েছিলাম সে পুরোপুরি মৃত’।

ডুকরে কেঁদে উঠতে গিয়েই ঊর্মিলা একেবারে কঠিন হয়ে গেল। চোখ ঘুরিয়ে সে ভোরের উড়তে-থাকা ফুলগুলোকে একবার দেখে নিল। তার নিজের হাতেও গোটাকয় চটকানো পাপড়ি। তাদের নাকের কাছে ধরে স্পষ্ট স্বরে ঊর্মিলা বলল, ‘আমি প্রায়শ্চিত্ত করব’।

বলে, চোখে তখন আর ঘোর নেই, ঊর্মিলা আঙুলের ডগায় যে রক্তটুকু লেগে ছিল, তাই দিয়েই কপালের ঠিক মাঝখানে বড় করে নিটোল গোল একটা ফোঁটা আঁকল।

১৯ নভেম্বর ১৯৮৩

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev