বাংলা ভাষা ও বাঙালি কি সংকটে? তবে বাংলা ভাষার ব্যবহার, ভাষা সংরক্ষণে অবহেলা, হিন্দি ভাষার আগ্রাসন এবং ডিজিটাল যুগে বাংলা হরফের ব্যবহার কমছে। এগুলি কি সংকটের লক্ষণ? যদি তাই হয় তবে এসব কাটিয়ে উঠতে হবে, তা না পারলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিজস্বতা হারাতে পারে। শহরাঞ্চলে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা এখন আর গুরুত্ব পায় না। অনেকেই বাংলা ভাষার ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছে এবং দিতে চাইছে, তারা ইংরেজি বা হিন্দিতে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। হিন্দি ভাষা বাংলা ভাষার উপর আধিপত্য বিস্তার করছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে হিন্দি ভাষার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাংলা ভাষা উপেক্ষিত হচ্ছে। ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলা হরফের ব্যবহার কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজি হরফে বাংলা লেখার প্রবণতা বেড়েছে, যা বাংলা ভাষার নিজস্বতা ও বানানরীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলা ভাষা যে সংকটে সেটা বোঝা যাচ্ছে। আরও বুঝতে হবে যে ভাষার সংকট কেবল ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংস্কৃতি।
২১ ফেব্রুয়ারি এলে আমরা বাংলা ভাষার জন্য আবেগ তাড়িত হই। আমাদের সেই আবেগে কোনো খাদ নেই কারণ এই আবেগ সৎ না হলে কোনো জাতিই সভ্য হতে পারে না। কিন্তু আগামী প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষার কদর এমনভাবে থাকবে না। এমনিতেই বিশ্বায়নের যুগে ভাষা বাঁচিয়ে রাখা কঠিন। পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০০০ সালে পৃথিবীতে যে সাত হাজার ভাষা ছিল ২০০৪ সালের সমীক্ষা বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই মুহুর্তের কথ্য ভাষাগুলির ৯০ শতাংশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বিশ্বে বাংলা ভাষার স্থান পঞ্চম, ভারত বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশ মিলিয়ে বাংলাভাষীর সংখ্যা ৩০ কোটির বেশি। কিন্তু তারপরও বাংলা ভাষা সংকটে, বিশেষ করে ভারতে। যেখানে ২২টি জাতীয় ভাষার মধ্যে একটি ভাষা বাংলা। ভাষাতত্ত্ববিদ সুকুমার সেন বাংলা উপভাষাকে যে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছেন, তার একটি হল ঝাড়খণ্ডী উপভাষা। ঝাড়খণ্ডের জনগণের একটা বড় অংশ যেমন বাংলা বলতো লেখালেখিও করতো। একসময় বাংলা ভাষায় ঝাড়খণ্ডে একাধিক সাহিত্য রচিত হয়েছে। অনেকে নিজেকে বাঙালি ভেবে মানভূম বিদ্রোহে নাম লিখিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন। তারপর বিরাট বাংলাভাষী অঞ্চলটিকে পুরুলিয়া থেকে ভাগ করে বিহার প্রদেশে ঢোকানো হয়েছে। এরপর ক্রমাগত আন্দোলনের ফলে বিহার থেকে ভেঙে ঝাড়খণ্ড রাজ্য। বিহারে থাকাকালীনও বাংলা ভাষাভাষী প্রধান অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষামাধ্যমে বাংলা পাঠ্যপুস্তক, বাঙালী শিক্ষক ছিল। কিন্তু এখন সবই হিন্দি। ঝাড়খণ্ডে বাংলা ভাষার এই অবস্থার জন্য দায়ী কে? যারা এখন তাদের তাদের ছেলেমেয়েদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পাঠাচ্ছে।
একটি রাজ্য থেকে বাংলা ভাষাকে সম্পূর্ণভাবে অবলুপ্ত করে দেওয়া মানে সেই রাজ্যের লোকসাহিত্য, লোকসংস্কৃতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলা। একইসঙ্গে গোটা দুনিয়ায় বাংলা ভাষার পঞ্চম স্থানটিকেও খুইয়ে ফেলা। বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি, হিন্দি জানা বোঝাটা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে বাংলা ভাষা যদি একটি রাজ্য থেকে লুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে ২১ ফেব্রুয়ারি দিবস একেবারেই অর্থহীন হয়ে যায়। যেটা ঝাড়খণ্ডে হয়েছে কাল তা যে এই রাজ্যে হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাহলে কি বাংলা ভাষা বিপন্ন। যখন বাংলা ভাষার উপর অন্য ভাষার আগ্রাসন নেমে এল, তখন বাংলা ভাষাকে বাঁচাতে বাঙালি প্রাণ পর্যন্ত দিল কিন্তু আজ এই বাংলাতেই বাংলা ভাষা বিপন্ন। কেন এই বিপন্নতা? হিন্দি ভাষার আগ্রাসনমূলক মনোভাবী কি এর জন্য দায়ী? অথবা আজ রাষ্ট্রক্ষমতা যাদের হাতে, তারা এক ভারত, অখণ্ড ভারতের নাম করে হিন্দি ভাষাকেই জাতীয় ভাষা করে তোলার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। হিন্দি বলয়ের সংস্কৃতিকে এ দেশের সংস্কৃতির ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলিতে বাংলা ভাষাকে ব্রাত্য করে হিন্দি ভাষাকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ছেলেমেয়েরা ইংরেজি বলতে পারলেই বাঙালি বাবা মায়েরা আভিজাত্য বোধ করেন-এটাই বাঙালির সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শাসকের হাত ধরে হিন্দি ভাষা যেমন এখন সারা ভারতে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে এই রাজ্যেও ঠিক তেমনিভাবে আঞ্চলিক উপভাষাগুলিকে দমন করে রাখার চেষ্টা চলছে। এর কারণ কলকাতার আধিপত্যবাদ। কারণ বাংলা ভাষা অন্যান্য উপভাষাকে প্রাধান্য দিলে কোথাও ভাষার নগর শাসনকে অগ্রাহ্য করা হয়। ঠিক যেমন একই ভাষায় কথা বলা এবং একই অঞ্চলের বাসিন্দা মানুষের মধ্যে প্রান্তিক মানুষদের আমরা ভুলে থাকি। প্রান্তিক মানুষের যে সংস্কৃতি, তাও আমাদের অগোচরে থাকে। কিন্তু বাংলা ভাষাকে আগামী দিনে টিকে থাকতে হলে কেবলমাত্র কলকাতার উপর নির্ভরশীল হলে হবে না। কারণ এখন কলকাতা বা মহানগরে আধিপত্য বিস্তার করে রয়েছে হিন্দি ও ইংরেজি। আজকের শিশু বা কিশোরদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়ত বাংলা ভাষাটি বুঝতেই পারবে না। তাহলে বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখবে কারা? বাংলার গ্রাম, প্রান্তিক অঞ্চল কি বাংলা সংস্কৃতি, বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে? ঠিক যেমন লোকজ সংস্কৃতি এবং লোকগীতি বহু শাসনের পরও টিকে আছে। কিন্তু কতদিন অনাদৃত, অনালোকিত অবস্থায় লড়াই করে যাওয়ার প্রেরণা পাবে? ভাষা ও ক্ষমতার মধ্যেকার সম্পর্ককে আমরা নিজেদের অজান্তে যেভাবে এতদিন ধরে চর্চা করে আসছি, তাকে যদি বদলানো না যায়, তাহলে বাংলা ভাষাকে বাঁচানোর লড়াই মিথ্যা হয়ে যাবে।
সাভারকার নাস্তিক ছিলেন কি হিসাবে?