ক’দিন আগে কলকাতার সবচাইতে উঁচু বাড়িটার একটা ধোঁয়াশা মোড়া ছবি দেখছিলাম। দারুণ লাগছিল। কিন্তু এই দারুণ দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নিদারুণ সত্য। স্মগ বা ধোঁয়াশা মানেই বায়ুদূষণের বিপদ। মানে এক নিঃশব্দ মৃত্যুর বার্তা। এই মৃত্যুতে অতিমারি, মহামারি বা সাধারণ অসুখবিসুখের মত মৃত্যুর হাহাকার নেই। তা আসে নীরবে, যদিও মৃতের সংখ্যা দেখলে চমকে উঠতে হয়! সম্প্রতি প্রকাশিত ল্যান্সেট প্ল্যানেটরি হেলথ রিপোর্ট দেখলে চোখ কপালে উঠবে আপনার। সেই রিপোর্ট বলছে, গত দুই দশকে ভারতে বায়ুদূষণে মারা গেছেন ১.৭ মিলিয়ন মানুষ। বায়ুদূষণ বেড়েছে ১১৫ শতাংশ। এই হিসেব ১৯৯০ থেকে ২০১৯-এর।

শীতে এই বিপদ আরও বাড়ে। শ্বাসকষ্টজনিত নানা অসুখে আক্রান্ত হন বহু মানুষ, অনেকে মারাও যান। দূষণ কথাটা এমনিতে অসুখবিসুখের নামের মত ভয়াবহ নয়। এতে কোন মৃত্যুর গন্ধ নেই। সব জায়গাতেই কম বেশি দূষণ থাকে। কিন্তু এর তীব্রতা বাড়লেই মৃত্যু যেন জীবনের কাছাকাছি চলে আসে। প্রাণদায়ী বায়ু কিংবা জল হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী, তখন কিছু করার থাকেনা। বায়ুদূষণজনিত কারণে দেশের মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৩৬.৬ শতাংশ। দূষণ রুখতে সতর্কতা নেওয়ার জন্য সরকার আছে, আছে নানা বেসরকারি সংস্থা, বিদেশী দানখয়রাতও রয়েছে। কিন্তু এব্যাপারে মানুষের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তবুও আমরা সচেতন নয়। আমরা আমাদের পুরনো অভ্যাসগুলোতে বদল আনতে পারছি না। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করার মত ক্ষতিকর অভ্যাস বদলাতে পারছি না, কম করতে পারছি না ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার।

ক’দিন আগে প্রকাশিত ল্যান্সেট এর এই রিপোর্টটির নাম ‘দ্য ইন্ডিয়া স্টেট লেভেল ডিজিজ বার্ডেন ইনিশিয়েটিভ।’ আর্থিক ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব এই রিপোর্টের মূল বিষয়। সম্প্রতি প্রকাশিত এই রিপোর্ট বলছে, আমাদের দেশে মোট মৃত্যুর ১৮ শতাংশই হয় বায়ুদূষণে। এতে বলা হয়েছে গত দু’দশকে আমাদের এই সবুজ গ্রহে অন্যান্য দূষণ প্রায় ৬৪ শতাংশ কমলেও বায়ুদূষণ কমার বদলে বেড়েছে। এই অবস্থার জন্য আমরাই অনেকটা দায়ী। গাড়ি, এসি, ফ্রিজ ইত্যাদির অত্যাধিক ব্যবহার সমস্যা আরও বাড়িয়েছে।
মৃত্যুর পাশাপাশি এই সময়কালে আমাদের দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও এই দূষণের আঘাত মারাত্মক। বায়ুদূষণের অকাল মৃত্যুর ফলে ভারত হারিয়েছে ১.৪ জিডিপি। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ দাঁড়াবে মোট ২,৬০,০০০ কোটি টাকা। যা কিনা ২০২০-২১ এর কেন্দ্রীয় বাজেটের ৪ গুণ বেশি। দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা একটু জোরদার করা গেলে ক্ষতির পরিমাণ এত ব্যাপক হত না। আমরা হারাতাম না এত বিপুল পরিমাণ মানবসম্পদ!

সচেতন হওয়ার ফলে বায়ুদূষণের অবস্থা উত্তর ও মধ্য ভারতের তুলনায় পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে ভালো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী উজ্জলা যোজনা, উন্নত চুলা অভিযান ইত্যাদির ফলে বায়ুদূষণ কমেছে। আমাদের রাজ্যেও কয়লার মত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমেছে, বেড়েছে গ্যাসের ব্যবহার। সত্যি বলতে কি বায়ুদূষণ ঠেকানোটা কারও একার কম্মো নয়। রাষ্ট্রের উদ্যোগ এবং মানুষের সচেতনতাই এটা রুখতে পারে। কিন্তু দূষণে মৃত্যুর পরিসংখ্যান দেখে আমরা আঁতকে উঠলেও তা রুখতে আমাদের উদ্যোগ ও সচেতনতা এখনও খুবই কম।