আধুনিকতার সোপানে উৎকর্ষমুখর গণতান্ত্রিক আধারেই ভাষার বহুত্ববাদী চেতনা প্রবহমান। শুধু তাই নয়, সেখানে ভাষার চেয়ে মাতৃভাষার বুনিয়াদী চেতনার জাগরণে তার স্বীকৃতি ও সম্মান এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা ছিল সময়ের অপেক্ষা। ভাষার একাধিপত্য থেকে ভাষার রাষ্ট্রীয়করণের পথে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠাই তার মূলাধার। সেদিক থেকে বাংলা ভাষার বনেদি ভূমিকা চরৈবেতি। ১৯৯৯-এর ১৭ নভেম্বরে ইউনেসকো-র আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তারই স্বীকৃতি। শুধু তাই নয়, বাঙালি তার মাতৃভাষার সম্মান ও স্বীকৃতি লাভের শ্রীবৃদ্ধিমান প্রকৃতিতে সমান সচল। ২০০২-এ পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওন বাংলা ভাষাকে সম্মানসূচক সরকারি ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত বিদেশি ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষা তৃতীয় স্থানে উঠে আসে ২০১৮-তে।
অন্যদিকে মাসতিনেক পূর্বে ২০১৯-এর ডিসেম্বরে ব্রিটেনের রাজধানী লণ্ডনে দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত ভাষার মর্যাদা লাভ করেছে বাংলা। ইংরেজির পরেই সেখানে বাংলাতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ কথা বলেন। বাংলাভাষাভাষীর সংখ্যা ৭১,৬০৯। সেদিক থেকে বাঙালির আত্মশ্লাঘা জাগাই স্বাভাবিক। বাংলাভাষার বিস্তারে এসব স্বীকৃতি ও সম্মান লাভের পথ বেয়ে তার আত্মপ্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করে তুলেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার সংখ্যাগুরুর প্রকৃতি নিয়ে বিতর্ক বর্তমান। আর এই বিতর্কের মূলে রয়েছে আমাদের ভাষিক চেতনা। সেখানে ভাষা ও মাতৃভাষার একাকার। অথচ ভাষামাত্রেই যেমন সকলের মাতৃভাষা নয়, মাতৃভাষামাত্রই ভাষা হয়ে ওঠে না। যে ভাষা মানসিক লালন-পালনে মা হয়ে ওঠে, সেই ভাষাই মাতৃভাষা। তার সঙ্গে নাড়ির যোগ ছেদন হলেও অদৃশ্য অস্তিত্বে তা আজীবন বহমান।
যে ভাষা আঘাতে বেরিয়ে আসে, আনন্দে জেগে ওঠে, সে ভাষাই মাতৃভাষা। সেই মাতৃভাষার আকাঁড়া মূর্তিই পরিশোধিত হয়ে ভাষার আভিজাত্যে প্রতিমায় নৈবেদ্য লাভ করে। সেদিক থেকে মাতৃভাষা যেখানে জনসম্পদে বিস্তার লাভ করে, তেমনই তার ভাষা মনসম্পদে শ্রীবৃদ্ধি করে চলে। মাতৃভাষার প্রকাশে আন্তরিক, ভাষা বিচরণে আত্মনিষ্ঠ। সেক্ষেত্রে তাদের সম্পর্ক বৈরিতার তো নয়ই, বরং একেঅপরের অবিচ্ছিন্ন পরিপূরক আত্মীয়তার। অন্যদিকে ভাষার যোগ যেখানে বহুবিস্তারি, মাতৃভাষা সেখানে একক হয়েও প্রকাশমুখর। সেই প্রকাশেই যে অস্তিত্বের স্বাভাবিক বিস্তার। তাকে অস্বীকারের মধ্যে সেই মানুষকেই অস্বীকার করা হয়। এজন্য যেখানে ভাষা মানুষের অধিকারের কথায় উচ্চকিত, সেখানে মাতৃভাষা তার আপন অস্তিত্বে প্রকট প্রকাশ। সেদিক থেকে বাংলার ভাষিক শ্রীবৃদ্ধিতে তার ভাষার নয়, মাতৃভাষার যোগ সুনিবিড়।
আসলে আধুনিক বিশ্বে বহুমুখী বিস্তারে ভাষার আবেদন উৎকর্ষমুখর। তার বিকল্পের পরিসর যেমন মুক্ত, তেমনই তার বিস্তার আবেদনপ্রবণ। এজন্য একাধিক ভাষাশিক্ষার প্রবণতা সেখানে প্রবহমান। শুধু তাই নয়, সেখানে ভাষাশিক্ষায় আভিজাত্যবোধের বিষয় নানাভাবেই হাতছানি জাগায়। অন্যদিকে মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই। যথেষ্ট বড় হওয়া সত্বেও সুস্থসবল শিশুর কথা বলতে না শেখার হদিশ মেলে তার বাবা-মা’র দুই ভিন্ন ভাষায় কথা বলার মধ্যে। তার অবিকল্পতাই তার আত্মিক স্বকীয়তা। এজন্য মাতৃভাষায় কণ্ঠরোধ হলেই জনকণ্ঠ মুখর হয়ে ওঠে। সেখানে অমর একুশের ভাষা আন্দোলন ছিল আসলে মাতৃভাষার সংগ্রাম। মাতৃভাষার মধ্যে শুধু ভাষিক পরিচিতি থাকে না, আত্মিক সত্তা তার অবিচ্ছেদ্য। এজন্য সেই ভাষিক অস্তিত্বে শাসকের সাম্রাজ্যবাদী চেতনায় আঘাত নেমে আসা যেমন স্বাভাবিক, তেমনই তার প্রতিরোধী চেতনাও জীবনমরণ লড়াই-এ সামিল করে। বন্দুকের গুলি থেকে ধর্মের বুলি দিয়েও তাকে বিরত করা যায় না। শুধু তাই নয়, সেখানে ভাষার ক্ষেত্রে কিছু শিথিল মানসিকতা দিয়েও সেই মাতৃভাষার আন্দোলনকে বাগে আনা যায় না।
প্রসঙ্গত স্মরণীয়, ১৯৫৫-তে পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা একাডেমি গঠন করে দুধের বদলে পিটুলি গোলা দিয়েও ভোলাতে পারেনি। আসলে তা ভোলানো যায় না। যেখানে অস্তিত্বই ধ্বংসের মুখে, সেখানে মূকও মুখর হয়ে ওঠে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সেই মাতৃভাষার আন্দোলনে দেশের ৮৫ শতাংশ আপামর আমজনতাই ভাষাসৈনিক। সেই মাতৃভাষার সৈনিকরাই ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের সবুজ পতাকার মাঝে রক্তিম সূর্য নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে দেশভাগ হয়েছে, মানুষ ভাগ হয়েছে, ভাষাও এপার-ওপারে ভাগ হয়েছে, কিন্ত মাতৃভাষাকে কেউ ভাগ করতে পারেনি। অস্তিত্বের পরশেই তার সরব প্রকাশ। এজন্য তা অবিভাজ্য, অবিচ্ছিন্ন সত্তায় বিরাজমান। সেই মাতৃভাষার কণ্ঠরোধ করার উপক্রম হলেই তার প্রতিরোধে সামিল হওয়ার জন্য পূর্ব প্রস্তুতি বা প্রেরণার প্রয়োজন হয় না, স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই তার বিরুদ্ধে আমজনতার কণ্ঠ জীবনপণ প্রতিবাদে গর্জে ওঠে।
এভাবেই উঠে এসেছে ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ মে’র রক্তাক্ত সংগ্রাম। সেখানে ভাষার পরিশুদ্ধতা বা ধনসম্পদ তার নেই, কিন্তু আকাঁড়া প্রকৃতির সবুজ প্রাণের পরশে রয়েছে আত্মিক যোগ। সেই যোগের পরিচয়ে বাঙালির ভাষিক পরিচিতি আজ শ্লাঘার বিষয় হয়ে উঠেছে। সেখানে বাংলা ভাষার নয়, বাঙালির মাতৃভাষাই সমান সচল। আসলে বিশ্বায়নের যুগে ভুবনগ্রামে ভাষিক পরিচয়ের সঙ্কট সেই অর্থে নেই। সেখানে মাতৃভাষার আত্মিক সঙ্কটকে অনিবার্য করে তুলেছে। একদিকে যেমন তার বহুভাষার বা জাতীয়বাদী এককভাষার আভিজাত্যবোধ শ্রীবৃদ্ধিমান, অন্যদিকে তার আগ্রাসী প্রভাবে মাতৃভাষা ক্রমহ্রস্বমান। সেই প্রেক্ষিতে বাঙালির মাতৃভাষা যখন বিদেশেও আপন অস্তিত্বে মর্যাদা লাভ করে, তখন তার বনেদিয়ানাই স্বীকৃতি পায়। অন্যদিকে ভাষার আভিজাত্যের মধ্যে তার মাতৃভাষার অস্তিত্বও বর্তমান।
লেখক, প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।
মনোজ্ঞ লেখা।পড়ে সমৃদ্ধ হলাম।প্রাঞ্জল ভাষায় সুন্দর বিশ্লেষণ।
❤️❤️❤️ খুব ভালো লাগলো স্যার।।❤️❤️❤️