রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’-এ মানুষের দেহে স্বতন্ত্র হলেও মনে ঐক্যপ্রত্যাশীর কথা তুলে ধরেছেন। দেশের মানুষের ক্ষেত্রেও সেই ঐক্যবোধ অস্বাভাবিক নয়। সেক্ষেত্রে ভারতের মতো বহু ভাষার দেশে জাতীয়তাবোধে ভাষিক ঐক্যচেতনার বিষয়টি আপনাতেই প্রাসঙ্গিকতায় উঠে আসে এবং তার বাস্তবায়নে সক্রিয় উদ্যোগও শুরু হয়। অথচ তার মান্যতায় অনৈক্যবোধের পরিচয়ও সুবিদিত। সেখানে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দিভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করে তোলার মানসিকতায় অন্যান্য ভাষাভাষী রাজ্যের অসমর্থনও স্বাভাবিক হয়ে আসে। সম্প্রীতি কেন্দ্রে নতুন সরকারের খসড়া শিক্ষানীতিতে যে-সব বিষয় গণমাধ্যমের দৌলতে সারা দেশে চর্চার পরিসর তৈরি করেছে, তার মধ্যে নতুন শিক্ষানীতিতে সেই ভাষিক বিস্তার নতুন করে বিতর্ককে আমন্ত্রণ জানায়। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ত্রিভাষা শিক্ষানীতিতে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিতর্কের অবকাশ তৈরি করে এবং তার প্রতিবাদে ইতিমধ্যে তা আবশ্যিকের পরিবর্তে ঐচ্ছিক বলে ঘোষণা করা হয়। এভাবে বহু ভাষাভাষী দেশে একটি ভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া নিয়ে বাংলায় সেভাবে প্রতিবাদ লক্ষ করা যায়নি। বরং রাজনৈতিক কারণেই হোক বা দেশজ চেতনাতেই হোক তার পক্ষ-বিপক্ষের যুক্তি-প্রতিযুক্তির পরিসর তৈরি করেছে। সেখানে তামিলনাড়ুর মতো নিজের ভাষার মতো তীব্র স্বাভিমানবোধ বাঙালিমানসে নিবিড় হয়ে ওঠেনি। যেন হলেও ভালো, না-হলেও মন্দ নয়। এরূপ উদাসীন, উদার এবং নিরপেক্ষ মানসিকতা কতটা প্রত্যাশিত ও স্বাস্থ্যকর, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আপনাতেই প্রকাশমুখর। বিশেষ করে যে বাঙালি আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্বের মাতৃভাষার প্রতি সম্মানবোধ এনে দিয়েছে, সেই বাঙালির মধ্যে অন্যভাষার আধিপত্যকে মেনে নেওয়ার মধ্যে বিরূপ মানসিকতার অভাব এত তীব্র কেন, তা আপনাতেই ভাবিয়ে তোলে। শুধু তাই নয়, যে হিন্দি ভাষার আগ্রাসী আধিপত্যে বাঙালিকে স্বদেশে পরবাসী হতে হয়েছিল, সেই হিন্দির প্রাধান্যে বাংলার প্রতিবাদ গর্জে ওঠে না।
দেশ স্বাধীনতা হওয়ার পরেও ১৯৪৮-এর ১৪ জুন থেকে ১৯৫৬-এর ১ নভেম্বর পর্যন্ত মানভূমের ধারাবাহিক ভাষা আন্দোলনের তিক্ত অভিজ্ঞতাও সেখানে বিস্মৃত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে হিন্দি ভাষার বিস্তারে বাঙালিরই ভূমিকা অবিস্মরণীয়। সেক্ষেত্রে তার উদার মহানুভবতায় হিন্দির অগ্রগতিতেই তার প্রান্তিক পরিসরও আরও শ্রীবৃদ্ধি লাভ করেছে। ভাষা নিয়ে বাঙালির স্বাভিমান তার শ্রেষ্ঠত্ববোধে সেভাবে সক্রিয় হতে পারেনি। অথচ সক্রিয় হওয়ার পরিবর্তে বাঙালিমানসে উদাসীনতার উদারতা ছড়িয়ে পড়েছে। দেশে হিন্দি ভাষা প্রাধান্যের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার ভূমিকায় বাংলা তার স্বক্কীয় সত্তায় পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারত। সেখানে তামিলনাড়ু আমাদের অগ্রদূত হয়ে উঠেছে। অথচ প্রয়োজনবোধে বাঙালি কীভাবে গর্জে উঠতে পারে, তার পরিচয়ও বর্তমান।
দেশের প্রধান ভাষা হিসাবে হিন্দির প্রচলনে উদ্যোগী হওয়ার বিষয়টি দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব থেকে সক্রিয় ছিল। সেখানে তার তীব্র প্রতিবাদও লক্ষণীয়। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে তার তীব্র প্রতিবাদ সক্রিয়তা লাভ করে।
১৯৩৭-এ প্রথম ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সরকারের বিদ্যালয়ে হিন্দিভাষা শিক্ষার বাধ্যমূলকতার বিরুদ্ধে সি রাজাগোপালচারীর নেতৃত্বে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির বিদ্যালয়গুলিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে রাজাজি সেবিষয়ে নরম মনোভাব নিলেও বিশেষ করে তামিলনাড়ুতে তীব্র অনীহা গর্জে ওঠে। এজন্য ঐক্যমত্যের অভাবে ও বিচ্ছিন্নতাবোধে ১৯৫০-এ দেশে সংবিধান গ্রহণের সময় পরিকল্পনামাফিক প্রথম পনেরো বছর পর্যন্ত সরকারি কাজের ভাষারূপে দেবনাগরী হরফে হিন্দির সঙ্গে তার সহায়ক ভাষা হিসাবে ইংরেজিকেও সামিল করা হয়। সেক্ষেত্রে ধীরে ধীরে ইংরেজি ব্যবহার হ্রাস করে প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে হিন্দিকেই শেষে সরকারি ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করার লক্ষ্য ছিল। দক্ষিণ ভারতে অহিন্দিভাষী মানুষের কাছে সেই পরিকল্পনা ষড়যন্ত্র হয়ে ওঠে এবং তার তীব্র প্রতিবাদ সংগ্রামমুখরতা লাভ করে। এজন্য ১৯৬৩-তেই সরকারি ভাষা আইনে ১৯৬৫-এর পরেও সেই ধারা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। আবার ১৯৬৪-তে সরকারিভাবে ইংরেজি তুলে দেওয়ার প্রয়াসও সেক্ষেত্রে প্রতিবাদে সাফল্য লাভ করেনি। তাতে দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে উত্তরভারতের একাধিক রাজ্যও সামিল হয়েছিল। ১৯৮৬-তে কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতিতে নবোদয় বিদ্যালয়ে হিন্দি ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা বিস্তারের পরিকল্পনা অন্যত্র বাস্তবায়িত হলেও তামিলনাড়ুতে সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে স্বদেশি হিন্দি ভাষার বিরোধিতায় বিদেশি ইংরেজি ভাষার মান্যতার বিষয়টি আপাতভাবে স্ববিরোধী মনে হতে পারে। অবশ্য সেদিক থেকে ঘরের লোককে পর করে বাইরের লোক্ককে আত্মীয় ভাবার বিষয়টি নিয়ে সেরকম উচ্চবাচ্য না হলেও দেশে হিন্দি ভাষার প্রাধান্য নিয়ে বিতর্কের অবকাশ এখনও চরৈবেতি। সেখানে বাংলা দেশের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষার অধিকারী হওয়া সত্বেও বাঙালিমানসে হিন্দিকে চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে সেভাবে আন্দোলন দানা বাঁধেনি। উল্টে হিন্দি ভাষাকে জাতে তোলার জন্যই হোক বা তার জাতীয় স্তরে প্রাধান্য লাভের ক্ষেত্রেই হোক বাঙালির উদারতা প্রথমাবধি সচল রয়েছে।

বিহারের বিদ্যালয় পরিদর্শক হিসাবে সাহিত্যিক ভূদেব মুখোপাধ্যায় সাধারণ লোকের সুবিধার্থে ফারসির পরিবর্তে হিন্দি ভাষা প্রচলনের জন্য রীতিমতো আন্দোলন করেছিলেন। তাঁর জন্যই বিহারে হিন্দি ভাষা যথাযোগ্য মর্যাদা লাভ করে। ভূদেব মুখোপাধ্যায় সর্বভারতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দিকেই সুযোগ্য মনে করতেন। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও তিনি আশা ব্যক্ত করেছেন। ভূদেব মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘সামাজিক প্রবন্ধ’ (১৮৯২)-এ লিখেছেন : ‘ভারতবাসী চলিত ভাষাগুলির মধ্যে হিন্দী-হিন্দুস্থানীই প্রধান এবং মুসলমানদিগের কল্যাণে উহা সমস্ত মহাদেশে ব্যাপক। অতএব অনুমান করা যাইতে পারে যে, উহাকে অবলম্বন করিয়াই কোন দূরবর্তী ভবিষ্যকালে সমস্ত ভারতবর্ষের ভাষা সম্মিলিত থাকিবে।’ সাহিত্যিক ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ও অনুরূপ বিশ্বাস করতেন। এজন্য তিনি উড়িশ্যায় হিন্দি প্রচলনে ‘বাঙ্গালা উঠাইয়া দিয়া’র কথাও ব্যক্ত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সরকারি কাজের ভাষা হিসাবে হিন্দিকে সুপারিশ করেছেন। আবার ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের হিন্দি ভাষাপ্রেম তো সুবিদিত। অথচ বাঙালির এই হিন্দি ভাষাপ্রীতি সেক্ষেত্রে দুর্বলতার অবকাশ তৈরি করেছে। হিন্দিভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যে বাঙালির ভাষা সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। মানভূম ভাষা আন্দোলন তারই ফসল। সেখানে বিহার সরকারের বাংলা ভাষার কণ্ঠরোধের প্রতিবাদে সেদিনও গর্জে উঠেছিল মাতৃভাষার প্রতি তীব্র স্বাধিকারবোধ। ভজহরি মাহাতো রচিত সেই সাড়া জাগানো গানের তার মূর্ত পরিচয় ফুটে উঠেছে : ‘শুন বিহারী ভাই/তোরা রাখতে নারবি ডাঙ্গ দেখাই/(তোরা) আপন স্বার্থে ভেদ বাড়ালি/বাংলা ভাষা দিলি ছাই।/ভাইকে ভুলে করলি বড়/বাংলা-বিহার বুদ্ধিটাই……বাংলা ভাষার দাবীতে ভাই/কোন ভেদাভেদ নাই।/এক ভারতে ভাইয়ে ভাইয়ে/মাতৃভাষায় রাজ্য চাই।’ সেখানে পরিকল্পনামাফিক হিন্দি ভাষার আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে তার জাতীয় ভাষার অস্তিত্বকে প্রকট করার সক্রিয়তায় বাঙালিমানসে তা নিয়ে কোনোরকম তাপ-উত্তাপ ঘনীভূত হয় না। শুধু তাই নয়, বাঙালির মধ্যে নিজের মাতৃভাষার পরিবর্তে অস্তিত্ব-সংকটে হিন্দিকে আপন করে ভারতীয় হয়ে ওঠার প্রয়াস সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সেক্ষেত্রে ইংরেজির সঙ্গে হিন্দিকে মেলালে চলবে না।
ইংরেজি অনেক দিন পূর্বেই আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা হয়ে উঠেছে। সেটি কোনো জাতির বা দেশের ভাষা নয়। তাছাড়া ইংরেজি টিকে আছে তার ব্যবহারিক উপযোগিতায়, তার অবিকল্পতায় এবং তার গ্রহণযোগ্যতার আভিজাত্যবোধে। সেদিক থেকে হিন্দির জাতীয়তাবোধে ইংরেজিকে বিজাতীয় করে তোলাও সমীচীন নয়। দেশে হিন্দির মতো আরও ২১টি সংবিধান স্বীকৃত ভাষা বর্তমান। সেগুলিকে উপেক্ষা করে করে শুধুমাত্র জাতীয়তাবোধের তীব্রতায় হিন্দিকে ‘রাজভাষা’ বা রাষ্ট্রীয় ভাষায় উন্নীত করার পরিকল্পনার মধ্যে কল্পনা আর বাস্তবের বিভেদ আপনাতেই প্রকট হয়ে ওঠে। এমনিতেই গণমাধ্যমের দৌলতে বিশেষ করে বলিউডি সিনেমার জনপ্রিয় হাতছানিতে হিন্দি ভাষার বিস্তার সাধারণ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে তার ছায়ায় প্রাদেশিক ভাষাগুলিও অস্তিত্ব-সংকটে পড়েছে। সেখানে বাঙালিদের মধ্য নিজেদের ভাষাগৌরবের প্রত্যয়ী মানসিকতায় জাতীয় স্বার্থে হিন্দির একনায়কত্ব মেনে নেওয়ার মধ্যে শুধু স্বাভিমানের অভাববোধই প্রকট হয়ে ওঠে না, স্বকীয় অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তোলে। মানুষের অস্তিত্বে তার মাতৃভাষা অবিচ্ছিন্ন সত্তায় আত্মিকভাবে আবদ্ধ। সেই মাতৃত্বকে বিমাতৃত্বের দিকে সক্রিয় করলে শুধু মা নয়, তার সন্তানও তার শিকার হতে বাধ্য। সেক্ষেত্রে দেশে ভাষিক অস্তিত্বে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হওয়ার পথটি আপনাতেই সুগম হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ধর্মও সেখানে ব্যাহত হয়ে ওঠে। সকলের প্রাধান্যেই দেশের গণতান্ত্রিক পরিসর আদর্শায়িত হয়েছে। সেখানে ভাষা শেখায় অসুবিধা নেই, এক ভাষাকে উচ্চকিত করতে গিয়ে অপর ভাষাগুলিকে নিম্নগামী করাতেই আপত্তি। ভাষার ধর্ম প্রকাশ করা। সেই প্রকাশের দৌরাত্ম্যে বৈষম্যবোধে ঐক্যবোধও ব্যাহত হতে বাধ্য। সেদিক থেকে ভাষা শিক্ষা হোক মুক্ত, ঐচ্ছিক এবং আবেদনক্ষম।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।