দেশজুড়ে মূল্যবৃদ্ধি, পেট্রোল-ডিজেল-সহ রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে পাঁচটি বামপন্থী দল আগামী ২৫ থেকে ৩১ মে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কর্মসূচি করবে। কেন্দ্র-বিরোধী এই কর্মসূচির ডাক দিয়েছে সিপিআইএম, সিপিআই, আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক এবং লিবারেশন। আলিমুদ্দিনের বৈঠকে এই আন্দোলনকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আরও বেশি দলকে শামিল করতে অন্যান্য দলের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিমান বসুকে।
তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি ও কেন্দ্রের বুলডোজার নীতি ছাড়াও এই কর্মসুচিতে দেউচা-পাঁচামি, আনিস-কাণ্ড, নিয়োগ-দুর্নীতির অভিযোগে রাজ্যের বিরুদ্ধেও আন্দোলনের কথা বলেছে লিবারেশন। প্রসঙ্গত, একুশের বিধনাসভা ভোটের আগেও সিপিআইএমএল লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য জানিয়েছিলেন, তৃণমূল নয়, বিজেপিকেই বামেদের প্রথম শত্রু হিসেবে দেখা দরকার, প্রয়োজনে তৃণমূলের সঙ্গে জোট করার কথাও বলেন তিনি। কিন্তু এবার অবস্থান বেশ কিছুটা বদলে সিপিএমের অবস্থানেই গলা মেলালেন। প্রধান শত্রু হিসেবে বিজেপিকে রেখে নতুন স্লোগান তৈরি করলেন- ‘তৃণমূলকে ছাড় নয়, বিজেপিকে ভোট নয়’। অর্থাৎ এতদিন তৃণমূল সম্পর্কে লিবারেশন যে মনোভাব পোষণ করতেন এখন তা অনেকটাই পরিপন্থী হল।
উল্লেখ্য, বালিগঞ্জের উপনির্বাচনেও সিপিআইএমএল তৃণমূল প্রার্থী বাবুল সুপ্রিয়কে ভোট না দিয়ে তারা সরাসরি সায়রা হালি্মকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। তারা বলেন, বিরোধী দল হিসেবে বিজেপিকে দুর্বল করে বামেদেরই প্রধান শক্তি হতে হবে। বিজেপি হটাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বড়াই করে বলেছিলেন, ‘আমি সব বামপন্থী নেতাদের খারাপ মনে করি না। দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের মতো বামপন্থীদের আমি সম্মান করি। কারণ ওঁরা বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অনেক আন্তরিক। কিন্তু দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বিজেপির বিরুদ্ধে একজোট হওয়ার প্রয়োজনে বললেন, তৃণমূল সরকারকেও কোনও ছাড় দেওয়া যাবে না।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালে বিহারের ভোটে সিপিআইএমএল লিবারেশন সিপিএম ও সিপিআইয়ের সঙ্গে জোট করে ২৯টি আসনে লড়ে ১৬টি আসন জেতে। তারমধ্যে সিপিআইএমএল একাই পেয়েছিল ১২টি আসন। তারপর একুশের বাংলা বিধানসভা ভোটের আগেও দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী বন্ধুদের বোঝা উচিত বড় শত্রু বিজেপি। তৃণমূল ও কংগ্রেসকে বিজেপির সঙ্গে একই বন্ধনীতে রাখা ঠিক হচ্ছে না। বিজেপির বিরুদ্ধে একজোট হতে তিনি তৃণমূলকে সঙ্গে নেওয়ার কথাও বলেছিলেন। লিবারেশন সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসের পাশে দাঁড়ালে তা নিয়ে জোর চর্চাও হয়। বিজেপিকে ঠেকাতে তামিলনাড়ুতে ডিএমকে বা বিহারে আরজেডির সঙ্গে জোট হলে বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হবে না কেন? লিবারেশনের এই প্রশ্নে আরও জোরদার সমলোচনা হয়। সিপিএম ও লিবারেশনের মতাদর্শগত পার্থক্য দেখা দেওয়ায় ঐক্যবদ্ধ বামফ্রন্ট ধাক্কা খায়। বাধ্য হয়ে বাম জোটে ফাটল দেখা দেয়। আলাদা লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় লিবারেশন নেতৃত্ব। ‘নো ভোট টু বিজেপি’ বলে প্রচার চালায় তারা।
সেদিন লিবারেশনের তৃণমূলকে সমর্থন ভালভাবে নেয়নি আলিমুদ্দিন। তারা বিজেপি বা তৃণমূল কাউকেই ছাড় দিতে নয়। যদিও দীপঙ্করবাবুর ব্যাখ্যা, “আমরা কিন্তু তৃণমূলের সঙ্গে জোট বা সমঝোতা করার কথা বলিনি! আমাদের বক্তব্যের কিছু ভুল ব্যাখ্যা হয়েছে!’’ আজ তিনি বলছেন, আকাশ ছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি দেশবাসীকে গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে। রান্নার গ্যাসের দাম হাজার টাকা পার করে গিয়েছে। গত আট বছরে মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। সীমাহীন বেকারত্ব, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা ক্রমশ কমছে, দেশের অর্থনীতি গভীর খাদের মুখে। অন্যদিকে তৃণমূল দেউচা পাঁচামীতে পরিবেশ বিরোধী, জনবিরোধী কয়লাখনি প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ছাত্র আন্দোলনের নেতা আনিস খান হত্যা থেকে শুরু করে বগটুই হত্যাকান্ডের নেপথ্যে তৃণমূল নেতা ও পুলিশ প্রশাসনের গভীর সংযোগ রয়েছে। ‘জন-বিরোধী’ প্রশাসনের বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে গেলে বামপন্থী ও সমমনোভাবাপন্ন সব শক্তির আরও বৃহত্তর, বিকল্প মঞ্চ গড়ে তোলা দরকার।
কিন্তু বৃহত্তর বাম ঐক্য গড়ে তুলতে গেলে বামপন্থার কয়েকটি মৌলিক দিককেই তুলে ধরতে হয়। সেটা কি শুধুমাত্র ভোট কিম্বা ভোটকেন্দ্রিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সফল করা? সিপিএম যতদিন ক্ষমতায় ছিল ততদিন অন্য বামপন্থী দলগুলিকে সংগঠন করতে বাধা দিয়েছে। নকশালপন্থী দলগুলিকে তো কাজ করতেই দেয়নি, নানাভাবে হেনস্তা করেছে। এমনকি নিজেদের শরিক দলগুলির প্রতিও ছিল চরম অবহেলা। আজ ক্ষমতা হারিয়ে মুখে বাম ঐক্যের কথা বললেও সেই আচরণ পুরোপুরি পাল্টাতে একথা কোনও যুক্তিতে মানা যায়না। কিন্তু তা সত্ত্বেও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বামপন্থী সংগঠনগুলি সিপিএমের বৃহত্তর, বিকল্প,বর্ধিত ইত্যকার বামফ্রন্টীয় তত্ত্ব গিলছে। তাছাড়া যারা এত বছর ধরে বাম আন্দোলনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল তাদের সঙ্গে কতটা পথ একসঙ্গে হাঁটা যাবে, কতদিন ঐক্য টিকিয়ে রাখা যাবে সেটাই বিরাট প্রশ্ন।