১৮৮৫ সালের এপ্রিল মাস। খুব গরম পড়েছে সেবার কলকাতায়। সেই সময় লন্ডন থেকে জাহাজে চড়ে বরফ কলকাতায় এসেছে। প্রখর গ্রীষ্মে ঠাকুর কষ্ট পাচ্ছেন দেখে ভক্তরা অনুরোধ করে বরফ খাবার। শরবৎ পানীয়র সঙ্গে বরফ ব্যবহার করে ঠাকুর বালকের ন্যায় আনন্দ পেলেন।
একদিন কলকাতা থেকে বরফ কিনে গামছায় জড়িয়ে পায়ে হেঁটে শশী (পরবর্তীকালে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ) দক্ষিণেশ্বরে আসলেন। ঠাকুর তাঁর ঐকান্তিকতা, বুদ্ধি এবং রৌদ্রে দেহ ঘর্মাক্ত ও মুখ শুষ্ক দেখে ব্যথিত কণ্ঠে তারিফ করে বললেন, “আহা! তোর বড়ো কষ্ট হয়েছে! দ্যাখ, যার হাতে জল গলে না, লোকে তাকে কৃপণ বলে; কিন্তু আমি দেখছি তুই কৃপণ নস, তুই দাতা”।
ঠাকুরের গৃহীভক্ত দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার নিজ বাড়িতে ‘বসন্ত নবরাত্রি ব্রত’ মহোৎসবের (সম্ভবত ১৮৮৫-এর ৮ এপ্রিল) আয়োজন করে ঠাকুরকে নিয়ে যান। তিনি প্রচুর পরিমাণে কুলফি বরফ আনিয়ে রেখেছিলেন। এমনি ঠাকুরের শরীরে কোন সমস্যা নেই। অসুখ বলতে আমাশয় আর বায়ুবৃদ্ধি রোগ। ঠাকুর ও তাঁর ভক্তরা মনের আনন্দে কুলফি সেবা করলেন।
পরের দিন সকালে ঠাকুর অনুভব করলেন ঢোঁক গিলতে গেলে গলায় লাগছে। টাকরায় একটা অস্বস্তি। হয়তো অতিরিক্ত বরফ খাওয়ার ফলে ঠাণ্ডা লেগেছে। বৈশাখের শুরুতেই শুরু ব্যাথা। একই পরিস্থিতিতে এলো জৈষ্ঠ্য। ব্যাথা কমা তো দুরের কথা, বেশি কথা বললে — সমাধিস্থ হাওয়ার পর ব্যথা বাড়ছে, কন্ঠ তলে সামান্য ফুলছে। টোটকা, প্রলেপ কিছুতেই উপকার হলো না।
ঠাকুরের যুবক ভক্ত শরচ্চন্দ্র কলকাতার থেকে দক্ষিণেশ্বরে ডেকে আনলেন রাখাল ডাক্তারকে। ডাক্তার দু-ধরনের ওষুধ দিলেন। সেবকদের বললেন, কথা কম বলার জন্য আর বারবার সমাধিস্থ না হওয়ায় জন্য। দোহারা চেহারার এই ডাক্তারের আঙ্গুলগুলি ছিলো মোটা মোটা। তাই তিনি যখন ঠাকুরের গলায় আঙ্গুল চালিয়ে পরীক্ষা করতেন ঠাকুরের খুব কষ্ট হতো।
১ সেপ্টেম্বর ১৮৮৫। ভক্তের সমাগমে দক্ষিণেশ্বরে জন্মাষ্টমী পালন হচ্ছে। দুর্বল শরীর নিয়ে কালীঘরে, বিষ্ণুঘরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কামারহাটির গোপালের মা তাঁর জীবন্ত গোপালের জন্য নিজের হাতে খাবার তৈরি করে এনেছেন। দু-চোখ ভরে জল নেমে ঠাকুরকে বলছে, ‘তুমি তো খাবে না’। গিরিশচন্দ্র কাঁদতে কাঁদতে এলেন। ঠাকুরের চরণে মাথা রেখে বলছেন, “তুমিই পূর্ণ ব্রহ্ম। তা যদি না হয়, সবই মিথ্যা। বড় খেদ রইলো তোমার সেবা করতে পেলুম না।”
চিকিৎসার জন্য ঠাকুরকে দক্ষিণেশ্বর থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয় সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। খেতে কষ্ট হচ্ছে। শরীর ক্রমশঃই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আসলে, ঠাকুর স্ব-ইচ্ছায় নিজেকে গুটিয়ে আনছেন। যে দায়িত্ব নিয়ে এই ধরাধামে তাঁর আসা, কয়েক মাসের মধ্যেই তার সমাধা করতে হবে। দেহের অসুখ একটি ছল। কাজ সমাপ্ত হলেই খোলস ত্যাগ করবেন।
শরীরের এই অবস্থায় রাঘব পন্ডিতের চিড়া উৎসবে পানিহাটির গঙ্গাতীরে গেলেন সদলে। বৈষ্ণবদের বিরাট উৎসব ও মেলা। এর আগেও গেছেন কিন্তু এটাই ছিলো তার শেষবার। ভক্তির ঝড় বইয়ে দিলেন। কার শরীর, কিসের শরীর!! প্রেমানন্দের মহা হিল্লোল। পরের দিন ব্যথা বাড়লো। তাঁর কন্ঠ তালুদেশ থেকে প্রথম রক্তক্ষরণ আগস্ট ১৮৮৫। এই কন্ঠরোগ ক্রমে ক্যান্সারে পরিণত হচ্ছে। নরেন্দ্রনাথ, রামচন্দ্র, গিরিশচন্দ্র, দেবেন্দ্র, মাষ্টারমশাই প্রমূখ ভক্তেরা বুঝলেন ঠাকুরের বিদায়কাল আসন্ন। দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যানসারের ওষুধ তখন আবিষ্কৃত হয়নি। দক্ষিণেশ্বরে রেখে চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। বড় বড় ডাক্তার সব কলকাতায়।
কলকাতায় ঠাকুর যখন এলেন শহরময় রাষ্ট্র হয়ে গেল, “ওরে! শহরে এক প্রেমদাতা এসেছেন, মনের অবরোধ খুলে দিতে, সে এক রত্নাকর।” এইবার ঠাকুরের গলার ফাঁদে পড়লেন কলকাতার বৈদ্যকূল। দক্ষিণেশ্বর থেকে কাশীপুর উদ্যানবাটি এই পরিসরে এলেন বহু ডাক্তার। হোমিওপ্যাথি, কবিরাজী, এলোপ্যাথি কিছুই বাদ গেলো না। সব পথের চিকিৎসকরা ঠাকুরের চিকিৎসায় এলেন, কিন্তু তাঁরা ঘুণাক্ষরেও টের পেলেন না যে, চিকিত্সা হচ্ছে তাদের। ঠাকুর বসেছেন ‘ভব রোগ বৈদ্য’র আসনে। ঠাকুর বললেন — ভোগের পৃথিবীতে সন্ন্যাসীর ত্যাগ, সে কয়েকজনের জন্য। তোমাদের পথ ঈশপনিষদের পথ। শাস্ত্রবিহিত, শুভ কর্ম করে যাও, আর শাস্ত্র একটা কথাই বলে — ধর্ম-কর্ম।
এই চিকিৎসক মন্ডলী থেকে প্রকাশিত হলেন এক নক্ষত্রসম বিজ্ঞানী চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকার। শ্যামপুকুর বাটিতে ঠাকুর আর মহেন্দ্রলালের সাক্ষাৎকার যেন এক দৈব যোগাযোগ। ঠাকুরের সঙ্গে ঈশ্বরীয় কথাপ্রসঙ্গে তিনি মুগ্ধ হতেন। নিত্য নতুন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে একদিন বলেই ফেললেন, ‘এতদিনের পর আমি আমার হৃদয়ের বন্ধুটিকে পেয়ে গেছি।’ সমাধি অবস্থায় ঠাকুরের শরীর পরীক্ষা করে তাঁহাতে নিস্পন্দভাব লক্ষ্য করে বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, ‘As a man I have the greatest regard for him.’ উচ্চকোটির সাধক প্রাণের ক্রিয়া ইচ্ছামতো স্তব্ধ ও পুনরায় সক্রিয় করতে পারেন। শরীর বিজ্ঞানে যার কোন সঠিক ব্যাখ্যা নেই।
দক্ষিণেশ্বর থেকে মা সারদা এলেন শ্যামপুকুর বাটিতে। শুরু হলো তাঁর জীবনের শ্রেষ্ট তপস্যা। জীবন্ত বিগ্রহের চরণে নিজেকে সমর্পণ। মায়ের স্থান হলো তিনতলায়, ছাদে ওঠার সিঁড়ির চাতালে। শরৎ, শশী, কালী, ছোট গোপাল, নরেন্দ্রনাথ… যুবক ভক্তরা একত্রিত হয়ে নিজেদের ঘর বাড়ি ছেড়ে ঠাকুরের সেবায় নিয়োজিত করলেন। (চলবে।)
তথ্য সূত্র : ‘লীলা প্রসঙ্গ’ — স্বামী সারদানন্দজী, শ্রীম-র দিনলিপি, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত।
অপূর্ব লেখনী
থ্যাংক ইউ ❤️
শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ*কথা অমৃত সমান,প্রণাম ঠাকুর*
জয়তু রামকৃষ্ণ ????
Khub bhalo lekha
Dhonyobad ????