অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচন শেষ হল। ৪ জুন ফলাফল বেরিয়ে গেল। বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ পরাজিত হয়েছেন। পরের দিন সকালে তাঁকে ঘিরে ধরল সাংবাদিকরা। তিনি রোজ সকালে প্রাতঃভ্রমণে বের হন। সে সময়ে সাংবাদিকরা তক্কে তক্কে থাকেন। এদিনও ছিলেন। বিশেষ করে ছিলেন। কারণ গতবার তিনি মেদিনীপুর কেন্দ্র থেকে জিতেছিলেন। এবার তিনি সেখান থেকেই দাঁড়াবেন, তেমনি অলিখিত কথা ছিল। প্রার্থীদের তালিকা বেরিয়ে গেল কিন্তু দিলীপ ঘোষের নাম নেই। বঙ্গ বিজেপির অনেকেই অবাক। অনেক পরে নাম এল দিলীপ ঘোষের। কিন্তু এ কি রে বাবা! মেদিনীপুরের প্রার্থীকে পাঠিয়ে দিয়েছে বর্ধমান-দুর্গাপুরে!
এসব লিস্টি-ফিস্টি বানাচ্ছে কে! কেন, বিরোধী দলনেতা! তৃণমূল থেকে বিজেপিতে এসেছেন তিনি। কেউ কেউ বলেন আশ্রয় নিয়েছেন। অন্ধততামশঘন ঘোর রজনী, তাই বড় আশা করে এসেছি গো ….। সে অন্ধতামশ হল কেন্দ্রের এজেন্সি। বিজেপিতে এসেই তিনি ছড়ি ঘোরাতে শুরু করলেন। কট্টর তৃণমূলবিরোধী হয়ে গেলেন। সেই যে বলে না : নতুন কাকের গু খাইসে…। চলনে–বলনে কি দৃপ্ত ভঙ্গিমা! আর তাঁর তৃণমূল বিরোধিতার মূল সুর : পিসি-ভাইপো… পিসি-ভাইপো… পিসি-ভাইপো। এসব বলে বলেই তিনি মন জয় করে নিলেন শাহজি আর মোদিজির। তাঁরাই তাঁকে বঙ্গ বিজেপির ভাঁড়ার ঘরের চাবি দিয়ে দিলেন। আর তিনি দেখলেন পথের কাঁটা সরাতে হবে। সে কাঁটা দিলীপ ঘোষ। ঠোঁটকাটা মানুষ। ছাড়েন না নিজের দলের লোককেও।
দেখতে দেখতে এসে গেল লোকসভার নির্বাচন। পথের কাঁটা সরাবার সঠিক সময়। মেদিনীপুর থেকে সরিয়ে দিতে হবে দিলীপ ঘোষকে। ২০১৯-এ যে মেদিনীপুর থেকে ঘোষমশায় হেভিওয়েট তৃণমূল প্রার্থী মানস ভুইঞাকে হারিয়েছিলেন ৮৯ হাজার ভোটে। যুক্তি দেওয়া হল এবার মেদিনীপুরে দাঁড়ালে হেরে যাবেন তিনি। এই যুক্তি কোন যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তা কিন্তু জানতে চাইল না কেউ। চাণক্য বলে কথিত অমিত শাহ তো তখন শুভেন্দুর গরবে গরবিনি। মেদিনীপুরে বসাতে হবে নিজের লোককে। দিলীপ ঘোষ যাবেন বর্ধমান দুর্গাপুর। মেদিনীপুরে লড়বেন অগ্নিমিত্রা পল। বর্ধমান দুর্গাপুরের আলুআলিয়া যাবেন কোথায়? তিনি যাবেন আসানসোল। নিন্দুকেরা বলে এ ভাবে ২৮টি আসনে বিরোধী দলনেতা না কি নিজের মনোমত প্রার্থী দিয়েছেন। ফল যা হবার তাই হয়েছে। এক লপ্তে গেল তিনটি আসন। দিলীপ ঘোষ হেরেছেন দেড় লক্ষ ভোটে, অগ্নিমিত্রা পল হেরেছেন সাতাশ হাজার ভোটে, আলুয়ালিয়া হেরেছেন পঞ্চাশ হাজার ভোটে।
কিন্তু সে কিসসা যাক। ফিরে আসি দিলীপ ঘোষের কথায়। ফলাফল প্রকাশের পরের দিন সকালে তিনি সাংবাদিককে বললেন, ‘আমার হাতে থাকে লাঠি, ওদের হাতে থাকে কাঠি।’ কখনও লাঠি, কখনও ত্রিশূল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন দিলীপ ঘোষ। ঠিক। কিন্তু কাঠিটা কি আর সে কাঠি থাকে কার হাতে? কাঠিটা আসলে কাঠিবাজি, আর সেটা করে চলেছেন কে বা কারা, দিলীপ ঘোষ তা স্পষ্ট করে বলেন নি। সংবাদপত্রের প্রতিনিধিকে তিনি বলেছেন, ‘দল বর্ধমান-দুর্গাপুর আসনে জিততে পাঠিয়েছিল না হারতে তা জানি না। কেন মেদিনীপুর থেকে বর্ধমান-দুর্গাপুর পাঠানো হয়েছিল, এর পিছনে কোন ষড়যন্ত্র ছিল কিনা জানি না। কোনও ষড়যন্ত্র থাকতেই পারে। মেদিনীপুর ১ লক্ষ ভোটে জেতার পরিস্থিতি ছিল। সেখান থেকে কেন বর্ধমান-দুর্গাপুরে সরানো হল তা জানি না। দলের নির্দেশে বর্ধমান-দুর্গাপুর আসনে লড়াই করতে যাই। কিন্তু ওখানে পিছন থেকে কাঠিবাজির জন্য জিততে পারি নি।’
বুঝতে কি অসুবিধে হয় আমাদের? একদম নয়। ঘুরে ফিরে এসে যায় সেই বিরোধী দলনেতার কথা। কাঠিবাজির অভ্যেসটা অনেকদিনের তাঁর। নিজে বিজেপিতে গিয়ে আরও কয়েকজনকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সবাই অবশ্য থাকেন নি শেষ পর্যন্ত। যে পিসির দৌলতে তাঁর লাইম লাইটে আসা, সেই পিসিকে মাত্রাহীন গালাগালি করতে তাঁর বাধেনি। আর ভাইপো তাঁর কাছে কয়লাচোর, গরুচোর ছাড়া অন্য কিছু নয়। এই পিসি-ভাইপোকে জেলের ঘানি টানাবার, তাঁদের দলকে বঙ্গোপসাগরে বিসর্জন দেবার কত ডেডলাইন যে তিনি দিয়ে গেলেন দু-বছরে, তার অন্ত্য নাই গো নাই।
কিন্তু এ বারের নির্বাচন সব হিসেব ওলোট-পালট করে দিল। তাঁর নেতৃত্বে জল ঢেলে দিল মানুষ। আর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল ভাইপোর নেতৃত্ব। দিল্লি থেকে ডাক এসেছে তাঁর। আগে যেমন নেতাজির ‘দিল্লি চলো’র মতো তিনি বুক ফুলিয়ে দিল্লি যেতেন, এবারে আর তেমন হবে না। কেননা তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। মুখে চুন-কালি লেপে দিয়েছেন বড়কর্তাদের। ২৫ তো দূরের কথা, থেমে যেতে হয়েছে ১২ তে। ছেড়ে কথা কি বলবেন মোদি-শাহ ? তার উপর মোদি_শাহের সে বিক্রম যে নেই। নিতীশ –নাইডুর অন্যায় আবদারের কাছে নত করতে হচ্ছে মাথা। কুর্সি রাখার জন্য তা না করে উপায় নেই যে! আর সেই জন্য হেরো শুভেন্দুর দিকে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। এর আগে তার অনেক অন্যায় আবদার মেনে নিয়েছেন। ঘন ঘন পাঠিয়েছেন নানা এজেন্সিকে। করেছেন এই কারণে যে বঙ্গের আসন বাড়বে। বাড়া তো দূরের কথা কমেই গেল। তাহলে আর কদর কেন শুভেন্দুর?
তাই মহা ফাঁপরে বিরোধী দলনেতা।
সেই যে বলেছি : অন্ধ তামশঘনঘোর রজনী। এবার তিনি কার কাছে যাবেন বড় আশা করে? না কি দেব্রবত বিশ্বাসের মতো সুরে সুরে বলবেন : বড় আশা করে এসেছি গো জননী কোলে তুলে লও…
সেই জননী কে?
কে সেই জননী?
কিন্তু দিলীপ ঘোষের হাতের লাঠি কি একেবারেই চুপ থাকবে? কাঠিবাজি বন্ধ করার জন্য সে লাঠি কি চুলবুল করবে না?
তাহলে মহা সংকটে পড়বেন যে বিরোধী দলনেতা। ঘরে কুমির ডাঙায় বাঘ। শান্তিকুঞ্জেও ধাঁ করে ঢুকে পড়বে চরম অশান্তি। তাঁর চারদিকে যখন বাঁকা জল করিবে খেলা, তখন তাঁর পরিবারের লোকেরা কি থাকবেন তাঁর পাশে ? সেই দস্যু রত্নাকরের গপ্পো। রত্নাকরের সংকটের দিনে তার পরিবারের লোকেরা বলে, তুই পাপ করেছিস, আমরা কেন তোর পাপের ভাগীদার হতে যাব?
হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলে চলবেন : ফিরায়ো না জননী, বড় আশা করে এসেছি গো…