সুবেশ চৌধুরী একজন পুরস্কার প্রাপ্ত বুদ্ধিজীবী লেখক। সমাজের প্রতি তাঁর একটা দায়বদ্ধতা আছে। তাই তিনি বিভিন্ন আর্থসামাজিক সমস্যা নিয়ে লেখালিখি করেন। তাঁর লিখিত গুরুগম্ভীর রচনায় জীবনের সমস্ত তিক্ততা পাতায় পাতায় ফুটে ওঠে। দুষ্টু লোকেরা বলে, শুক্ত বা তেতো রাঁধতে গেলে মহার্ঘ সজনের ডাঁটা, উচ্ছে, করলা এসব না কিনে সুবেশ বাবুর বইয়ের একটু পৃষ্ঠা ছিড়ে রান্না করলেই চমৎকার তেঁতো হয়ে যাবে।
নিন্দুকেরা যাই বলুক, এমন খাতির কজন লোকই বা পায়! সম্প্রতি সরকারের কাছ থেকে অনুরোধ এসেছে সুবেশবাবুর কাছে বই লেখার জন্য। বইটির উদ্দেশ্য অতি মহৎ। গ্রামের গরীব মানুষেরা নানা রকম দুঃখ কষ্টে দিন কাটান। এদের মধ্যে অনেকেই নৈশ বিদ্যালয় বা বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রে লেখাপড়া শিখেছেন। এইসব সদ্য শিক্ষিত মানুষদের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। তাই তাদের জন্য সরস এবং প্রাঞ্জল ভাষায় হালকা চালে মজার বই লিখতে হবে।
বই লিখতে গিয়ে সুবেশবাবুর বেশ একটি কঠিন সমস্যা হলো। তিনি জন্মেছেন কলকাতার কালীঘাটে। ফ্ল্যাট কিনে হাজরা রোডে চলে এসেছেন। গ্রামের মানুষজন নিয়ে তিনি কখনোই কিছু লেখেননি। একবার এক শীতকালের সন্ধ্যায় গাড়ি করে ডায়মন্ডহারবার থেকে কলকাতায় ফিরবার পথে সুবেশবাবু দেখেছিলেন গেছুরেরা খেজুর গাছ বেয়ে উঠছে। ড্রাইভারের কাছে প্রশ্ন করলেন, ‘এই সন্ধ্যেবেলা এই লোকগুলো গাছে উঠছে কেন?’
জবাব পেলেন, ‘ওরা খেজুরের রসের হাড়ি নামানোর জন্য গাছে উঠেছে। রস খাবে, জ্বাল দিয়ে গুড় করবে।’
সেদিন সুবেশবাবু জানতে পেরেছিলেন খেজুরের গুড় হয় খেজুর রস দিয়ে, আখের গুড় হয় আখের রস দিয়ে আর তালের গুড় হয় তালের রস দিয়ে। এই ঘটনাটা মনে গেঁথে গেছিল সুবেশবাবুর।
সেদিনে তিনি যা যা দেখেছিলেন সেই অনুযায়ী পদ্য লিখে ফেললেন। প্রথমে লিখেছিলেন ‘ওই দেখো খেজুর গাছ’ কিন্তু ছন্দে না মেলার জন্য বাকি কিছু না পাল্টিয়ে খেজুর কেটে লিখলেন আখ।
কবিতাটি লিখে অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে সরকারি অনুদান অধিকর্তা ডা. ব্রহ্মলাল ব্রহ্মচারীকে ফোনযোগে সুবেশবাবু কবিতাটি পড়ে শোনান। পাড়াগ্রামে বড় হওয়া ডাক্তারবাবু, আখ গাছে রসের কলস শুনে হকচকিয়ে গেলেন। সুবেশবাবুকে সংশোধন করতে যাচ্ছিলেন কিন্তু হঠাৎ তার খেয়াল হল বইটা তো হাসির, গ্রামের লোকের এসব পড়লে যথেষ্টই হাসবে। সুতরাং ব্রহ্মচারী সাহেব সুবেশবাবুকে বাহবা দিয়ে বললেন, চমৎকার হয়েছে। তবে শুধু মনে রাখবেন রস আর গুড় নয়, গ্রামের লোকেদের কামার-কুমোর, ধোপা-নাপিত, চাষী, গরু, বাছুর, হাঁস মুরগির কথা, খরাবন্যার কথাও কিছু বলবেন। বইটির একটি চটকদার নাম দিন। সুবেশ চৌধুরী উত্সাহিত হয়ে বললেন, নাম ঠিক করেই রেখেছি “চাষীর মুখে হাসি”।
সুবেশ চৌধুরী জানতেন তার ক্ষমতা সীমিত। তাই রবীন্দ্র পরবর্তী কবিদের ধরতে গেলেন, প্রথমেই জীবনানন্দ দাশ, বনলতা সেন আর রূপসী বাংলা মিলিয়ে লিখলেন,..

হাজার বছর ধরে আমি মাছ ধরিতেছি বাংলার জলে বারাসাত পার হয়ে বসিরহাটের পথে বনগাঁর বিলে
মাছ ধরে, মাছ খেয়ে চলে যায় কাকা আর চিল
আমিও তাদের সাথে মাছ ধরি।
কিছুটা লেখার পর সুবেশ চৌধুরী বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা মোটেই জুতসই হচ্ছে না। এসব ইয়ার্কি হয়তো পাঠক খাবে না। বাধ্য হয়ে এবার তিনি নিজের লাইনে এগোতে লাগলেন।
ব্রহ্মচারী সাহেবের পরামর্শ মেনে সুবেশবাবু অনেক কবিতাই লিখে ফেললেন যেমন ধরুন —
(ক) তুমি ভাই কুমোর, /তোমার নাই গুমো।
(খ) ছুরি বানায় কাঁচি বানায়,/কামার মশাই হাঁপড় চালায়।
(গ) ধান গাছে ধান হয় পান গাছে পান/বর্ষার জল হয় খালে আসে বান,/শীতকালে লোকজন বেয়াই-বেয়ান।…
এত রচনার পরও, সরকার সুবেশ চৌধুরীর বইটি অনুমোদন করেননি। কবিতা লেখা সরকারের পছন্দ নয়, তাছাড়া সরস করতে গিয়ে সুবেশবাবু “চাষীর মুখে হাসি” বইটি খুব হালকা করে ফেলেছেন।
দ্বিতীয় ঘটনা খুবই বিস্ময়কর। সরকারের কাছ থেকে পান্ডুলিপি ফেরত নিয়ে সুবেশবাবু বইটি তার পুরনো প্রকাশক কে ছাপতে দিয়েছিলেন। বই ছেপে প্রকাশক তো বটেই সুরেশবাবুও অবাক। বইটি রাতারাতি বেস্ট সেলার হয়ে গেছে। আগে তার কোন বই সব শুদ্ধু ৪০০/৫০০ বিক্রি হতো। এখন সপ্তাহে ৫০০টি বিক্রি হচ্ছে। লোকের হাতে হাতে “চাষীর মুখে হাসি” বইটি ঘুরছে তাদের মুখে ঘুরছে ছড়া,
‘ওই দেখো আখ গাছ, গাছে গাছে রস
প্রতিটি গাছেতে তাই ঝুলিছে কলস।’
পাঠকগণ দয়া করে কোন চরিত্রের সঙ্গে মিল খোঁজার চেষ্টা করবেন না। নিছকই মজার সুবেশ চৌধুরির চরিত্রটি বা তাঁর কাহিনী আমার প্রিয় লেখক তারাপদ রায়ের লেখা। যদিও গল্পটি ছিল বেশ বড় কিন্তু স্বল্পপরিসরে শোনাবো বলে অনেকটা কাটছাঁট করলাম। উদ্দেশ্য একটাই, ‘বিশ্ব হাসি দিবস’এ পাঠকের মুখে এক চিলতে হাসি।
বিশ্বব্যাপী হাস্যযোগ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ডা. মদন কাটারীয়া ‘ফেসিয়াল ফিডব্যাক হাইপোথিসিস’ দ্বারা তিনি অনুপ্রাণিত হয়ে এই দিবস উদ্যাপন করেছিলেন ১৯৯৮ সালের ১০ মে তারিখে মুম্বাইতে। হাসির মাধ্যমে সৌভ্রাতৃত্ব এবং বন্ধুত্বের বিশ্বজনীন সচেতনতা বাড়ানোর জন্য ২০০৫ সাল থেকে লস এঞ্জেলেসে এই দিবস পালিত হচ্ছে এবং তখন থেকে কমেডি এবং হাসির প্রতি মানুষের ভালোবাসা প্রকাশ করার উপায় হিসেবে সারা বিশ্বে এটি ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব হাসি দিবস প্রতি বছর মে মাসের প্রথম রবিবার প্রাণখোলা অকারণ হাসি এবং এর অসংখ্য উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে পালিত হয়। বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশ আনন্দ ও উত্তেজনার সাথে বিশ্ব হাসি দিবস উদযাপন করে।
হাসি শরীরের স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল কমাতে সাহায্য করে, যা মানসিক এবং শারীরিক সুস্বাস্থ্যের দিকে ইঙ্গিত করে। এমনকি হাসি ওজন কমাতে সাহায্য করে এবং মুখের মূল পেশীগুলির জন্য একটি ওয়ার্কআউট প্রদান করতে পারে। হাসি শরীরে শক্তির বিস্ফোরণ সৃষ্টি করে যা ইতিবাচক এবং একটি আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।
আসলে আমরা সবাই আট থেকে আশি, দুঃখ ভুলে হাসতে ভালোবাসি। তাইতো গোটা পৃথিবী জুড়ে দীর্ঘকাল ধরে হাসির গল্প, উপন্যাস, ছড়া, কবিতা লেখা হয়ে আসছে। নিত্যদিনের জটিলতায়, হতাশায় জীবন যখন নাভিশ্বাস তোলে, পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হাসির খোরাক পাওয়া খুব জরুরী।
জেড যুগে সময়ের যাঁতাকলে আমরা যুদ্ধং দেহী হয়ে লড়ে চলেছি। ফলস্বরূপ আমাদেরর মুখে রাজ্যের বিষণ্নতা, চোখে অজানা আশঙ্কা, চোয়ালে ইস্পাতের কাঠিন্য। এই সকল সমস্যার মহৌষধ হলো নির্মল হাসি। সব হাসির কারণ না বুঝে বরং বিশ্ব হাসি দিবসে হাসি নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা ছেড়ে প্রাণ খুলে হাসুন আর সুকুমার রায়ের ভাষায় বলুন —
“ভাবছি মনে, হাসছি কেন? থাকব হাসি ত্যাগ ক’রে,
ভাবতে গিয়ে ফিকফিকিয়ে ফেলছি হেসে ফ্যাক ক’রে ৷
পাচ্ছে হাসি চাইতে গিয়ে, পাচ্ছে হাসি চোখ বুজে,
পাচ্ছে হাসি চিম্টি কেটে নাকের ভিতর নোখ গুঁজে৷”
দারুণ। পড়তে পড়তে হাসলাম।
খুব খুশি হলাম ❤️