ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বাজেট ঘোষণাতেই জানিয়েছিলেন, কয়েকটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাদ দিয়ে বাকিগুলির বেসরকারিকরণ করা হবে। এর মধ্যে দু’টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক এবং একটি সরকারি সাধারণ বিমা সংস্থাও আছে বলেও তিনি জানান।
দেশে বর্তমানে ৩০০ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা রয়েছে। কেন্দ্র সেই সংখ্যা ছেটে ২৪ করার কথা অনেকদিন ধরেই ভাবছে। কারণ সেগুলি নাকি ক্ষতিতে চলছে তাই সেই সব রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির বোঝা ঘাড় থেকে নামাতেই কেন্দ্রীয় বিলগ্নিকরণ দফতরের এই উদ্যোগ।
ইতিমধ্যেই, নীতি আয়োগকে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণের তালিকা করতে বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত তালিকায় অনুমোদন দেবে। জানা গিয়েছে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক প্রতিরক্ষা সমেত চারটি ক্ষেত্র বাদ দিয়ে বাদবাকি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জাতীয় সড়ক থেকে রেলস্টেশন, ট্রেনের রুট, বিদ্যুতের লাইন, গ্যাসের পাইপলাইন-পরিকাঠামো এমন আরও বহু সরকারি সম্পদ কর্পোরেট সংস্থার হাতে তুলে দিয়ে মোদী সরকার আগামী কয়েক বছরে ৬ লক্ষ কোটি টাকা ঘরে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। তালিকায় থাকতে পারে দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেন, কলকাতা মেট্রো রেলের পরিকাঠামোও।
সরকারি সম্পত্তি বেসরকারিকরণের কারণ সরকারের শূন্য ঝোলা ভরাট করা৷ বিমান পরিষেবাকে আগেই বেসরকারিকরণ করা হয়েছে এবার সেই তালিকা আরো লম্বা করা হবে। বেসরকারি করণের তালিকায় রয়েছে বিএসএনএল, এমটিএনএল-এর টেলিকম টাওয়ার, ফাইবার নেটওয়ার্কের মতো সংস্থাও৷
গত তিন দশকের বেশি সময় ধরেই বেসরকারিকরণের গল্পটা এদেশে চলছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এয়ার ইন্ডিয়ার বেসরকারিকরণের চেষ্টা যেমন আছে পাশাপাশি লোকসানের অজুহাতে ঋণগ্রস্ত সরকারি মালিকানাধীন ব্যাঙ্কগুলিকে বড় ব্যাঙ্কের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বেসরকারিকরণের গল্পটা হল অলাভজনক শিল্পগুলিকে সরকার আর ভর্তুকি দিতে পারছে না। ভর্তুকি দিতে গিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প প্রবলভাবে ব্যহত হচ্ছে। তাই সরকারি কোষাগারের চাপ কমাতে জনস্বার্থে জাতীয় সংস্থাগুলির অতি দ্রুত বেসরকারিকরণ প্রয়োজন। প্রসঙ্গত, পাঁচ দশক আগে দুনিয়াজুড়ে পুঁজিবাদ যে নয়া অর্থনৈতিক রূপরেখা আমাদের সামনে তুলে ধরেছিল— যার পোশাকি নাম বিশ্বায়ন— তার মোদ্দা বিষয় ছিল নিয়ন্ত্রণহীন বাণিজ্য, পুঁজির অবাধ চলাচল, পণ্য ও পরিষেবার বেসরকারিকরণ, শিল্প ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া, ট্রেড ইউনিয়নের অবলুপ্তি বা ক্ষমতাহ্রাস, শ্রমিকের অধিকার লুপ্ত করা অন্যদিকে পুঁজির হাত শক্ত করা। ইত্যাদি। এদেশে তার একটি সংস্কার রূপায়িত হয়েছে।
অতএব অলাভজনক তত্ত্বের হাত ধরে বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়ায় জোরালো হয়ে উঠেছে যে ব্যবসাবানিজ্য এবং পরিষেবা দেওয়া সরকারের কাজ নয়। এদেশে পুঁজিবাদী বিকাশের স্বার্থে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের উত্থান ও তার সম্প্রসারণ ঘটলেও পুঁজিবাদী বিকাশ পুঁজির মালিকদের স্বার্থেই ঘটে। যখন ব্যক্তি পুঁজির পায়ের তলার মাটি আলগা থাকে তখন রাষ্ট্র তাদের হয়ে মাঠে নামে পুঁজির পুঞ্জীভবন করতে, শিল্পের পরিকাঠামো গড়ে তুলতে। এবং কালক্রমে জনগণের অর্থ ও শ্রমের বিনিময় তৈরি এই সম্পদ বেসরকারি হাতে জলের দরে তুলে দেওয়া হয়।
তাই সরকার বেসরকারিকরণের পদক্ষেপে নেওয়ায় খুশি শিল্প-বাণিজ্যমহল। কারণ বহু দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ী মহলের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষায় শিলমোহর দিয়েছে মোদি সরকার। তাই শিল্প-বাণিজ্যমহলের বড়-ছোট কেষ্ট-বিষ্টুরা কেন্দ্রীয় সরকারের ঢালাও প্রশংসা করে। মোদি সরকারের বেসরকারিকরণের পদক্ষেপে উৎসাহিত হয়ে দাবি তোলেন যে সমস্ত কলকারখানাগুলিকে গ্লোবাল টেন্ডারের মাধ্যমে বেসরকারি হাতে তুলে দিতে হবে।
মোদি সরকার বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া শুরু করেছিল দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা পেয়েই। যার অন্যতম অঙ্গ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির সংযুক্তিকরণ, পেট্রোলিয়াম, শিপিং কর্পোরেশন, কন্টেনার কর্পোরেশন ইত্যাদি সংস্থাগুলির সরকারি মালিকানা কমিয়ে ফেলা। করোনার আগেই গত নভেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা ২৮টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নীকরণের সিদ্ধান্ত নেয় যার মধ্যে ছিল এয়ার ইন্ডিয়া, ভারত পেট্রোলিয়াম, ইত্যাদি। তবে এবারের আয়োজন সবকিছু ছাপিয়ে গেছে। এখনও পর্যন্ত ৪২টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কথা আমরা জানতে পেরেছি যেগুলি হয় বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হবে অথবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। বিক্রির তালিকায় রয়েছে এয়ার ইন্ডিয়ার সহায়ক সংস্থা এআইএপিএসএল, বিইএমএল, স্কুটার ইন্ডিয়া, পবন হাংস, ভারত পাম্প কম্প্রেসার, সেলের সালেম ইস্পাত কারখানা, ভদ্রাবতী ও দুর্গাপুর ইউনিট, হিন্দুস্তান নিউজপ্রিন্ট, হিন্দুস্তান ফ্লোরো কার্বন, এইচএলএল লাইফ কেয়ার, সেন্ট্রাল ইলেকট্রনিক, ব্রিজ অ্যান্ড রুফ ইন্ডিয়া, ইত্যাদি। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে বিপুল সম্পদ বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হবে এবং হাজার হাজার মানুষ কাজ হারাবেন।
প্রঙ্গত, দেশে বর্তমানে নব্বই শতাংশ কয়লা উৎপাদন করা হয় উন্মুক্ত খনি থেকে। উন্মুক্ত খনি থেকে কয়লা তোলার খরচ সারা পৃথিবীতে গড়ে সাবেকি মাটির তলার খনির থেকে চারভাগের এক ভাগ। এতে মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের বহুগুণ ক্ষতি হয়। ফলে উন্মুক্ত খনির সংখ্যা বাড়লে হাজার হাজার গ্রাম মরবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে লক্ষ লক্ষ গাছ, বন্য প্রাণী তথা মানুষের জীবন জীবিকা। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে যেখানে কয়লা ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির উত্তোলন ও ব্যবহার বন্ধ করে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করা দরকার সেখানে কেন্দ্র ব্যক্তিগত পুঁজির স্বার্থে কয়লা উত্তোলন বাড়িয়ে যেতে চায়।
কেবল তাই নয়, বিগত কয়েক বছর ধরে একের পর এক কেন্দ্র সরকারের নীতি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যপরিষেবাকে মুনাফা-চালিত ব্যবসায় পরিণত করেছে। যেখানে সারা পৃথিবী জুড়ে মানবিক সুরক্ষা ও সুস্বাস্থ্যের বেসরকারিকরণের নীতি প্রত্যাখ্যান করছেন, জনপরিষেবাকে জাতীয়করণ করার আওয়াজ তুলছেন, সেখানে কেন্দ্র সরকার বেসরকারিকরণের পিছনে ছুটছে। অথচ পাবলিক এন্টারপ্রাইজ-এর সমীক্ষা বলছে ২৪৯টি চালু সংস্থার মধ্যে ১৭৯টি লাভজনক এবং মাত্র ৭০টি লোকসান করছে।
বেশ ঝরঝরে লেখা; আমার মত লেম্যান ও ধরতে পারছি বিষয়টা।
উল্লেখযোগ্য, এসব এমন একটা সময়ে করা হচ্ছে যখন 4 কোটি মানুষ তার জীবিকা চাকরি হারিয়েছেন। একদিকে এরা কেন্দ্রের হাতে অর্থ নেই বলছে,অন্য দিকে তারা দেউলিয়ায় নাম ওঠা অনিল আম্বানিকে 40 হাজার কোটি টাকা দিয়েছে যাদের একটা খেলনা প্লেন করার অভিজ্ঞতাও নেই তারা রাফেল যুদ্ধ বিমান করবে বলে