দিল্লির কনওয়াট প্লেস সার্কল থেকে উত্তর-পুবে যে রাস্তাটা বেরিয়েছে, তার নাম আগে ছিল মিন্টো রোড, এখন হয়েছে স্বামী বিবেকানন্দ মার্গ। সেটা দিয়ে তিনশো মিটার মতো গেলেই ডানদিকে যে চওড়া রাস্তাটা আইটিও-র দিকে গেছে, সেটা হচ্ছে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় মার্গ। ওই রাস্তাটা কমবেশি দু-কিলোমিটার মতো লম্বা। শেষ হওয়ার দুশো মিটার মতো আগে অর্থাৎ আইটিও-র কাছাকাছি এলে বাঁদিকে একটা গলি দেখতে পাওয়া যাবে, ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আদি-গুরুদের একজন পণ্ডিত বিষ্ণুদিগম্বর পলুস্করের নামে এই রাস্তাটির নাম বিষ্ণুদিগম্বর মার্গ। এই গলির মধ্যে শ-দেড়েক মিটার ভেতরে ঢুকলেই বাঁহাতে পড়বে হিন্দি ভবন। ওই হিন্দি ভবনের সামনে রাস্তার ওপরেই দেখবেন গাছতলায় একটা চায়ের স্টল, সামলাচ্ছেন এক বৃদ্ধ। তাঁর নাম লক্ষ্মণ রাও, বয়স সত্তর পেরিয়ে গেছে।
এত লোক থাকতে হঠাৎ লক্ষ্মণ রাওয়ের কথা কেন? কেননা উনি ওই একই জায়গায় চা বিক্রি করছেন আজ প্রায় সারে-চার দশক ধরে। চা বিক্রি করে সবাই প্রধানমন্ত্রী হতে পারে না। সে কথা থাক। মোদ্দা কথা হচ্ছে, চা বিক্রি করে সবাই লক্ষ্মণ রাও-ও হতে পারে না।

দরিদ্র চাষি পরিবারের ছেলে লক্ষ্মণ রাওয়ের জন্ম মহারাষ্ট্রের অমরাবতী শহরে, ১৯৫২ সালে। ছোটবেলা থেকেই তার গল্পের বই পড়ার শখ। হিন্দি বিভিন্ন লেখকের বইপত্তর পড়ে তার শখ হল নিজেও বই লিখবে। এ রকম বেয়াড়া ইচ্ছে তো আমাদেরও হয় মাঝেমধ্যে, আমরা সবাই কি আর বই লিখতে পারি? লক্ষ্মণ রাও কিন্তু লিখে ফেলল একপিস বই। অমরাবতী শহরে ছাপাখানা আছে বটে, তবে প্রকাশনা নেই। লক্ষ্মণ রাওয়ের ইচ্ছে, সে বড় প্রকাশকের প্রকাশনায় তার বই ছাপাবে, যাতে তার বই অনেক লোক পড়তে পারে। তেমন তো অমরাবতীতে নেই।
ইস্কুলে পড়াশুনা মাথায় উঠল তার। কোনোরকমে হায়ার সেকেন্ডারি পেরিয়ে পড়াশুনা ছেড়ে দিল। ১৯৭৫ সালে তেইশ বছর বয়সে সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল রাজধানী নতুন দিল্লির উদ্দেশে। বগলে একতাড়া কাগজ, তার প্রথম বইয়ের পাণ্ডুলিপি আর গোটা চল্লিশ টাকা। তাকে প্রতিষ্ঠিত লেখক হতেই হবে।
দিল্লিতে খুঁজেপেতে সে গেল দু-চারটে প্রকাশকের ঘরে। সবাই দূর দূর করে ভাগিয়ে দিল তাকে। বই লেখা কি মুখের কথা! তার পাণ্ডুলিপিও পড়ে দেখতে চাইল না তারা। বিস্মিত লক্ষ্মণ রাও ভেবেছিল, যারা বই লেখে তাদের বুঝি অনেক সম্মান। অথচ রাজধানীর মতো সম্মানীয় জায়গায় তার মতো একটা গোটা বইয়ের লেখককে যোগ্য সম্মানপ্রদর্শন দূরে থাক, ভিখারির মত তাড়িয়ে দিচ্ছে প্রকাশকরা!

ক্ষুব্ধ ও অপমানিত লক্ষ্মণ রাওয়ের মোহভঙ্গ হল, কিন্তু তখন তার আর ফেরার উপায় নেই। লোকের ফাইফরমাশ খেটে, বাড়ি তৈরির ইট বয়ে, চায়ের দোকানে বাসন মেজে কোনোরকমে দিন গুজরান করতে লাগল সে। সুধী পাঠকদের স্মরণ থাকতে পারে, এই বছরের মাঝামাঝি সময়েই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে রাষ্ট্রপতি জনাব ফকরুদ্দিন আলি আমেদ দেশজুড়ে ঘোষণা করলেন জরুরি অবস্থা। জেলখানাগুলো ভরে গেল ছোট-বড় নেতায়। মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল।
এর মধ্যেই কোনো রকমে বছর দেড়েক দিন গুজরান করে ফেলল লক্ষ্মণ রাও। সে খুঁজে পেল কয়েকটা জায়গা, যেখানে খুব সস্তায় বই ভাড়া পাওয়া যায়। সেখান থেকে বই নিয়ে সে পড়তে লাগল। গল্পের বইয়ের নেশা অতি বিচিত্র, যার আছে সেই বোঝে।
১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থা শেষে নির্বাচন হল, দেশে নতুন সরকার এল। লক্ষ্মণ রাও স্থির করল, পেট চালানোর একটা স্থায়ী উপায় ভাবা দরকার। হিন্দি ভবনের সামনের গাছতলায় বসে পড়ল সে চা-পান-সিগারেটের অস্থায়ী একটা স্টল দিয়ে। সাতচল্লিশ বছর ধরে সেই চা-বিক্রি এখনও চলছে।

নতুন যা, তা হচ্ছে এই — এর মধ্যে তাঁর পঁচিশটা বই ছাপা হয়েছে। অধিকাংশই নিজের প্রকাশনায়। ভারতীয় সাহিত্য কলা প্রকাশন নামে তাঁর নিজস্ব প্রকাশনা থেকে তিনি তাঁর লেখা বই ছাপান। চা বিক্রির টাকা জমিয়ে ১৯৭৯ সালে প্রথম বই ছাপিয়েছিলেন সাত হাজার টাকা খরচা করে, সেই বইয়ের নাম ‘নঈ দুনিয়া কি নঈ কাহানি’। রামদাস, নর্মদা, দৃষ্টিকোণ, দংশ, রেণু, প্রধানমন্ত্রী — এইসব তাঁর অন্যান্য বই। বইগুলো চায়ের দোকানের সামনেই সাজানো থাকে, তবে সেখান থেকে বইয়ের বিক্রিবাটা খুব একটা নেই। বেলা বাড়লে চায়ের দোকানে যখন ভিড় কম হয়, তখন দোকানে নাতিকে বসিয়ে লক্ষ্মণ রাও সাইকেলে নিজের লেখা বই চাপিয়ে চলে যান শহরের অলিতে গলিতে, বই বিক্রি করতে।
এতদিনে তাঁর বই বিক্রি হয়েছে তিরিশ হাজার কপিরও বেশি!
১৯৯৪ সালে তিনি প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে গ্র্যাজুয়েট হন। ২০১৫ সালে তেষট্টি বছর বয়সে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট। বই বিক্রি থেকে মাসে তাঁর আয় হাজার দশেক টাকা। ১৯৮৪ সালে তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে দুটো বই উপহার দিয়ে এসেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর জীবন নিয়ে বই লেখার বাসনা প্রকাশ করলে শ্রীমতী গান্ধী তাঁকে পরামর্শ দেন, জীবনীর বদলে তাঁর কাজের ওপর কিছু লিখতে — সেই নিয়েই লেখা ‘প্রধানমন্ত্রী’ শীর্ষক বইটা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেই বই তাঁকে উপহার দেওয়ার আগেই তিনি নিহত হলেন। ‘রামদাস’ নামে বইটার জন্যে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি শ্রীমতী প্রতিভা পাটিলের হাত থেকে তিনি ‘ইন্দ্রপ্রস্থ সাহিত্য ভারতী পুরস্কার’ও পেয়েছেন। এই বইয়ের তৃতীয় সংস্করণ শেষের মুখে, হাজার পাঁচেক কপি বিক্রি হয়ে গেছে। অ্যামাজন-ফ্লিপকার্টেও তাঁর বই বিক্রি হয়। অনলাইন সংস্করণের বিলিব্যবস্থা দেখাশুনা করে ছেলে হিতেশ।

এখন তাঁর বেশ সচ্ছল অবস্থা। তবুও এখনও কেন চা বিক্রি করেন, জিজ্ঞেস করলে চোস্ত হিন্দিতে তিনি জবাব দেন – লক্ষ্মীকে অবহেলা করতে নেই। চা-বিক্রি করেই একদিন সরস্বতীর সন্ধান করেছিলাম বটে, তবে ইনিই ছিলেন লক্ষ্মী। এখনও রাত নটা অবধি তিনি চা বিক্রি করেন আর বাড়ি ফিরে রাত একটা অবধি লেখেন। হিন্দি ছাড়াও লক্ষ্মণ রাও এখন আরও কয়েকটা ভাষা বলতে ও লিখতে পারেন। নিজের উদ্যোগে নিজের প্রকাশনায় এখন থেকে তিনি নিজের বইয়ের অন্য ভাষায় অনুবাদ করবেন ভাবছেন, যাতে তাঁর বই অন্য ভাষাভাষী লোকেরাও পড়ার সুযোগ পায়। ইতিমধ্যেই কয়েকটার ইংরাজি অনুবাদ হয়ে গেছে, একটার কিন্ডল এডিশনও আছে। শুধু গল্প লেখাই নয়, কেমন করে গল্প লিখতে হয় তিনি সে বিষয়ে এখন কোচিং-ও দেন রাজধানীর অক্সফোর্ড বুকস্টোরে। তাঁর কোচিং ক্লাশে দেখা গেছে কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিককেও। স্কুল-কলেজে মোটিভেশনাল স্পিচ দেওয়ার জন্যেও তাঁর ডাক পড়ে মাঝেমধ্যে। ইন্ডিয়ান ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (IEEMA) ২০১৬ সালে গুরগাঁওয়ের এক পাঁচতারা হোটেলে তাদের বার্ষিক সভায় তাঁকে ডেকেছিল প্রধান অতিথি হিসাবে, সেই সভায় তিনি ইচ্ছাশক্তি, সততা ও কঠোর পরিশ্রমের গল্প শুনিয়ে শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করেছিলেন।
জীবনে আর কী স্বপ্ন আছে? জানতে চাইলে মৃদু হেসে প্রৌঢ় লক্ষ্মণ রাও জবাব দিলেন, আমি চাই হিন্দিভাষায় পি এইচ ডি করতে। লোকে আমাকে চিনুক এ কালের শেক্সপিয়র হিসাবে।
সংগৃহীত লেখা