“যাই বলো বাপু, তোমাদের বারোমেসের খুঁচির লক্ষ্মী ঐ ক্যালেন্ডারের লক্ষ্মীপিতিমের মতই মোটেও সুন্দর নয়। যতই তোমরা তাকে লালচেলি, সোনার চোখ, মাথায় মকুট, নাকে নোলক, সোনার টিপ দিয়ে সাজাও না কেন। পেঁচার মতই তো দেখতে লাগে!”
ন-ঠাকুমা একথা শুনে জিভ কেটে, নিজের নাক কান মূলে দশবার কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, —
“বলিস নি বাবা বলিস নি। ঠাকুর পাপ দেবে ”
“কি পাপ দেবে শুনি। লক্ষ্মী তোমাদের সংসার ছেড়ে পালাবে নাকি?যত সব !সত্যি কথা বললেই দোষ না?”
ছোট খুকিটা এমনই।বাড়ির সবার আদরে খুব বাড় বেড়েছে। মুখে কিছুই আটকায় না। তার গাজ্বালানি পাকা পাকা কথায় সবাই বিরক্ত হয়। ভয়ও পায়। ঐ একরত্তি মেয়ের সবদিকে নজর। হাটে হাঁড়ি ভাঙা স্বভাব। এই তো সেদিন ভাদ্দরমাসের লক্ষ্মীপুজোর দিন সবার সামনে কি কাণ্ডটাই না করলে সে!
সাদাসিধে ন-ঠাকুমার সঙ্গে তার যত ঝগড়া, তত ভাব। তাঁরই সঙ্গে গা জোয়ারি।
বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী! ব্যবসায়ী চন্দরদের পরিবারে তাই সারাবছর লক্ষ্মীপুজোর খুব ঘটাপটা। কোজাগরী পূর্ণিমার লক্ষ্মীপুজো। কালীপুজোর রাতে অলক্ষ্মী বিদায়। প্রতি বৃহস্পতিবার নিরামিষ ভোজন, সন্ধ্যেয় লক্ষ্মীর পাঁচালি। ভাদ্রমাস, পৌষমাস আর চৈত্রমাসের লক্ষ্মীপুজোর নিয়ম সেই কোনকাল থেকে চলে আসছে।
চালমাপার বেতের কুনকেতে ধান, কড়ি, পয়সা ভ’রে তাকে সিঁদূর লেপে লক্ষ্মীর অবয়ব করা হয়। রুপোর সিংহাসনে বসে তিনিই এবাড়ির কুলদেবী হয়ে আছেন। ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষের বৃহস্পতিবারে তাঁর পুজোর বিশেষ আয়োজন।
বুধবার বিকেলে মানদাঝিকে কোমরে হাত দিয়ে ছোটখুকিই বলে দিয়েছে, —
“মানদা মাসি কাল সকাল সকাল এসে বাসিকাজ সব করে দিয়ে যাবে। জানোতো কাল আমাদের লক্ষ্মীপুজো।”
মানদা পুঁচকে মেয়ের পাকা পাকা কথা শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ে বলেছে, “জানি গো জানি মেয়ে। কাল আমি তোমার বাড়িতেই পেত্থম কাজে আসব”।
ভাদুরে লক্ষ্মী ব্রতয় পাকা তালের রমরমা। তালচাটুনিতে ঘষে ঘষে ছোটখুকির মা তালের মাড় বে’র করেছে। তাকে নতুন কাপড়ে বেঁধে ছাঁকা হয়েছে। তিতকুটে ভাব থাকলে কমে যাবে। পানের বাটা থেকে সামান্য চুন মেশানো হয়েছে তাতে। সোয়াদ নাকি তাতে আরো খোলে। তালের আঁটি বাগানের মাটিতে পুঁতে দেওয়া হল। দু’তিন মাসে সেসব ফোঁপল হয়ে কোজাগরী লক্ষ্মীর প্রসাদ হয়ে উঠবে।
জ্বাল দেবার আগে কাঁচা তালের নেচি যাবে ফল প্রসাদের সঙ্গে বারকোষে। শুদ্ধ কাপড়ে তোলা উনুনে বটঠাম্মা, মেজঠাম্মা বানাচ্ছে তালের বড়া, লুচি। টগবগে ফুটন্ত তেলে সে বড়া, লুচি ফুলে ফুলে উঠছে। গরম তেলের আঁচে, ভাদুরে গরমে ঠাকমাদের ফর্সা মুখ লাল।সারা বাড়ি তালের গন্ধে ম ম। সেই গন্ধে গন্ধে জুটেছে কতগুলো নীলমাছি।
তালের রস জ্বাল দিয়ে তাতে দুধ, নারকেলকোরা, মিষ্টি দিয়ে তৈরি হচ্ছে তালক্ষীর। তালক্ষীর বড় প্রিয় ছোটখুকির। দু-তিন বাটি সে একাই সাবড়ে দিতে পারে। মা বলেছে, “ঠাকুরের ভোগ লাগার আগে কোনো জিনিসে লোভ দেবে না”। ছোটখুকি তাই পড়েছে বড় আতান্তরে। লোভ সামলে মাঝেমাঝে এসে দেখে যাচ্ছে কতদূর কি হল!
সকালে মানদা বাসিঘর ঝাঁটপাট দিয়ে মুছে পরিষ্কার করে গেল। রাতে ভেজানো আতপচাল শিলপাটায় ছোটখুকির মা চাল বেটে রেখেছে। পিটুলিগোলায় ন্যাকড়া ডুবিয়ে ন-ঠাকুমার সঙ্গে সারা ঘরের চৌকাঠে, ঠাকুরঘরে আল্পনা দিল ছোটখুকি। মা লক্ষ্মীর প্রিয় পদ্মফুল, শঙ্খ, কলস, ধানেরছড়ার আল্পনা। সিঁড়িতে, সদর দরজায় মায়ের ছিচরণ। ভোলেভালা মানুষ ন-ঠাকমা। ভুল করে লক্ষ্মীর শ্রীচরণ উল্টোমুখে এঁকে ফেলে ছিল। ব্যস আবার পাকা মেয়ের কথা!
“তোমার কোনো কান্ডজ্ঞান নেই গো, ন-ঠাকমা! মাগো, এটা কি করলে! লক্ষ্মীকে তুমি বাড়ির বাইরে যাবার পথ দেখিয়ে দিলে!” ন-ঠাকমা ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি লক্ষ্মীর উল্টো পা মুছে আবার সোজা করলে।
ঠাকুরঘরে ততক্ষণে থালায় সাজানো হয়েছে ফলপাকুড়, পাঁচকড়াই, মিষ্টি। পাথরের গেলাসে ডাবের জল। কাঁসার পরাতে তাল ফুলুরি, তালের নুচি। কালো পাথরের খোরায় ঘন সোনালী তালক্ষীর জ্বলজ্বল করছে। তাতে নৌকার মত ভাসছে দুটি সবুজ তুলসীপাতা। সেদিকে একবার তাকিয়েও ছোটোখুকি চোখ সরিয়ে নিল। আর মাত্র কিছুক্ষণ পরেই তো অপেক্ষার শেষ! ঠাকুরমশাই ঘন্টা নেড়ে পুজো শুরু করে দিয়েছেন।
পুজোর শেষে ব্রতকথা। তালক্ষীরের মত লক্ষ্মীর ব্রতকথা শোনার আকর্ষণ কম নয় ছোটখুকির। বটঠাকুমা লালপেড়ে শাড়ির ঘোমটা মাথায় দিয়ে, নথ নেড়ে, চোখ ঘুরিয়ে তিন মাসের তিনটি ব্রতকথার গল্প বলেন। তখন শুধু ছোটখুকি নয়, অন্য ব্রতীরাও জোড়হাতে আশীব্বাদের ফুলসিঁদূরপাতা নিয়ে মুগ্ধ হয়ে সে গল্প শোনে। আট বছরের ছোটখুকির সবথেকে পছন্দ চোতমাসের ব্রতকথার গল্পটি।
এক পূর্ণিমা রাতে লক্ষ্মী নারায়ণ বৈকুণ্ঠ থেকে পুষ্পক রথে চড়ে মর্ত্যভ্রমণে আসেন। রথ থেকে নেমে তাঁরা নিজের মত করে এদিক সেদিক পায়ে হেঁটে ঘোরেন। নারায়ণ নিজের গিন্নিটিকে আগে থেকেই সাবধান করে দিয়েছিলেন, “সবদিকে যাবে, দেখবে কিন্তু উত্তর দিকপানে চা’বেও না, যাবেও না।” মেয়েদের কৌতূহলী মন! বরের কথা না শোনার চিরকেলে অভ্যেস! লক্ষ্মীদেবী ঠিক পতির বারণ না মেনে উত্তর দিকেই যান। সেখানে গিয়ে দেখেন এক বামুনের বাড়ির ছেঁচাবেড়া দেওয়া বাড়ির বাগানে সাদাসাদা তিল ফুল আলো করে ফুটে আছে। পুন্নিমারাতের ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় সে ফুল অপরূপ দেখাচ্ছে। এক গা সোনার গয়নাপরেও লক্ষ্মীদেবী ফুলের লোভ সামলাতে পারলেন না। ফুল তুলে গলায় মালা করে পরলেন, খোঁপায় দিলেন। বুড়ো বামুনের রাতে ঘুম হয়না। বাগানে আওয়াজ পেয়ে এসে দ্যাখে অপরূপা এক সুন্দরী মেয়ে বাগানে ঘুরছে। ফুল তুলছে। বামুনের হাতে বামাল ধরা পড়লেন লক্ষ্মীদেবী। গোলমাল দেখে নারায়ণ শঙ্খচক্রগদাপদ্ম ছেড়ে সাধারণ বেশে সেখানে আবির্ভূত হলেন। নিজের গিন্নিকে বললেন, “চুরি করেছে, শাস্তি তো পেতেই হবে। নাও, এবার একবছর বামুনের বাড়িতে দাসীবৃত্তি কর”। লক্ষ্মীদেবী মাথা পেতে দোষ স্বীকার করলেন। নারায়ণ অন্তর্হিত হলেন।
এই গল্পটি বড় হয়ে ওঠা আট বছরের খুকির মনে খুব দাগ কাটল। সে গভীরভাবে ভাবলে, “চুরি করলে, অন্যায় করলে ভগবানেরও তা’লে মাফ নেই!” সে খুঁচির লক্ষ্মীকে নমো করে পিতিজ্ঞে করলে, “আমি নিজে কখনো এমন অন্যায় করব না। অন্যকেও করতে দেব না।”
যেমন প্রতিজ্ঞা, তেমনি তার কাজ! এবার মালক্ষ্মীর কৃপায় চোরের পালাবার পথ নেই।
বটঠাকুমা গলায় আঁচল ভক্তিভরে ব্রতকথা বলার শেষে শোলোক আওড়ালেন। এই ব্রত করলে কি পুন্যি হয় সে সব বলা হল। তারপর গড় হয়ে, গলায় আঁচল দিয়ে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীকে প্রণাম করলেন। পুজোশেষে সবাই তখন ব্যস্ত এদিক ওদিক। সবারঅলক্ষ্যে বাড়ির বড় গিন্নি আঁচলের তলায় লুকিয়ে রাখা বাটিতে টপাটপ করে তালফুলুরি, মিষ্টি সরাতে শুরু করলেন। অষ্টমবর্ষীয়া ছোটখুকির নজর বড় সাংঘাতিক! সে কোমরে হাত দিয়ে চোখ গোলগোল করে নাটকীয় ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠলো, “ওমা বটঠাকুমা! তুমি এটা কি করলে! তোমার কি এতটুকু পাপের ভয় নেই গো! এইমাত্তর তুমি বললে, চুরি করলে, অন্যায় করলে ভগবানেরও মাফ নেই আর তুমিই কিনা! ধম্মে সইল তোমার!”
গোটা ঠাকুরঘর থমথমে। কোনো মেয়েবৌয়ের মুখে কথা সরছেনা। বুড়ো পুরুতমশাই থপ করে বসে পড়লেন মাটিতে। তাঁর মাথা ঘুরছে! বড়বৌয়ের আঁচল মেঝেতে লুটোচ্ছে। সাদা শান বাঁধানো মেঝের ওপর চুরি করা তালফুলুরি গড়াগড়ি দিচ্ছে। দুঃখে, অপমানে অনুশোচনায় তাঁর চোখে জলের ধারা। তিনি হাতজোড় করে বিড়বিড় করে ঠাকুরের কাছে বোধহয় মাফ চাইছেন।
তবে এমনটি এর আগেও হয়েছে। বড়বৌ পালাপাব্বনে এভাবেই মিষ্টিমাষ্টা সরিয়েছেন। যবে থেকে বড়বৌয়ের শাশুড়ি গত হয়েছেন, তবে থেকে তার এমন চৌর্যবৃত্তি। তাঁর দাপটে ছোটো জা-বৌরা কখনো মুখটি খুলতে সাহস পায় নি। আজ একরত্তি মেয়ের কাছে তিনি সর্বসমক্ষে এমন অপদস্থ হলেন!
বড়বৌয়ের শাশুড়ি গত হবার পরপরই ছোটখুকি মায়ের পেটে এসেছে। সে গিন্নী সংসারের অনাচার, অস্বৈরণ সহ্য করতে পারত না। সবার প্রতি ছিল তাঁর সমদৃষ্টি। পান থেকে চুন খসলেই সে বুড়ি বাড়ি মাথায় করত। তার ঠোঁটকাটা ন্যায্যকথা সব্বাই সমঝে চলত। ভয় পেত। সংসারকে শাসনেসোহাগে সে বেঁধে রেখেছিল। ছোটখুকি আর সে গত হওয়া গিন্নির গোলগোল চোখের ভাষায় যেন অনেকটাই মিল। তবে আজকের ঘটনার পর আর কারোর কোনো সংশয়ই থাকে না যে সে বুড়ি সংসারের মায়া কাটাতে পারেনি। বাড়ির লক্ষ্মীরূপে ছোটখুকি হয়ে পুনর্জন্ম নিয়েছে। তার হাতে গড়ে ওঠা লক্ষ্মীমন্ত সংসারে যাতে কোনো অনাচার, অবিচার না হয়!
সব সময়ই তোমার লেখা পাঠকমননকে বড় তৃপ্তি দেয়। বড় সরল .. বড় মধুর সে পাঠ-তৃপ্তি’র আরাম!