একুশের ভোটে বিরাট বিপর্যয়ের পর মঙ্গলবারের নবান্ন অভিযান ছিল বঙ্গ বিজেপির প্রথম বড় কর্মসূচি। অনায়াসে দু-শো পেরবে এমনই এক লক্ষ্য নিয়ে একুশের কুরুক্ষেত্র যু্দ্ধে নেমেছিল বিজেপি। কিন্তু তিন অঙ্কের অনেক আগেই থেমে যেতে হয়েছিল তাদের। পরে পরেই জন সমর্থনে ভাটা পড়ে। একের পর এক নির্বাচনে তাঁদের হারতে হয়েছে। সে পুরসভা নির্বাচন হোক বা উপনির্বাচন বিজেপি পর্যুদস্ত হয়েছে। সামনের বছর পঞ্চায়েত ভোট। তারপরের বছর লোকসভার মহারণ। কিন্তু বঙ্গ বিজেপির বেহাল দশার ছবিটা ক্রমশই প্রকট হয়ে উঠছে। বঙ্গের গেরুয়া শিবির নেতাদের কোন্দলে জেরবার। বঙ্গ বিজেপির অনৈক্যের ছবি যে পদ্মের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বারবার অস্বস্তিতে ফেলছে। তাঁরা বঙ্গ বিজেপির দলীয় কোন্দলে তিতিবিরক্ত।
বঙ্গ বিজেপি চলছে আদি-নব্য-তৎকাল-এই ত্রিধারায়। দিলীপ ঘোষকে সরিয়ে সুকান্ত মজুমদার রাজ্য সভাপতি হওয়ার পর থেকেই আদি-নব্য দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। তার আগে শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর দিলীপ ঘোষের সঙ্গে তাঁর একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। প্রতি পদেই তাঁদের অনৈক্যের ছাপ ধরা পড়েছে। সুকান্ত-শুভেন্দুকে অনেক ক্ষেত্রে একসঙ্গে দেখা গেলেও সেখানেও উত্তর-দক্ষিণ বিভাজন রয়েছে। অন্যদিকে সুকান্ত-দিলীপের মধ্যেও প্রবল অনৈক্য। সেই অনৈক্য প্রকাশ্যে এসে পড়ে নবান্ন অভিযানে যাওয়া নিয়েই, যখন বিজেপি কর্মীরা অভিযোগ করেন। তাদের বক্তব্য, দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদাররা তৃণমূলের গুন্ডাদের নিয়ে প্রচার করছেন। সাচ্চা বিজেপি-র কেউ তাতে শামিল নেই। বিজেপি কর্মীদের আরও অভিযোগ, এ ভাবে নবান্ন অভিযান করে মানুষ টানা যাবে না।
বিজেপিতে আদি-নব্য-তৎকাল দ্বন্দ্ব, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সঙ্গে অন্য গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব, নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে, দলের গোষ্ঠীকোন্দলে প্রলেপ লাগাতে বঙ্গ বিজেপির জন্য উত্তরপ্রদেশের চাণক্য বলে পরিচিত পর্যবেক্ষক সুনীল বনশল ছাড়াও বিহারের দোর্দণ্ডপ্রতাপ মঙ্গল পাণ্ডেকে বাংলার পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। অমিত শাহের খাস লোক সুনীল বনশল উত্তরপ্রদেশে দলকে সাফল্য এনে দেওয়ার পর বাংলায় বৈদিক ভিলেজে মন্থন শিবিরে একতার বার্তা দিয়ে দলকে এক ফ্রেমে দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু দলের কর্মীদেরই কথা, এক ফ্রেমে নেতাদের দেখা গেলেও তাঁদের মধ্যেই চূড়ান্ত কোন্দল, তাঁরা কেবল ফোটোসেশনেই হাসিখুশি মেজাজে পাশাপাশি থাকেন, আদতে তাদের মধ্যে মতানৈক্য বিস্তর।
তবু বছর ঘুরলেই পঞ্চায়েত নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনকে পাখির চোখ করতে গেরুয়া নেতারা মঙ্গলবার ‘নবান্ন অভিযান’ কর্মসূচি নিয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নবান্ন অভিযান কর্মসূচির সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার উপরই দলের জেলা সংগঠনগুলির হালহকিকত বিচার করতে চাইছেন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। প্রশ্ন, মঙ্গলবারের অভিযান খতিয়ে দেখার পরেই কি বঙ্গ বিজেপি পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করবে ভেবেছে। কিন্তু বিজেপির জেলা সংগঠনই সেভাবে তৈরি হয়নি, অথচ লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাহলে কিভাবে সম্ভব? জেলার নেতাদের বক্তব্য, ভাঙাচোড়া সংগঠন নিয়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায়না। তবে চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে জোর করা যাবে না। এদিকে বঙ্গ–বিজেপির নবান্ন অভিযান কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কারা থাকবেন, তা নিয়েও ছিল ধোঁয়াশা। কারণ কে উপস্থিত থাকবেন আর থাকবেন না, তা স্পষ্ট করে কেউই জানান নি।
একটা দলের নেতৃত্বের মধ্যে যে কোনও একতা নেই, তা মঙ্গলবার নবান্ন অভিযানের দিনও স্পষ্ট দেখা গেল। নবান্ন অভিযান তখন বিজেপির ত্রি-শক্তির মধে দুই শক্তি রাজপথে নেমেছেন। কারণ ময়দানে নামার আগেই শুভেন্দু অধিকারী লালকার্ড দেখে মাঠের বাইরে চলে গিয়েছেন। কার্যত তাঁকে লালবাজারে বসেই বিজেপির নবান্ন অভিযান দেখতে হয়েছে। কিন্তু তারপরও দিলীপ ঘোষ বনাম সুকান্ত মজুমদারের মতবিরোধ প্রকাশ্যে এল। শাসক তৃণমূলকে নবান্ন থেকে উৎখাতের সংকল্প নিয়ে দলের কর্মীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনে নেমেছে, একদিকে রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার অগ্নিমিত্রা পাল-সহ হাওড়া ময়দান থেকে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যেতেই পুলিশের বাধা পেয়ে ধর্নায় বসে পড়লেন। অন্যদিকে মিছিল নিয়ে আগুয়ান দিলীপ ঘোষও বাধা পেয়ে কর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। কিন্তু তিনি ঘোষণা করে দেন, আমাদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে, নবান্ন অভিযান শেষ। এই ঘোষণায় বিভ্রান্ত ছড়ায়। কারণ তখনও মিছিল নিয়ে ধর্নায় বসে রয়েছেন সুকান্ত মজুমদার, অগ্নিমিত্রা পাল। অন্যদিকে লালবাজারে আটক শুভেন্দু অধিকারী, লকেট চট্টোপাধ্যায় ও রাহুল সিনহাকে মুক্ত করতে শুরু হয়েছে আরেকটি মিছিল, তখন কোন নীতিতে দিলীপ ঘোষ নবান্ন অভিযানে ইতি টানেন? রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এটা স্রেফ নেতৃত্বের মতবিরোধী ছাড়া আর কিছুই নয়। নবান্ন অভিযানেও দলের বিজেপি নেতারা নিজেদের কোন্দল চাপা রাখতে না পেরে প্রকাশ্যে নিয়ে এল। ফলে বঙ্গ বিজেপির তিন শীর্ষ নেতা রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার, প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী নবান্ন অভিযানে দলের মধ্যে ঐক্যের ছবি দেখাতে যেমন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেন একইসঙ্গে মঙ্গলবারের কর্মসূচিকে সামনে রেখে দলের পালে হাওয়া তুলতেও ঠিক মতো পারলেন না।