একুশের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে একই সঙ্গে তৃণমূল ও বিজেপিকে রুখতে সংযুক্ত মোর্চা গড়েছিল বাম, কংগ্রেস ও আইএসএফ। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেল একটিও আসন জিততে পারেনি বামেরা এবং কংগ্রেস। সংযুক্ত মোর্চার পকেটে এসেছিল কেবলমাত্র ভাঙড় আসনটি৷ উল্লেখ্য বামেদের শরিকদের কিন্তু এই সংযুক্ত মোর্চার ব্যাপারে সায় ছিল না। তাই নিয়ে রীতিমতো বড় শরিকের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি শুরু হয়ে গিয়েছিল। ভোট মিটতেই সংযুক্ত মোর্চার আর কোনও অস্তিত্ব আছে কিনা যেই প্রশ্ন চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠতে শুরু করেছিল। বিশেষ করে নির্বাচন পরবর্তী কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকের পর থেকে। তখন সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি জানিয়েছিলেন, এই মোর্চা সারাজীবনের জন্য নয়। নির্বাচনের নিরিখে তা তৈরি হয়েছিল। তার মানে তিনি একথাই বলতে চেয়েছিলেন যে ভোট মিটেছে মানে জোটের আয়ুও শেষ।
শেষ পর্যন্ত সেটাই সত্যি হল। রাজ্য বিধানসভার ভোট শেষ হওয়ার পাঁচ মাসের মধ্যেই বাংলায় বাম, কংগ্রেস ও আইএসএফের জোট ভেঙে গেল। ভবানীপুর উপনির্বাচন ও মুর্শিদাবাদের দুই কেন্দ্রে নির্বাচনের প্রাক্কালে আর জোট রইল না বাম-কংগ্রেসেরও। ভবানীপুর উপনির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া নিয়েই মতান্তর শুরু হয়েছিল বাম ও কংগ্রেসের। এই আসনটি জোটের সমঝোতা অনুযায়ী কংগ্রেসের প্রার্থী দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কংগ্রেস ভবানীপুর উপনির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী দেওয়া থেকে বিরত থাকে। তারপর জোট-শর্ত ভেঙে সিপিএম প্রার্থী দেয়। তখনই জল্পনা জোরদার হয়ে ওঠে তাহলে জোটের ভবিষ্যৎ কী?
সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি সেই জল্পনার অবসান ঘটালেন সংযুক্ত মোর্চার আর কোনও অস্তিত্ব নেই বলে। কলকাতার এক অনুষ্ঠানে এসে তাঁর সাফ কথা, ভোট শেষ জোটও শেষ। এখানে কংগ্রেস-আইএসএফের সঙ্গে জোটে নেই বাম কলকাতায় সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর একটি বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। সেই অনুষ্ঠানে এসে সংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি সাফ জানালেন, কংগ্রেস আর আব্বাস সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফের সঙ্গে কোনও জোট নেই। ভোটের সঙ্গে সঙ্গেই জোট শেষ হয়ে গিয়েছে।
সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, ভোট শেষ জোট শেষ। রাজনীতিতে একটা ফ্রন্ট বা মোর্চা তৈরি হয় কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য। একুশের বাংলা বিধানসভা নির্বাচনে একই সঙ্গে তৃণমূল ও বিজেপিকে রোখাটাই সংযুক্ত মোর্চার উদ্দেশ্য ছিল। সেই উদ্দেশ্য হয়তো সফল হয়নি, কিন্তু সেই উদ্দেশ্যের কার্যকারণ ফুরিয়ে গেলে উদ্দেশ্য যাই থাক তার আর কোনও মূল্য থাকে না। তেমনই বাংলার বিধানসভা ভোট শেষ হতেই সংযুক্ত মোর্চা ভেঙে গিয়েছে। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সেই তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য বোঝাতে একটি উদাহারণও দেন। তিনি ইন্দিরা গান্ধী ও জনতা দলের উদাহারণ দেন। বলেন, জনতা পার্টি এসেছিল ইন্দিরা গান্ধীকে হারাতে। হারিয়ে দেওয়ার পর জনতা পার্টি শেষ হয়ে যায়। তেমনই সংযুক্ত মোর্চা তৈরি হয়েছিল বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। সেই উদ্দেশ্য সফল হোক আর ব্যর্থ হোক মোর্চার অস্তিত্বও শেষ।
বাংলায় বিধানসভা ভোটের আগে বাম-কংগ্রেসের সঙ্গে আব্বাস সিদ্দিকির আইএসএফকে নিয়ে সংযুক্ত মোর্চা গঠন করা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু তার ভবিষ্যৎ যে ঊজ্জ্বল নয়, তার আভাস আগেই মিলেছিল। সেটাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হল। ভবানীপুর উপনির্বাচন ও মুর্শিদাবাদের দুই কেন্দ্রে নির্বাচনের প্রাক্কালে আর জোট রইল না বাম-কংগ্রেসের। অর্থাৎ দুই কেন্দ্রের সাধারণ নির্বাচন ও ভবানীপুরের উপনির্বাচনে আর জোট প্রার্থীকে ভোট দেওয়া নিয়ে বাধ্যবাধকতা থাকল না। এবং আসন্ন পুরভোট বা বাকি কেন্দ্রের উপনির্বাচনেও জোটের অস্তিত্ব রইল না।
প্রসঙ্গত, বাম সমর্থকদের একটা বড় অংশ একুশের ভোটে বিশ্রী ফলের জন্য দায়ী করেছিলেন আইএসএফের সঙ্গে হাত মেলানোকে। তাঁদের মতে আইএসএফের সঙ্গে হাত মেলানোয় তাঁদের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি আঘাত পেয়েছিল। এরপরেই ধীরে ধীরে আব্বাস সিদ্দিকীর দলের সঙ্গে দুরত্ব তৈরি করতে থাকে বামেরা। এবার সরাসরি জল্পনায় যবনিকা টানলেন সীতারাম। জানালেন, জোটকে যদি দীর্ঘস্থায়ী ভাবা হয়, তাহলে তাতে দলের মঙ্গল হবে না। উল্লেখ্য, রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনের পরেও কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে সীতারাম ইয়েচুরি, প্রকাশ কারাতরা সাফ জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের সময় মোর্চা গঠন হয়েছিল। তবে তা কখনওই দীর্ঘস্থায়ী জোট হতে পারে না। এই মন্তব্যের পর থেকেও কিন্তু প্রশ্নের মুখে পড়েছিল জোট।