এই রাজ্যে ২৬ আসন দিয়ে বামপন্থীরা যাত্রা শুরু করেছিলেন। ১৯৫২ সালে। বাড়তে বাড়তে সেটা ২৩৮ ছুঁয়ে তার পর এখন শূন্য।
অনেকেই বলছেন বামপন্থীদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতে পারে না। আরও একটা কথা বলা হচ্ছে। সেটা হল, ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সঙ্গে গিয়েই বামেদের এই সর্বনাশ হয়েছে। না হলে এই ভাবে দলের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ত না।
আরএসপি, ফব, সিপিআই। এই সব চড়াই-চাতকের দলে বিরাট ঈগল হয়ে সিপিএম দীর্ঘকাল ডানা মেলে উড়েছিল। এখন সিপিএমেরও চড়াইত্ব প্রাপ্তি হয়েছে। সঙ্কটটা বড়ো করে দেখা দিয়েছে। ক্ষমতায় থেকে সিপিএম (বামফ্রন্ট) কী করত? সরকারে থাকাকালীন! রাস্তা-ঘাট, হাসপাতাল, শিক্ষা ইত্যাদি জনহিতকর কাজকর্মে জোর দিয়েছিল। পার্টি সংগঠনের বেড়ায় বাঁধা ছিল গোটা রাজ্য। গাছের পাতা পড়ার খবরও রাখত এলসি। পুলিশ মুঠোয়। আমলা পকেটে। শিক্ষকরা মিছিলে। আর ছিল পার্টির পলিসি। যেখানে বোমা দরকার সেখানে বোমা, যেখানে ওয়ান শটার দরকার সেখানে তাই, যেখানে কোলাকুলিতে কাজ হয় সেখানে কোলাকুলি সঙ্গে লালসেলাম। মিডিয়া ৭০ ভাগ নতজানু, ২০ ভাগ হাফ নতজানু, ১০ ভাগ বিরোধী। দিব্বি চলছিল। কিন্তু বিষেরও এক্সপায়েরি ডেট থাকে। সব কিছুই একদিন শেষ হয়। সিপিএমেরও হয়েছে।
তৃণমূল সিপিএমের ইসকুলের সেরা ছাত্র। বলা যায় ডবল প্রমোশন পেয়ে পেয়ে মাস্টারমশাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তফাৎ এই। শাসন পার্টি নির্ভর নয়। প্রশাসন নির্ভর। রাস্তা, ঘাট হাসপাতাল, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষায় কিছুটা তরল ভাবে হলেও সিপিএমের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে। এবং অল্প সময়ে মধ্যেই এগিয়ে। সিপিএমের নারদা-সারদা ছিল না। কিন্তু আনন্দমার্গী হত্যা, মরিচঝাপি, বানতলা, ২১ জুলাই, গড়বেতা, কেশপুর, নেতাই, নন্দীগ্রাম ছিল। রাজনৈতিক খুন তখনও যেমন ছিল, এখনও চলছে। হয়তো একটু কমেছে। কিন্তু জোরকদমে জারি আছে। সব মানুষের চাল-ডাল, দুয়ারে রেশন, স্বাস্থ্যসাথি, সাইকেল, স্টুডেন্ট ক্রডিট কার্ড অন্যান্য সুযোগ সুবিধার কথা ধরলে, মানে প্রাপ্তির হিসেব ধরলে, তৃণমূল সরকার সিপিএমের থেকে কয়েক যোজন এগিয়ে। এই ফ্রন্টে সিপিএম আর চেষ্টা করলেও হালে পানি পাবে না। ভোট কী ভাবে করতে হয়, সিপিএম শিখিয়ে গিয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেস অক্ষরে অক্ষরে তা অনুসরণ করছে। এবং এ ব্যাপারে তৃণমূলের থিসিস সিপিএমের থেকে অনেক বেশি মূল্যবান। সব থেকে বড়ো কথা, কংগ্রেসের বিরোধিতা করতে গিয়ে, যে হিন্দুত্বাদীদের জাতীয়স্তরে প্রতিষ্ঠা পেতে বিভিন্ন সময়ে সিপিএম নানা ভাবে, ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছায়, সহায়তা করেছে, রাজ্যে যে কাজ করেছেন মমতা, শেষ বেলায়, সেই হিন্দু মৌলবাদীদেরই রুখে দিয়ে মমতা এবারের বিধানসভা ভোটে একটা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন, যে কাজে, মুখে যাই বলুক, এখনও অনেক পিছিয়ে সিপিএম। রাস্তা, ঘাট হাসপাতাল, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি উন্নয়নে মমতা যদি সফল হন, বিজেপিকে রুখতে মমতা যদি সারা দেশে প্রথম সারিতে প্রথম হন, তাহলে সিপিএমকে কেন লোকজন চাইবে? সমস্যাটা এখানেই। সিপিএম যে সব কাজ সরকারে থেকে করেছে, করতে পারে, করতে চায়, করতে পারত, তার জন্য বামপন্থী হওয়ার দরকার নেই। মমতা করে দেখিয়ে দিয়েছেন।
স্বাধীনতার পরে ভারতের সংবিধানকে কমিউনিস্টরা বললেন, সাম্রাজ্যবাদের দলিল। আর নেহরু কী করলেন? ১৩ শতাংশ শিক্ষিত একটা দেশে ‘সবার জন্য একটি ভোট’, এই আইন করলেন। যে কাজ করতে আমেরিকা, ইংল্যান্ডকে বহু বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এর থেকে বড়ো বামপন্থী সিদ্ধান্ত আর কী হতে পারে! বা গান্ধী। অস্ত্র ধরতে সাধারণ মানুষ ভয় পান। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষকে সঙ্গে না পেলে বৃটিশ সিংহকে কাবু করা সম্ভব নয়। গান্ধীর আবিষ্কার সত্যাগ্রহ। মানুষের মন থেকে ভয় দূর করে দিলেন তিনি। লক্ষ মানুষ সামিল হলেন যে আন্দোলনে সেই আন্দোলনের নেতাকে অস্বীকার করা কী ধরনের বামপন্থা ছিল?
২০-র দশকে রুশ বিপ্লব সহ যে সব দেশে বামপন্থীরা বিপ্লব করতে পেরেছেন, ৭০-৭৫ বছরের মধ্যেই সেই বিপ্লব হাহাকারে পরিণত হল। বামপন্থীরা অপছন্দের তথ্য অস্বীকার করতে ভালোবাসেন। না হলে রুশ আর্কাইভ থেকে যে সব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বোঝা যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন নির্মম একনায়কতন্ত্র ছাড়া কিছু ছিল না। স্তালিনের গুলাগ বা পূর্ব ইয়োরোপের দেশগুলো, সবই তাই। চিন একনায়কতন্ত্রের অধীন একটি ধনতান্ত্রিক দেশ।
যে সব দেশে এখনও পর্যন্ত ‘বিপ্লব’ হয়েছে তার একটিতেও গণতন্ত্র ছিল না। ফলে রুশ-চিন মডেল ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে (যত দুর্বলই হোক সেই গণতন্ত্র) গ্রহণ যোগ্যতা পাবে না। এখন মোদী জমানায় দেশের গণতন্ত্র সঙ্কটে। গণতন্ত্রের জন্য, গণতন্ত্র নিশ্চিত করার জন্য, গণতন্ত্র রক্ষা করার জন্য রক্তপাতহীন সত্যাগ্রহ হয়তো অনেক বেশি কার্যকরী হতে পারে। শাহিনবাগে তার শুরুটা আমরা দেখেছি। এখন দেখছি কৃষক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। এর থেকে কী বামপন্থীরা কিছু শিক্ষা নেবেন না?
বামপন্থীরা কী করবেন? সরকারে আসা গেল কি গেল না, সেটা কোনও বড়ো প্রশ্ন নয়। এই ধরনের আন্দোলনের সঙ্গী হওয়াটা এখন বামপন্থীদের প্রধান কাজ হওয়া উচিত। সিপিএমের দশ হাজার কর্মী যদি দিল্লির দরজায় কৃষকদের সঙ্গে খোলা আকাশের নীচে রাত জাগা শুরু করেন, দলটা সম্পর্কে মানুষের ধারণাই বদলে যেতে পারে রাতারাতি। সরকারেই যেতেই হবে, এই ধারণাটা বোধহয় বদলানোর সময় এসেছে।