২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের ভোটে সিপিআইএম প্রায় ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাদের প্রায় ২৪ শতাংশ ভোট কমে গিয়েছিল। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে সেই ভোট ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এই রেখাচিত্র থেকে পরিষ্কার সিপিআইএম-এর রক্তক্ষরণের ছবিটা। ২০০৪-এর লোকসভা নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক বিজেপির বিপদ ঠেকাতে কংগ্রেসকে সমর্থন করেছিল বামেরা। তখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। রানী রাসমনি রোডে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের এক সভায় বুদ্ধবাবু বলেছিলেন, কংগ্রেসকে আমরা সমর্থন দিয়েছি ঠিকই, তবে আমরা ওদের উঠতে বললে উঠবে, বসতে বললে বসবে। আজ রাজ্যে নিজেদের আরও পতন ঠেকাতে সেই কংগ্রেসের সঙ্গেই জোট করতে মরিয়া সিপিআইএম।
নয়-এর দশকের মাঝামাঝি থেকেই সিপিআইএম-এর দলীয় সংগঠন দল-অন্তপ্রাণ কর্মীদের দক্ষতায় নয় টিঁকেছিল প্রশাসনিক ক্ষমতার ওপরে। তাই ২০১১-তে এই প্রশাসনিক ক্ষমতা হারাতেই সিপিআইএম-এর দলীয় সংগঠন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণ করতে যাওয়াই সিপিআইএম-এর পতনের কারণ বলে যাঁরা মনে করেন আমি তাঁদের দলে নই। আমি মনে করি নয়-এর দশকের ওই মাঝামাঝি সময় থেকেই সিপিআইএম-এর সাংগঠনিক ভিঁতে পচন ধরতে শুরু করে। সেই সময় থেকে ২০১১ সালে ক্ষমতা হারানো পর্যন্ত সিপিআইএম-এর জেলাভিত্তিক পার্টির রিপোর্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সেখানে তথ্যের এদিক-ওদিক করে পরিস্থিতি অনুকূলে রয়েছে বলেই আলিমুদ্দিনকে জানানো হয়েছে।
সিপিআইএম-এর কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা আমাকে বলেছিলেন, ১৯৯৯ সালের নির্বাচনের আগে এইরকমই রিপোর্ট নিয়ে রাজ্য সম্পাদকমন্ডলীতে আলোচনা হয়। রাজ্য সম্পাদকমন্ডলীর সেই বৈঠকে সেই রিপোর্ট নিয়ে একমাত্র জ্যোতিবাবুই সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাসকে রিপোর্টের তথ্য তুলে তুলে কোন কোন কেন্দ্র নিয়ে জ্যোতিবাবু কি বলেছিলেন, তার মধ্যেই সিপিআইএম-এর রোগের লক্ষণ ধরা ছিল। একেবারে নীচুতলার সঙ্গে জ্যোতিবাবুর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিলনা বললেই চলে। তবু তিনি যে কি করে রাজনৈতিক বাস্তবতা আঁচ করতে পারতেন তা নিয়ে গবেষনা করা উচিত সিপিআইএম-এর। দীর্ঘদিন সংসদীয় ক্ষমতায় থাকার পার্শ প্রতিক্রিয়া হলো ক্ষমতায় আঠায় চোখ বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই কারনে দলের মধ্যে বছরের পর বছর ঘুণপোকা বাসা বাঁধলেও সিপিআইএম নেতারা তা দেখতে পাননি।
একেবারেই দেখতে পাননি বলাটা অবশ্য ভুল হবে, ১৯৯৭ সালে সংসদীয় ক্ষমতায় থাকার কারনে দলের বিচ্যুতি নিয়ে শুদ্ধিকরণ দলিল তৈরী করে সিপিআইএম। তাতে অবশ্য কোনও লাভ হয়নি। ক্ষমতায় থাকাটাই পাখীর চোখ হওয়ায় শুদ্ধিকরণের দলিল পরে থেকেছে এক দিকে আর সিপিআইএম-এর নেতৃত্বের নজর থেকেছে অন্যদিকে। ২০১১ সালে ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পরে, নির্বাচনি ফলাফল কাটাছেঁড়া করতে বসে সিপিআইএম। কাটা ছেঁড়ার পরে সিপিআইএম নেতারা বলেন ভোটে হারার অনেকগুলি কারণের মধ্যে অন্যতম একটি প্রধান কারণ হলো নেতাদের দুর্নীতি। অন্য অর একটি কারণ হলো সাধারণ মানুষকে পার্টি অফিসের ওপর নির্ভরশীল করে রেখে মৌরসিপাট্টা বজায় রাখা।
তাই গ্রামাঞ্চলে পঞ্চায়েত আর সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়ায় দাতা ও গ্রহীতার। সিপিআইএম-এর এই আত্মসমালোচনা থেকে বোঝা যায় শুদ্ধিকরণ দলিল তৈরি করে ঢাকঢোল বাজিয়ে শুদ্ধকরণ অভিযান হলো দুর্নীতিগ্রস্ত ও ক্ষমতালোভী নেতাদের বড়ো অংশই বহাল তবিয়েতে দলে থেকে গিয়েছেন। এই কারণেই নয়-এর দশকের শেষ দিকে প্রথম শোনা গিয়েছিল রাজ্য সম্মেলনের আগে লোকাল, ব্রাঞ্চ ও জোনাল কমিটিতে সাংগঠনিক নির্বাচনে পদে থেকে যেতে অনেক নেতা পার্টি সদস্যদের জামা-প্যান্টের পিস বা অন্য উপহার দিয়েছেন। এই সময় থেকেই সিপিআইএম-এর মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে নয়, দলের মধ্যে অনুগামী বাড়িয়ে সাংসদ, বিধায়ক, জেলাপরিষদের সভাধিপতি, পঞ্চায়েত সমিতি বা পঞ্চায়েতের প্রধান ও উপপ্রধান হওয়া শুরু। একইভাবে বছরের পর বছর জেলা সম্পাদক ও সম্পাদকমন্ডলীতে থেকে যাওয়াও শুরু। ফলে পঞ্চায়েত ও পার্টির সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বাড়া তখন থেকে শুরু।
(আগামীকাল দ্বিতীয় পর্ব)