রুশ বিপ্লবের মহড়া হয়েছিল ১৯০৫ সালে। সে বছরের ৯ জানুয়ারি রাস্তায় রক্তাক্ত সংঘর্ষ হয়। সেদিন গণমিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ফাদার গ্যাপন। সেই দিনটাকে বলা হয় ‘রক্তাক্ত রবিবার’ (ব্লাডি সানডে)। এই ফাদারকে বলশেভিকরা জার-এর চর বলতেন। কিন্তু সেদিনের ঘটনার পর লেনিন বলেছিলেন, মানুষের মূল্যায়ন করা অত সহজ নয়। ফাদার সম্পর্কে আমাদের ভুল স্বীকার করতে হবে।
ডা. বিধানচন্দ্র রায় ১৯৪৮ সালের ২৩ জানুয়ারি মুখ্যমন্ত্রী হন। তারপর অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তাদের নিজেদের নৈরাজ্যবাদী লাইনের জন্যই বেআইনি ঘোষিত হয়। তারপর হাইকোর্টের রায়ে ১৯৫০ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। সে সময় কমিউনিস্টরা বলতেন, মসনদে বসেছে নলিনী ও বিধান, বঙ্গের কূলবধূ হও সাবধান। তারপর পঞ্চাশ বছর ধরে অনেক ঝড়ঝাপ্টা গেছে। ২০০৬ সালে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের সময় বামপন্থীরা বলতেন, বিধান রায়ের আমলে উন্নয়নে আমরা বাধা দিইনি বরং সহযোগিতা করেছি। কথাটা কতটা সত্য, তা নিয়েও ভাবতে হবে। চিত্তরঞ্জন লোকমোটিভ ওয়ার্কস তৈরির সময় জমি অধিগ্রহণ করতে গেলে কৃষকরা বাধা দেন। পুলিশের গুলিতে ৬ জন সাঁওতাল চাষি নিহত হয়েছিলেন।
২০০৬ সালের ১ জুলাই মহাজাতি সদনের অ্যানেক্স হলে বিধানচন্দ্র রায় নিয়ে এক সেমিনারে বক্তা ছিলেন জ্যোতি বসু।
সেদিন বিধানচন্দ্র প্রশংসা করে জ্যোতি বসু বলেছিলেন, ১৯৫৮ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের রিপোর্ট মেনে ডা. রায় সল্টলেক উপনগরী গড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন আমরা তাঁর সমালোচনা করেছিলাম। এখন বুঝি ভুল করেছিলাম। ডা. রায় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। সল্টলেক না হলে এতো মানুষের মাথার উপর ছাদের ব্যবস্থা কোথায় হতো? জ্যোতি বসুর মুখে সেদিন ওইসব কথা শুনে বিস্মিত হয়েছিলাম। যাই হোক, জ্যোতি বসু বিধানচন্দ্র রায়ের আংশিক মূল্যায়ন সেদিন করেছিলেন। ২০২০ সালে বিধান ভবনে গিয়ে বামফ্রন্ট নেতারা যখন বিধানচন্দ্র রায়ের গলায় মালা দিলেন, তখন তাঁরা পুরোনো দিনের আর কি কি ভুল হয়েছে, সেগুলো নিয়ে ভাবুন।
ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম ১৮৮২ সালের ১ জুলাই। এ বছরের ১ জুলাই তাঁর ১৪০তম জন্মদিন ও একইসঙ্গে ৬১তম মৃত্যুদিন। কারণ তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন একই। তিনি পাটনায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৯০১ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। এমবিবিএস পাশ করার পর বিলেত গিয়ে এমআরসিপি ও এফআরসিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁকে বলা হতো ধন্বন্তরী চিকিৎসক। তিনি রোগীর নাড়ি দেখেই সুচিকিৎসায় দক্ষ ছিলেন।
সেই সময়টা ইংরেজ শাসন চলছে। বিধানচন্দ্র রায় জাতীয় কংগ্রেসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। তিনি মহাত্মা গান্ধীর চিকিৎসকও হয়েছিলেন। ১৯৩০ সালে তিনি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হন। ১৯৩০ দশকে তিনি দু-বার কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র হয়েছিলেন।
ডা. বিধানচন্দ্র রায় বাংলার উন্নয়নে যে কাজ করেছিলেন তার স্বাক্ষর আজও আছে। বিধানচন্দ্র রায় কিন্তু উন্নয়নের জন্য বিদেশি পুঁজি (এফডিআই) আনার জন্য ছটফট করতেন না। কেন্দ্রীয় সরকারকে চাপ দিয়ে চিত্তরঞ্জন, আসানসোল, দুর্গাপুরে অনেক কারখানা বসিয়েছিলেন। আবার দেশীয় শিল্পপতিদের ধরে তারাতলা-হাইড রোড, শ্রীরামপুর, হুগলি, হাওড়া, ব্যারাকপুর এলাকাতেও অনেক কারখানা তৈরি করিয়েছিলেন। ১৯৫০-৫১ সালে রাজ্য সরকারের বাজেট ছিল মাত্র ৩৮ কোটি টাকা। সেই টাকার মধ্য থেকেও কিছু টাকা খরচ করে তিনি হরিণঘাটায় সেন্ট্রাল ডেয়ারি, কলকাতা রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগম তৈরি করেছিলেন। কল্যাণী উপনগরী ও দিঘার মতো পর্যটন স্থল তৈরি করা ছিল বিধান রায়ের অন্যতম অবদান। মনে রাখতে হবে দেশভাগের পর ৭৬ লাখ উদ্বাস্তু আসেন। এই উদ্বাস্তুদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য বিধান রায় চেষ্টা করেছিলেন। সেজন্য তাঁকে প্রধানমন্ত্রী নেহরুর সঙ্গে পত্রযুদ্ধ করতে হয়েছিল। এ বিষয়ে ১৯৪৯ সালের ১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে তিনি একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে ছিল, “১৯৪৮-’৪৯ ও ১৯৪৯-’৫০ এই দুটি আর্থিক বছরে কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গকে ৩ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। বাকি ৫ কোটি টাকা ঋণ। আপনি কি মনে করেন না যে, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে যে টাকা খরচ হচ্ছে তার তুলনায় এটা অপ্রতুল?” ওই চিঠিতে আরও লিখেছিলেন, আমরা কেন্দ্রের কাছ থেকে দুর্ব্যবহার পেয়ে যাচ্ছি ও আয়কর থেকে আমাদের পাওনার অংশ কেন্দ্র নিয়ে নিচ্ছে।
চটশিল্পের কর থেকে আমাদের যা পাওনা তা থেকে আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে বলা হলো, আয়কর থেকে পশ্চিমবঙ্গের পাওনার পরিমাণ ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১২ শতাংশ করা হয়েছে। এই কমিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো, পশ্চিমবঙ্গ আয়করের ভাগ হিসেবে বছরে ৬ কোটি টাকা পেত, তা কমে সাড়ে ৩ কোটি টাকায় দাঁড়াল। অথচ বোম্বাই প্রদেশকে কেন্দ্রীয় করের পাওনা ২০ থেকে বাড়িয়ে ২১ শতাংশ করা হলো।… বিধান রায় ওই চিঠির শেষে লিখেছিলেন, কোনও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে গেলে যে যে সুস্পষ্ট লক্ষ্য থাকা দরকার কেন্দ্রীয় সরকারের তা নেই। ১৯৫৫ সালে মাশুল সমীকরণ নীতি চালু করলে বিধান রায় তার প্রতিবাদ করে নেহরুকে ফের চিঠি লেখেন। এই হলেন উন্নয়নের রূপকার বিধানচন্দ্র রায়।
মনে রাখতে হবে, বিধান রায়ের আমলে বিরোধী পক্ষে বাঘা বাঘা বক্তা ছিলেন। তাঁরা হলেন জ্যোতি বসু, সোমনাথ লাহিড়ী, রণেন সেন, মণিকুন্তলা সেন, হেমন্ত বসু প্রমুখ। বিরোধী দল এবং আন্দোলনের প্রতি ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের ব্যবহার কেমন ছিল তার দুটি উদাহরণ দিই।
১৯৫০ সালে সিপিআই-এর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা হাইকোর্ট তুলে দেয়। জ্যোতি বসু-সহ নেতারা মুক্তি পান। কিন্তু তখনও গোয়েন্দা পুলিশ জ্যোতি বসুকে ফলো করত। জ্যোতিবাবু মহাকরণে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়কে এ নিয়ে অভিযোগ জানান। মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে আইজি হীরেন সরকারকে ডাকেন। আইজিকে তিনি বলে দেন, বিরোধীদের বিরুদ্ধে কোনওরকম গোয়েন্দাগিরি চলবে না। এতে কাজ হয়।
দ্বিতীয় উদাহরণ হলো, বাংলা-বিহার সংযুক্তি প্রস্তাব বিরোধী আন্দোলনের সময়ের কথা। ১৯৫৬ সালে বিধানচন্দ্র রায় ও বিহারের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সহায় দুজনে মিলে বললেন, বাংলা ও বিহার এক হয়ে পূর্বদেশ নাম হবে। ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের সময় সেটা ছিল এক অদ্ভুত প্রস্তাব। এর বিরুদ্ধে বামপন্থীরা তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে। স্বাধীনতার পর বামপন্থীদের নেতৃত্বে যত আন্দোলন হয়েছে, সম্ভবত সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় আন্দোলন। একদিনে কলকাতায় ১৩-১৪টি বড় জনসভা হয়েছে। প্রতিটিতেই বাঘা বাঘা বক্তা ছিলেন।
সে সময় কলকাতা উত্তর-পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্রের বামপন্থী সাংসদ ড. মেঘনাদ সাহা মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে শূন্য আসনে উপনির্বাচন হয়। বিধান রায় একদিন জ্যোতি বসুকে ডাকেন। বলেন, তোমরা তো আমাদের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছো, এই উপনির্বাচনটা হবে গণভোট। আমাদের বাঘা প্রার্থী অশোক সেনকে হারাতে পারলে তোমাদের কথা মেনে নেব। জ্যোতি বসু সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। ভোটের ফল বেরোলে দেখা গেল, বামপন্থী প্রার্থী মোহিত মৈত্র জয়ী হয়েছেন। বিধানচন্দ্র রায় সেই সংযুক্তি প্রস্তাব ফিরিয়ে নেন। এমন গণতান্ত্রিক মনোভাব তাঁর ছিল।
বামপন্থীদের শক্তিকে তিনি সমীহ করতেন, গুরুত্বও দিতেন। ১৯৫৭ সালের ভোটে বৌবাজার বিধানসভা কেন্দ্রে ডা. বিধানচন্দ্র রায় অবিভক্ত সিপিআইয়ের প্রার্থী মহম্মদ ইসমাইলের বিরুদ্ধে মাত্র ৫৪০ ভোটে জেতেন। সেই ভোটে কলকাতায় বামপন্থীদের শক্তি খুব বেড়েছিল। কলকাতার ২৫টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস ৮টি পেয়েছিল। পরের ১৯৬২ সালের ভোটে ডা. বিধানচন্দ্র রায় নিরাপদ ভেবে চৌরঙ্গী কেন্দ্রে দাঁড়ান। এই অবস্থার অর্থ হলো, তখন ভোট ১০০ শতাংশ অবাধ হতো।
গণতন্ত্রে মিডিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতাকে কী চোখে দেখা হচ্ছে তা দেখে, বুঝে একজন রাজনীতিকের মূল্যায়ন করা যায়। বিধানচন্দ্র রায় ১৯৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। সে সময় তিনিই প্রথম সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা কোর্স চালুর উদ্যোগ নেন। ১৯৫১ সালে সেটি চালু হয়। সেদিন সাংবাদিকতার ডিপ্লোমা কোর্সের উদ্বোধন করে বিধান রায় বলেছিলেন, সাংবাদিকদের চিন্তার স্বাধীনতা অবশ্যই থাকতে হবে। সেখানে যেন রাজনৈতিক বিবেচনা ও মতাদর্শ বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ঘটনা লেখার সময় সাংবাদিক যদি রাজনৈতিক বিবেচনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন অথবা গড্ডালিকা স্রোতে ভেসে যান অথবা কাগজের বিক্রি বাড়ানোর জন্য লেখেন তাহলে সাংবাদিকের স্বাধীনতা সেখানেই শেষ হয়ে যায়। সাংবাদিকদের জন্য মহাকরণে তাঁরই ঘরের কাছে ও তাঁর যাতায়াতের পথে প্রেস কর্নার ডা. বিধানচন্দ্র রায় তৈরি করে দেন। ভারতের মধ্যে একমাত্র কলকাতাতেই রাজ্য সচিবালয়ে প্রথম প্রেস কর্নার চালু হয়েছিল। এর জন্য সাংবাদিকদের ঋণী থাকতে হবে ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে। ১৯৯৩ সালের ৭ জানুয়ারি বামফ্রন্ট সরকার ওই প্রেস কর্ণার ভেঙে দেয়।