তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাও করেছিলেন তৃণমূল প্রধান তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৫ মার্চ, শুক্রবার তিনি বলেছিলেন, রাজ্যে আবার পত্তন করা হবে বিধান পরিষদ। এ রাজ্যে পঞ্চাশ বছরেরও আগে বিলুপ্ত হওয়া পরিষদ আবার জাগিয়ে তোলার রাজনৈতিক ফলাফল কী হতে পারে, তা নিয়ে সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে চর্চা। প্রথমদিকে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ মহলেই এই চর্চা সীমাবদ্ধ থাকলেও ছবিটা পাল্টেছে তৃণমূলের ইস্তেহারে সেই কথা স্থান পাওয়ার পরে। বিধান পরিষদ নিয়ে সদ্য উত্থাপিত প্রসঙ্গেই স্মৃতিতে উঠে আসছে এই নিয়ে এক দশক আগের প্রস্তাবও।
৫ মার্চ যে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছিলেন মমতা, তাতে ৫৭ জন বর্তমান বিধায়ক, যাঁদের মধ্যে ৫ জন মন্ত্রী, সরাসরি বাদ পড়েছিলেন। পরবর্তীতে আরও কয়েকটি পরিবর্তন হয়েছে রাজ্যে শাসক দলের প্রার্থী তালিকায়। অনেকেই যে বার্ধক্য বা অসুস্থতার জন্যই বাদ গেছেন, সেটা কবুল করে ওইদিন মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বাদ পড়া মন্ত্রীদের মধ্যে অমিত মিত্র ও পূর্ণেন্দু বসুকে ভবিষ্যতে বিধান পরিষদ গড়ে সংসদীয় রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনবেন। এর ক’দিন পরে, ১৭ মার্চ দলের ইস্তাহার প্রকাশ করেন মমতা। সেই নির্বাচনি দলিলে স্পষ্ট ভাবে বিধান পরিষদ গড়ার উল্লেখ রয়েছে। তৃণমূলের ইস্তাহারে ‘বিধান পরিষদ পুনর্গঠন’ শিরোনামের অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে,
”আমরা রাজ্যের আইনসভায় একটি নতুন চেম্বার পুনরায় প্রবর্তন ও স্থাপন করব, যা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হবে, যাঁরা রাজ্যের কার্যকারিতায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। ভারতীয় সংবিধানের ১৬৯(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে রাজ্য বিধানসভায় একটি প্রস্তাব পাস করার মাধ্যমে বিধান পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হবে, তারপরে সংসদকে এটির জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে এর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে।”
এ রাজ্যে বিধান পরিষদের ইতিহাসের দেড় শতকেরও বেশি পুরনো দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। পরাধীন আমলে ১৮৬১ সালের আইন অনুসারে বাংলায় বিধান পরিষদ গঠিত হয়েছিল। সেই পরিষদে ছিল ইউরোপীয়দের প্রাধান্য, ক্ষমতাও ছিল সামান্য। এর পরে ব্রিটিশ আমলেই নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভারতীয়দের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এলেও প্রকৃত ক্ষমতা হাতে পায়নি বিধান পরিষদ।
স্বাধীন দেশে বিধান পরিষদ
১৯৫২ সালে সারা দেশে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে লোকসভা ও বিধানসভাগুলি। সে সময়ে রাজ্যে উচ্চকক্ষ হিসেবে থেকে যায় বিধান পরিষদ। ১৯৫৭ সালে সংবিধান সংশোধন করে পশ্চিমবঙ্গে বিধান পরিষদের আসনসংখ্যা ৫১ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ করা হয়। বামপন্থীরা বরাবরই বিধান পরিষদের বিরোধী ছিলেন। তাঁদের মত ছিল, এটা সরকারি তহবিলের অযথা অপব্যয়। কিন্তু ক্ষমতসীন কংগ্রেস বিধান পরিষদে নিজেদের অনেক নেতা তথা সমাজের বিশিষ্টদের জায়গা দিতেন। ১৯৬৭ সালে রাজ্যে সিপিএম সহ বামপন্থীরা এবং কংগ্রেস-ছুট বিধায়কদের নিয়ে প্রথম যুক্তফ্রন্ট গড়ে উঠলেও তা মাত্র কয়েক মাস স্থায়ী হয়। আবার বিধানসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, উপমুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন জ্যোতি বসু। এই আমলেই ১৯৬৯ সালে রাজ্যে কংগ্রেস বিরোধী যুক্তফ্রন্ট সরকার রাজ্যে বিধান পরিষদ বিলুপ্ত করে। এই মর্মে বিধানসভায় উপযুক্ত গরিষ্ঠতায় গৃহীত প্রস্তাব সংসদের উভয় কক্ষে পাশ হবার পরে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করেছিলেন।
কারা ভোট দিয়ে বিধান পরিষদের সদস্য নির্বাচন করেন?
বিধান পরিষদের এক-তৃতীয়াংশ নির্বাচিত হয় নানা স্তরের পঞ্চায়েত ও পুরসভা সদস্যদের ভোটে। অপর এক-তৃতীয়াংশ আসেন রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের মধ্যে ভোট নিয়ে। ছয় ভাগের এক ভাগ মনোনীত করেন রাজ্যপাল। সমাজের নানা ক্ষেত্রে কৃতি মানুষদেরই রাজ্যপাল মনোনয়ন দেন। বারো ভাগের এক ভাগ রাজ্যের গ্র্যাজুয়েটরা (যারা অন্তত তিন বছর আগে গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন) নির্বাচন করেন। অবশিষ্ট বারো ভাগের এক ভাগ শিক্ষকরা (যারা অন্তত তিন বছর শিক্ষকতা করেছেন) নির্বাচন করেন। ধরা যাক বিধান পরিষদের সদস্য ৬০ জন। সেক্ষেত্রে ২০ জনকে পঞ্চায়েত ও পুরসভার সদস্যরা, ২০ জনকে বিধায়করা নির্বাচন করেন। ১০ জনকে রাজ্যপাল মনোনয়ন দেন। পাঁচজনকে গ্র্যাজুয়েটরা ও অবশিষ্ট পাঁচজনকে শিক্ষকরা নির্বাচিত করেন।
বিধান পরিষদের প্রস্তাব – ২০১১
২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। সে সময় তিনি দেশের রেলমন্ত্রী ছিলেন। তৃণমূল ও জাতীয় কংগ্রেসের জোট সেবার রাজ্যে ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটায়, বিধানসভার সদস্য না হয়েও মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আইন অনুযায়ী তাঁকে ছ’মাসের মধ্যে বিধানসভার সদস্য হতে হতো। মুখ্যমন্ত্রী হয়েই মমতা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন, যার মধ্যে ছিল রাজ্যে বিধান পরিষদ গঠনের কথাও। পরিষদে বুদ্ধিজীবী সহ নানা ক্ষেত্রের মানুষদের জায়গা করে দিতে চেয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু এ নিয়ে আপত্তি ওঠে। তৃণমূলের সঙ্গে তখন জোটে ছিলেন এসইউসি দল। এসইউসি রাজ্যে নতুন করে পরিষদ গড়ার ধারণার বিরোধিতা করে। সেসময় তৃণমূল সমর্থক বড় অংশের বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও আপত্তি জানায়। তা সত্ত্বেও ২০১১-র জুনে বিধান পরিষদ সংক্রান্ত বিল বিধানসভায় পেশ করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। বিধানসভায় এহেন বিল উপযুক্ত গরিষ্ঠতায় পাশ হতে হবে। সংবিধানের ১৬৯(১) ধারা অনুযায়ী বিধানসভার সদস্যসংখ্যার অর্ধেকের বেশি অথবা উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ বিধান পরিষদ গড়ার বা বিলুপ্ত করার প্রস্তাবে সমর্থন দিলে তা গৃহীত হয়েছে বলে ধরা হবে। বিধানসভায় পাশ হলেও তা পাঠাতে হবে সংসদে। সংসদের দুই কক্ষের সমর্থন পেলে এবং রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর মিললে তবে তা আইনে পরিণত হবে। সেটা কতদিনে হবে, বা আদৌ হবে কি-না, সেটা তখন বলা মুশকিল ছিল। এদিকে মমতাকে ছ’মাসের মধ্যে নির্বাচিত হতেই হবে। এই অবস্থায় কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত বিধায়ক তৃণমূলের সুব্রত বক্সি পদত্যাগ করেন, উপনির্বাচনে মমতা বিপুল ব্যবধানে নির্বাচিত হন। এর পরে আর বিধান পরিষদ গড়ার উদ্যোগ নিয়ে নাড়াচাড়া হয়নি।
বেশি বয়স হয়ে যাওয়া কয়েকজন বিধায়ককে ২০২১ সালে মনোনয়ন দেয়নি তৃণমূল। সে প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়েই বিধান পরিষদ গড়ার কথা প্রথম তোলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। পরে রাজ্যের শাসক দলের ইস্তাহারে অবশ্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কথা উল্লিখিত হয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ রাজ্যেই বিধান পরিষদ অবলুপ্ত হলেও কয়েকটি রাজ্যে তা রয়েছে। এই রাজ্যগুলি হলো বিহার, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও উত্তরপ্রদেশ। বিধান পরিষদের ক্ষমতা খুবই সামান্য। কোনো অর্থবিলে বিধান পরিষদ মত দিতে পারে না। যেসব বিলে পারে, সেখানে বেশ খানিকটা বাড়তি সময় লেগে যায় রাজ্যের দুই কক্ষ থেকে পাশ হতে। সমালোচকরা মনে করেন, সরাসরি জনগণ দ্বারা নির্বাচিত বিধানসভা থাকতে বিধান পরিষদ সরকারি তহবিলের উপর অপ্রয়োজনীয় বোঝা।
তবে এটাও ঠিক, সমাজের বিশিষ্ট মানুষ, যেমন বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, কবি, চিকিৎসক ইত্যাদিদের অনেকেই ভোটে দাঁড়াতে চান না। তাই এঁদের কথা আইন প্রণয়নের সময় শোনার কোনো বিধিবদ্ধ উপায় নেই। বিধান পরিষদ গঠিত হলে এঁরা এঁদের মত জানাতে পারবেন। তবে বিশিষ্টদের কীভাবে চিহ্নিত করা হবে, তা নিয়ে থেকে যাবে ধোঁয়াশা। যাই হোক, এই প্রস্তাব এখনও পর্যন্ত কেবলই একটি প্রস্তাব। সত্যিই তেমন কিছু হবে কি-না, তা রয়েছে ভবিষ্যতেরই গর্ভে।