ফেলে আসা বছরটা নিয়ে কোন কথা উঠলেই সবাই বলছেন— গেলেই বাঁচি। বছরভোর বিপর্যয় ও মৃত্যুর এই যুগলবন্দী গত ১০০ বছরে মানুষ দেখেনি। কিন্তু মৃত্যু আর ধ্বংসের ঘেরাটোপ সরিয়ে বছরটার দিকে তাকালে দেখা যাবে ২০২০ হল মনুষ্যত্বের জয়ের বছর। যুদ্ধ, দাঙ্গা হাঙ্গামা কিংবা খুনোখুনি নয়, শুধু মানুষকে ভালোবেসে তাদের বাঁচাতে প্রাণ দিয়েছেন বহু মানুষ। একটু ভালোভাবে মনে করার চেষ্টা করুন, দেখবেন এমন ঘটনা সাম্প্রতিক অতীতে তো বটেই দূর অতীতেও ঘটেনি। কোভিড মোকাবিলা করতে গিয়ে গোটা পৃথিবী জুড়ে মারা গেছেন অসংখ্য চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী। গত ২ অক্টোবর অবধি পাওয়া একটা হিসেবে দেখলাম দেশে প্রায় ৪৫৪ জন ডাক্তার মারা গেছেন। এর মধ্যে ৫১ জন পশ্চিমবঙ্গের, দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এরা সবাই কোভিড শহিদ। এই মহামানবেরা কিন্তু আমাদের মধ্যেই ছিলেন।
২০২০কে আরও একটি কারণে মনে থাকবে, যুদ্ধ বিগ্রহ, অর্থনৈতিক মারপ্যাঁচ, পরিবেশ দূষণ ইত্যাদি নানা প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত পৃথিবী অতিমারি মোকাবিলায় এক হয়ে লড়েছে। একই লক্ষ্যে, একই কর্মসূচি নিয়ে কাজ করেছে মানুষ। অতিমারি যেন বাঘে গরুকে এক ঘাটে জল খাইয়ে ছেড়েছে। আমাদের দেশনায়করা এই পরিস্থিতিতে যে একটা চূড়ান্ত কান্ডজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন একথা ঘোর নিন্দুকরাও স্বীকার করবেন। নাহলে একইসঙ্গে দ্রুত তিনটি কোভিড ভ্যাকসিন আসতো না। কোভিড দ্রুত গতিতে ছড়িয়েছে। তার চেয়েও দ্রুত গতিতে এসেছে ভ্যাকসিন। পারস্পরিক সহযোগিতা, চিন্তাভাবনার বিনিময় এবং এক হয়ে লড়াই করার মানসিকতা না থাকলে এটা সম্ভব হত না। এর আগে পৃথিবীতে এত দ্রুত কোন মারণরোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্য আসেনি। ২০২০ যেন আমাদের বলে গেল, চেষ্টা, ইচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে অসাধ্য সাধন করতে পারে মানুষ।

ফেলে আসা বছরে অতিমারির বিভীষিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপর্যয়ের তান্ডব। নিসর্গ, নিভার, আমফান, বুরেত্তি’র মত ঘূর্ণিঝড় তছনছ করে দিয়েছে পাঁচ মহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এ বছরেই আমরা দেখেছি মহাকাব্যে পড়া দাবানলের ভয়ঙ্কর চেহারা। বহুদিন পর আকাশ অন্ধকার করে রাজ্যের পর রাজ্যে হানা দিয়েছে পঙ্গপালের ঝাঁক। নতুন প্রজন্ম এসব দেখা তো দূরের কথা, নামও শোনেনি। ২০০৮ এর পর পৃথিবী এত বড় আর্থিক মন্দাও দেখেনি। ২০২০তে এরা সবাই এসে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়ে গেল। মানুষের সক্রিয়তায় অবশেষে এসবই প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।
সবচেয়ে অবাক হওয়ার মত কথা হল, এসবের মোকাবিলা করার জন্য পৃথিবীর নুন্যতম প্রস্তুতিও ছিলনা। বছরের গোড়াতেই আইএমএফ বলেছিল এ বছর বিশ্বের মানুষদের আয় ৩ শতাংশ বাড়বে। বছর শেষে আমরা দেখলাম হয়েছে ঠিক উল্টোটা। তবুও মৃত্যু, ধ্বংস, বিপর্যয় মানবজাতির ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে পারেনি। বাঁচার তাগিদে মানুষ লড়ে গেছে কালব্যাধি ও ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়ের সামনে। ম্যানকাইন্ড কথাটা আমরা আকছার ব্যবহার করি। ২০২০ যেন কথাটার ওজন আমাদের বুঝিয়ে দিল।
নতুন বছর যারা খুল্লামখুল্লা মুখোশহীন উল্লাসে মাতবেন, তারা শুধু মনে রাখবেন, মানুষকে বাঁচাতে প্রাণ দেওয়া মানুষগুলির কথা। শারীরিক দুরত্ববিধি ভেঙে, মুখোশহীন জমায়েতে, ভিড়ে যাওয়া মানে এই মানুষগুলিকে অপমান করা। তাদের সাফল্যকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দেওয়া। আপনাদের বেঁচে থাকাকে মানুষগুলি গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু তাদের মৃত্যুকে আপনারা কোন গুরুত্ব দিলেন না।
শুধুই নিজেদের স্বার্থ আর ভালোমন্দ নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানুষ ২০২০তে চিনতে শিখলো মানব সম্প্রদায়কে। ভাবতে শিখলো তাদের ভালোমন্দের কথা। ফেলে আসা বছরটি মোটেই কোন অন্ধকারাচ্ছন্ন সময় নয়। বরং হঠাৎ আলোর ঝলকানির মত এই বছরটিতেই আমরা দেখতে পেয়েছি মানুষের ভুলে যাওয়া মুখ। দেখেছি মানুষের সেবাধর্মের চেহারা। কবিতায় পড়েছি মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক। সেই নরকের চেহারা দেখতে অভ্যস্ত মানুষকে ২০২০ দেখালো স্বর্গের চেহারা। জয় হোক মানুষের।